ডব্লিউএইচএ-এর ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা

প্রকাশিত: ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ, মে ২৬, ২০২০

ডব্লিউএইচএ-এর ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা

বেইজিং (চীন), ২৬ মে ২০২০: সংহতি এবং সহযোগিতার মাধ্যমে কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সবার জন্যে স্বাস্থ্যের বৈশ্বিক সম্প্রদায় গঠন

ওয়ার্ল্ড হেলথ ‍অ্যাসেম্বলির সভাপতি
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মহাপরিচালক
প্রিয় প্রতিনিধিবৃন্দ,

একেবারে শুরুতেই আমাকে বলতে হয় যে, যখন সমগ্র মানবজাতি নভেল করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত, সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি লক্ষণীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সবচেয়ে মারাত্মক বৈশ্বিক স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থার মুখোমুখি রয়েছি। সারা পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে কোভিড-১৯ ২১০টির অধিক দেশ ও অঞ্চলে সংক্রমণ ঘটিয়েছে, সাত বিলিয়ন মানুষকে আক্রান্ত করেছে এবং তিন লক্ষের বেশি মানুষের মূল্যবান জীবন কেড়ে নিয়েছে। প্রত্যেকটি মানুষের মৃত্যুতে আমি শোক প্রকাশ করছি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।

মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এবং দুর্যোগের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধতার ইতিহাস। ভাইরাস কোন সীমানা প্রাচীর মানে না। না কোন জাতিগোষ্ঠী অথবা জাতীয়তাকে, যখন সেই রোগ বিস্তার লাভ করে। কোভিড-১৯ ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবেলায়ও কোন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই পিছু হটেনি। সব দেশের জনগণই চলমান ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সারা পৃথিবীতে মানুষ একে অপরের দিকে লক্ষ্য রেখেছে এবং একাত্ম হয়ে গেছে। কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমরা ভালোবাসা এবং সহমর্মিতা নিয়ে অসাধারণ ঐকতান গড়ে তুলেছিলাম।

চীনে চরম প্রচেষ্টা এবং ব্যাপক ত্যাগের পরে আমরা ভাইরাসটির গতিপথ রুখে দিতে এবং আমাদের জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পেরেছি। পুরো সময়টা জুড়ে আমরা খোলামেলা মনোভাব, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছি। আমরা ডব্লিউএইচও (WHO) এবং আক্রান্ত দেশগুলোকে যথাসময়ে তথ্য সরবরাহ করেছি। আমরা জিনোমটির (Genome) গতিপ্রকৃতি যথাশীঘ্র প্রকাশ করেছি। আমরা কোনরকম রাখঢাক ছাড়াই সারা পৃথিবীর সাথে ভাইরাসটির নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসাবিষয়ক আমদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছি। আমাদের ক্ষমতার ভেতরে যা কিছু করা সম্ভব সাহায্য প্রত্যাশী দেশগুলোকে সব ধরণের সহযোগিতাই করেছি।

জনাব সভাপতি,

এমনকি এখন যে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি ভাইরাসটি কিন্তু তৎপর আছে এবং এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে আরো অনেক কিছুই করতে হবে। এই পর্যায়ে আমি নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলো পেশ করতে চাইঃ

প্রথমত, কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসার জন্য আমাদের যা কিছু করণীয় তা আমাদের করতেই হবে। এটিই এখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমাদের সবকিছুর আগে জনগণকে ‍অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই পৃথিবীতে নেই। আমাদের অবশ্যই যেখানে সবচেয়ে বেশি দরকার সেখানেই দক্ষ চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রেরণ করতে হবে। প্রতিরোধ, কোয়ারেন্টাইন, সনাক্তকরণ এবং পথ অনুসরণের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আমাদের শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। পৃথিবীব্যাপী ভাইরাসটির সংক্রমণ বিস্তার রোধ করতে এবং আন্ত-সীমান্ত সংক্রমণ ছেটে দিতে আমাদের যত দ্রুত সম্ভব অগ্রসর হওয়া দরকার। আমাদের দরকার তথ্য শেয়ার করা, অভিজ্ঞতা ও সবচেয়ে কার্যকর অনুশীলনের আদান-প্রদান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা, পরীক্ষা পদ্ধতি, চিকিৎসা এবং ভ্যাক্সিন ঔষধ গবেষণা ও উন্নয়নের ব্যাপারে এগিয়ে আসা। আমাদের দরকার বিজ্ঞানীদের দ্বারা ভাইরাসটির উৎস, সংক্রমণের পথ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা।

দ্বিতীয়ত, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের উচিত বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়াকে নেতৃত্ব দেওয়া। ডঃ টেড্রোসের নেতৃত্বে, ডব্লিউএইচও কোভিড-১৯-এর প্রতি বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়াকে নেতৃত্ব প্রদান এবং এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল অবদান রেখেছে। তাঁর এই ভালো কাজটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা পেয়েছে। এরকম এক বিরূপ সময়ে ডব্লিউএইচও’কে সমর্থন করাটা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানুষের জীবন বাঁচানোর যুদ্ধকে সমর্থনের শামিল। চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ডব্লিউএইচও’র প্রতি রাজনৈতিক এবং আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সকল সম্পদ জড়ো করার আহ্বান জানাচ্ছে।

তৃতীয়ত, আমাদের অবশ্যাই আফ্রিকা, উন্নয়নশীল দেশসমূহ, বিশেষত আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশসমূহ যাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মান দুর্বল তাদের জন্য বেশি বেশি সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। কোভিড-১৯-এর প্রতিক্রিয়ায় তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সাহায্য প্রদানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য দ্রব্যসামগ্রী, প্রযুক্তি এবং জনবল সহায়তা প্রদান আজ বিশ্ববাসীর দরকার। চীন ৫০টিরও অধিক আফ্রিকার দেশ ও আফ্রিকান ইউনিয়নের জন্য প্রচুর পরিমাণ চিকিৎসা সামগ্রী এবং সহায়তা পাঠিয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের পাঁচটি দলও পাঠানো হয়েছে। সর্বসাকুল্যে বিগত সাত দশক ধরে ২০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ চীনা চিকিৎসা দলের পক্ষ থেকে সেবা এবং চিকিৎসা পেয়েছে। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে কোভিড-১৯ দমন প্রচেষ্টায় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ৪৬টি চীনা চিকিৎসক দল আফ্রিকায় কাজ করে যাচ্ছে।

চতুর্থত, জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টাকে আমাদের অবশ্যই জোরদার করতে হবে। এই করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমরা মানব জাতি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবো। তবুও আমাদের দ্বারপ্রান্তে আসা স্বাস্থ্যঝুঁকির হুমকি এখানেই শেষ না-ও হতে পারে। কোভিড-১৯-এর দেখিয়ে দেওয়া আমাদের দুর্বলতা ও ঘাটতির আলোকে আমাদের জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য এ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা দরকার। জনস্বাস্থ্যগত জরুরী অবস্থা এবং বৈশ্বিক মহামারী মোকাবেলায় সরবরাহ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার জন্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে আমাদের অতি দ্রুত সঞ্চয় কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। কোভিড-১৯’কে নিয়ন্ত্রণে আনার পরে আমাদের অভিজ্ঞতার সারসংকলন ও ঘাটতিগুলো দূর করার জন্য বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া এবং বোধগম্য পর্যালোচনা ভাবনাকে চীন সমর্থন করে। এই কাজটি হতে হবে ডব্লিউএইচও-এর নেতৃত্ব এবং বিজ্ঞান ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে।

পঞ্চমত, আমাদের অবশ্যই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ধরে রাখতে হবে। ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে চলমান কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার সময়ে যেখানেই পরিবেশ অনুকূল মনে হবে সেখানেই ডব্লিউএইচও’র পেশাদারী নির্দেশনা মেনে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় স্কুল, কলেজ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরায় চালু করতে হবে। এর মধ্যেও, আন্তর্জাতিক বৃহদাকার অর্থনৈতিক সমন্বয় এগিয়ে নিতে হবে এবং যদি আমাদের বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তবে বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদন ও সরবরাহ শেকল স্থির ও বাধামুক্ত রাখতে হবে।

ষষ্ঠত, আমাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। মানবজাতি হবে ভবিষ্যতকে ভাগাভাগি করে নেওয়ার একটি সম্প্রদায়। এই ভাইরাসটিকে পরাজিত করতে সংহতি ও সহযোগিতা হলো আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এটাই হলো মূল শিক্ষা যা এইচআইভি/এইডস, ইবোলা, আভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইনফ্লুয়েঞ্জা এ(এইচ১এন১)-র মতো বড় বড় বিশ্বজনীন মহামারী থেকে পৃথিবী শিখেছে। এবং সংহতি ও সহযোগিতা হলো একটি নিশ্চিত উপায় যার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর মানুষ এই নভেল করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করতে পারি।

জনাব সভাপতি,

চীন সব সময় মানবজাতির জন্যে একটি শেয়ার করার মতো ভবিষ্যৎ সম্পন্ন একটি সম্প্রদায় গঠনের লক্ষ্যে দাঁড়িয়ে আছে। চীন শুধুমাত্র নিজ দেশের নাগরিকদেরই নয়, বরং সারা বিশ্বের মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করাকে একটি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে। কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বেগবান করার তাগিদে, আমি নিম্নলিখিত বিষয়গুলো ঘোষণা করতে চাইঃ

– চীন কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত দেশগুলোতে বিশেষত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতি সাড়া দিতে দুই বছরে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে চায়।

– চীন, চীনে বৈশ্বিক মানবিকতা রেসপন্স ডিপো ও হাব গড়ে তুলতে, বিশ্বজনীন মহামারীতে সরবরাহ শেকলের কার্যক্রম নিশ্চিত করতে এবং দ্রুত গতিশীল পরিবহন ও কাস্টম ক্লিয়ারেন্স সহজীকরণে ‘সবুজ বেষ্টনী’ গড়ে তুলতে জাতিসংঘের সাথে কাজ করবে।

– চীন তার দেশের হাসপাতালগুলোর জন্য একটি সহযোগিতা-কৌশল প্রতিষ্ঠা করবে, যাতে তারা আফ্রিকার ৩০টি হাসপাতালের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এবং মহাদেশটিতে রোগবিষয়ক প্রস্তুতি ও নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বাড়াতে আফ্রিকা সিডিসি’র সদর দপ্তর তৈরিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

– চীনে কোভিড-১৯ ভ্যাক্সিন উন্নয়ন ও প্রয়োগ যখন থেকেই চালু হবে তখন থেকেই সেটি বিশ্বজনীন গণ-পণ্য করে দেওয়া হবে। এটি হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ভ্যাক্সিন প্রাপ্তি ও ভোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চীনের অবদান।

– চীন গরীব দেশগুলোর জন্য ঋণ সেবা স্থগিত উদ্যোগ কার্যকরকরণে জি-২০ ভুক্ত অন্যা্ন্য দেশগুলোর সাথে কাজ করবে। চীন সবচেয়ে গুরুতরভাবে আক্রান্ত দেশগুলো যারা ঋণ সেবার তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে তাদের প্রতি সহযোগিতা জোরালো করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত, যাতে সে-সব দেশ চলমান সংকট থেকে উদ্ধার পেতে পারে।

উপসংহারে আমি সকলকে একত্রিত হওয়ার এবং একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাই। চলুন, আমরা সব দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে ও স্বাস্থ্যরক্ষায় সমন্বিতভাবে কাজ করি। চলুন, আমরা আমাদের প্রিয় গ্রহ পৃথিবীকে রক্ষা করতে একসঙ্গে কাজ করি। চলুন, সবার জন্যে স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায় গড়ে তুলি।

সবাইকে ধন্যবাদ।

ইংরেজি থেকে বঙ্গানুবাদঃ বিপ্লব রঞ্জন সাহা

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ