মহামারির হাত ধরে কি আসছে চীন-মার্কিন শীতল যুদ্ধ?

প্রকাশিত: ১:৫১ অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২০

মহামারির হাত ধরে কি আসছে চীন-মার্কিন শীতল যুদ্ধ?

কাজী জেসিন, ০২ জুন ২০২০ : যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ উত্থানের শুরু থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদিন প্রেস কনফারেন্স করছেন। আর, এই প্রেস কনফারেন্স এই করুণ মহামারির কালেও কখনও সাধারণ মানুষের মনে যোগাচ্ছে হাসির খোরাক কিংবা উদ্বেগ।

তিনি প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো সাংবাদিকের উপর চড়াও হচ্ছেন, তাদের উত্থাপিত প্রশ্ন পছন্দ না হলেই। “জঘন্য প্রশ্ন” হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে প্রিয় জবাব।
সম্প্রতি তিনি তাঁর চির চেনা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় চড়াও হন, সিবিএসের সাংবাদিক ওয়েজিয়া জিয়াং-এর উপর। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “হয়তো এই প্রশ্ন আপনার করা উচিৎ চীনকে। আমাকে না, চীনকে প্রশ্ন করেন, ঠিক আছে?”
অদ্ভুত কথা।
সাংবাদিক ওয়েজিয়া জিয়াং: প্রশ্ন করলেন আমেরিকা নিয়ে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বললেন চীনকে জিজ্ঞেস করতে!
মিজ ওয়েজিয়া প্রশ্ন করেছিলেন: “কেন ট্রাম্প বরাবর ভুলভাবে দাবি করে আসছেন যে করোনা ভাইরাস টেস্টিংয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য সব দেশের চেয়ে ভালো করছে? কেনই-বা এই তুলনা প্রয়োজন?”
এই প্রশ্নের জবাব চীনকে কেন করতে হবে? নাকি ট্রাম্পের মনোজগতে খেলা করছে চীন ইস্যু?
ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই বারবার করোনা ভাইরাসকে বলছেন “চায়না ভাইরাস”। তিনি করোনা ভাইরাসকে চীনের ল্যাবে তৈরি মানব-সৃষ্ট জীবাণু-অস্ত্র বলেও মন্তব্য করেন। এমনকি চীনের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট অভিযোগ করে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুব স্পর্শকাতর সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অর্থায়ন বন্ধ করেন।
এটা এখন দৃশ্যমান যে ইউ.এস.-চীন সম্পর্কের উপর সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলি খুব নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এরই মধ্যে গত ২৪ মে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই চীনা সংসদের অধিবেশনে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,” গত কয়েক দশক ধরে দুই দেশের সহযোগিতার ফলে যে সুফল সৃষ্টি হয়েছে, তা নষ্ট করলে তাতে আমেরিকার নিজের ক্ষতি তো হবেই, পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতা এবং সচ্ছলতা হুমকিতে পড়বে।”
ট্রেড ওয়ার
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপড়েন নতুন কিছু না। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই এই সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিকে বলেন “ট্রেড ওয়ার” বা “বাণিজ্য-যুদ্ধ”।
হয়তো সাধারণ মানুষকে বিষয়টা অবাক করে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার জমজমাট হয়ে আছে চীনা পণ্যে। আমেরিকার সবচেয়ে বড় সুপার স্টোর আমাজন, টার্গেট, কস্টকো-র শেলফগুলো চীনা পণ্যে ভর্তি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯০ মিলিয়ন মানুষ আই ফোন ব্যবহার করে, আর এই আই ফোনও প্রস্তুত হয় চীনে।
তৃতীয় বৃহত্তম বাজার:
বাণিজ্য যুদ্ধ বন্ধের জন্য এ বছর করা নতুন বাণিজ্য চুক্তি বিভিন্ন সেক্টরের জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে এ্যাপেলকে। কারণ, এ্যাপেলের বেশিরভাগ উপাদানই তৈরি হয় চীনে। শুধু তাই নয়, চীন এ্যাপেলের তৃতীয় বৃহত্তম বাজার।
নতুন বাণিজ্য চুক্তি ইতিমধ্যে চীনকে এমন একটি পরিস্থিতিতে ফেলেছে যেখানে হয় এ্যাপেলের মুনাফা কমে যাবে নয়তো আই ফোনের দাম বেড়ে যাবে। আই ফোন এক্সএস-এর দাম সেক্ষেত্রে বাড়তে পারে ১৬০ ডলার।
কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি চীন- যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে ইতিমধ্যে এমন একটা অবস্থায় এনেছে যেখানে ট্রেড ওয়ার সমাপ্তি নয়, বরং এখন নতুন করে শঙ্কা দেখা দিচ্ছে শীতল যুদ্ধের। অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের হাত ধরে ইতিমধ্যে ফাটল ধরা সম্পর্ক এখন ধাবিত হচ্ছে সেদিকেই।
নতুন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
মার্কিন ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য-প্রমাণ না পাবার পরও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যকে সমর্থন করেন। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নিয়ে যাচ্ছে নতুন বৃহৎ সংকটের দিকে।
আর তা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা ট্রাম্পকে বলতে শুনি, “আমরা অনেক কিছুই করতে পারি। সম্পূর্ণ সম্পর্কই আমরা শেষ করে দিতে পারি।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প: ”সম্পূর্ণ সম্পর্কই আমরা শেষ করে দিতে পারি।”
চীন বিষয়ে এটাই তার সবচেয়ে কঠোর মন্তব্য যাকে বিশেষজ্ঞরা পাঠ করছেন একটা শীতল যুদ্ধের ইশারা হিসাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কিন-চীন শীতল যুদ্ধের সূত্রপাত হলে তা দুই দেশের উপর বা সারা বিশ্বের উপর কি প্রভাব ফেলবে?
দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের একটি বড় অস্বস্তির জায়গা হলো চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি। মার্কিন-চীন বাণিজ্য ১৯৮০ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৩১ বিলিয়ন ডলারে উন্নতি হয়। আজ মার্কিন-চীন বাণিজ্য ঘাটতি সার্ভিস এবং পণ্য মিলিয়ে ২০১৯ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী দাঁড়িয়েছে ৬১৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার যা গত বছরের চেয়ে ১০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার কম।
গত প্রায় এক যুগ ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেবার পরও ওয়াশিংটন এই বিশাল বাণিজ্য বৈষম্যের কমার ক্ষেত্রে কোনো আলোর দিশা পায় নি। এর নেপথ্যে কাজ করেছে চীনের দুর্লভ ধাতু বা রেয়ার আর্থ মেটাল, যা আই ফোন থেকে শুরু করে মিলিটারি জেট ইঞ্জিনের মতো বহু পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয়।
চীনের বায়ান ওবোতে রেয়ার আর্থ মেটাল-এর সব চেয়ে বড় মজুত আছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আদামাস ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী দুর্লভ ধাতু ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদনে বিশ্বের মোট সক্ষমতার ৮৫ শতাংশই চীন নির্ভর। আর, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় দুর্লভ ধাতুর ৮০ শতাংশ আমদানি করা হয়েছে চীন থেকে।
গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিলের মতে, চীন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবার পথে রয়েছে। প্রশ্ন হলো বাণিজ্য নীতিমালায় কি প্রতিবন্ধকতা ছিল যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে দিয়েছে? শুধু এই দুর্লভ ধাতু বা রেয়ার আর্থ মেটালই কি ছিল চীনের অস্ত্র নাকি এর নেপথ্যে আছে অন্য আরও কোনো কারণ?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভেতরে যখন চলছে ধুন্ধুমার বাণিজ্য যুদ্ধ, তখন সবচেয়ে বড় মার্কিন সংস্থাগুলি, জেপি মরগ্যান চেজ এন্ড কোম্পানি, গোল্ডম্যান স্যাক্স গ্রুপ ইনকর্পোরেশান, বেইজিংয়ের শীর্ষ নীতি নির্ধারকদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠক হয় বেইজিংয়ের ফাইনানশিয়াল স্ট্রিটের রিটজ-কার্লটন হোটেলে, যেখানে অংশ নেন পিপলস্ ব্যাংক অব চায়নার গভর্নর ইগাং ও চীন সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
বার্লিনে চীন প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক দেয়াল অঙ্ক
ব্লুমবার্গ-এর প্রতিবেদন অনুসারে “ট্রেড ওয়ার” ওয়াল স্ট্রিটের চীনে ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ থামাতে পারে নি। কৌতূহল বেড়ে যায় আরও যখন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্সের প্রফেসর মাইকেল পেটিস বলেন, “চীন তার আর্থিক বাজার সংস্কার করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং চীন জানে যে বড় আমেরিকান খেলোয়াড় ছাড়া অনেক কঠিন হবে সত্যিকার অর্থে একটি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য কথা বলা।”
তিনি আরও বলেন,” চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লবি সাপোর্ট নিযুক্ত করাও খুব স্বাভাবিক।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন চীনের সাথে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুল পয়েন্টগুলো মিস করেছে। এমনকি বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে গত জানুয়ারির বাণিজ্য সমঝোতা চুক্তির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে,পণ্যের মানের চেয়ে, পণ্যের পরিমাণের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তিরিশ বছর আগে চীনে বেশি রপ্তানি করতো আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর পণ্য, যেমন এয়ার ক্রাফট আর চীন মূলত: রপ্তানি করতো ভোগ্যপণ্য যেমন কাপড়, জুতো। এখন ঠিক উল্টোটা হচ্ছে, চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করছে কম্পিউটার আর যুক্তরাষ্ট্র ঝুঁকে পড়েছে সাধারণ ভোগ্য পণ্য রপ্তানিতে।
চীন-মার্কিন বৈরিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়েই।
মারাত্মক পরিণতি হবে
মার্কিন নীতি নির্ধারকদের জন্য এটা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, কেন চীনের সাথে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি এইভাবে বেড়ে গেছে যা রীতিমত ওয়াশিংটনকে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত চীনের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখার দিকেই অগ্রসর হতে থাকেন, যেমনটা তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা দুই দেশের উপরই শুধু না, বিশ্বজুড়ে এর পরিণতি হবে মারাত্মক যেমনটা ইতিমধ্যে অনেকেই বলেছেন।
দুই দেশের বিচ্ছিন্নতা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে বিরাজমান চীন-বিরোধী মানসিকতা বাড়িয়ে দেবে, এবং একই জিনিস ঘটবে চীনে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা তথ্য অনুযায়ী মোটামুটিভাবে, দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান এখন চীন বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে যা কি-না ২০০৫ পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ।
চীন বিশেষজ্ঞ রেচেল এসপ্লিন ওডেল বলেন, “বিশ্বের জন্য এটা বিপজ্জনক।” মিজ ওডেল কাজ করছেন কুইন্সি ইন্সটিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফ্টে, যা কি-না ইউ এস মিলিটারি নীতি নির্ধারণে সংযমের পক্ষে কথা বলে।
তিনি বলেন, “এই পতন বহুদূর নিতে পারে, দীর্ঘায়িত করতে পারে মহামারিকে, বাড়িয়ে দিতে পারে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট, নষ্ট করতে পারে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য বিষয়ক আলোচনা এবং নতুন করে ফাটল ধরাতে পারে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কগুলোতে।”
মার্কিন নির্বাচনে চীন বিদ্বেষ
এক মাত্র সময়ই বলে দেবে সামনের দিনগুলোতে কী ঘটবে। এমন হতে পারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সমস্ত বক্তব্যের সবই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সাধারণভাবে যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেট দুটো দলই দেশের বিরাজমান চীন বিদ্বেষকে নির্বাচনী প্রচারণায় কাজে লাগাতে চায়।
আবার এ-ও হতে পারে চীনের উপর এক ধরণের চাপ সৃষ্টি করে, চীনকে করোনাভাইরাসের জন্য দায়ী করে ক্ষতিপূরণ দাবি করার উদ্দেশ্যেই এতো সব কথা। ট্রাম্প ইতিমধ্যে বলেছেন, চীনের কাছ থেকে কোভিড-১৯ এর জন্য ক্ষতিপূরণ চাইবার কথা।
বলা বাহুল্য সামনের দিনগুলোতে ওয়াল স্ট্রিট চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে যা একটি আসন্ন শীতল যুদ্ধকে থামিয়ে দিতে পারে। তবে চীন-মার্কিন সম্পর্ক যদি শেষ পর্যন্ত একটি শীতল যুদ্ধের দিকে গড়ায় তবে তা নিশ্চয়ই মারাত্মক প্রভাব ফেলবে করোনা বিধ্বস্ত বিশ্বে, ছোট-বড় কোনো দেশই যা থেকে রক্ষা পাবে না।
ইতিহাস বলে শাসকদের ভুল সিদ্ধান্তের দায় বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকেই। আর তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ কোভিড-১৯।