মানুষের চিকিৎসা সেবা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে?

প্রকাশিত: ৩:২৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ৮, ২০২০

মানুষের চিকিৎসা সেবা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে?

মাইনউদ্দিন হাসান শাহেদ ০৮ জুন ২০২০ : মানুষের চিকিৎসা সেবা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে?

একটি আইসিইউ শয্যা থাকলে হয়তো আবু সায়েম ডালিমের প্রাণ বাঁচানো যেতো। তাঁর স্বজনেরা আইসিইউ ব্যবস্থা করতে প্রাণপন চেষ্টা করছিল। শেষ-মেশ তিনদিনের মাথায় আইসিইউ’র ব্যবস্থাও হয়েছিল। শুক্রবার বিকেলে তাঁকে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ আইসিইউ শয্যার প্রয়োজনীয়তা ততক্ষণেই পুরিয়ে গেলো। কোনো কাজে আসলো না।

করোনার সঙ্গে কঠিন যুদ্ধে হেরে গেলেন কক্সবাজারের তরুণ উদ্যােক্তা আবু সায়েম ডালিম। তিনি শুক্রবার (৫জুন) সন্ধ্যায় উখিয়ায় একটি বেসরকারি সংস্থার আইসোলেশন সেন্টারে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে পুরো কক্সবাজারবাসীর। চিকিৎসা সেবার দৈন্য দশায় তরতাজা এই তরুণের মৃত্যু হওয়ার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।

শুক্রবার ফেসবুকে তাঁর মৃত্যুর দায়ভারকে নিবে-এমন প্রশ্ন তুলে অনেক সচেতন ব্যক্তি মতামত দিয়েছেন। আসলেই তো এ মৃত্যুর দায়ভার কার? তরুণ ডালিমের পরিবারই বা কিভাবে নিজেদের বুঝাবে? রাষ্ট্রের কি এ ক্ষেত্রে কোন দায় নেই? অবশ্যই রাষ্ট্রের কাছ থেকে ডালিম মৌলিক অধিকার হিসেবে যথাযথ চিকিৎসা সেবা পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু পেল কি? সবার প্রিয় ডালিম মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে রাষ্ট্রের দূর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে আঙ্গুল ঠেকিয়ে গেলো । শুধু তিনি নন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এ সপ্তাহে আরও দুই তরুণ ব্যবসায়ীর পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু হয়েছে।

এ চিত্র এখন পুরো দেশেই ফুঁটে উঠছে। মানুষ এখন করোনার চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে গিয়ে যথাযথ চিকিৎসা তো পাচ্ছেনই না বরণ অবহেলার শিকার হচ্ছেন। এমনও দেখা গেছে, শুরুতে খোদ আক্রান্ত চিকিৎসকও সেবা পায়নি। সিলেটের একজন চিকিৎসক আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স সহযোগিতা চেয়েও পাননি। তিনি করোনায় চিকিৎসকদের প্রথম মৃত্যু।

এ রকম উদাহরণ এখন নিত্যদিনের। যা লিখে শেষ করা যাবেনা। প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে যেসব খবর আসে চিকিৎসার হাল নিয়ে তা মোটেও সুখকর নয়। তবে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কিছু মানবিক চিকিৎসক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তাঁদের সাফল্যের খবরও প্রতিদিন পত্রপত্রিয়ায় শিরোনাম হচ্ছে মানুষ তাঁদেরই সাধুবাদ জানাচ্ছে।

গত ২৮ মে দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোয় করোনাজয়ী সাংবাদিক শওকত হোসেন মাসুম নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্ববিস্তারে লিখেছেন। তাঁর লেখায় চিকিৎসা ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়েছে। অনেক তদবির ও ক্ষমতাশালী মানুষের সহযোগিতা থাকা স্বত্বেও তিনি চিকিৎসা পেতে নানা ঝামেলার মধ্যে পড়েছেন।

এখানে আরেকটি উদাহরণ উল্লেখ করা যায়, কক্সবাজার জেলার প্রথম করোনা রোগী মোসলেমা খাতুন (৭৮)। একজন বয়োবৃদ্ধ মহিলা। তিনি চিকিৎসায় নানা অবহেলার শিকার হয়েছেন । পরে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে তাঁকে তাঁর স্বজনেরা চিকিৎসা করান। ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেন।

কোভিট-১৯ করোনা ভাইরাস এখন বৈশ্বিক মহামারী। এ রোগ সারা বিশ্ব দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বিশ্বের অন্তত ২১০টি দেশে এ রোগ ছড়িয়েছে। ভয়ংকর ছোঁয়াচে এ রোগের বিস্তার ঠেকাতে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসা শাস্ত্রে এর কোন নিরাময় কিংবা প্রতিষেধকের ব্যবস্থা না থাকায় মানবজাতি এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। বেশিরভাগ দেশের মানুষ বন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কখন এই পরিস্থিতির অবসান হবে তাও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

তবে খুব সহসা প্রাণঘাতি এ ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে- এ রকম নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বেশ কয়কটি বিশেষজ্ঞ সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ ভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাকসিন বের হতে আরও কয়েকমাস সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে ভাইরাসের প্রকোপ কমলেও সামাজিক কিংবা শারিরীক দূরত্ব বজায় রেখেই মানুষকে চলাফেরা করার উপর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য, চীনসহ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে বলে আশ্বস্ত করে আসছে।

বিশ্বে ৫ জুন শুক্রবার পর্যন্ত করোনায় তিন লক্ষ ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ লাখের কোঠায়। এই মৃত্যু সংখ্যার মধ্যে পৃথিবীর শক্তিধর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক লক্ষ ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া মৃতের সংখ্যায় শীর্ষে থাকা যুক্তরাজ্যে ৪০ হাজার, ব্রাজিল ৩৪ হাজার ও ইতালী ৩৩ হাজার ছাড়িয়েছে।

আমাদের দেশেও দিনদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। প্রায় তিনমাস আগে বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরমধ্যে গত ১৫ দিনেই মোট আক্রান্তের অর্ধেক রোগী শনাক্ত হয়েছে। শুক্রবার (৫জুন) পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৬০ হাজার ৩৯১জন। এরমধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৮১১জন আর সুস্থ হয়েছেন ১২ হাজার ৮০৪জন।

জীবিকার তাগিদে ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গত ৩১মে থেকে ‘লকডাউন’ শিথিল করে সীমিত পরিসরে জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক করে দিয়েছেন সরকার। প্রায় ৬৬ দিন সরকার ‘সাধারণ ছুটি’ দিয়ে করোনা মোকাবেলার চেষ্টা চালায়। কিন্তু নানা কারণে সরকার লকডাউন ফলপ্রসু করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে মানুষের লকউাউন মেনে চলতে অনীহা ছিল শুরু থেকেই। এ ছাড়া গার্মেন্টস মালিকেরাও যখন তখন লকডাউন ভেঙ্গে শ্রমিকদের বাড়িতে আনা নেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে।

এ দিকে লকডাউন শিথিলতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দ্বি-মত পোষণ করে আসছেন। কারণ এখন বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলোতে করোনা বিস্তারে পিক টাইম বলা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখনও লকডাউন চলছে। দেখা যাচ্ছে, লকডাউন তুলে দেওয়ায় আমাদের দেশে আশংকাজনকহারে রোগী বেড়ে যাচ্ছে। কয়দিন ধরে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা- এভাবে রোগী বাড়লে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবেনা।

যাই হোক, মহামারী এ ভাইরাস ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিভাগের নানা অব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা স্পষ্ট। চারিদিকে সমন্বয়হীনতা। একজন রোগীর করোনা টেষ্ট করাতেই এক সপ্তাহের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এতে সহজেই রোগের বিস্তার ঘটছে। দেশের বিভাগীয় কিংবা জেলা সদর হাসপাতালগুলো করোনা রোগীর চিকিৎসায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আক্রান্ত রোগীর অবস্থা খারাপ হলেই ঢাকায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। সামনে ঢাকায় বা রোগীর ঠাঁই হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে, এখন সেদিকে খেয়াল করতে হবে। মানুষ চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়েছে। এ ক্ষেত্রে গুটিকয়েক মানুষ দায়ী। এ জন্যে আমরা পুরো চিকিৎসক সমাজকে দায়ী করতে পারিনা। এজন্য স্বাস্থ্য বিভাগে সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিন্ডিকেট ভাঙতে তাগিদ দিতে হবে এবং দূর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার উপর নজর দিতে হবে।

কথা হলো, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র অনেক পুরানো। প্রায় সময় এ খাতের নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতি নিয়ে লেখালেখি ও সংবাদ প্রচার হয়ে আসছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে চিত্র পাল্টায়নি। এ খাতে বড়বড় দূর্নীতির খবর মানুষ জানে। এই দূর্যোগের সময়েও এখানকার দূর্নীতি পরায়ন কমর্কর্তাদের মন গলেনি।

তারা নিম্নমানের পিপিই, মাস্ক ও চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয় করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। এ দূর্নীতির বিষয়টি গনমাধ্যমে বের হলে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। এ নিয়ে একটি তদন্তনকমিটি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এর তদন্ত কতদূর এগিয়েছে তা এখনও প্রকাশ হয়নি। এখন দেশবাসী এ দূর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত দেখতে চাই।

শুরুতে এমনও দেখা গেছে করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা ছিল না। এ নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসকেরা শুরু থেকে চিকিৎসা সামগ্রীর জন্য দাবি জানিয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেনি। পুরো বিষয়ে সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হলো।

রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে বহু চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। তবে সর্বশেষ জানা গেল, চিকিৎসকদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পিপিই, পযার্প্ত মাস্কসহ চিকিৎসা সামগ্রী আমদানি করা হয়েছে। আপাতত সরঞ্জামের অভাব নেই। এখন শুধু সঠিক নির্দেশনা ও সমন্বয়ের দরকার।

আমরা জানি সাম্প্রতিক সময়ে একজন চতুর্থ শ্রেণির কমর্চারি ও তাঁর স্ত্রীর হাজার কোটি টাকার দূর্নীতির ঘটনা রূপ কথাকেও হার মানায়। এই দম্পতি কয়েকটি উন্নত দেশে বাড়ি ঘরও করেছে। এ অপরাধ তারা একদিনে করেনি। দীর্ঘদিন ধরে তারা অনিয়ম করলেও পার পেয়েছে। এদের যারা শেল্টার দিয়ে আসছিল তাদের দূর্নীতি নিশ্চয় আরও বড়। এরা বহাল তবিয়তে দেশেই আছে। আমরা আশা করবো, এ খাতে যারা দূর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তাদের স্ব-রূপও উম্মোচন করা হোক।

এদিকে সমালোচনার মুখে স্বাস্থ্য বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্থলে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন এই মন্ত্রণালয়ের দুই কর্তা ব্যক্তির মধ্যে মতানৈক্য ও সমন্বয়হীনতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতটি ডুবছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একজনকে সরানো হলেও আরেকজনের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা হয় তাও মানুষ দেখতে চায়।

সর্বশেষ বলবো, আমাদের দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার পাঁচটি। এর মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। মূল্যবান এই অধিকার আমরা কতটুকু ভোগ করছি বা রাষ্ট্র তা কতটুকু নিশ্চিত করলো-বিষয়টি করোনাকালে বেশ ভোগাচ্ছে। কারণ রাষ্ট্র যারা চালায়, তাঁদের বেশির ভাগই এ দেশে চিকিৎসা নেন না। তাঁরা বিদেশে চিকিৎসায় অভ্যস্থ। তবে এখন তো দেশেই চিকিৎসা নিতে হবে। এখন তাঁরা বুঝবেন দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার কি হাল!

এ সেবা খাত নিয়ে দূর্নীতির পাশাপাশি বানিজ্যিকীকরণও কম হয়নি। চিকিৎসার এ বাণিজ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কমর্কর্তা-কমর্চারির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সারাদেশে শহর উপ-শহরে হাসপাতাল ক্লিনিক গড়ে তোলে কিছু মুনাফালোভী দেদারসে ব্যবসা করছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের শতকরা দুইজন মানুষ প্রতিবছর চিকিৎসার বুঝা বইতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ছে।

তাঁরা জমিজমা ও সহায় সম্বল বিক্রি করে দেশে-বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মানুষ করোনাকালে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে যে হাল দেখছে, তা হয়তো সম্বলিতভাবে আগে দেখেনি। যার যার মতো অনুধাবন করতো। তখন হয়তো নিয়তি হিসেবে মেনে নিতো। এখন মানুষকে এই সেবা খাত নিয়ে জাগতে হবে, জাগাতে হবে। এটি মানুষের অধিকার।

লেখক:

লেখক ও সাংবাদিক

কক্সবাজার।