সরল চোখে বাজেট ভাবনা: খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা হবে মূলভিত্তি

প্রকাশিত: ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২০

সরল চোখে বাজেট ভাবনা: খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা হবে মূলভিত্তি

ড. সুশান্ত দাস, ০৮ জুন ২০২০ : অর্থনীতির ছাত্র নই বিশেষজ্ঞও নই। তাই বাজেটের উপর সার্বিকভাবে মতামত রাখা কঠিন। সেটা ভাবছিও না। গোটা বিশ্বের সকল দেশই যে এবার বাজেট ভাবনায় ও বাস্তবায়নে বিশেষ দৃষ্টিভংগী গ্রহণ করবে তা বোঝা কঠিন নয়। সেটা মাথায় রেখেই সাধারণ রাজনৈতিক-অর্থনীতির দৃষ্টিতে বাজেট সম্পর্কে মৌলিক দৃষ্টিভংগীর কিছু বিষয়ে বলার চেষ্টা করছি।

করোনাকালে এবার বাজেটকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে মৌলিক চাহিদা রক্ষার দিকে লক্ষ্য রেখে। আগামী বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উপর প্রধান মনোযোগ দিতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে জি ডি পির ন্যূনতম ৫-৬% শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্যখাতে নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী বৃদ্ধি ও দ্রুত ট্রেনিং এর মাধ্যমে সক্ষম করে সংগে সংগে তাঁদের কাজে নিয়োগের মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে এবং তার জন্যে বিশেষ বরাদ্দ থাকতে হবে। করোনাকালীন সময়ে দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে যে দূর্বলতা ধরা পড়েছে, তা অবিলম্বে দূর করার জরুরি বিশেষ পদক্ষেপ ও বরাদ্দ রাখতে হবে। দেশের অসুধ শিল্পের যে কাঠামো রয়েছে তা দিয়ে স্বল্পমূল্যে জরুরি অসুধ (যদি করোনার অসুধ আবিষ্কৃত হয়) তৈরির পরিকল্পনা রাখতে হবে।
কৃষি হবে তুরূপের তাস। কৃষিতে বিশেষ প্রনোদনা , কৃষি ও গ্রামীন উৎপাদনে সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্য্যয্যমূল্য কৃষকের হাতে যাবার ব্যবস্থা করতে হবে। ‘মধ্যস্বত্ব ভোগী’ ব্যবসায়, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। আভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজারের উপর মনোযোগ ও নির্ভরের আপদকালীন নীতির ভিত্তিতে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা ও তাতে কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। আভ্যন্তরীণ বাজারকে এই মুহূর্তে প্রধান হিসেবে গণ্য করতে হবে। অনলাইন সেবার ক্ষেত্র ইতিমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে। তাকে কার্যকর করার জন্য দেশের ডিজিটাল কারিগরি সামর্থ্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের দেশের তথ্য ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে শুধু প্রচারের বিষয় হিসেবে না রেখে তাকে প্রকৃত কাজের বিষয়ে রূপান্তরিত করতে হবে।

করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থা উপর আঘাত এসেছে। বিকল্প প্রযুক্তি, গতিশীল ব্যবস্থাপণা ও তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় অর্থব্যবস্থাপনা জরুরি। ছাত্ররা যেখানে আছে শিক্ষাব্যবস্থাপনাকে সেখানে নিয়ে যেতে হবে। ছাত্রদের বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ( ছাত্রদের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে) বিশেষ সাহায্যের প্রনোদনা এবার শিক্ষা বাজেটে রাখতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ছাত্রদের বাড়ি বাড়িতে লেখাপড়ার বিশেষ ব্যবস্থা করার উদ্যোগ রাখতে হবে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের প্রযুক্তিগত যে অসুবিধা হচ্ছে তা দূর করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাত্রদের অনলাইন সুবিধা দেবার জন্যে আপদকালীন প্রণোদনা দেওয়া কঠিন নয়। বাজেটে তার বরাদ্দ উল্লেখ থাকাটা জরুরি।
উচ্চশিক্ষায় বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে এবং তথ্যপ্রযুক্তিখাতে গবেষণার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য সরাসরি কৃষকের হাতে যাবার ব্যবস্থা করতে হবে। বিষয়টি কঠিন নয় তবে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক নীতি ঠিক না হলে তা করা যাবে না। বাজেটে সেই নীতি সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট থাকতে হবে। কার স্বার্থ প্রধান সেটা স্পষ্ট থাকতে হবে। সাধারণ শ্রমজীবি ( প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয়), কৃষিজীবি, নিম্নমধ্যবিত্ত মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন ও জীবিকা এবারকার বাজেটের ‘ভরকেন্দ্র’ হতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায় ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার বিশেষ বাজার ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিতে হবে। বিলাসদ্রব্য আমদানীর উপর কঠোর বিধি প্রয়োগ করতে হবে। ব্যবসায়কে মূলতঃ আভ্যন্তরীণ বাজারের উপরে নির্ভর করার নীতি গ্রহণ করতে হবে। যতদিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, ততদিন এ বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বৃদ্ধিকে লক্ষ্য রেখে বরাদ্দবৃদ্ধি করতে হবে। পাঁচ কোটি মানুষকে ( প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ খানা) রেশনের আওতায় আনতে হবে।
সরকারি ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে আনতে হবে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সকল দূর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি তৈরি করতে হবে।
শিল্প কারখানা ক্ষেত্রে এবার বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। সর্বোচ্চ মুনাফার দৃষ্টিভংগী ত্যাগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকের কাজের নিশ্চয়তা, মজুরির নিশ্চয়তা সুনিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক ছাঁটাই বা লে অফ বন্ধ করতে হবে। ঘোষিত প্রণোদনা শ্রমিকদের কাছে যাচ্ছে কিনা তার জবাবদিহিতার নীতি নিশ্চিত হতে হবে। জাতীয়করণকৃত শিল্প বা ব্যক্তি মালিকানা উভয় ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভংগী থাকতে হবে। পুঁজি মালিকদের মুনাফার জন্য বিশেষ প্রণোদনা বন্ধ করতে হবে। তাঁদের অন্যায় আবদার বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক দূর্নীতি, ঋণখেলাপীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিদেশে অর্থপাচার বন্ধ করতে হবে। দেশিয় পুঁজির বিনিয়োগ দেশেই করতে হবে। আভ্যন্তরীণ বাজারকে মাথায় রেখেই শিল্প প্রনোদনা তৈরি করতে হবে।
উচ্চাভিলাষী পরিকাঠামোগত উন্নয়নে আপাততঃ লাগাম টানতে হবে।
এ বারের বাজেট ‘বিশেষ বাজেট’। বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির উপর লক্ষ্য রেখে বাজেটের গতিশীলতা (dynamics) রক্ষা করতে হবে। দ্রুত পরিস্থিতির সংগে যাতে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায় সেই ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা Elasticity র দৃষ্টিভংগী রাখতে হবে। সামনের সময়ে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটবে- এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
‘মানুষের জীবন ও জীবিকা’ – এটাই হতে হবে এই বাজেটের প্রাণ ভোমরা।