প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

প্রকাশিত: ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২০

প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

সায়মা হক বিদিশা,১৫ জুন ২০২০ : কোভিড-১৯ ভাইরাসের কারণে আমাদের শ্রমবাজার ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একদিকে যেমন বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প- কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে রয়েছে, তেমনি নিম্ন আয়ের মানুষের আয় এবং কর্মসংস্থানের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ছিল। এ উদ্দেশ্যে কিছু কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সার্বিকভাবে কর্মসংস্থান তৈরি ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমজীবী মানুষদের আয় পুনরুদ্ধারের এই প্রত্যাশা প্রস্তাবিত বাজেটে সেভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি মেটাতে আভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার প্রস্তাবনা করা হয়েছে (ঘাটতির ৫৮%) যার ফলে ব্যক্তিখাতে ঋণের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা কর্মসংস্থান তৈরিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বৃহৎ শিল্প/সেবাখাতকে চাঙ্গা করবার জন্য এই বাজেটে অবশ্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যেমন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর হার ৩৫% থেকে কমিয়ে ৩২.৫% করার প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করবার জন্য আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর মূশক ৫% থেকে ৪% করবার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আরও দুবছরের জন্য সবুজ ছাড়পত্র সহ এবং সবুজ ছাড়পত্র ছাড়া পোশাক শিল্পকারখানাগুলোর ওপর করহার আগের বছরের মত ১০% ও ১২% রাখা হয়েছে, যা পোশাক শিল্পকে সাহায্য করবে। পোশাক শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের ওপর কর ছাড়সহ আগের বছরের মত রপ্তানির ওপর ১% হারে প্রণোদনা পাবে পোশাক শিল্পকারখানাগুলো। তবে এধরনের প্রণোদনার অর্থ যদি সার্বিকভাবে শ্রমিকদের কল্যাণ ও তাদের বেতন পরিশোধ ও কাজ ছাঁটাই প্রতিরোধের শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হত তবে তা কর্মসংস্থান সংরক্ষণে সহায়ক হত। শ্রমিক ছাঁটাই রোধে সুস্পষ্ট কোন প্রণোদনা কিংবা শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কোনও দিকনির্দেশনা প্রস্তাবিত বাজেটে অনুপস্থিত।

সরকারের পূর্ববর্তী প্রণোদনা প্যাকেজ ও নির্দেশনা সত্ত্বেও শ্রমিক ছাঁটাই কিন্তু বন্ধ নেই- সেটি বিবেচনা করে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের খুব দ্রুত অন্যক্ষেত্রে কাজে নিয়োজিত হবার জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা ও ভাতার প্রস্তাবনা থাকলে তাতে করে শ্রমিকরা সরাসরি উপকৃত হতে পারতেন। সরকারি কর্মকর্তাদের মাসিক বেতনে ‘কোভিড কর’ এর মত করারোপের মাধ্যমে এ ভাতার অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারত।

তুলনামূলকভাবে কম সময়ে কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকরী উপায় হতে পারে স্বনিয়োজিত কাজের ব্যবস্থা করা এবং এর জন্য প্রয়োজন সহজ শর্ত ও স্বল্প সুদে ঋণ। এবিষয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিছুকিছু কাঁচামালের আমদানির ওপর করছাড়, বিদেশি কিছু পণ্যের (নেইল, স্ক্রু, মেশিনারি দ্রব্য, মধু) আমদানির ওপর কর ও শুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশীয় কিছু শিল্পকে সহায়তা করার প্রস্তাব বাজেটে রয়েছে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের শিল্পকে উজ্জীবিত করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরিতে এবারের বাজেটে বিশেষ ঋণসুবিধা ও করছাড় অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু সেধরনের কোনও বিশেষ প্রস্তাবনা দেখা যাচ্ছেনা। বিশেষ করে মুশক ফেরতের (রিফান্ডেবল) প্রক্রিয়া সহজ করা ও টার্নওভার কর কমানোর মাধ্যমে এধরনের শিল্পগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যেত। এছাড়া চলতি বাজেটে তরুণদের জন্য ১০০ কোটি টাকার স্টার্ট আপ মূলধন বরাদ্দ করা হয়েছিল, প্রস্তাবিত বাজেটে এটি বাড়িয়ে ও শর্ত শিথিল করে এর মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেত। কিন্তু এ বাজেটে স্টার্ট আপ এর জন্য আলাদা কোন বরাদ্দ নেই।

সার্বিকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যেটির মাধ্যমে দরিদ্র কৃষক, আভিবাসী শ্রমিক, বেকার তরুণরা স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে গ্রামাঞ্চলে কৃষি, কৃষিজাত পণ্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এক্ষেত্রে চারটি প্রতিষ্ঠানের (পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক) মাধ্যমে এই ঋণ বিতরণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ঋণ প্রাপ্তিকে জটিল করে তুলতে পারে। এছাড়া তেলের মূল্য কমে যাবার ফলে ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের কাজ হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে – বাজেটে শুধু তাদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে বিশেষ ঋণ সুবিধা ও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল।

এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের অধীনে ও গ্রামীণ সামাজিক সেবা কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্র ও অতি দরিদ্রদের স্বনিয়োজিত কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থানের জন্য সহায়ক হবে। তবে বর্তমান বিবেচনায় এই বরাদ্দ যথেষ্ট নয়।

আমাদের ৮৫% শ্রমিকই যেহেতু অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, লকডাউন/সাধারণ ছুটির কারণে এদের আয় ও কর্মসংস্থান ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এবারের বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের, বিশেষ করে যারা কোভিড-১৯ এর কারণে কাজ হারিয়েছেন বা ব্যবসায় লোকসান করেছেন তাদের বিষয়ে এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা। এক্ষেত্রে টেলিফোন ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজ নিজ আর্থিক সমস্যা জানানোর ব্যবস্থা (সেলফ-ক্লেইম) থাকতে পারে, এনজিও, পরিসংখ্যান ব্যুরো ও স্থানীয়/খাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান/প্রতিনিধিদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

বাজেটের বরাদ্দ এসবের সাথে সরাসরি জড়িত না হলেও, বাজেটে এ বিষয়ে নীতিগত নির্দেশনা থাকবে এ প্রত্যাশা ছিল। করোনাভাইরাসের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দের প্রস্তাবনা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এ বরাদ্দ থেকে নিম্ন আয়ের কাজ হারানো মানুষদের (আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতে) জন্য অন্তত তিনমাসের জন্য বেকার ভাতার মত বিশেষ ভাতা দেয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে যা, কর্মসংস্থান তৈরি ও দারিদ্র দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কোভিড-১৯ ভাইরাসের ব্যাপ্তি ও সময়কাল ও এর পাশাপাশি সরকার গৃহীত কর্মসূচিগুলোর সাফল্য ও সুচিন্তিত বরাদ্দের ওপর নির্ভর করবে কতটা দ্রত আয় ও কর্মসংস্থানের ক্ষতি মোকাবিলা করে শ্রমবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি যে, চাহিদা সংকট (দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয়ই) কাটিয়ে উঠতে না পারলে শ্রমবাজারকে পুরোপুরি চাঙ্গা করা কঠিন হবে। এ প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান রক্ষায় তাই প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ ও কর্মপরিকল্পনা।
#

সায়মা হক বিদিশা
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।