বিনা চিকিৎসায় প্রতিটি মৃত্যুর বিচার হতে হবে

প্রকাশিত: ৩:২৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৭, ২০২০

বিনা চিকিৎসায় প্রতিটি মৃত্যুর বিচার হতে হবে

ফজলুল বারী, সিডনি (অস্ট্রেলিয়া) ১৭ জুন ২০২০ : করোনা মহামারী বাংলাদেশের নানাকিছু সবাইকে নতুন করে চেনাচ্ছে। দেশে ব্যক্তি ব্যক্তির সম্পর্ক, পারিবারিক-সামাজিক সম্পর্ক, ধনী-গরিবের সম্পর্ক এমন নানান দ্বন্দ্বের সত্য বাস্তব বাংলাদেশকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই মহামারী।

এই বৈষম্যের দেশে আপনি পুলিশ হন বা বিশেষ কোন বাহিনীর সদস্য বা সাংবাদিকের মতো স্পর্শকাতর পেশার সভ্য হলেও বিশেষ হাসপাতালের বিশেষ সুবিধা আপনার জন্যে সংরক্ষন করা হয়েছে।
কারন এই মহামারী আপনার পেশার যোগ্যতা-দক্ষতা-অনিশ্চিত চরিত্রটিকেও প্রকট প্রকাশিত করেছে। বেতন ঠিকমতো দিক অথবা না দিক, আপনাকে সোহাগে ডাকার একটি নাম কিন্তু দিয়েছে, মহান ‘ফ্রন্টলাইন ফাইটার’!
অথচ বিনা চিকিৎসায় মুক্তিযোদ্ধাদের মারা যাবার খবর বেরিয়েছে। যাদের যুদ্ধে এই স্বাধীন তাদের চিকিৎসার অধিকার শিকেয় তুলে রেখে নতুন ফাইটার খুঁজছি! সঠিক তদন্ত হলে জানা যাবে নিরাপদ যুদ্ধের ট্রেনিংটাই নতুন ফাইটারদের অনেকের নেই।
অথবা তা তাদেরকে দেয়া হয়নি। নিরাপদ যুদ্ধের ট্রেনিং’এর সম্পাদ্য-উপাপাদ্য হচ্ছে আগে নিজেকে নিরাপদ করবেন, এরপর নিরাপদ করবেন আরেকজনকে। এই ট্রেনিং এর জন্যে সবাইকে যোদ্ধা হওয়া লাগেনা।
হওয়া লাগেনা সামরিক বাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত সদস্য অথবা কর্মকর্তা। বেশিরভাগ দেশে একটি সাধারন যোগ্যতা। বেশিরভাগ চাকরি পেতেও প্রাথমিক চিকিৎসার ট্রেনিং-সার্টিফিকেট প্রাপ্ত হতে হয়।
প্রতি বছর আপডেট করাতে হয় এর এক বছর মেয়াদী সনদ। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে থাকতে বাধ্যতামূলক এক বা একাধিক প্রাথমিক চিকিৎসার সনদধারী কর্মী। এই সনদ বাধ্যতামূলক করার কারনও নির্দিষ্ট করা আছে।
কোন ঘটনায় এম্বুলেন্স আর প্যারামেডিক্স পৌঁছার আগ পর্যন্ত আপনি অন্তত আপনার সহকর্মীর জীবন রক্ষার জরুরি টিপস অথবা সহায়তা দিতে পারবেন। আপনি নতুন চাকরিতে অফিসে যাবার প্রথম দিনের ইনডাকশনেই দেয়া হয় প্রথম পাঠ।
বাংলাদেশে সব সময় সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াটি দূর্নীতিগ্রস্ত। বেশি দামে কেনা হয় নিম্নমানের সামগ্রী। এবার নিম্নমানের পিপিই-মাস্ক ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহার করতে দিয়ে তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
এবার মহামারীতে পড়ে জানা গেলো বোঝা গেলো, আপনার এমন নানান প্রাথমিক জ্ঞানই নাই অথবা এসব হয়তো আপনাকে নিতেও বলা হয়নি! এরজন্যে অনভ্যস্ত মহামারী যুদ্ধের প্রথম রাউন্ডেই আপনি পড়ে গেলেন বিপদে!
অনেকে হা-হুতাশ করে বলতে শুরু করলো আহারে মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে এত ভালো মানুষটা কী বিপদেইনা পড়ে গেলো! আপনাকে দেয়া হলো আদুরে কিছু নিরাপত্তার ঘেরাটোপ! ‘লকডাউন’, ‘হোম আইসোলেশন’!
রচনা হয়ে গেলো প্রথম কিছু শহীদের তালিকাও। কিন্তু এরপর নানান ঘটনা প্রকাশ পেতে শুরু করলো আস্তে আস্তে! প্রকাশ পেতে শুরু করলো এই নির্দোষ বিপদগ্রস্তদের অনেকে শুরুর দিকে প্রাথমিক অনেক কিছুই জানতেননা!
জানতেননা তাদের জন্যে নিরাপদ পিপিই অথবা মাস্ক কোনগুলো! তাদের নকল অনিরাপদ পিপিই-মাস্ক এসব কারা দিয়েছে কারা বুঝে নিয়েছে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হত্যা সামগ্রীর মোটা অংকের বিল, সে রিপোর্ট মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে।
কিন্তু কথিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট মুখস্ত অভ্যাসমতো মন্ত্রী আজ পর্যন্ত তা খুলে পড়ার সময় পর্যন্ত বের করতে পারলেননা! এই করোনায় কত দেশ তাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ব্যর্থতার দায়ে বরখাস্ত করেছে।
অথবা যাদের বিবেক আছে তারা নিজেরাই পদত্যাগ করে চলে গেছেন। কিন্তু আমাদের এই মন্ত্রীর বোধ নেই বিবেক নেই বলে তিনি পদত্যাগ করে চলে যাননি। তাঁর বিরক্তিকর ব্রিফিঙ অতঃপর উচ্চতর নির্দেশে বন্ধ করতে হয়েছে।
কিন্তু তাঁকে বরখাস্ত করা হয়নি। যেন এই বিপদের সময় চাকরি খেয়ে দিলে যদি বেচারা না খেয়ে মারা যায় সেই আতঙ্কে তাই সিদ্ধান্তটিই নিতে পারলোনা মানবিক বাংলাদেশ!
আর আমরাও হাওয়া বুঝে সে আশা ছেড়ে অন্য আবিষ্কারে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। আমরা লিখতে শুরু করলাম কোন দোষ নেই নিষ্পাপ মন্ত্রীর। সচিবটা একটু দুষ্টু প্রকৃতির মনে হওয়ায় তাকে সরিয়ে দিয়েছি।
আসলে এসব ফ্রন্টলাইন ফাইটাররাই পিপিই-মাস্ক এসব কিভাবে নিরাপদভাবে পরতে খুলতে হয় তা তারা জানতোনা বা তা তাদের শেখানোই হয়নি। তাদের কেউ কেউ দেখতে বয়স্ক মানুষের মতো দেখালেও আসলে বালক প্রকৃতির!
করোনার মতো ছোঁয়াছে মহামারীর একজন রোগী দেখতে গিয়ে একজনকে কতবার পিপিই অথবা মাস্ক বদল করতে হবে সঠিকভাবে তাও সঠিকভাবে তাদের অনেকে জানতেননা। তারা এসব শিখে ফেলার পর আক্রান্ত হচ্ছেন কম।
এতদিন দেশের হাসপাতালগুলো মূলত নিরুপায় গরিব মানুষরাই ব্যবহার করতেন। করোনায় আন্তর্জাতিক সীমান্ত বন্ধ থাকায় ধনীরা অভ্যাসমতো ভারত-সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক যেতে না পারায় তারা দেশের হাসপাতালে যাতায়াত শুরু করেন।
এভাবে ধনীক শ্রেনীর লোকজনের শ্যেনদৃষ্টি গরিবের হাসপাতালগুলোয় নজর পড়ায় গরিবদের চিকিৎসার সুযোগ সংকুচিত হয়। আনোয়ার মডার্ন হাসপাতাল গরিবদের চিকিৎসা দেবে বলে সরকার তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছিল।
কিন্তু এস আলম গ্রুপের মতো বড় একটি শিল্পপতি গ্রুপ তাদের পরিবারের করোনা রোগীদের চিকিৎসা করাতে পুরো হাসপাতাল ভাড়া নিতে গেলে তারা মন পাল্টায়। ফকিন্নি গরিবদের চিকিৎসা করবোনা বলে তারা নিজে নিজে বাতিল করে দেয় চুক্তি।
সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্তরা বড়লোক ভালোবাসেন বলে তারা আনোয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক তাদের ডেকে একটা বকা পর্যন্ত দেননি। শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রো লিভার হাসপাতাল করোনা রোগের চিকিৎসার জন্যে তৈরি হচ্ছে হচ্ছে বলে দিনের পর দিন রিপোর্ট হচ্ছিল।
ওই হাসপাতাল করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্যে তৈরি হলেও রোগী ভর্তি করা হচ্ছিলোনা! যেখানে চারপাশে চিকিৎসা সংকটে এত দূর্যোগ এত মৃত্যু, সেখানে গ্যাস্ট্রোলিভারে কী সমস্যা তা খুঁজতে গিয়েও রাষ্ট্রের ধনীক শ্রেনীর চরিত্রটি প্রকাশ পায়!
জানা গেলো বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালটি সংরক্ষিত রাখা হয়েছে! যদি আল্লাপাকের কৃপায় কূটনীতিকরা করোনায় আক্রান্ত হন তাদের চিকিৎসার জন্যে আলাদাভাবে সদা প্রস্তুত গ্যাস্ট্রো লিভার হাসপাতালে!
এভাবে অনেক দিন রোগীবিহীন থাকতে থাকতে অতঃপর মঙ্গলবার একজন রোগী পেয়েছে এই হাসপাতাল! ইনি অবশ্য কোন কূটনীতিক নন। সাবেক চীফ হুইপ ও মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ।
এতদিন প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় মন্ত্রী-এমপিরা সিএমএইচ’এ চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হবার উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদকেই প্রথম সিএমএইচ’এ ভর্তি না করে ভর্তি করা হয়েছে গ্যাস্ট্রো লিভারে।
এতদিন শাসক দলের বর্তমান, সাবেক মন্ত্রী, মেয়র, এমপি হন, অথবা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ, তাদেরকেও সিএমএচে চিকিৎসার জন্যে পাঠানো হচ্ছিল। অনেককে জরুরিভাবে সামরিক হেলিকপ্টার, এয়ার এম্বুলেন্সেও উড়িয়ে আনা হয়েছে ঢাকা শহরে!
সিএমএইচ’এর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। আবার এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনায় প্রান হারিয়েছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। মৃত্যুর আগে তাঁর করোনার কথা শোনা যায়নি।
বাংলাদেশে এমনিতে সব মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থার নেই। এই মহামারীতে গরিবের চিকিৎসা সংকটটি আরও উৎকট সামনে নিয়ে এসেছে। দেখা গেলো গরিবের আলাদা কোন হাসপাতালই নেই।
এতদিন কোন একজন মুক্তিযোদ্ধা যথাযথ চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হলে আমরা কাঁদতাম। কারন এসব মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধেই এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু এই করোনা মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সংকটকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

আমরা এখন নতুন নতুন নামের ফাইটার খোঁজা নিয়ে ব্যস্ত। আসল ফাইটার যে একাত্তরে মুক্তিসেনা, তিনি যদি এখনকার বাজারে অখ্যাত অথবা রাজনৈতিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ন একজন মুক্তিযোদ্ধা হলেও আপনার জন্যে খারাপ এই সময়।
এখনকার এই দুঃসময় দেখালো আপনার প্রান প্রিয় স্ত্রী বা সন্তান, এই মহামারীতেও অনেক প্রচন্ডরকমের স্বার্থপর স্ত্রী-সন্তানের মতো পালিয়ে না গেলেও আপনাকে নিয়ে তারা হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরলেও আপনি সেখানে ঢুকতে পারবেননা।
অথচ আপনার শাসকেরা সারাক্ষন আপনাকে যে সংবিধান দেখায় সেই কিতাবে স্পষ্ট হরফে লেখা আছে চিকিৎসা পাওয়াটা আপনার সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু আপনি চিকিৎসা পাচ্ছেননা, আপনাকে তারা হাসপাতালে ঢুকতে দিচ্ছেনা!
আপনি হাসপাতালের সামনে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন বা যাচ্ছেন, কিন্তু রাষ্ট্র এরজন্যে সেই লোভী দানব হাসপাতাল মালিককে গ্রেফতার করেনি। আপনার জীবনের দাম মৃ্ত্যুর ক্ষতিপূরন আদায় করেনি!
উচ্চ আদালত এ নিয়ে আপনার পক্ষ নিলেও সরকার সে আদেশ স্থগিত করাতে গেছে! কারন খোঁজ নিয়ে দেখুন তারা তাদের দল করে। তারা চিকিৎসা ব্যবসায়ী চামার। বাংলাদেশে এই চামাররা সব সময় সরকারি দল করে।
এখনকার আরও সত্য এই করোনায় দেশের মানুষ আর সংসারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বেসরকারি খাত। কিন্তু তারা যে কথায় কথায় সরকারকে জিম্মি করে সে কারনে সরকারও তাদের গায়ে হাত দিতে পারেনি।
নতুবা যেভাবে ইউনাইটেড হাসপাতালে এতগুলো রোগী পুড়ে মরলো, রাষ্ট্র তাদের বুড়ি কী স্পর্শ করতে পেরেছে? ৪০০ শয্যার হাসপাতালের বাইরের গাড়ির গ্যারেজ এলাকায় কত অবহেলায় তারা বানিয়েছিল মানুষ মারার করোনা ইউনিট!
বিশ্বাস করুন কোন সভ্যে দেশে এর অপরাধে সেটিতে স্থায়ীভাবে লাল বাতি এবং তালা ঝুলতো। কারন যারা রোগীদের জন্যে নিরাপদ হাসপাতাল এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেনা তারা হাসপাতাল পরিচালনার যোগ্য নয়।