সেদিন আর এদিন

প্রকাশিত: ৪:৪৯ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

সেদিন আর এদিন

শান্তনু দে, কলকাতা (ভারত), ২১ জুন ২০২০ : চৌত্রিশ বছরে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সময় কখনও হয়নি। কখনও বলতে হয়নি ‘সততার প্রতীক’, কিংবা ‘বাংলার গর্ব’।

এখন চলছে ‘বাংলার গর্ব মমতা’। শহর মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে। নিজেই নিজের নামে প্রচারের উদ্বোধন করেছেন। আত্মপ্রচারের এক বেনজির দৃষ্টান্ত। বিদ্যাসাগর কখনও নিজেকে ‘দয়ার সাগর’ বলেননি। কিংবা রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বলেননি ‘বিশ্বকবি’। তিনি বলেছেন। অতএব ধ্রুবসত্য!
বাংলায় এখন এটাই দস্তুর। তিনি বলবেন। শুধু তিনিই বলবেন। আর বাকিরা— মন্ত্রিসভা থেকে বিধানসভা সবাই নিছকই শ্রোতা। গণতন্ত্রে বিরোধীদের ভূমিকা, সেদিন নেই। বিরোধী শূন্য পঞ্চায়েত থেকে তিনি চান বিরোধী শূন্য বিধানসভা। সংবাদমাধ্যম সামান্য সমালোচনা করলেই চোখ রাঙান। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধের হুমকি দেন। হুমকিতে কাজ না হলে বন্ধও করে দেন। আদালত রায় দিলে তা অমান্য করেন। আবার কখনও পত্রিকার সম্পাদককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানার আসার সমন পাঠান।
বিপন্ন শিল্পের স্বাধীনতা। সেন্সরের ওপর সেন্সর। অনীক দত্তের ‘ভবিষ্যতের ভূত’। চব্বিশ ঘণ্টার আগেই তুলে নেওয়া হয় সমস্ত মাল্টিপ্লেক্স থেকে। যদিও ছবিটি ছিল নিখাদই একটি পলিটিক্যাল স্যাটায়ার। রাজনৈতিক বিদ্রূপ। যেমন গ্রেট ডিক্টেটর, হীরক রাজার দেশে। আর তাতেই কোপ। অথচ, কে না জানেন সমালোচনা, ভিন্নমতের অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধীদের ভূমিকা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
ভবিষ্যতের ভূত, অনীকই প্রথম নন। সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গচিত্র এঁকে জেলে যেতে হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্রকে। নিরীহ প্রশ্ন তোলার ‘অপরাধে’ প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী তানিয়া ভরদ্বাজের গায়ে মুখ্যমন্ত্রী বেমালুম সেঁটে দিয়েছেন ‘মাওবাদী’ তকমা। সমাবেশে ধানের দাম নিয়ে অসহায় প্রশ্ন তোলায় জেলে যেতে হয়েছে শিলাদিত্যকে।
ছাত্র সংসদের নির্বাচন চেয়ে পুলিশের লাঠিতে শহীদ সুদীপ্ত গুপ্ত। ২০১১ থেকে লাল ঝাণ্ডার আড়াই হাজার পার্টি অফিস জবরদখল। হাজার হাজার পার্টি কর্মীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে গ্রেপ্তার। হাজার হাজার পার্টি কর্মী ঘরছাড়া। বামপন্থী সমর্থকদের দোকান লুট, ভাঙচুর। কোথাও কৃষককে নিজের জমিতে চাষ করতে না দেওয়া। কোথাও জমি থেকে পাট্টদার, বর্গাদারকে উচ্ছেদ। কোটি কোটি টাকা জরিমানা আদায়। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, এ-গলি, ও-গলি সব দখল। এক কামদুনি নয়, সাত থেকে সত্তর ধর্ষণ। মহিলাদের উপর অপরাধে তিন নম্বরে রাজ্য। ২০১৮, দেশে অ্যাসিড হামলায় শীর্ষে রাজ্য (এনসিআরবি)। দলদাসের ভূমিকায় পুলিশ। নির্বাচনের আগেই বিপুল আসনে জয় ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’। নির্বাচনের দিন ভোটের নামে প্রহসন। আর নির্বাচনের পর চোখ রাঙিয়ে দল ভাঙিয়ে বাকিটুকু দখল। গণতন্ত্র হত্যা।
সত্তর দশকে এরকমই এক নৈরাজ্য কাটিয়ে সাতাত্তর। রাজ্যে বামফ্রন্ট। একদিনে নয়। দশকের পর দশক ধরে শ্রেণিসংগ্রাম আর গণআন্দোলনের ফসল। আধা ফ্যাসিবাদী অত্যাচারের রক্তচিহ্ন সারা শরীরে বহন করে, বুকের মধ্যে চেপে রাখা স্বজন হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে সংগ্রাম আর সাফল্যে এক নতুন অধ্যায়। একটি সুশাসন। গ্রামে-শহরে সাধারণ মানুষের, বিশেষত শ্রমজীবী মানুষের মাথা তুলে দাঁড়ানোর অধিকার। এক নতুন পরিবেশ। এক অপ্রতিহত অগ্রগতির যুগের যাত্রা শুরু।
দায়িত্বে এসেই প্রথম রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বন্দিদের বিনা শর্তে মুক্তি। অধিকাংশই ছিলেন নকশালপন্থীরা। যাদের হাতে বামপন্থী কর্মীরা খুন হয়েছিলেন, মুক্তি পেয়েছিলেন তাঁরাও। সমকালীন ভারতে এক সাহাসী ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। বিনা বিচারের মতো বর্বর প্রথা রদ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পূরণের জন্য ব্যবহার করা হয়নি পুলিশকে। আগের কংগ্রেস জমানায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন ভাঙাই ছিল পুলিশের মুখ্য কাজ। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে মর্যাদা দেয় সরকার। পুলিশকে দেয় ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট করতে দেওয়ার অধিকার। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
ধর্মঘট ভাঙতে কখনও পুলিশ পাঠায়নি। বিরোধী রাজনৈতিক কার্যকলাপকে কখনও পুলিশ, কিংবা প্রশাসনকে দিয়ে দমন করেনি। সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশই ছিল বিরোধী দলের ভূমিকায়। শেষদিন পর্যন্ত চালিয়ে গিয়েছে কুৎসা-অপপ্রচার। কিন্তু তাই বলে রাজ্য সরকার কখনও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। কট্টর সমালোচক সংবাদমাধ্যমও পেয়েছে সরকারি বিজ্ঞাপন। দেশের মধ্যে প্রথম, বামফ্রন্ট সরকারই রাজ্যস্তরে গড়েছে মানবাধিকার কমিশন।
মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু শপথ নেওয়ার পরেই ঘোষণা করেছিলেন, বামফ্রন্ট শুধুমাত্র রাইটার্স বিল্ডিং থেকে সরকার চালাবে না। গণতন্ত্রের প্রসার ঘটাবে। এবং নিছক ঘোষণা নয়। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ই ত্রিস্তর পঞ্চায়েত। প্রথম আধুনিক পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। গ্রামের সরকার। গরিবের হাতে ক্ষমতা। মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ ৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ। পঞ্চায়েতে মানুষের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে ১৯৯২ সালে গ্রাম সংসদ। মানে ৭৩ তম সংবিধানের আগেই। পঞ্চায়েতে গণ অংশগ্রহণে পশ্চিমবঙ্গই এদেশে পথপ্রদর্শক। সঙ্গে শহরাঞ্চলে পৌর ব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণ।
বামফ্রন্টের সময় পঞ্চায়েত তো বটেই, অনেক পঞ্চায়েত সমিতি এমনকি জেলা পরিষদ পর্যন্ত চালিয়েছে বিরোধীরা। কখনও মুর্শিদাবাদ, কখনও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, কিংবা পূর্ব মেদিনীপুর। বামফ্রন্ট কখনও কোনওদিন সেগুলিকে ভাঙার চেষ্টা করেনি। সিপিআই(এম) কখনও বিরোধীদের ভোটে জেতা কোনও সদস্যকে কৌশলে ভাঙিয়ে আনার চেষ্টা করেনি।
গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩৪ শতাংশ আসনেই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ জয়ী হয়েছে তৃণমূল। যেখানে বামফ্রন্টের সময় ২০০৮ সালে শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই হার ছিল ৫.৫৭ শতাংশ। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন ২,৮৪৫ জন, যেখানে ২০১৮-তে জয়ী হয়েছেন ২০,১৫৯ জন তৃণমূল প্রার্থী। ভোট দিতে পারেননি এক কোটির বেশি ভোটার।
বামফ্রন্টের সময়ই বিরোধী দলের নেতাকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা। বিধানসভায় আলোচনার অর্ধেক সময় বিরোধীদের জন্য বরাদ্দ। দেশের মধ্যে ছিল এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। দেশের মধ্যে এরাজ্যেই প্রথম লোকায়ুক্ত গঠন। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ এর আওতায়।
বামফ্রন্ট সরকারের কি কোনও সমস্যা ছিল না? ছিল। বহু সাফল্যের মধ্যেও সমস্যা ছিল। সীমাবদ্ধতা ছিল। একটি দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে ক্ষমতায়। প্রতিটি চব্বিশ ঘণ্টা লড়তে হয়েছে সংবাদমাধ্যমের কুৎসা, অপপ্রচারের বিরুদ্ধে। লড়তে হয়েছে দিল্লির নীতির বিরুদ্ধে। এমনকি ওয়াশিংটনের ব্লুপ্রিন্টের বিরুদ্ধে। নাহলে ২০১১-তে পরাজয়ের পর নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে আসেন মার্কিন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিন্টন। সীমিত ক্ষমতায় এই ব্যবস্থার মধ্যেই ‘বিকল্প নীতি’ রূপায়ণ। ভূমি সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সবার উপর ছিল মানুষের কথা বলার অধিকার। সরকারকে সমালোচনার গণতন্ত্র। ধর্মতলার ব্যস্ত রাস্তায় মাচা বেধে ছাব্বিশ দিন সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ। পুলিশ যায়নি। গণতন্ত্রের ‘মন্দির’ বিধানসভা ভাঙচুর। ভিডিও ফুটেজ থাকলেও কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। মাচা ভেঙে সিঙ্গুরে কারখানা করেনি। বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন থাকলেও। সেদিন এমনই ছিল গণতন্ত্র।