বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম ও সুভাষ-মুজিব সম্পর্ক (শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ২:২৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২০

বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম ও সুভাষ-মুজিব সম্পর্ক (শেষ পর্ব)

আশরাফুল ইসলাম || ২৩ জুন ২০২০‌‌‍ : মোহাম্মদ আবু তৈয়বকে বলছিলাম চলতি বছরের (২০১৭) জানুয়ারিতে প্রয়াত হওয়া নেতাজির সারথি কর্নেল নিজাম উদ্দিনের কথা। নেতাজির কথা শুনেই শ্রদ্ধায় আপ্লুত হন ষাটোর্ধ্ব এই গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। এসময় কলকাতায় দায়িত্ব পালনের সময়গুলোতে ফিরে যান আবু তৈয়ব। নেতাজির মহিমান্বিত জীবনের নানাদিক নিয়ে মূল্যবান মন্তব্য তুলে ধরেন তিনি। নেতাজি ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শগত ঐক্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি অবতারণা করেন একটি ঘটনার, যা তিনি শুনেছিলেন কলকাতা ডেপুটি হাইকমিশনে দায়িত্ব পালনের সময়ে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার মুখে। সেই পুলিশ কর্মকর্তা ব্রিটিশ শাসনামলে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন ব্রিটিশমুক্ত ভারতেও।

মোহাম্মদ আবু তৈয়বের ভাষ্যে, ‘১৯৯৮ সালের ঘটনা। আমি তখন কলকাতা ডেপুটি হাই কমিশনে প্রেস কাউন্সিলর। সেখানে একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার এসেছিলেন, নাম এসকে দে। তিনি একজন ক্যাথলিক খ্রিস্টান। তার বাড়ি কলকাতার শহরতলীর হাবড়াতে। পুলিশ কর্মকর্তা এসকে দে তখন রাজভবনের বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন ভারতের কেন্দ্রিয় সরকারের পক্ষ থেকে।” আমাকে তিনি বললেন, “আপনারা অনুসন্ধান করে দেখুন, এই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একচল্লিশের সেই শেখ মুজিব কিনা?” তিনি একটি ঘটনা বললেন, সুভাষচন্দ্র বসু তখন এলিগন রোডের বাসায় গৃহবন্দি ছিলেন। তখনও ওই ভবনের নিরাপত্তার সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন এসকে দে। তিনি তখন কলকাতা পুলিশের নতুন অফিসার। চাকরি জীবনের প্রথম ওই বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্ব পান। তখন ব্রিটিশের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছিল কিছু সংখ্যক অতিথি নেতাজির সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। নেতাজি নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্তদের তালিকা দিয়েছিলেন। সেই তালিকায় নাম ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের।

নেতাজি-বঙ্গবন্ধু সম্পর্ক নিয়ে এরকম নতুন তথ্য আরও আগ্রহী করে তোলে। তিনি বলে চলছেন, ‘‘এস কে দে আমাকে বললেন, একদিন তিনি বসা আছেন। সকাল বেলা হালকা পাতলা চেহারার একটা লম্বা ছেলে এসে নেতাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য স্লিপ দিল। লিস্টে দেখলো শেখ মুজিবুর রহমানের নাম আছে। নাম জানার পর নেতাজি তাকে ডেকে পাঠালেন। তখনি তিনি তাকে একজন পুলিশ দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন নেতাজির কাছে। ওই সদস্য দিয়ে চলে আসলো। এখন ঘটনাটি হলো, উনি (শেখ মুজিবুর রহমান) ঢুকেছিলেন সকালে। বেরিয়েছেন বিকালের দিকে। এই লম্বা সময় কী করলেন উনি সেখানে? আমাদের তো ক্ষমতা নাই জিজ্ঞেস করার যে, স্যার টাইম চলে যাচ্ছে। তারপরও একবার রিমাইন্ডারও দেয়া হয়েছিল। কার সঙ্গে কতক্ষণ কথা বলবেন নেতাজি সেরকম সময় নির্দিষ্ট করা ছিল না। এসকে দে’র ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমান সম্ভবত সেখানে মধ্যাহ্নভোজও করেছেন। বিকাল বেলায় বেরিয়ে আসেন ওই লোক (শেখ মুজিবুর রহমান)। তিনি বলেন, ওই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে নেতাজি অন্তর্ধান হলেন। উনি বলছেন, আমার ধারণা নেতাজির অন্তর্ধানের পেছনে এই শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকাও ছিল। তিনি কোনোভাবে এখান নেতাজিকে বের করে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।’’

মোহাম্মদ আবু তৈয়ব বললেন, “এইখানে একটি কথা বলে রাখি, বাম নেতাদের সঙ্গে নেতাজির সাংঘাতিক মতপার্থক্য ছিল। কমরেড মুজাফফর আহমেদ ও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে ব্যাপক মতপার্থক্য ছিল নেতাজির, অন্তত ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে। উনি ছিলেন মূলত জাতীয়তাবাদী নেতা। খাটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা।“ নেতাজির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও আদর্শগত যে সাদৃশ্য তা ব্যাখ্যা করতে আরও কিছু ঘটনার অবতারণা করে আবু তৈয়ব বললেন, “বঙ্গবন্ধুর সহপাঠি ও বন্ধু কবি গোলাম কুদ্দুসের কাছে শুনেছি, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে। কুদ্দুস সাহেব বলতেন, পাকিস্তানকে বিশ্বাস করে শেখ সাহেব পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত হননি। সুদূর প্রসারী চিন্তার অংশ ছিল এটা। তিনি ভাবতেন, যদি ভারত এক থাকে তবে বাঙালিরা আর কোনোদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। যদি বাংলা ভারতবর্ষের এক রাষ্ট্রের অধীনে থাকে…। পাকিস্তান হলে সেখান থেকে বাংলাকে বের করে আনার একটা পথ তিনি খুঁজে পাবেন। এই সুদূর প্রসারী চিন্তার অংশ হিসাবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এটা তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে। যদিও সোহরাওয়ার্দী অবাঙালি ছিলেন। তবে নেতাজিকে কারামুক্ত করার জন্য যে হলওয়েল মুভমেন্ট হয়েছিল কলকাতায়, সেই মুভমেন্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যোগ করেন আবু তৈয়ব।

তিনি আরও বলেন, “নেতাজির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিগত যে আদর্শ তা অনুপ্রেরণাগত… এই দুই মহান নেতার চিন্তা-চেতনার মিল সবই ছিল। তিনি তার দ্বারা অনুপ্রাণিতও হয়েছিলেন। আজকে আমরা বাংলাদেশকে যে স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে পেয়েছি তার মূলে বঙ্গবন্ধু অনুপ্রাণিত হয়েছেন নেতাজির চিন্তাধারা থেকে।’’ ২০১২ তে প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমানের জেলখানায় বসে লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠে এবিষয়ে নতুন তথ্যের দ্বার উন্মোচিত হয়। গ্রন্থটিতে নেতাজির প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর শ্রদ্ধা, ব্যক্তিগত অনুরাগ, তার আদর্শের প্রতি সংহতি একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর লেখনিতে নেতাজি সম্পর্কে যেসব মূল্যায়ন উচ্চারিত হয়েছে তা মোহাম্মদ আবু তৈয়বের তথ্যকেই সমর্থন করে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখছেন, ‘তখন স্বদেশি আন্দোলনের যুগ। মাদারীপুরের পূর্ণদাস তখন ইংরেজের আতঙ্ক। স্বদেশি আন্দোলন তখন মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের ঘরে ঘরে। আমার মনে হতো, মাদারীপুরে সুভাষ বোসের দলই শক্তিশালী ছিল। ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নেই। স্বাধীনতা আনতে হবে। আমিও সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম।’ অন্যত্র মুজিব লিখছেন, ‘যখন আবার হিন্দুরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল তখন অনেকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে মরতে দ্বিধা করে নাই। জীবনভর কারাজীবন ভোগ করেছে, ইংরেজদের তাড়াবার জন্য। এই সময় যদি এই সকল সকল স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ত্যাগী পুরুষরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাথে সাথে হিন্দু ও মুসলমানদের মিলনের চেষ্টা করতেন এবং মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার ও জুলুম হিন্দু জমিদার ও বেনিয়ারা করেছিল, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন, তাহলে তিক্ততা এত বাড়ত না। হিন্দু নেতাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং নেতাজী সুভাষ বসু এ ব্যাপারটা বুঝেছিলেন, তাই তারা অনেক সময় হিন্দুদের হঁশিয়ার করেছিলেন।’ নেতাজির সংগ্রামী জীবনাদর্শ তরুণ শেখ মুজিবের মনে গভীর দাগ কাটে। বঙ্গবন্ধুর আপোসহীন সংগ্রামী যে জীবন তার ভিত্তি অনুসন্ধানে আমরা খোঁজে পাব নেতাজিকে। কারাপ্রকোষ্ঠে মুজিব শ্রদ্ধার সঙ্গে নেতাজির ত্যাগের মহিমা বর্ণনা করেছেন তার জীবনালেখ্যে।

তিনি লিখছেন, ‘‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমান সৈন্যদের দলে নিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে সিঙ্গাপুর থেকে সুভাষ বাবুর বক্তৃতা শুনে চঞ্চল হয়ে উঠতাম। মনে হত, সুভাষ বাবু একবার বাংলাদেশে আসতে পারলে ইংরেজ তাড়ান সহজ হবে।’ আবার মনে হতো, সুভাষ বাবু আসলে তো পাকিস্তান হবে না। পাকিস্তান না হলে দশ কোটি মুসলমানের কি হবে? আবার মনে হতো, যে নেতা দেশ ত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারেন, তিনি কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না। মনে মনে সুভাষ বাবুকে তাই শ্রদ্ধা করতাম।’’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয়ের সময়ে ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট সায়গন থেকে নেতাজির অজানা বিমানযাত্রার পর চলে গেছে সাত দশক। এরপর ইতিহাসের এই মহানায়ককে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। একের পর এক তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়েছে। হয়েছে তাকে মৃত প্রতিপন্ন করতে সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে নানা চেষ্টা। তা সত্বেও কল্পলোকের রাজপুত্র হয়ে বারবার গণমানুষের আলোচনায়, কখনো রাশিয়ায়, কখনো সাইবেরিয়ায়, কখনোবা চীনে কিংবা প্যারিসে-ভিয়েতনামে নেতাজির উপস্থিতির খবর বেরিয়েছে। সবশেষে আশির দশকে ভারতের উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদেও আশ্রমে গুমনামিবাবা বা ভগবানজির ছদ্মবেশে নেতাজির উপস্থিতির খবর সাম্প্রতিক দশকেও আলোচনার তুঙ্গে। ভারতবর্ষের বহু সাধুরা বারবার উচ্চারণ করেছেন, নেতাজি আজও জীবিত। তিনি ভারতে ফিরে আসবেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে কলকাতা সফরে গিয়ে রেড রোডে নেতাজির প্রতিকৃতিতে অবনত শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তার আদর্শ পুরুষের প্রতি। পরবর্তীতে বাংলাদেশে নেতাজিকে নিয়ে বাংলাদেশের কোনো সরকার প্রধান বা জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক উপমহাদেশের মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে স্মরণ রাখেননি। শ্রদ্ধা জানাননি এই বীর বাঙালিকে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, বহুমাত্রিক.কম ও নেতাজি গবেষক

সহায়ক গ্রন্থ
সুভাষ ঘরে ফেরে নাই: শ্যামল বসু
অসমাপ্ত আত্মজীবনী: শেখ মুজিবুর রহমান
নেতাজি গেলেন কোথায়? (১৯৯৫): ড. জয়ন্ত চৌধুরী