করোনায় কর্মহীন মানুষ ও বৈষম্যের প্রভাব

প্রকাশিত: ১২:২১ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২০

করোনায় কর্মহীন মানুষ ও বৈষম্যের প্রভাব

|| সুতপা বেদজ্ঞ || ২৭ জুলাই ২০২০ : করোনাকাল দীর্ঘ হচ্ছে। সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কর্মহীন মানুষের হাহাকার। এ জন্য মহামারীর মতো দুর্যোগ যতটা দায়ী তার চেয়েও বেশি দায়ী বিদ্যমান বৈষম্যভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। খ্রিস্টান অ্যাড নামের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘করোনায় বাড়ছে অসমতা। ২০২০ সালে তীব্র ক্ষুধায় ভোগা মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ, অর্থাৎ ২৫ কোটিতে গিয়ে ঠেকবে। অতিগরিব দেশগুলোর মেয়েরা আর কখনোই স্কুলে ফিরে যেতে পারবে না।’ দেশে দেশে মানুষে মানুষে যে বৈষম্য বিদ্যমান ছিল তা করোনা নতুনমাত্রায় উন্মোচন করেছে।

এ সময়ে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে আয় বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো এমনকি পৃথিবীর অনেক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রেও বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। সমাজবিশ্লেষক ও অর্থনীতিবেদেরা দেখিয়েছেন- ‘ভীষণ বৈষম্য অনেক দিক থেকেই এক সামাজিক ক্ষত। বৈষম্য যত বেশি, সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ততই নাজুক হয়। একই কারণে মহামারীতে মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। পাশাপাশি উচ্চ বৈষম্য মানে নিম্নতর সামাজিক সংহতি, কম সামাজিক বিশ্বাস এবং অধিকতর রাজনৈতিক বিভেদ। এই অবস্থা সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলার সামর্থ্য কমিয়ে দেয়।’

আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সীমারেখা নির্ধারণে জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে বৈষম্যের সীমারেখা টেনে রেখেছে। যেমন গরিব দেশের মানুষের জন্য দারিদ্র্যসীমা ১ দশমিক ৯০ ডলার অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্যসীমা হিসেবে দৈনিক গড় আয় ধরা হয়েছে ১৫ ডলার। করোনা মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বৈষম্যভিত্তিক উন্নয়ন প্রকৃত উন্নয়ন নয়, উন্নয়ন হতে হবে দরিদ্রবান্ধব, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশবান্ধব ও সমতাভিত্তিক। করোনাকাল শুরু হওয়ার প্রথম ২১ দিনের লকডাউনেই ভারতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে ১২ কোটি মানুষ। ভারতে বিভিন্ন শহরের আট কোটি মৌসুমি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। করোনার আঘাতে লণ্ডভণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ মার্চের পর থেকে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশ থেকে যারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এখনো বৈধ কাগজপত্র করে উঠতে পারেননি তারা রয়েছেন চরম ঝুঁকির মধ্যে। ইইউ ও ব্রিটেনে কলেজের ডিগ্রি নেই এমন ৮০ শতাংশ কর্মজীবী রয়েছে স্থায়ী ও খণ্ডকালীন চাকরি হারানোর ঝুঁঁকিতে। চীনে ১০ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
অক্সফাম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসে যত লোক মারা যাবে তার চেয়ে বেশি মারা যাবে ক্ষুধায়। চলতি বছরে বিশ্বের সবচেয়ে গরিব প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ মানুষ অতিমাত্রায় দারিদ্র্য ও অনাহারে ভুগবে। বিআইডিএস-এর জরিপ দেখিয়েছে, দেশে নতুন দরিদ্র ১ কোটি ৬৪ লাখ। করোনার সময়ে শহরের শ্রমিকদের আয় কমেছে ৮০%, গ্রামে ১০%। ব্র্যাকের সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী করোনার অভিঘাতে আয় কমেছে ৯৫ শতাংশ মানুষের। ৩% লোক চাকরি থাকলেও বেতন পাননি। আর দৈনিক মজুরিভিত্তিতে যারা কাজ করেন তাদের ৬২% কাজের সুযোগ হারিয়েছেন।

সংবাদপত্র, চাকরির ওয়েব পোর্টাল বিশ্লেষণের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গত তিন মাসে নতুন সরকারি চাকরির কোনো বিজ্ঞপ্তি ছিল না। বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমে গেছে। চাকরির বাজার নিয়ে সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশে চাকরির বাজারে ধস নেমেছে। চাকরির বিজ্ঞাপন ব্যাপকভাবে কমেছে। এ বছরের মার্চে চাকরির বিজ্ঞাপন ৩৫ শতাংশ কম ছিল। গত এপ্রিলে কমেছে ৮৭ শতাংশ, এপ্রিলে পোশাক ও শিল্প খাতে ৯৫ শতাংশ কম চাকরির বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। উৎপাদন শিল্পে ৯২ শতাংশ কম চাকরির বিজ্ঞাপন এসেছে। স্বাস্থ্য খাতে কমেছে ৮১ শতাংশ। যে তথ্য প্রযুক্তি খাত নিয়ে দেশের যুব সমাজ আশায় স্বপ্ন বুনছিল সেই খাতে চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে ৮২ শতাংশ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে ৬৪ শতাংশ। করোনা মহামারীর পূর্বে বাংলাদেশে কর্মক্ষম বেকার ছিল প্রায় ২৭ লাখ, যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে। দেশের বাস্তব অবস্থা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে বেশি বৈ কম নয়। এই মহামারীর মধ্যেই সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল লোকসান দেখিয়ে পিপিপির মাধ্যমে চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। পাট কলে কর্মরত ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে স্বেচ্ছা অবসরে পাঠানোর সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন।

এছাড়া তালিকাভুক্ত বদলি ও দৈনিকভিত্তিক ২৬ হাজার শ্রমিককে নিশ্চিত বেকারত্বের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। করোনা সংকটের শুরুর দিকেই সরকার পোশাক শ্রমিকদের তিন মাসের মজুরি দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদন তহবিল ঘোষণা করে। সদ্য ঘোষিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী পোশাক খাতের কর্পোরেট কর ১০-১২ শতাংশ রাখার সুপারিশ করেন। এমনকি পোশাক রফতানির বিপরীতে ১ শতাংশ নগদ সহায়তাও এই বছর অব্যাহত থাকবে। বেসরকারি পোশাক খাতের মালিকদের এত সুবিধা দেওয়ার পরেও কর্মী ছাঁটাই থামছে না। কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের হিসাব মতে, ২২ জুন পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন এবং এখন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত আছে। সরকার একদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সকল সেবা বেসরকারিকরণের মাধ্যমে জনগণের প্রতি দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে গত ১০ বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ৩২১% পর্যন্ত বাড়িয়ে সরকারি-বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য টেনে দিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা দেয়ার, তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং আয় বৈষম্যের প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।

করোনা মহামারীতে যুক্তরাজ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০ শতাংশের বেশি রেস্টুরেন্ট। করোনায় প্রবাসীরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় দেশের রেমিট্যান্স আয় কমে যাওয়ার আশংকা রয়েছে, অন্যদিকে দেশের মধ্যে হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসা বন্ধ থাকায় বা সীমিত আকারে চলায় সেখানেও অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। একইসাথে পরিবহন খাতসহ আরো নানা খাতে বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে কর্মরত হাজার হাজার নন এমপিও শিক্ষকরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সাথে যুক্ত হয়েছে প্রায় চল্লিশ হাজার কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক। কর্মহীন হয়ে পড়েছে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিভিন্ন পার্লারে কর্মরত শ্রমিক, বাড়িতে কাজের সহকারী। জনসংখ্যা অনুপাতে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম সৃষ্টি হওয়ায় কতিপয় কোটিপতি ছাড়া অধিকাংশ মানুষ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়েছে।
এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতির চাকা সচল করতে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের মানুষও চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারি কর্মক্ষেত্র এভাবে সংকুচিত হলে মানুষ যাবে কোথায়? শুধুমাত্র খাদ্য সহায়তা বা কিছু অর্থ সহায়তা দিয়ে এত ব্যাপক মানুষের বেকারত্ব মোকাবিলা সম্ভব নয়। ঢাকা শহর থেকে কর্মহীন হাজার হাজার মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। সেখানে গিয়ে কী করবেন তা অনেকেরই অজানা। বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি এককেন্দ্রমুখী হওয়ায় গ্রামে এমনকি জেলা বা বিভাগীয় শহরেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এ সময়ে ব্যক্তি উদ্যোগে ছোট-বড় খামার, মাছের ঘের বা ফল-ফসলের উৎপাদন যতটা বেড়েছে তা প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ ততটা বাড়েনি। এদেশের ধনী ব্যবসায়ীরা দেশের বাইরে টাকা পাঠিয়ে সেখানে গড়ে তুলেছেন দ্বিতীয় হোমল্যান্ড। দেশে কাজের সুযোগ না থাকায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে কোটি কোটি দক্ষ আধা দক্ষ শ্রমিক।

সেখানে তারা খেয়ে, না খেয়ে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যে অর্থ দেশে পাঠিয়েছে তা সরকারের চাকাকে সচল করেছে আর তৈরি করেছে ব্যক্তিগত ছোট-বড় ইমারত। তাদের অনেকেই করোনাকালে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকিনজি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ঐ প্রতিবেদনে বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে তা মোকাবিলায় কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। ম্যাকিনজি তার প্রতিবেদনে বলেছে- এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে একসঙ্গে মিলে মানুষকে চাকরির নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর ছাড়, ব্যাংক লোন বা সরকারের পক্ষ থেকে কর্মীদের চাকরির সুরক্ষা দিতে হবে। প্রণোদনা প্যাকেজগুলো সঠিক, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সাথে প্রকৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়ার ওপর নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংকট হ্রাস-বৃদ্ধি। কৃষি এদেশের প্রাণ। প্রকৃত কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণ ও ন্যায্যমূল্য ব্যবস্থা চালু করা দরকার। প্রতিবছর আমাদের দেশের অনেক ফসল শুধুমাত্র গুদামজাত ও প্রক্রিয়াজাত করার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
গত একযুগ ধরে সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা ২২ লাখ টনেই আটকে আছে। বর্তমান অবস্থায় খাদ্য নিরাপত্তার সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। এরই মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে জেলায় জেলায় বন্যা ও নদীভাঙন। উত্তরাঞ্চলে বন্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের আশপাশেও বন্যা আঘাত হেনেছে। ইতিমধ্যে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় কৃষক-শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে তাদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা দিতে না পারলে রাস্তা-ব্রিজ বা ভবনের উন্নয়ন কোনো কাজেই আসবে না।
#
লেখক-সুতপা বেদজ্ঞ

নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রী।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ