নৌকার হাল-রিকশার প্যাডেলে ঘুরছে বন্ধ হওয়া পাটকল শ্রমিকের জীবন

প্রকাশিত: ২:১৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২০

নৌকার হাল-রিকশার প্যাডেলে ঘুরছে বন্ধ হওয়া পাটকল শ্রমিকের জীবন

চট্টগ্রাম, ২৪ অাগস্ট ২০২০: চট্টগ্রামের আমিন জুটমিলসে গত ১১ বছর ধরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা জাহাঙ্গীর আলমের এখন জীবন চলছে রিকশা চালিয়ে।

করোনাভাইরাস মহামারিতে সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেওয়ায় জাহাঙ্গীরের মতো অনেক শ্রমিকের জীবন চলছে পেশার বদল ঘটিয়ে মানবেতরভাবে।
কর্মহারা এ্ই শ্রমিকদের কেউ কেউ সহজ পেশা হিসেবে রিকশা চালানোয় যুক্ত হয়েছেন। কেউ হয়েছেন নৌকার মাঝি। কেউবা ফল বিক্রেতা কিংবা নির্মাণ শ্রমিকের কাজেও নেমেছেন। আর এখনও কাজ জোগাড় করতে না পেরে বেকার জীবন পার করছেন অনেকে।
মিল বন্ধ করে দেওয়ার পর প্রাপ্য মজুরি দুই মাসেও পায়নি বলে দাবি আমিন জুট মিলসের শ্রমিকদের। আগের বছরের মজুরিও বাকি রয়েছে। চট্টগ্রামের শ্রমিকদের মতো দেশের সব রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকেরই এমন অবস্থা বলে জানা গেছে।
গত ৩০ জুন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় শ্রমিকদের অবসরে পাঠিয়ে বন্ধ করে দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল।
বন্ধ হয়ে যাওয়া ২৫টি পাটকলে ২৫ হাজারের মতো শ্রমিক ছিলেন। তাদের উপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষকে পড়তে হয়েছে জীবিকার সঙ্কটে।
বন্ধের পরপরই শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করে দেওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা শ্রমিকরা না পেয়ে মহামারীকালে কষ্টে দিন পার করছেন।
কথা হয় চট্টগ্রামের আমিন জুট মিলসের জাহাঙ্গীরসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে।
তাদেরই একজন শহিদুল ইসলাম। বাড়ি সিরাজগঞ্জে হলেও প্রায় ৩০ বছর কাজ করছেন আমিন জুট মিলসে। দুই ছেলেও মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন কয়েক বছর আগে।
শহিদুল বলেন, “দুই ছেলে আর আমার আয়ের টাকায় ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু হঠাৎ মিল বন্ধ করে দেওয়ায় চোখে অন্ধকার দেখছি।”
কাজ না থাকায় চট্টগ্রাম ছেড়ে পরিবার নিয়ে চলে গেছেন সিরাজগঞ্জে।
এখন কী করছেন- জানতে চাইলে শহিদুল বলেন, “নৌকা চালিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে।”
জীবনের বেশিরভাগ সময় পাটকলে কাজ করেছেন বলে অন্য কোনো কাজ শেখা নেই শহিদুলের, তার ছেলেদেরও একই অবস্থা।
শহিদুল বলেন, চাকরির যে সঞ্চয় ছিল সেগুলো দিয়ে একটা নৌকা কিনেছেন। সারাদিন নৌকা চালিয়ে খরচ শেষে আয় থাকে দুই থেকে তিন’শ টাকা। সেই টাকায় কষ্ট করে চালাতে হচ্ছে জীবন।
শফিকুল ইসলাম নামে আরেক শ্রমিক জানান, তিনি এখনও কোনো কাজ জোগাড় করতে পারেননি বলে বেকার।
“ছোট বেলায় যোগ দিয়েছিলাম মিলে। অন্য কোন কাজ জানি না। মিল বন্ধ হওয়ায় কোনো কাজ নেই, অনেক কষ্টে জীবন চলছে।”
দুই মাস আগে পাটকল বন্ধ হওয়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান শফিকুল।
“এখানেও কিছু করতে পারছি না। গ্রামের মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে পারছি না কোনো কাজ করতে। মাছ ধরা বা চাষবাসের কোনো কাজও করতে পারছি না।”
আমিন জুট মিলসের শ্রমিকরা জানান, তাদের মতো দেশের সব পাটকল শ্রমিকদের একই অবস্থা। শ্রমিকরা মিল ছেড়ে চলে গেছেন বাড়িতে। যারা আছেন তারা পাওনা টাকা পাওয়ার আশায় মিলে এসেছেন। অনেক শ্রমিক মিলের কলোনি ছেড়ে না গেলেও তারা নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
শ্রমিক শামসুল আলম জানান, ৩০ জুন পাটকল বন্ধের সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হলেও তারা কাজ করেছেন জুলাই মাসের ২ তারিখ রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত।
“শ্রম আইন অনুযায়ী মিল বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর দুই মাসের নোর্টিস ফি (মোট বেতনের বেসিক) দেওয়ার কথা থাকলেও তারা পেয়েছেন এক মাসের। এর সাথে গত বছরের তিন সপ্তাহের মজুরিও বকেয়া আছে।”
শামসুল জানান, ২০১৫ সালে পে-স্কেল ঘোষণা করা হলেও পাটকল শ্রমিকরা তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দেশব্যাপী আন্দোলনের ফলে এ বছরের জানুয়ারি থেকে তাদের পে-স্কেল দেওয়া হলেও পাননি ‘এরিয়ার’ । তার পাশাপাশি ২০১৪ সাল থেকে যারা অবসরে গেছেন, তারাও তাদের বকেয়া পাওনা পাননি।
তিনি বলেন, “এই অবস্থা শুধু চট্টগ্রামের আমিন জুট মিলে না। সারাদেশে কোনো কোনো পাটকলে ২০১৯ সালের বকেয়া মজুরি পেলেও অধিকাংশ মিলে শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া আছে।”
মো. মানিক নামে এক শ্রমিক জানান, মিল বন্ধ ঘোষণা করার পরও তারা দুই দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেছেন। সে মজুরি থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। কোরবানির ঈদের বোনাসও তারা পাননি।
সরকার লোকসানের কথা বলে পাটকলগুলো বন্ধ করলেও এতে শ্রমিকদের কোনো দায় নেই বলে দাবি করেন মানিক।
“শ্রমিকদের কারণে পাটকল লোকসানে পড়ে না। বিজেএমসি (বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন) কর্মকর্তারাই লোকসানের জন্য দায়ী।”
তিনি বলেন, দেশের প্রায় পাটকলে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত পণ্য গুদামে পড়ে আছে। এভাবে মিল বন্ধ করে রাখলে সেগুলো সব নষ্ট হয়ে যাবে।
সরকারের পক্ষ থেকে পাটকলগুলো নতুন ব্যবস্থাপনায় চালু করার আশ্বাস দেওয়া হলেও শ্রমিকরা তাতে ভরসা পাচ্ছেন না। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) মাধ্যমে পাটকলগুলো চালু হলে তার সফলতা নিয়েও সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।
বিজেএমসির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৯৮১ সালে তাদের নিয়ন্ত্রনাধীন পাটকলের সংখ্যা ছিল ৮২টি। ১৯৮২ সালে ৩৫টি পাটকল বিরাষ্ট্রীকরণ, আটটি মিলের পুঁজি প্রত্যাহার ও একটি পাটকল ময়মনসিংহ পাটকলের সাথে একীভূত করার পর তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন পাটকলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮২ থেকে কমে ৩৮টিতে। পরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ২৫টিতে। যার মধ্যে ২২টি জুট মিল ও তিনটি নন জুট মিল।
বিজেএমসির তালিকা অনুযায়ী জুট মিলগুলোর মধ্যে দুইটি করে ঢাকা, যশোর ও নরসিংদীতে। একটি করে সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীতে। সাতটি করে খুলনা ও চট্টগ্রামে। আর তিনটি নন জুট মিলের দুটি চট্টগ্রামে অন্যটি নারায়ণগঞ্জে।