ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৪ : ধর্ম-সমাজ ও শ্রেনীদর্শন (তৃতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২১

ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৪ : ধর্ম-সমাজ ও শ্রেনীদর্শন (তৃতীয় পর্ব)

|| হাফিজ সরকার ||

১১ এপ্রিল ২০২১ : উপসংহার
শোষিতের নেই কোনও ধর্মভেদঃ
ইতিপূর্বে আমি ধর্ম বিষয়ে আমাদের দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী রাখার চেষ্টা করেছি।
এবার সিদ্ধান্তের পর্বে প্রাত্যহিক জীবনের কিছু বাস্তব ঘটনার কথা বলছি। যে মজদুররা কারখানায় পাশাপাশি কাজ করেন, তাদের পরস্পরের মধ্যে কখনও এ প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়না যে তারা কোন সম্প্রদায়ভুক্ত। পুঁজির নির্মম শোষণ, মালিক শ্রেণীর অত্যাচারের খড়্গ জাত। ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে তা সমানভাবে নেমে আসে মজদুরদের ভাগ্যে। তাই তার প্রতিরোধও মালিক যখন কারখানায় লক আউট, ক্লোজার ঘোষণা করে বা শ্রমিক ছাঁটাই করে তখন মালিকের ধর্ম সম্প্রদায়ের ওপর সেই বিশেষ সম্প্রদায়ের মজদুরদের সৌভাগ্য নির্ধারিত হয় না। সামন্ত ও কৃষক শ্রেণী অথবা যে কোন শোষক ও শোষিত শ্রেণীর ক্ষেত্রই এই কথা সমান সত্যি।

শোষন মুক্তিই একমাত্র পথঃ

এই পৃথিবীতে বহু পূর্বে যখন আমাদের পূর্ব পুরুষেরা জঙ্গল কেটে বসত গড়ে ছিলেন, হিংস্র জানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিপন্ন অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তখন হজরত মুহম্মদ, খ্রীষ্ট বা মনু কেউই এই পৃথিবীতে আসেননি। ছিল না কোন জাতপাতের ভেদাভেদ, ছিল না শোষণ। মানুষের সম্পদ ছিল চিন্তাশীলতা, গতিশীলতা। মানুষ ভাবতে চেষ্টা করত তার দুঃখের কারণগুলিকে। কখনও পথের বাধা আর শোষণের পাহাড়, তার গতিশীল পরিক্রমাকে রুদ্ধ করতে পারেনি। মানুষ সংঘবদ্ধ হয়েছে, বিদ্রোহে ফেটে পড়েছে বারে বার। কখন সুদুর রোমে স্পার্টাকাসে নেতৃত্বে, কখনও তা ভারতে অখ্যাত সিধু,কানু, মজনু শাহ, কাকদ্বীপের অহল্যামা
কিংবা নকশালবাড়ীর বাবুলাল, ত্রিবেণী, বড়কামাঝিদের নেতৃত্বে। সেই অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা আজও নিরবিচ্ছন্ন ধারায় ব’য়ে চলেছে। আসুন, সেই স্রোতের সহযাত্রী হিসাবে আমরাও নিজেদের প্রগতির জনসাগরে মিলিয়ে দিই।

মুখবন্ধঃ

প্রতিটি ঘটনার পিছনেই একটা ইতিহাস থাকে। ৬ই ডিসেম্বর অযোধ্যায় যা ঘটেছে এবং তারা জের টেনে আজও মহারাষ্ট্র, গুজরাট সহ নানা স্থানে যে দাঙ্গা চলছে তার ইতিহাস বহুদিনের। “জয়শ্রীরাম” ধ্বনি তুলে হিন্দু মৌলবাদ তাণ্ডব চালাচ্ছে। তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটছে মুসলমন সমাজেও – শক্তিশালী হচ্ছে মুসলিম মৌলবাদ। সারা দেশে সরকারী হিসাবেই দু’হাজারের উপর মানুষ নিহত হয়েছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘর ভেঙ্গে বা পুড়িয়ে দিয়ে
উদ্বাস্তু করে দেওয়া হয়েছে, ধর্মের নামে। তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও ধর্মানিরপেক্ষ সরকার কেবল ভোটের হিসাব ও রাজনীতির প্যাঁচ কষছে। বহু জায়গা থেকে অভিযোগ উঠেছে যে, মৌলবাদী চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে, শান্তি রক্ষকরা সরাসরি সংখ্যালঘুদের উপর তাণ্ডব চালাচ্ছে।
আমরা দাঙ্গা চাই না –
বাঁচতে চাই।
মন্দির মসজিদ চাই না –
খেতে, পরতে, শিক্ষাপেতে চাই।
সেসব থেকে আমাদের বঞ্চিত করে,
সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলি ঠেলে দিচ্ছে
অত্যাচার,
শোষণ ও মৃত্যুর দিকে।
বি জে পি চক্র এর জন্য সরাসরি দায়ী।
কিন্তু সমস্ত ভোটবাজ রাজনৈতিক দলগুলির হাতই আজ সাধারণ মানুষের রক্তে লাল।
তাই আমাদের সামান্য ক্ষমতায়,
প্রকাশ করলাম এই পুস্তিকা। এতে আমরা ধরতে
চেয়েছি ধর্মের উদ্ভব, দার্শনিক ভিত্তি ও শ্রেণীবিভক্ত সমাজে এর রূপকে। আর একটালেখায় তুলে ধরতে চেয়েছি, রামমন্দিরের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা।
শাসকশ্রেণী সাম্প্রদায়িকতার শিকড় আমাদের মনে ভালোভাবেই ছড়িয়ে দিতে চাইছে।
আমাদের ক্ষমতা আজ অল্প হতে পারে, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, শ্রমিক, কৃষক মেহনতী মানুষের লৌহদৃঢ় ঐক্যই এই ধর্মীয় ভেদাভেদকে চূর্ণ করবে। তাই এই পুস্তিকা যদি একজনও পড়েন তার প্রতিবেশী বন্ধু বান্ধবদের সাথে আলোচনা করেন ও শ্রেণীচেতনার আলোকে সব ঘটনাকে বিশ্লেষণ করেন, তবেই আমাদের প্রয়াস সার্থক বলে জানব।
(অমর ভট্টাচার্য,
সম্পাদক
২১.১.৯৩)

সংগ্রহ ও সম্পাদনাঃ
হাফিজ সরকার

তথ্যসূত্রঃ
অমর ভট্টাচার্য
রেফারেন্স বুক;
১। হিন্দু সংস্কৃতির স্বরূপ – ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রী।
২। সাংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক তত্ত্ব – বলু সন ওরমান।
৩। Anti Dubring – Frederik Engels.
৪। ধর্ম প্রসঙ্গে মার্কস এঙ্গেলস্ – মস্কো প্রকাশন।
৫। পৌরাণিক অভিযান – সুধীরচন্দ্র সরকার দ্বারা সংকলিত।
৬। Ancilla to pre-Socratic Philosophers – Cathlecon Freeman.
৭। ধর্ম ও সমাজ – জর্জ টমসন।
৮। ভূত, যাদু আর ধর্ম এ. কে. রায়।
৯। মানব সন্তান ঈশ্বর – ভবাণী প্রসাদ সাহ।
১০। মানুষের ক্রমবিকাশ এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতি – কমলকুমার সান্যাল।
১১। প্রমিথিউসের পথে – উৎস মানুষ সংকলন।
১২। বাস্তবাদীর ভারত জিজ্ঞাসা – নন্দগোপাল সেনগুপ্ত
১৩। মার্কস এঙ্গেলস্ মার্কসবাদ – লেলিন
১৪। শ্রীমদ্ভগদগীতা।
১৫। ঋগ্বেদ সংহিতা – হরফ প্রকাশনী।
১৬। শ্রী শ্রী চণ্ডী – স্বামী জগদীশ্বরানন্দ।
১৭। উপনিষদ – হরফ প্রকাশনী।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ