ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৫: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

প্রকাশিত: ১১:১১ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২১

ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৫: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

|| হাফিজ সরকার ||

১২ এপ্রিল ২০২১ : পর্ব-১
হেফাজতী ইসলাম গঠনঃ ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি এই সংগঠনটি চট্টগ্রামের প্রায় একশত কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত হয়। হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা। এটি ২০১০ সালে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ২০১১ সালে তারা বাংলাদেশ নারী উন্নয়ন নীতি (২০০৯) এর কয়েকটি ধারাকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক দাবি করে এর তীব্র বিরোধিতা করে। ২০২০ সালে শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর এই সংগঠনের আমির হন জুনায়েদ বাবুনগরী।

হেফাজতী ইসলামের উত্থানঃ

গণজাগরণ মঞ্চ যুদ্ধাপরাধের ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা একটি র্নিদলীয় আন্দোলন। কিন্তু দেশের মৌলবাদী শক্তি যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বানচাল করার জন্য হেফাজত ইসলাম নামে আর্বিভূত হয়। গণজাগরণ মঞ্চের ব্লগারদের নাস্তিক অভিহিত করে তাদের ফাঁসির দাবিতে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করে।

১৩ দফাঃ

ইসলাম হেফাজতের নামে ‘হেফাজতে ইসলাম’ ৬ এপ্রিল ২০১৩ সুদীর্ঘ লংমার্চক’রে তাদের ১৩ দফা দাবী জানায়। এই ১৩ দফা দাবী শুধু সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক-ই নয় বরং এটি ইসলাম পরিপন্থীও৷ ১৩ দফাএকদিকে যেমন সংবিধান পরিপন্থী তেমনিমুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী।

নারীনীতিঃ

নারীনীতি বাতিলসহ নারীদের অবরুদ্ধ করার মাধ্যমে হেফাজতে ইসলাম দেশকে একটি তালেবান রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করছে। তারা সুপরিকল্পিতভাবে নারীদের নিগৃহীত করার জন্য মধ্যযুগীয় কায়দায় দেশ পরিচালিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের এই উদ্দেশ্যকে কোনভাবেই সফল করতে দেওয়া যাবেনা। দেশের জনগণকে যেমন তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, তেমনি সরকারকেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংবিধান বিরোধীঃ

হেফাজতে ইসলাম তার প্রথম দফায় বলেছে, সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পূনঃস্থাপন করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২ অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তাই সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ১ম দফাটি কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য হবে না। ২য় দফায় হেফাজত আল্লাহ, রাসুল (সাঃ) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুত্‍সা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুৃ দন্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করার কথা বলেছে। কিন্তু এটিও সংবিধান পরিপন্থী। বাংলাদেশের সংবিধানে ৩৯ (২) অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা, মত ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। আর কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা একটি দন্ডনীয় অপরাধ। হেফাজতে ইসলাম নবী (সা:)-এর নামে কুত্‍সা রটনাকারী নাস্তিক ব্লগারদের গ্রেফতার পূর্বক কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করতে বলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ (১) অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা-চেতনা ও বিবেকের স্বাধীনতা রয়েছে। তাই ৩য় দফাটিও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

নারীদের অবরুদ্ধ করার দাবীঃ

হেফাজতের ১৩ দফার পরের দুইটি দফায় নারীর উন্নয়ন নীতি বাতিলসহ নারীদের অবরুদ্ধ করে রাখার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে হেফাজত নারীর স্বাধীনতাকে হরণ করেছে। এটি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অবাধ বিচরণ নিষিদ্ধ করা হলে সরকারী-বেসরকারী কর্মসংস্থানসহ জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি সরকারিক্ষেত্রে নিয়োজিত লক্ষ লক্ষ নারীকর্মী কর্মহীন হয়ে পড়বেন যা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে জাতীয় অর্থনীতি ও উন্নয়নকে। এছাড়াও এ দাবি পূরণ করা হলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করতে হবে। ফলে নারীর ক্ষমতায়ণ বিঘ্নিত হবে, যা সংবিধানের মুল চেতনার পরিপন্থী। তাই এটি কোনভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না।

ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপঃ

আর ইসলাম বিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করার কথা বলা হয়েছে হেফাজতের ১৩ দফায় যা স্বাধীন বাংলাদেশে এযাবত্‍কালের মধ্যে প্রণীত সবচেয়ে অগ্রসর দুটি মৌলিক নীতিমালাকেই প্রত্যাখ্যান করে দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। হেফাজতের ৭ম দফাটিও সংবিধান পরিপন্থী। বলা হয়েছে কাদিয়ানিদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমুলক সব অপতত্‍পরতা বন্ধ করতে হবে। সংবিধানে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। আর সংবিধান রাষ্ট্রকে মুসলমান বা অ-মুসলমান ঘোষণার কোন দায়িত্ব দেয়নি। বরং সরকারের দায়িত্ব সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। তাই হেফাজতের এই দফাটিও বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারী ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্য ধর্ম প্রচারের বাঁধাঃ

১৩ দফার ১০ নম্বর দফাটিতে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিষ্টান মিশনারীগুলোর ধর্মান্তকরণসহ সব অপতত্‍পরতা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনসহ সকল ধর্মের ধর্ম-প্রচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে খ্রিষ্টান মিশনারীদের ধর্ম প্রচারে বাধা দিলে সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা হবে। আর কোন এনজিও বা মিশনারী যদি ধর্ম অবমাননাকর কোন কর্মকান্ড করে তবে প্রচলিত আইনেই তার বিচার হবে।

ভাস্কর্য ধ্বংসের দাবিঃ

হেফাজত বলছে মসজিদের নগরী ঢাকাকে মূর্তির নগরীতে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করতে হবে। হেফাজতের এই দফাটির বিপরীতে অবস্থান করছে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৪। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাত্‍পর্যমন্ডিত স্মৃতি নির্দশনসমহূকে রক্ষা করবার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি হেফাজতের দাবি অনুযায়ী ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য সমূহকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয় তবে তা সংবিধান পরিপন্থী হবে।

উন্নয়ন বিরোধীঃ

দেখা যাচ্ছে এভাবে হেফাজতের প্রতিটি দফাই কোন না কোন ভাবে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুলত ‘হেফাজতে ইসলাম’ ইসলাম রক্ষার নামে সংবিধান বিরোধী ও ইসলাম বিরোধী দাবি জানিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা সংবিধানের ওপর নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস এবং প্রত্যয়কে পরাহত করেছে। এছাড়াও এটি শুধু নারী প্রগতি বিরোধী নয়, এটি দেশের উন্নয়ন বিরোধীও।

লক্ষ্য পার্বত্য চট্টগ্রামঃ

হেফাজতে ইসলামের ১৩-দফা নিয়ে চারদিকে প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে সংগত কারণেই, কিন্তু আদিবাসী জীবনের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব সে কতটা মারাত্মক হতে পারে সেটাও ভেবে দেখা দরকার। হেফাজতের ১৩-দফায় “পার্বত্য চট্টগ্রামকে খ্রিষ্টান করা হচ্ছে” এই অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে এবং বলা হচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছ। এই বক্তব্য বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমরা দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চলসহ দেশের সমতল এলাকায় বাঙালী ছাড়াও কমপক্ষে আরও যে ৭৫ টি আদিবাসী জাতি বাস করে তাদের জাতিগত অস্তিত্বকে দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই অস্বীকার করা হচ্ছে এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামীকরণের চেষ্টা চালিয়ে
আসছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪ লক্ষ বাঙালী মুসলমানকে পাঠিয়ে বাঙালীকরণের আড়ালে
কার্যত ইসলামীকরণ করে। রাষ্ট্রীয় এই পৃষ্ঠপোষকতাকে কাজে লাগিয়ে জামাতে ইসলাম, নেজামী ইসলাম, মুসলীম লীগ, বিএনপি এবং হেফাজতিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে উগ্র-সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রসার ঘটিয়েছে। বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিগত প্রায় চার দশক জুড়ে উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির সশস্ত্র প্রশিক্ষণের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এদের সাথে যুক্ত হয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমারের উগ্রবাদী জাতিগত দাঙ্গা উপদ্রুত আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের মধ্যকার জঈীবাদীরা। এই মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে উগ্র মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মায়ানমারের আরাকানের সমন্বয়ে একটি জঙ্গীবাদী ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই প্রেক্ষিতে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গকে বিবেচনা করতে হবে। গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিষ্টান জনসংখ্যার হার ৫ শতাংশের নীচে। কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে খ্রিষ্টানকরণের বক্তব্য তুলে ধরে যারা অহেতুক ভীতির সঞ্চার করতে চাইছে তারা বিশেষ অপউদ্দেশ্যে এটা করছে। তাছাড়া বাংলাদেশের সংবিধান হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষকে মানবাধিকার ও সমমর্যাদা প্রদান করেছে। স্বেচ্ছায় ধর্মান্তকরণ নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার।

সরকারের দায়িত্বঃ

সরকারের উচিত্‍ এই মূহুর্তে সংবিধান অবমাননাকারী এবং অসত্‍ এবং অনৈতিক উদ্দেশ্যে সংবিধান বাতিলের ষড়যন্ত্রকারী হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সাথে হেফাজতে ইসলামের কর্মকান্ডকে যারা নানাভাবে সমর্থন করেছে, সহযোগিতা দিয়েছে বা উস্কানি প্রদান করেছে তাদের বিরুদ্ধেও সরকারের উচিত যথার্থ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
(চলবে)