ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৬: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

প্রকাশিত: ১:৫৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২১

ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-৬: অসাম্প্রদায়িকতা – ধর্মনিরপেক্ষতার সংগ্রাম এবং চলমান হেফাজতী তান্ডব সংস্কৃতি

|| হাফিজ সরকার ||

১৩ এপ্রিল ২০২১: পর্ব-১(পুর্বে প্রকাশের পরের অংশ)
সাম্প্রতিক ঘটনা ও তার মূল্যায়নঃ সাম্প্রতিক হেফাজতের কর্মকাণ্ড কিভাবে মুল্যায়্যন করেন প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপি?
প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপি পৃষ্টপোষকতার সনদ দিয়ে আজকে এই পর্যায়ে এনেছে। ২০১৩ সালের মে মাসের ৫ তারিখে শাপলা চত্তরে আমরা যে তান্ডবটা দেখেছিলাম, তারা ১৩ দফা দাবি তুলেছিলো যা ছিল সবই সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তখন আমরা দেখেছিলাম বেগম খালেদা জিয়া দেশের মানুষকে সরাসরি বলেছিলেন,”দেশবাশি হেফাজতের পাশে এসে দাঁড়ান”। এরশাদ সাহেবও সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন। কাজী জাফর মাথায় টুপি পারে গিয়ে, সেখানে সেই হেফাজতের সমাবেশের মঞ্চে বসে ছিলেন। পানি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আওয়ামীলীগের অনেক নেতাকর্মীরা এলাকায় এলাকায় পানি বিলি করেছিলেন আমরা দেখেছি। তারপর আমরা দেখলাম আশকারা পেয়ে তারা বায়তুল মোকাররম মসজিদে কোরান শরিফ পুড়িয়ে দেওয়া, হাদিস শরিফ পুড়িয়ে দেওয়া, ইসলামী পত্রিকা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। আরও আমরা দেখলাম ঐ এলাকায় বেজমেন্টে শত শত গাড়ি পুড়িয়ে দিতে, রাস্তার গাছ কেটে দিতে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে একই চরিত্র দেখতে পায়। সেই সময় আমরা সরকারকে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন। বানরের হাতে যদি মশাল দেন তাহলে সমস্ত গ্রাম ঝালিয়ে দিবে। হেফাজত নামক বানরের হাতে সরকার ও প্রধান বিরোধীদল মশাল দিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তারা এখন স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুড়িয়ে দিচ্ছে।

সেই সময় যখন সুপ্রিম কোর্টের সামনে নির্মিয়মান ভাষ্কর্য নিয়ে বিতর্ক চলছে তখন সেই সময়ের ১৪ দলীয় জোট সরকারের কেবিনেট মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি জননেতা রাশেদ খান মেনন সংসদে সরকারের হেফাজত তোষণ নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছিলেন। জবাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আপনি পদত্যাগ করে এই বক্তব্য দিতে পারতেন’।
আমরা বলেছি। বার বার হুশিয়ার করেছি। আজকে এসে আমরা দেখছি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে টানাটানি শুরু হলো। হেফাজত নেতা মোমিনুল হক দম্ভের সাথে সরাসরি বললেন, “বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য ভেংগে বুড়িগংগায় ফেলে দেওয়া হবে”। তারপর আমরা দেখলাম ধর্মমন্ত্রী মাওলানা শফির কবর জেয়ারতের নাম করে হেফাজতের সাথে আলোচনা করলেন। তারপর কি হলো?
আমরা দেখলাম যে ভাষ্কর্য স্থাপন স্থগিত হয়ে গেল। এখন পর্যন্ত সেই ভাষ্কর্য নির্মিত হয়নি। এরপর আমরা কি দেখলাম? দেখলাম সুনামগঞ্জের শাল্লার ঘটনা। সেখানেও একই রকম ঘটনা। সেই একই ভাবে সরকার সকলকে বলে দিলেন, ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত সভা সমাবেশ না করার জন্য। কিন্তু হেফাজতকে ফ্রি হ্যান্ড দিয়ে দিলেন।
১৫ মার্চ হেফাজত নেতা শাল্লার পাশের গ্রাম নওদায় গেলেন, সেখানে গিয়েই চরমভাবে উত্তেজনা ছড়ালেন। বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করলেন। হিন্দু সম্প্রদায়কে তিনি ‘একিউজ’ করলেন এবং বললেন,’এখন জিহাদ ছাড়া আর কোন পথ নেই”। তিনি চলে এলেন। নওদার ছেলে ঝুমুর দাস প্রতিবাদ জানিয়ে নিজ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন। ” মামুনুল হক সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতি ভাংগার উস্কানি দিয়েছেন”। প্রশাসন জানলো। সবই জানলো। তারপরও ঝুমুর দাসকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হলো।

পরেরদিন হেফাজতের মওলানা শোয়েব, যিনি আফগানিস্তানে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। লন্ডন থেকে বহু অর্থ নিয়ে এসে ঐখানে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি স্বশরীরে থেকে মাইকিং করে, প্রচার করে, প্রশাসনের নাকের ডগায় ঐ তান্ডব কান্ড ঘটালো। প্রশাসন কোন ভুমিকাই নিলোনা। এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত নেন নায়। ভিডিও ক্লিপে আমরা দেখেছি, “মামুনুল হকের একশন, ডাইড়েক্ট একশন, হেফাজতের একশন, ডাইরেক্ট একশন”। ভিডিওতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, কিন্তু আপনি দেখবেন সুনামগঞ্জের এসপি বললেন কুমন্ত্রণা দিচ্ছে বিএনপি। অর্থাৎ সেই পুরাতন ঝগড়া, বিএনপি- আওয়ামীলীগের ঝগড়া, দোসারপের রাজনীতি।

এরপর হলো স্বাধীনতার সুবর্ন জয়ন্তীর অনুষ্ঠান টার্গেট। এখানে তারিখগুলো খেয়াল করবেন। একটা হলো ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষ। আরেকটি হলো ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস এবং সুবর্ণ জয়ন্তী। পরবর্তীতে আক্রান্ত হলো কারা ? খালি ভুমি অফিস, ডিসি অফিস, আওয়ামিলীগ অফিসই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মারক, বঙ্গবন্ধুর মোরাল, সুর সম্রাট আলাউদ্দিন আলো খাঁন যাদুঘর অর্থাৎ আমাদের শিল্প-সাংস্কৃতির ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধিনতার সব কিছু তারা ধ্বংস করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক আশকারা দিয়ে অরাজনৈতিক ধর্ম ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতকে আজকে এই পর্যন্ত আসার সুযোগ দিয়েছে বর্তমান বিএনপি-আওয়ামীলীগ দুই দলই। সেই জায়গায় এসে তারা যা দেখাচ্ছে, সেটা তাদের রশি টেনে ধরার জন্য আইনের আশ্রয় কীংবা তাদের দমন করার জন্য কি যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
এতদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, ” হেফাজত যে তান্ডব করেছে তার সাথে অবশ্যই জামাত-বিএনপি জড়িত আছে “।এবং প্রধানমন্ত্রী আরও একটি কথাও বলেছেন, ” সব হেফাজত ঘটনার সাথে জড়িত নয়”।
তার মানে দাঁড়ায় যে ভাল হেফাজত আছে তাদের সাথে কি আওয়ামিলীগ বা ১৪ দলের সখ্যতা আছে কিনা? সেই জায়গাটিকে আওয়ামীলীগ বা ১৪ দল কিভাবে দেখে?

প্রথম কথা হচ্ছে, বলা হচ্ছে হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। উত্তর হচ্ছে ‘না’। এটা অরাজনৈতিক সংগঠন নয়। অরাজনৈতিক মোড়কে ‘ধর্মীয় মৌলবাদী জংগী’ সংগঠন। যদি আপনি হেফাজতের নেতাদের নামের তালিকা পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে দেখবেন, সবাই কোন না কোন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত। কেউ খেলাফত মজলিস, কেউ খেলাফত আন্দোলন, কেউবা ইসলামি শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন এই ভাবে বিভিন্ন দলের সাথে জড়িত। আপনি যদি দেখেন মওলানা মমিনুল হক নিজে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব। তিনি ২০ দলীয় জোটভুক্ত রয়েছেন। এরা অরাজনৈতিক কোন সংগঠনের নয়, অবশ্যই রাজনৈতিক সংগঠন ভুক্ত।

এদের রাজনীতিটা বুঝতে হবে। রাজনীতির লক্ষটা বুঝতে হবে। অনুধাবন করতে হবে। বাংলদেশে পুনরায় মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ধরা যেটা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হয়েছিল আমরা দেখেছিলাম ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে। হেফাজতের ব্যানারে সেটাই আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশকে আবার পিছিয়ে দেওয়া, সুবর্ণ জয়ন্তীর ৫০ বছরে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি হয়েছে এই ৫০ বছরের অগ্রযাত্রা পিছিয়ে দিয়ে আবারও সেই পুরানো ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় তাদের উদ্দেশ্য। আর এখানে যাকিছু শিল্প, যাকিছু সৃংস্কৃতি, যাকিছু ঐতিহ্য তার বিরোধিতা করা। যেটা বলছি যে ব্যবস্থা নেওয়া? ব্যবস্থা নেয় নাই। তাদের ২০১৩ সালে বিএনপি জামাতের তান্ডব আমরা দেখেছি। সেই সময় বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল উস্কানিদাতা হিসাবে। একটা দুইটা মামলা না অনেকগুলি মামলা।

এখানে কিন্তু মামুনুল হক, কাসেমী, বাবু নগরীরা বলেই চলেছে, উস্কানি দিয়েই চলেছে এবং তার ফলে ঘটনা ঘটছে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে, তাদের নাম ধরে কোন মামলা হচ্ছেনা। আর পুলিশ? যেখানে আক্রমণ হচ্ছে সেখানে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। কেন কাজ করছেনা, পুলিশ এতো অসহায় কেন? কি কারনে?
আমরা বলবো যে, ঐ রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে যখন দেশ পরিচিত হয় এবং তাদের কোন নতুন এজেন্ডা আছে কিনা এটাও আমরা জানতে চাই। কারন আমাদের দেশে এই ঘটনা আগেও ঘটেছে, আবারও ঘটবে বলে আমাদের ধারণা। সেই ক্ষেত্রে সরকারকে আমরা শতর্ক করছি। আর হেফাজতের ভাল খারাপ নেই। ভালো একদিকে আর খারাপ একদিকে এটা মনে করার কোন কারণ নাই। সাপ সাপই। কেবল খালি খোলস বদলায়। খোলস বদলিয়ে চরিত্রের কোন পরিবর্তন হয়না।।
(চলবে).

(হাফিজ সরকার)