ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-১৩: বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ (১)

প্রকাশিত: ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০২১

ধর্ম যখন সন্ত্রাসীর হাতিয়ার-১৩: বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ (১)

|| হাফিজ সরকার ||

২০ এপ্রিল ২০২১ : বর্তমানে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যান্য অংশের মত মুসলিম মৌলবাদ এবং জঙ্গি সন্ত্রাসের ঘাঁটি হয়ে উঠেছে। এর উদ্ভব এবং তার মোকাবিলায় পদক্ষেপ বিষয়ে জানা শুধু বাংলাদেশের মানুষ নয় এই উপমহাদেশের সমস্ত জনগণের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত, পাকিস্থান এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক উৎপত্তি যেমন এক, এই দেশগুলির আর্থসামাজিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক জীবন এখনও একই সূত্রে বাঁধা। তাছাড়া দেশগুলির উপর সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব আজও বিপুল পরিমাণে বিদ্যমান। কাজেই এই উপমহাদেশের স্বাধীনতাও গনতন্ত্র সুরক্ষার উপায় সম্পর্কে সম্যক ধারনার লক্ষ্যেই এই আলোচনা।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিঃ

আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে সারা বিশ্বে এখন একচরম অস্থিরতা চলছে । আইএস নামের যে মৌলবাদী, জঙ্গী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরাক ও সিরিয়ায় বেশকিছু ভুখন্ড দখল করে ঐ এলাকায় জঙ্গী ও সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে আসছিলো তা সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিষাক্ত থাবা ও নখদন্ত বিস্তার করছে। চরম ধর্মান্ধ মতাদর্শে বিশ্বাসী এই সশস্ত্র সংগঠন বিভিন্ন দেশের তরুণদের আকৃষ্ট করছে। তাদের জিহাদের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করে বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছে। তাদের আক্রমণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, বহু মানুষের প্রাণ গেছে। এসব দেশের উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ছিন্ন-ভিন্ন করে তারা তাদের আক্রমণ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গী আক্রমণের
দায়ও স্বীকার করছে ঐ সংগঠনটি। আইএস-এর এই ধর্মীয় সন্ত্রাসী তৎপরতা আমেরিকা-ইউরোপের দেশ সমুহে বসবাসরত মুসলিম অভিবাসীদের এক বড় ধরণের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম নব প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন (Isoleted) মনে করছে। এর মধ্য দিয়ে এ সকল তরুণ আরও বেশি বেশি করে আইএস তথা উগ্র মৌলবাদী জঙ্গী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

ধর্মীয় সন্ত্রাসের জন্মদাতাঃ

এই ধর্মান্ধ সশস্ত্র সংগঠন সমূহের জন্মদাতা, আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য তথা পশ্চিমা দেশ সমুহ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে আফগানস্তান-ইরাক-সিরিয়ায় সে সব দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ও রাষ্ট্র সমূহকে উৎখাত করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে তাদের এই আক্রমণের ফলশ্রুতিতে এসব দেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের উত্থান ঘটে। যুক্তরাজ্যের চিলকট কমিশনের তথ্যানুসন্ধানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে; ইরাকে’উইপোন অব মাস ডেক্সট্রাকশন’ রয়েছে এই মিথ্যা অজুহাতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুশ প্রশাসনের সাথী হয়েছিল ইরাকে হামলা চালাতে। ইরাকের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করার ফলশ্রুতিতে প্রথমে ‘আল কায়দা ইন ইরাক’ ও পরে ‘ইসলামিক স্টেট ইন ইরাকএন্ড লেভেন্টার্স (আইএসআইএল) এর জন্ম হয়। এবং সিরিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন ও তার সিরীয় অনুগামীদের আক্রমণ ও হামলার সুযোগে তারা ইরাকের ‘রাকা’কে রাজধানী করে
ইরাক ও সিরিয়ার রাজধানী দখল করে আইএস’এর নেতৃত্বাধীন খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে। এই খিলাফতের জিহাদের আহ্বানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে জিহাদীরা সেখানে জড় হয়ে জঙ্গিপ্রশিক্ষণ লাভ করে। আইএস’র নেতৃত্বেই পৃথিবীর দেশে দেশে সন্ত্রাসী হামলা চলছে। এর জন্য আইএস-এর সে সব দেশে কোন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন হয়নি। পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি ঘৃণার প্রতিক্রিয়ায় সে সব দেশে যে জঙ্গী তৎপরতা শুরু হয় তারাই আইএস-এর অলিখিতঅনুগামী হিসাবে এই সব তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে।

নতুন অস্থিরতাঃ

ইরানের দৃঢ়তার কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজিত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে তার পারমাণবিকব্লাকমেইলিং বন্ধ করতে বাধ্য হলেও ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অবরোধ এখনও তুলে নেয়নি।কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেস্টা করলেও তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দশক দশক জুড়ে যে অবরোধ করে রেখেছে তা এখনও তুলে নেয় নি। অর্থাৎ ‘সালিশ মানি তাল গাছটা আমার’ এই নীতিতেই থেকেছে বিশ্ব মিথ্যুক ও প্রতারকের সর্দার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে ল্যাটিন আমেরিকার বামপন্থী সরকার সমুহকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র অব্যাহত
রেখেছে। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিন চীন সাগরে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন সহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন দাবীকে কেন্দ্রকরে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে তাকে ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে কাবু করার ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছে। এই অঞ্চলের উত্তেজনা এশিয়া মহাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেবে। চীনকে আটকে রাখার মার্কিন নীতিই এর জন্য প্রধানত দায়ী। তবে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটেছল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের নেতৃত্বে চরম রক্ষণশীল রাজনীতির উত্থান ঘটেছে সেই দেশে। পাশাপাশি ডেমক্রেটিক পার্টির মনোনয়নের লড়াইয়ে ববি স্যান্ডার্সকে কেন্দ্র করে প্রগতিশীল রাজনীতির দিকে ঝুকেছে সে দেশের তরুণরা। ববি স্যাণ্ডার্স মনোনয়ন না পেলেও এই নুতন প্রবনতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন উপাদান সংযোজিত করেছে। এর পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ইউরোপের
রাজনীতিতেও নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

আশু কর্তব্যঃ

এই পরিপ্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইকেপূনঃসংগঠিত ও বেগবান করা সকল বামপন্থী সহ প্রগতিশীল শক্তির কর্তব্য। এই সংগ্রামেসকল প্রগতিশীল শক্তিকে একত্রীত করে জনগণের ঐক্য গড়ে তুলে জনসচেতনতা বাড়িয়েতোলা বিশেষ প্রয়োজন। সেই দায়িত্বও বামপন্থীদের নিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ও সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সহ সকল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তবে এক্ষেত্রে একটি বিপদ সম্পর্কেও সবাইকেসচেতন থাকতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বের মুসলিম বিদ্বেষ প্রক্রিয়ায় ‘জেহাদি কর্মকান্ডকে’ সমর্থন অনুমোদন করা হবে বড় ধরণের ভুল। বরঞ্চ এই সত্যটি মানুষের মধ্যে স্পষ্ট করতে হবে যেঐসব ‘জেহাদি সংগঠন’ মুলত আমেরিকার সৃস্টি। আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের গৃহীত ব্যবস্থার কারণেই এসকল জেহাদি কর্মকান্ড এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পেরেছে।

জাতীয় পরিস্থিতিঃ

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের সম্প্রতিককালের এই উগ্রবাদী জঙ্গিবাদী হামলার সম্মুখীন। এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার হত্যা, লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক, পির, মাজারের খাদেম, বাউল, পুরোহিত, যাজক হত্যা, আহমদিয়ামসজিদ, শিয়া সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনা সংগঠিত হয়ে আসছে। আধিকাংশের ক্ষেত্রে আইএসের নামে এসব হত্যার দায় স্বীকার করা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে আল কায়দার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিুশ এসব ঘটনায় জেএনবি আনসারুল্লা বাংলা টিমকে দায়ী করেগ্রেফতার ও মামলার চার্জশীট প্রদান করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে মামলার ঝামেলায় না গিয়ে গ্রেফতারকৃতদের ‘ক্রসফায়ারে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব ঘটনার মুল উৎপাটন করা যায়নি। ভবিষ্যতে এধণের হত্যা-হামলা আরও হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামী’র পুনর্বাসণঃ

বাংলাদেশের এই উগ্রবাদী মৌলবাদী জঙ্গী হামলা নতুন নয়। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মুক্তি যুদ্ধের পরাজিত জামাতে ইসলামী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের আধিপত্ত বিস্তারের জন্য রগকাটা, চোখতোলা, হাতকাটাসহ হত্যা তাদের একাত্তরের সময়কার রাজনীতির পুনঃপ্রচলন করে। তাদের এসকল হত্যা হামলার মুল লক্ষ্য ছিল বামপন্থী
অসাম্প্রদায়িক সংগঠন ও শক্তি সমুহ। তাদের এই আক্রমণে এদেশের বৃহত্তর লড়াকু বাম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর নেতা জামিল আকতার রতন, রিমু চৌধুরী, দেবাশীষ রুপম, জাসদের উজ্জ্বল প্রমূখ নিহত হয়।বহুজন রগকাটা, হাতকাটা, চোখতোলার মতঘৃণ্য আক্রমণের সম্মুখীন হন।পঁচাত্তর পরবর্তীতে পূনর্বাসিত জামায়াতে ইসলামী এভাবেই রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়া ও তাদের মৌলবাদী মতবাদ নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের
উপর চাপিয়ে দিতে তৎপর থাকে।
(চলবে)