মুজিব বাহিনী: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রহস্যময় অধ্যায়

প্রকাশিত: ১:৫৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০২১

মুজিব বাহিনী: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রহস্যময় অধ্যায়

।।!|| হাফিজ সরকার ||।।

২৭ এপ্রিল ২০২১: মুক্তিবাহিনীর সবচেয়ে বড় অংশটি এসেছিল ছাত্রদের মধ্য থেকে। তারা একই সঙ্গে ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের অনুসারী। আদর্শগত সংঘাত এবং ভিন্ন নেতৃত্বকে অস্বীকার করার একটা প্রবণতা তাদের মধ্যে প্রবল। সেদিক থেকে আদর্শ গেরিলা ছিলেন মাটি থেকে উঠে আসা কৃষক শ্রেণীর লোকজন। তাঁদের মিথ্যা অহম ছিল না, একজোড়া জাঙ্গলবুটের জন্য হাপিত্যেশও তাঁরা করেননি, খাবার না পেলে খাননি, পরিধেয় বা বিছানা নিয়েও মাথা ঘামাননি। স্রেফ স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে তাঁরা মাটি কামড়ে লড়ে গেছেন … মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে ভারতীয় সামরিক হাই কমান্ডের মূল্যায়ন)

মুক্তিযুদ্ধের মাঝপথে আচমকাই রণাঙ্গনে নতুন একটি নাম ছড়িয়ে পড়ল_ মুজিব বাহিনী। নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি গণবাহিনীর যোদ্ধারা যখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছেন, তখন আচমকা একটি নতুন বাহিনী কী কারণে কিভাবে জন্ম নিল, তা ছিল এক বড় রহস্য। তারা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বাধীন ছিল না। মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী কিংবা পূর্বাঞ্চলে ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়ক লে. জেনারেল অরোরাও তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পাননি। মূলত মার্চের আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ছাত্রলীগের তিন জঙ্গি ছাত্রনেতা আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সিরাজুল আলম খান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগিনা যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন এই বাহিনীর নেতৃত্বে। অভিযোগ আছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা Research & Analysis Wing (RAW)-এর বিশেষ তত্ত্বাবধানে এবং বিখ্যাত সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানের ট্রেনিংয়ে ১০ হাজার সদস্যের এই এলিট বাহিনী যতখানি মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারও বেশি দুর্নাম কুড়িয়েছে বামপন্থী নির্মূল অভিযানে। অথচ মুজিব বাহিনী সম্পর্কে জানতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে হাসানুল হক ইনু’র মতো বামপন্থী নেতা-কর্মীরাও মুজিব বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইনু ছিলেন মুজিব বাহিনীর রাজনৈতিক প্রশিক্ষকদের একজন। মুজিব বাহিনীর অনেকেই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে নামার সুযোগ পাননি। আবার স্বাধীনতার পর তাঁরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়েছেন রক্ষীবাহিনী ও গণবাহিনীর আদলে।

রহস্যময় ‘সানী ভিলা’

কলকাতা ভবানীপুর পার্কের পাশে হালকা গোলাপি রঙের একটি দোতলা বাড়ি। বাসিন্দাদের নাম তপুবাবু, রাজুবাবু, সরোজবাবু, মনিবাবু, মধুবাবু। আশপাশের মানুষ তা-ই জানে। কিন্তু ঠিকানা ধরে যখন কেউ সেখানে যায় তখন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় ছদ্মনামগুলো। তপু ওরফে তোফায়েল আহমেদ, রাজু ওরফে আবদুর রাজ্জাক, সরোজ আ কা সিরাজুল আলম খান, ফজলুল হক মনি ওরফে মনিবাবু এবং বঙ্গবন্ধুর দেহরক্ষী মুন্সীগঞ্জের মহিউদ্দিন বা মন্টুবাবু। ৯ নম্বর সেক্টর থেকে নির্দেশ পেয়ে আসা বরিশাল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুর রহমান মোস্তফার জবানিতে : বাড়ির দোতলায় একটি কক্ষে তোফায়েল ভাই, রাজ্জাক ভাইসহ আরো কয়েকজন আমাকে নিয়ে বৈঠক করলেন। ওই বৈঠকে বসে জানলাম, আগরতলায় শেখ ফজলুল হক মনিসহ ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও কৃষক লীগের ভারতে আগত সদস্যদের নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আগরতলাতে হেডকোয়ার্টার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে নাকি বেশ কয়েক হাজার মুজিব বাহিনীর সদস্য ভারতের পার্বত্য দুর্গম এলাকা টেন্ডুয়াতে (তানদুয়া) প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ট্রেনিং নেওয়া আরম্ভ করেছেন।

২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোডের ‘সানী ভিলা’ নামের এই বাড়িটির মালিক প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সুতার। পিরোজপুরের বাটনাতলার এই অধিবাসী পাকিস্তান কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন এবং কংগ্রেস নেতা প্রণব কুমার সেনের মেয়েকে বিয়ে করেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে জয়ী হন, অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে ভারতে চলে যান। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আবারও নির্বাচিত হন এবং ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী চিত্তরঞ্জনের মাধ্যমেই মেজর জেনারেল উবানের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁদের। মার্চের উত্তাল দিনগুলো শুরু হওয়ার অনেক আগেই (১৮ ফেব্রুয়ারি) বঙ্গবন্ধু উলি্লখিত চার নেতাকে এই বাড়িটির ঠিকানা দিয়ে দেন এবং চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করে অস্ত্র ও ভারতীয় সহায়তা নেওয়ার নির্দেশ দেন। অবশ্য ২৫ মার্চের আগে আরেকবার ডা. আবু হেনাকে ছাত্রনেতাদের প্রতিনিধি হিসেবে সুতারের কাছে পাঠানো হয় সব কিছু ঠিকঠাক আছে কি না জানতে। মোটামুটি ‘সানী ভিলা’কেই ধরে নেওয়া যায় ‘মুজিব বাহিনী’র জন্মস্থান হিসেবে। এখানেই উবানের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রস্তাবিত বাহিনীর খসড়া পরিকল্পনাটি জানান মনি-সিরাজ-রাজ্জাক-তোফায়েল। এই বৈঠকে সুতার ছাড়া উপস্থিত ছিলেন আ স ম আবদুর রবও।

‘জয় বাংলা বাহিনী’র উত্তরসূরি

এই পর্যায়ে এসে আমাদের কিছু চমকপ্রদ প্রাসঙ্গিক ইতিহাস জানা হয়। মুজিব বাহিনীর পেছনে যাঁরা ছিলেন তাঁরা একই সঙ্গে আবার সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদেরও সদস্য, যার সূচনা সেই ১৯৬২ সালে। বলা হয়, ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী এই সংগঠনটির মূল পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে একদম শুরু থেকেই। ১৯৬২ সালে সিরাজুল আলম খান, রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদ পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করার জন্য এই বিপ্লবী পরিষদের জন্ম দেন। ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমেদ বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এটির অস্তিত্ব প্রকাশ হয় ১৯৭২ সালে যখন ছাত্রলীগে মতভেদ চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং সিরাজুল আলম খান তাঁর অধীনদের নিয়ে জাসদ গড়তে যান। বঙ্গবন্ধুকে এ সম্পর্কে জানানো হয় ১৯৬৯ সালে তিনি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ থেকে মুক্ত হয়ে ফেরার পর। রাজ্জাকের ভাষ্যমতে, মুক্তিযুদ্ধ যখন প্রায় অনিবার্য রূপ নিতে যাচ্ছে তার আগে মনি ও তোফায়েলকে এই পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করেন তাঁরা। এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ১৮ জানুয়ারি (মাসুদুল হকের ভাষ্যে ফেব্রুয়ারি হবে) একান্ত বৈঠক করেন। সেখানেই তাঁদের নির্দেশ দেওয়া হয় সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে। চারজনকে এই রূপরেখার কো-অর্ডিনেটর করা হয়।

বিপ্লবী পরিষদে তাজউদ্দীন আহমদকে অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। মার্চের পর সবাই ঠিকানামতো (সানী ভিলা) গিয়ে জানতে পারেন তাজউদ্দীন সেখানে যাননি। তিনি প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।

তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনাটি আরো আগেই নিয়েছিলেন মুজিব। ১৯৬৯ সালে লন্ডন থেকে ফেরার পর তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য তাঁর একটি বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানান। আর এই উদ্দেশ্যে প্রতি মাসে ২৫ জন নির্বাচিত যোদ্ধাকে ভারতে বিশেষ ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। যোদ্ধা বাছাইয়ের দায়িত্ব পান মনি-সিরাজ-রাজ্জাক ও তোফায়েল। কিন্তু এর মধ্যেই সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনাটি স্থগিত রাখা হয়। ১৯৭০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় নিহত সার্জেন্ট জহুরুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে ছাত্রলীগ। আর এর একাংশ থেকে ‘১৫ ফেব্রুয়ারি বাহিনী’ নামে একটি দল মার্চপাস্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরে। এই মিছিলে ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তবে এই বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে ফজলুল হক মনি এবং ডাকসু সহসভাপতি আ স ম রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন কিছুই জানতেন না। এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নগর ছাত্রলীগ সভাপতি মফিজুর রহমান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক হাসানুল হক ইনু। এখানে স্পষ্টতই চার নেতার মধ্যে আদর্শগত ক্ষেত্রে খানিকটা মতবিরোধের আঁচ পাওয়া যায়। আর তার প্রকাশ সে বছরই ১২ আগস্ট ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে সেখানে ৩৬-৯ ভোটে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রস্তাবটি পাস হয়। নূরে আলম সিদ্দিকী, মাখনসহ যাঁরা বিরোধিতা করেন তাঁরা সবাই শেখ মনির অনুসারী। মনি তখন ছাত্র নন, কিন্তু ছাত্রলীগের একটি অংশকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাঁর অনুসারীদের হারিয়ে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন অংশটির এই জয় দুজনের শীতল সম্পর্ককে আরো শীতল করে দেয়। আর এর প্রভাব মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীতে তেমন না পড়লেও স্বাধীনতার পর মারাত্মক রূপ নেয় এবং রক্ষীবাহিনী-গণবাহিনীর সংঘর্ষে এর ভয়াবহ প্রকাশ ঘটে। যুদ্ধকালীন আবদুর রাজ্জাকই মূলত সিরাজ-মনির মধ্যকার ভারসাম্য বজায় রাখতে অবদান রাখেন। তবে মুজিব বাহিনীর মূল পরিকল্পনায় তখনকার ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দুজনেই মনির অনুসারী ছিলেন।

বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের ওই ট্রাম্পের আগে জন্ম ‘জয় বাংলা বাহিনী’র। মূলত ছয় দফার ঘোষণা বার্ষিকী ৭ জুনকে সামনে রেখে এটি গঠিত হয়। ‘১৫ ফেব্রুয়ারি বাহিনী’র সদস্যরা স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত নন_এই বিচারে আরেকটু জঙ্গি হিসেবে এই সংগঠনের জন্ম। সিদ্ধান্ত হয়, সেদিন শহীদ মিনার থেকে পূর্ণ সামরিক কায়দায় মার্চপাস্ট করে তাঁরা পল্টন ময়দান যাবেন। পল্টনে সেদিন ছিল বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানাতে শ্রমিক লীগের কর্মসূচি আর তাতে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা ছাত্রলীগের। আগের রাতে, অর্থাৎ ৬ জুন ইকবাল হলে ‘জয় বাংলা বাহিনীর পতাকা’র নকশা করেন কুমিল্লা থেকে হঠাৎ ঢাকায় আসায় শিব নারায়ণ দাস। এটিই পরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকায় পরিণত হয়। ৪২ বলাকা ভবনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় অফিসের লাগোয়া ‘নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্স’ থেকে তৈরি হয় স্বাধীন বাংলার মানচিত্র সংবলিত সেই প্রথম পতাকা, যা সেলাই করেন আবদুল খালেক মোহাম্মদী। ‘জয় বাংলা বাহিনী’ পরিকল্পনা মতো মার্চ করে পল্টনে যায়, কিন্তু পতাকাটি গোটানো অবস্থায় বয়ে নিয়ে যান আ স ম রব। মিছিলে ওড়ে ছাত্রলীগের পতাকা, যা থাকে ইনুর হাতে। অভিবাদন মঞ্চে হাঁটু গেড়ে মুজিবকে পতাকাটি উপহার দেন রব। মুজিব সেটা খুলে দেখেন এবং আবার গুটিয়ে রবকে ফেরত দেন। এর পর এটি ইনুর হাত ঘুরে হাতে পান ছাত্রলীগ নগর সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আবার ওড়ে সেই ‘জয় বাংলা বাহিনী’র পতাকা। এর পর তা হয়ে যায় জাতির পতাকা, জাতীয় পতাকা। শেখ মুজিব জানতেন ‘জয় বাংলা বাহিনী’র অস্তিত্বের কথা। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের বদলে প্রতিরোধ দিবস পালন করে আওয়ামী লীগ। সেদিন পল্টনে আবারও ওড়ে পতাকা। আর এদিন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে নিজের বাসা থেকে দর্শনার্থীদের উদ্দেশে মুজিবের বক্তৃতায় আসে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র নাম। মার্চজুড়েই এরা ডামি রাইফেল নিয়ে ছাত্রলীগকর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। মোটামুটি একটা মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া হয় সশস্ত্র সংগ্রামের।

তাজউদ্দীনের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করেই মুজিব বাহিনী!

ফেব্রুয়ারিতে মুজিবের সঙ্গে চার ছাত্রনেতার বৈঠকের ব্যাপারটি তাজউদ্দীনের গোচরে ছিল। কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার পর তাঁদের উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্তে এগিয়ে যান তিনি। বিভিন্ন সূত্রে এটা আগেও অনেকবার উল্লেখ হয়েছে যে তাজউদ্দীনের এই প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ একদমই মেনে নিতে পারেননি শেখ মনিসহ বাকিরা। তাঁদের দাবি ছিল, মুক্তিযুদ্ধ চলবে একটি বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিলের অধীনে আর এর নেতৃত্ব দেবেন তাঁরা চারজন_বঙ্গবন্ধু তাঁদেরই মনোনীত করে গেছেন এ জন্য। গ্রহণযোগ্যতা ও অন্যান্য প্রেক্ষাপটে এই দাবিটি উপেক্ষা করা অবশ্যই আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে উপকৃত করেছে।

তাজউদ্দীনের ব্যাপারে এই তরুণ নেতাদের বড় অভিযোগটি ছিল বঙ্গবন্ধু আর ফিরবেন না_এটা ধরে নিয়ে তাজউদ্দীন যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি তিনি মওলানা ভাসানীসহ বাম দলগুলোর সদস্যদেরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর পেছনে আমীর-উল ইসলাম ও মাঈদুল ইসলামকে (মূলধারা ‘৭১-এর লেখক) দায়ী করেন তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা জাগে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব বামপন্থীদের কবজায় চলে যাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স নামের একটি বিশেষ বাহিনীর পরিকল্পনা নেন চারজন। আর তার ‘মুজিব বাহিনী’ নামকরণের পেছনে কারণ মুজিববাদ (জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র) কায়েম। এ বিষয়ে উবান লিখেছেন, Because of their single-minded loyalty to Mujib and their closeness to him, they were more eager to be known as the Mujib Bahini. They had been issuing certificates of genuineness, selecting from their old colleagues. Choosing enough sacrificing, upright and faithful men from Bangladesh, they were putting pressure that they should receive unconventional training in fighting techniques unlike the commando training received by members of the Mukti Bahini.

‘স্যামস বয়েজ’ : ভারতের গোপনে লালিত সংগঠন

১৯৭১ সালের মে মাসের শুরুতে ‘সানী ভিলা’র সেই বৈঠকে উবানকে তাঁদের পরিকল্পনা জানান চার নেতা। উবান তাঁর বইয়ে লিখেছেন, পরিকল্পনাটি তাঁর খুবই পছন্দ হয়। মুজিব বাহিনীর গঠন এবং প্রশিক্ষণের ব্যাপারটি পুরোটাই গোপনে ব্যবস্থা করা হয়; আর এ ব্যাপারে ভারতীয় সেনাপ্রধান এবং ওয়ার কাউন্সিল হেড জেনারেল স্যাম মানেকশ ছাড়া আর কেউই কিছু জানতেন না। এ কারণে মুজিব বাহিনীকে ‘স্যামস বয়েজ’ নামে উল্লেখ করত ভারতীয় বাহিনী। উবান জানাচ্ছেন, পরে তাজউদ্দীনকে মানেকশ সরাসরি বলেছেন যে সেনাবাহিনীর বিশেষ দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য মানেকশ নিজেই গড়ে তুলেছেন এই বাহিনী। তিব্বতিদের নিয়ে গড়া স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সফল রূপকার উবানকে দায়িত্বটা দেওয়া হয় ওপর মহল থেকে। ‘র’প্রধান আরএন কাও, যিনি একই সঙ্গে ভারতীয় কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সচিবও ছিলেন, উবান মুজিব বাহিনী বিষয়ে সরাসরি শুধু তাঁকেই রিপোর্ট করতেন। ২৯ মে মোট ২৫০ জনের প্রথম দলটি দেরাদুনের দেড় কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি শহর তানদুয়ায় প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করে। মেঘালয়ের হাফলংয়ে আরেকটি ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়, কিন্তু একটি ব্যাচ সেখানে ট্রেনিং নেওয়ার পর ক্যাম্পটি তুলে নেওয়া হয়। প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণে ছিল ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা। এঁদের মধ্যে উল্লেখ্য মেজর মালহোত্রা, যিনি পরে রক্ষীবাহিনীর প্রশিক্ষণেরও দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের মধ্যে থেকে আটজনকে বাছাই করা হয় প্রশিক্ষক হিসেবে_হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আ ফ ম মাহবুবুল হক, রফিকুজ্জামান, মাসুদ আহমেদ রুমী (প্রয়াত ক্রীড়া সাংবাদিক), সৈয়দ আহমদ ফারুক, তৌফিক আহমদ ও মোহনলাল সোম। পরে প্রশিক্ষকের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫২ করা হয়, ২০ নভেম্বর ১৯৭১ মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে পর্যন্ত ১০ হাজার মুজিব বাহিনী সদস্য প্রশিক্ষণ নেন। নেতাদের মধ্যে রাজ্জাকই প্রথম ব্যাচের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সামরিক ট্রেনিং নেন, বাকিরা নেন প্রাথমিক প্রশিক্ষণ।

মুজিব বাহিনীর সাংগঠনিক রূপরেখা

বাংলাদেশকে মোট চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয় মুজিব বাহিনীর অপারেশনের জন্য। উত্তরাঞ্চলীয় সেক্টর কমান্ডার ছিলেন সিরাজুল আলম খান, যাঁর আওতায় ছিল বৃহত্তর রংপুর, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর। তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন মনিরুল ইসলাম ওরফে মার্শাল মনি। দক্ষিণাঞ্চলীয় সেক্টর (বৃহত্তর খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী) ছিল তোফায়েল আহমেদের অধীনে, সহঅধিনায়ক ছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। শেখ ফজলুল হক মনির কমান্ডে ছিল পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টর (বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট এবং ঢাকা জেলার কিছু অংশ), তাঁর সহঅধিনায়ক ছিলেন আ স ম রব ও মাখন। আবদুর রাজ্জাকের দায়িত্বে ছিল কেন্দ্রীয় সেক্টর, যা গঠিত ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এবং ঢাকা নিয়ে। তাঁর সহঅধিনায়ক ছিলেন সৈয়দ আহমদ। চার নেতা ছিলেন জেনারেল সমমর্যাদার, তাঁদের যাতায়াতের জন্য হেলিকপ্টার বরাদ্দ ছিল, প্রত্যেক সেক্টরের জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ ছিল, যা বণ্টনের দায়িত্ব ছিল নেতাদের হাতে।

আলাদা ওয়্যারলেস সিস্টেম, আলাদা কোডের অধীনে মুজিব বাহিনী ছিল আদতে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একদল যোদ্ধা। পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ছিল দেশের মধ্যে ছোট ছোট পকেট তৈরি। সেসব পকেটে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানানো। প্রতিটি থানায় (বর্তমানে যা উপজেলা) পাঁচজনের একটি সেল তৈরি করা হতো, যার দায়িত্বে থাকতেন একজন সংগঠক ও তাঁর সহকারী। আশ্রয়স্থলের জন্য একজন নেতা থাকতেন এবং বাকি দুজনের দায়িত্ব ছিল বাহকের। এরপর সেখানে যোদ্ধারা আশ্রয় নিয়ে লড়াই শুরু করবেন, প্রতিবিপ্লবী ও দালালদের হত্যা করবেন। আর মুক্তাঞ্চল তৈরি হওয়ার পর তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে মুজিববাদের ভিত্তিতে।

মুক্তিযোদ্ধাদের কৃতিত্ব ছিনতাই!

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া

সে সময় কলকাতা থেকে আওয়ামী লীগের প্রচারপত্র হিসেবে বের হতো সাপ্তাহিক জয় বাংলা। কিন্তু আলোড়ন তুলল শেখ মনি সম্পাদিত সাপ্তাহিক বাংলার বাণী। একদল তরুণ সাংবাদিকের এই পত্রিকাটি অল্প সময়ে গ্রহণযোগ্যতা পেল পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক মহলে।

বাংলার বাণীর খবর প্রকাশের ধরনে রুষ্ট হলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ওসমানী। বাংলার বাণীতে বাংলাদেশের যেকোনো রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের যেসব সাফল্যের খবর ছাপা হতো তাতে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিবাহিনী না লিখে মুজিব বাহিনী লেখা হতো। মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের ভাষ্যে : বাংলার বাণীতে যেদিন প্রথম মুক্তিবাহিনীর স্থলে মুজিব বাহিনী লেখা হলো, সেদিন জেনারেল ওসমানী আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে খুবই কড়া ভাষায় বললেন, নজরুল সাহেব, মুজিব বাহিনী কী? ওসব কারা লিখছে? কেন লিখছে? আপনি এ সম্পর্কে তদন্ত করে জানাবেন আর বলবেন যেন ভবিষ্যতে মুজিব বাহিনী আর না লেখা হয়; এতে করে আমাদের নিয়মিত বাহিনীতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়।

দিন কয়েক পর নজরুল জানালেন তাঁর তদন্তের ফল। ‘বললাম, স্যার এই পত্রিকা শেখ ফজলুল হক মনি সাহেবের। এ কথা বলতেই জেনারেল সাহেবের উন্নত গোঁফগুলো নুয়ে গেল। এরপর হু বলে একটা গম্ভীর ধরনের শ্বাস ফেলে বললেন, ঠিক আছে। খানিক পর ওসমানীর মুখ থেকে বেরোল : সব কিছুতে একটা ডিসিপ্লিন আছে। এখানে আমরা রং-তামাশা করতে আসিনি। বিদেশের মাটিতে আমরা যে বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য দেখাচ্ছি, তা জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয় নজরুল সাহেব। এতে আমাদের সম্পর্কে এদের ধারণা খুব খারাপ হবে। আর আমাদের এই অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার কথা কি মনে করেন কলকাতার এই চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি থাকবে? শত্রুপক্ষ এর সুবিধা নিশ্চয়ই নেবে। আপনি-আমি এখানে বসে বসে নানা বাহিনী গঠন করি, আর যে ছেলেটি বাংলাদেশের পথে-জঙ্গলে কিংবা নদীতে ট্রিগারে আঙুল লাগিয়ে নিজের জীবন বাজি রেখে শত্রু হননের অপেক্ষায় বসে রয়েছে, তার কথা কি আমরা চিন্তা করি? বিষয়টি আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আনব।’

মুজিব বাহিনীর হুজুগেই জিয়া বাহিনী

মুজিব বাহিনী নিয়ে ওসমানীর সংশয় অমূলক ছিল না। প্রবাসী সরকারের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে একটি বাহিনী গড়ে উঠলে এবং সেই বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে চেইন অব কমান্ড নষ্ট হতে বাধ্য। মুক্তিযুদ্ধের শেষার্ধে জিয়াকে যখন এক নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব ছেড়ে একটি ব্রিগেড গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়, জিয়া সেই ব্রিগেডের নাম রাখলেন ‘জিয়া বাহিনী’। এমনিতে ওসমানী ‘মুজিব বাহিনী’ নিয়ে ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলেন, জিয়ার এই পদক্ষেপ আগুনে ঘি ঢালল। ওসমানী জিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক কমান্ডকে অস্বীকার করার অভিযোগ এনে তাঁর নেতৃত্ব কেড়ে নিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন। সিদ্ধান্তটি সত্যি কার্যকর করা হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা কি হতো ভাবতেই শিউরে উঠি, তবে তা হয়নি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের বিচক্ষণতার কারণে। তিনি ওসমানীর সিদ্ধান্তটি বাতিল করে আরো দুটি বাহিনী গঠন করার পাল্টা নির্দেশ দিলেন। ‘খালেদ বাহিনী’ ও ‘সফিউল্লাহ বাহিনী’র জন্ম এভাবেই। আমরা যাদের জেড ফোর্স, কে ফোর্স ও এস ফোর্স হিসেবে চিনি।

আসা যাক তাজউদ্দীনের প্রতিক্রিয়ায়। তিনি বিরক্ত হলেও নিরুপায় ছিলেন। তবে উবান লিখেছেন অন্যভাবে : অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার মানেই অপরিহার্যভাবে মি. তাজউদ্দীন। তিনি মুজিব বাহিনী নেতাদের দুই চোখে দেখতে পারতেন না এবং তাদের প্রতিটি অভিযোগকে বাজে কথা বলে উড়িয়ে দিতেন।

মুক্তিবাহিনীর মুখোমুখি

‘মুজিব বাহিনী’ নামে একটি সংগঠন মাঠে নেমেছে_এটা প্রথম জানাজানি হয় আগস্টের শুরুতে। তখনই বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মুজিব বাহিনীর পরিচয়গত সংঘাত সৃষ্টি হয়। ২ নম্বর সেক্টরে খালেদ মোশাররফের বাহিনীর চ্যালেঞ্জে পড়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোশাক পরা অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ মুজিব বাহিনীর ৪০ সদস্য। পরে উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সমাধান হয়। ৯ নম্বর সেক্টরেও ঘটে এমন ঘটনা। মেজর জলিল এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন : ‘আমার সেক্টরে হিঙ্গেলগঞ্জ ফিল্ডে যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তাঁরা ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেন। তারা তখন ভেতরে অনুপ্রবেশ করছিল। সেখানে তাদের চ্যালেঞ্জ করা হয়। এক ভদ্রলোক নিজেকে ক্যাপ্টেন জিকু (জাসদ নেতা নূরে আলম জিকু) বলে পরিচয় দেন। তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়।’

এই অবস্থায় মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কলকাতার হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন মুজিব বাহিনীর নেতারা। ভারত সরকারের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ প্রতিনিধি ডিপি ধর এতে অংশ নেন আর মুজিবনগর সরকারের তরফে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন। সেপ্টেম্বর মাসে আরেকটি বৈঠক হলেও প্রথমবারই একটি আপসরফায় আসে দুপক্ষ। বৈঠকে শাজাহান সিরাজকে মুজিব বাহিনী ও তাজউদ্দীন সরকারের মধ্যে লিয়াজোঁ রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয়, ওসমানী, তাজউদ্দীন কিংবা অরোরা কারোই এই বাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো তাঁদের জানানো হবে।

মুজিব বাহিনীর যুদ্ধ : উদ্দেশ্য বামপন্থী নির্মূল!

এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, মুক্তিবাহিনীর রিক্রুটের জায়গাগুলোতে (যুব শিবির) আওয়ামী লীগ নেতারা স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁদের কাজ ছিল মুক্তিবাহিনীতে যেন আওয়ামী ঘরানার বাইরে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রবেশ না ঘটে। কিন্তু তারপরও তা ঠেকানো যায়নি। উবান লিখেছেন, The training camps had to depend on the certificates given by the National Assembly Members (MNA) appointed by the provisional government about the sincerity of the trainees. MNAs used to issue the certificates, blindly based on the list prepared by the Bengali officers, but some of these trainees had a future political motive.

উবান জুলাইয়ের দিকে ব্যক্তিগতভাবে এ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ করেছিলেন। মেজর জিয়া ও খালেদ মোশাররফসহ বেশ কয়েকজন সামরিক অফিসারের বিরুদ্ধে তাঁর সেই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন যে মুক্তিবাহিনীতে এদের প্রশ্রয়ে কিছু নকশালপন্থী এবং চীনপন্থী পাকিস্তানি এজেন্টের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাঁর সেই অভিযোগে রাশেদ খান মেনন ও তাঁর ভাইদের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বলেন, জিয়া-খালেদরা ব্যক্তিগত বাহিনী তৈরি করছেন, যার মাধ্যমে স্বাধীনতার পর ক্ষমতা দখল করার মতলব আঁটছেন। সে সময় কমরেড ফরহাদের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা আলাদাভাবে ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। নিচ্ছিলেন চীনপন্থী ন্যাপ ভাসানীর সদস্যরাও। এ সময় বারবার সর্বদলীয় একটি বিপ্লবী সরকার গঠনের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল তাজউদ্দীনকে।

মুজিব বাহিনীর নেতারাও এ নিয়ে বারবার অভিযোগ করেছেন যে ভারত সরকার নকশালপন্থী-চীনপন্থীদেরও ট্রেনিং দিচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তাঁদের অপছন্দের কথাও তাঁরা উবানকে জানিয়েছেন। উবানের লেখাতে জানা গেছে, বামপন্থীদের এই প্রশিক্ষণের ব্যাপারটি তাঁরও পছন্দ ছিল না। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বামপন্থীরা নকশাল আন্দোলনের মতো কোনো সংগঠন গড়ে তুলবে।

কিন্তু উবান এবং মুজিব বাহিনী নেতাদের এই উদ্বেগ কোনো কাজে আসেনি। র-এর প্রধান আর এন কাও সরাসরিই উবানকে জানান, মওলানা ভাসানীর অনুসারী এবং অন্য বামপন্থীদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছা আছে, বাংলাদেশ সরকার মনে করে, বামপন্থীরাও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আর এন কাও মুজিব বাহিনীর নেতাদের বলার জন্য উবানকে বলেন যে ব্যাপারটি মুজিব বাহিনীর নেতাদের পছন্দ না হলেও ‘হজম’ করতে হবে। মুজিব বাহিনীই ভারত সরকারের একক উদ্দেশ্য নয়, এর বাইরেও ভারতের অন্যান্য এজেন্ডা আছে। মুজিব বাহিনীকে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকারও পরামর্শ দেন কাও।

এ পর্যায়ে এসে পড়ে ‘মুজিব বাহিনী’র বামপন্থী নির্মূল অভিযান বিষয়ে প্রচারণা। এ ক্ষেত্রে এটি উল্লেখ না করলেই নয়, মুজিব বাহিনীর রাজনৈতিক মোটিভেশনে সমাজতন্ত্র ছিল প্রধান বিষয় এবং তাদের ৮০ ভাগই ছিলেন বামধারায় উৎসর্গকৃত। পরবর্তী সময়ে জাসদ গঠনে এঁরাই নিয়েছিলেন মূল ভূমিকা। তার পরও এই অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে ঢাকার অদূরে সাভারে সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টির সেকেন্ড ইন কমান্ডসহ পাঁচ সদস্যকে হত্যা করেন মুজিব বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি এ-ও আমাদের মনে রাখা দরকার, দেশের ভেতরে থাকা চীনপন্থী সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর কয়েকটি শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিলেও গণচীনের মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে তারাও অবস্থান পাল্টায় এবং মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে। সর্বহারা, মতিন-আলাউদ্দিন গ্রুপ, তোয়াহা গ্রুপ সবার সঙ্গেই এই সংঘর্ষ চলতে থাকে।

তাজউদ্দীন হত্যাচেষ্টা

মূলধারা-৭১-এ মঈদুল হাসান দাবি করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে হত্যা করার জন্য মুজিবনগরে ঘাতক পাঠিয়েছিল মুজিব বাহিনী। সেই ঘাতক পরবর্তী সময়ে মুজিবনগরে আত্মসমর্পণ করে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুজিব বাহিনীর নেতারা। বিভিন্ন সময় তাঁরা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে অভিযোগটিকে বানোয়াট বলেছেন।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘একটা মুক্তিযুদ্ধ চলছে এবং যারাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে বন্ধু রাষ্ট্রে গিয়ে, সেখানে তাজউদ্দীন আহমদকে তারাই হত্যার ষড়যন্ত্র করছে_এ ধরনের কল্পনা বা এই ধরনের চিন্তাভাবনা মঈদুল হাসানরাই করতে পারেন।’

তবে মঈদুল হাসানের বই ছাড়া অন্য কোথাও এ ঘটনার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

মুজিব বাহিনীর অর্জন কী?

মুজিব বাহিনী কি উল্লেখ করার মতো যুদ্ধ করেছে? নাকি আওয়ামী লীগবিরোধী আর কমিউনিস্ট নিধনেই নিয়োজিত থেকেছে। প্রসঙ্গতই উল্লেখ করা যেতে পারে আবদুর রাজ্জাকের ভাষ্য। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমরা কমিউনিস্টদের হত্যা করার নির্দেশ দিইনি। আমাদের বৈঠকে এ ধরনের কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন এলে আমাদের চারজনের বৈঠক হতো। হ্যাঁ, আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল যদি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের বাহিনী আমাদের আক্রমণ করে তাহলে প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। এড়াতে না পারলে প্রতিরোধ করব। কিন্তু কমিউনিস্ট বাহিনীর সঙ্গে কোনো সংঘর্ষ হয়নি। আর কমিউনিস্ট বাহিনী তো ভেতরে ঢুকতেই পারেনি। তখন তো তারা ট্রেনিংই নিচ্ছে। কমিউনিস্ট বাহিনী আসলে যুদ্ধে যেতেই পারেনি। আমাদের বাহিনী ট্রেনিং নিয়ে ভেতরে ঢুকেছে।’

এখানে বোঝা যাচ্ছে, রাজ্জাক কমিউনিস্ট বাহিনী বলতে বুঝিয়েছেন দেশের বাইরে থেকে ট্রেনিং নিয়ে অনুপ্রবেশ করা বামদলীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। কিন্তু অনেকেই বলেন, দেশের অভ্যন্তরে থাকা চীনাপন্থী কমিউনিস্টদের হত্যা করায় মুজিব বাহিনীর অংশগ্রহণ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনী খুব বেশি যুদ্ধ করেছে, এমনটা পাওয়া যায় না। বরং এই বাহিনী প্রস্তুত হচ্ছিল দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য। মুজিব বাহিনী আসলে যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিকল্পনার ফসল, সে বিষয়ে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা তো সর্বাত্মক যুদ্ধ করতে পারিনি। আমাদের পরিকল্পনা ছিল মুজিব বাহিনী প্রথমে ভেতরে ঢুকবে। তারপর অস্ত্রশালা তৈরি করবে। এর পর আশ্রয়স্থল গড়ে তুলবে। তারপর সংগঠন গড়ে তুলবে_মুজিব বাহিনীর সংগঠন। এরপর থানা কমান্ড করবে। থানা কমান্ড করার পর প্রথম কার্যক্রম হবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী, অর্থাৎ রাজাকারদের ওপর হামলা চালানো, তাদের সরবরাহ লাইনের ওপর হামলা চালানো। গেরিলা কৌশলে ওদের দুর্বল করে দেবে।

সর্বশেষ হলো, ওরা যখন দুর্বল হয়ে পড়বে, তখন পাকবাহিনীর ওপর আঘাত হানো। আমরা তখন এ কাজই করছি। প্রাথমিক কাজ আমাদের মোটামুটি হয়ে গিয়েছিল। আমাদের ট্রেনিংপ্রাপ্ত সদস্যরা যেখানে যেতে পেরেছে, সেখানেই থানা কমান্ড হয়ে গেছে। আমরা জনগণের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করছি। কিছু কিছু রাজাকারও খতম হচ্ছে। কিন্তু মূল জায়গাটা, মানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামনে না পড়লে যুদ্ধ করিনি। দু-চার জায়গায় সামনে পড়ে গেছি, লড়াই হয়েছে। আমরা তো যুদ্ধ শুরুই করিনি। আমাদের তো পাঁচ বছরের পরিকল্পনা_প্রথম বছর কী করব, তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে কী করব। তারপর সরকার গঠন করব। এই ছিল আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনা। আমরা যদি সফল হতাম, তাহলে কোনো ঘাস থাকত না। আগাছা থাকত না। সমাজদেহ থেকে সব আগাছা উপড়ে ফেলতাম। প্রতিবিপ্লবীদের থাকতে হতো না। হয় মোটিভেট হয়ে এদিকে আসতে হতো, নইলে নিশ্চিহ্ন হতে হতো।’

শেষ লাইন কয়টিই আসলে বলে দেয় সব কথা। মুজিববাদী সমাজতন্ত্র যা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র হিসেবে তার দ্বিতীয় বিপ্লব তথা বাকশালে উল্লেখ করেছিলেন মুজিব, তা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বা মাওবাদী ঘরানায় কতখানি গ্রহণযোগ্য ছিল, তা পরের ব্যাপার। কিন্তু এই দলগুলো ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ঠেকানোর নামে স্বাধীনতার পরও যুদ্ধ চালিয়ে গেছে।

এ ক্ষেত্রে না বললেই নয় যে মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার তার বেশির ভাগই শেখ মনির অংশটির বিরুদ্ধে। অধ্যাপক আহসাবউদ্দীন আহমেদ নামে একজন ‘ইন্দিরা গান্ধীর বিচার চাই’ নামের একটি বই উৎসর্গ করেছেন ১৬ বামপন্থীর উদ্দেশে, যাঁদের ১৪ জনকে নাকি মুজিব বাহিনী সদস্যরা হত্যা করেছেন। এঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার নাপোড়া পাহাড়ে ঘুমন্ত অবস্থায় ব্রাশফায়ারে হত্যার শিকার হন। একইভাবে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় কাজী জাফর-মেনন গ্রুপের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির নেতা সৈয়দ কামেল বখতের হত্যার দায়ও মুজিব বাহিনীর ওপর চাপিয়েছেন তাঁর বড় ভাই এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী দিদার বখত। নরসিংদীতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেও লড়াইয়ে একপর্যায়ে সমঝোতা করেন সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক। এ ছাড়া পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে বন্দি ও রাঙামাটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা স্বপন চৌধুরীকে (ছাত্রলীগের সম্মেলনে সমাজতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলা প্রস্তাবনার উদ্যোক্তা) গুম করার অভিযোগও ওঠে শেখ মনি গ্রুপের বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে অভিযোগগুলো বেশির ভাগই সত্য।

সংগ্রহ ও সম্পাদনাঃ
হাফিজ সরকার
তথ্যসুত্র:
অমি রহমান পিয়াল