এক নজরে করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট

প্রকাশিত: ৩:০১ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২১

এক নজরে করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট

বিশেষ প্রতিনিধি | জাতীয় সংসদ ভবন (ঢাকা), ৩০ জুন ২০২১ : করোনাকালীন সংকটের মধ্যেই দ্বিতীয়বারের মতো নতুন অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এবারের বাজেটের আকার ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। বুধবার সকাল ১১ টায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় বাজেট পাস হয়।

এর আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা বাজেট অধিবেশনে ৫৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মঞ্জুরি দাবি তুলে ধরেন। কয়েকজন সংসদ সদস্যের ছাঁটাই প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর নির্দিষ্টকরণ বিল ২০২১ পাস হয়। এর মাধ্যমে শেষ হয় নতুন অর্থবছরের বাজেট পাস কার্যক্রম। ৩০ জুনের মধ্যে বাজেট পাসের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও রক্ষা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি আজই এতে সম্মতি দেবেন। আগামীকাল ১ জুলাই নতুন অর্থবছর থেকে তা বাস্তবায়ন শুরু হবে। ৩ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী। এরপর প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সংসদ অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার থেকেই কার্যকর হবে এ বাজেট।
এবারের বাজেটে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রাধিকার পেয়েছে। বাজেটটি করা হয়েছে সরকারের অতীতের অর্জন এবং উদ্ভূত বর্তমান পরিস্থিতির সমন্বয়ে। বাজেটে সঙ্গত কারণেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্যখাতকে। পাশাপাশি কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজসমূহের বাস্তবায়ন, কৃষিখাত, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থবিলে কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ থাকছে।
২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয়ের আকার ধরা হয়েছে ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির ১৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ। পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে তিন লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্যের সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে অর্থবিল পাস হয়। অর্থবিলে বিনাপ্রশ্নে নগদ টাকা, নতুন শিল্পে বিনিয়োগ, পুঁজিবাজার, ফ্ল্যাট ও প্লট, ব্যাংক আমানতসহ বেশ কয়েকটি খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন অর্থবছরের জন্য যে ব্যয় ধরা হয়েছে, তা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি। টাকার ওই অংক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৭.৫ শতাংশের সমান। বিদায়ী অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দেয়া বাজেটের আকার ছিল ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ১৩.২৪ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১৭.৯ শতাংশের সমান।
গতবারের মত এবারও করোনাভাইরাস মহামারীর সঙ্কটে টিকে থাকার পাশাপাশি অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে অর্থমন্ত্রীকে বাজেট দিতে হয়েছে। এবারের বাজেটের শিরোনাম- জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ।
এবারের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ১৪ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। এরই মধ্যে এডিপি অনুমোদন করা হয়েছে। আর পরিচালন ব্যয় ৩ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। এরমধ্যে ৬৯ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেই যাবে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ১৯ শতাংশের বেশি।

নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের ৬৪ শতাংশ রাজস্ব খাত থেকে পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৮ কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৯.৭ শতাংশ। টাকার ওই অংক মোট বাজেটের ৫৫ শতাংশের মত।

গতবারের মত এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ১ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১১ শতাংশের মত বেশি। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা ১ লাখ ১৫ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

আয়কর ও মুনাফার উপর কর থেকে ১ লাখ ৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৩৭ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৫৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৫৬ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী।

এছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। নতুন অর্থবছরের বাজেটে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে রেকর্ড ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার মত, যা মোট জিডিপির ৬.২ শতাংশ। বরাবরের মতই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর।

অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ৭৬ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।

মহামারীর মধ্যেই বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। পরে তা দুই দফা সংশোধন করে ৬ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তিনি আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৫.৩ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৭.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।

নির্দিষ্টকরণ বিল পাস: আগামী অর্থবছরের বাজেট ব্যয়ের বাইরে সরকারের বিভিন্ন ধরনের সংযুক্ত দায় মিলিয়ে মোট সাত লাখ ৯২ হাজার ৯১২ কোটি ৯৫ লাখ নয় হাজার টাকার নির্দিষ্টকরণ বিল জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। এরমধ্যে, সংসদ সদস্যদের ভোটে গৃহীত অর্থের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার ৩২ কোটি ৭১ লাখ নয় হাজার টাকা এবং সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায় দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৮০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। সংযুক্ত তহবিলের দায়ের মধ্যে ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধ, হাই কোর্টের বিচারপতি ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বেতনও অন্তর্ভুক্ত।

মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাব: আগামী অর্থবছরের বাজেটের ওপর সংসদে উত্থাপিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ খাতের ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপির ১২ জন সংসদ সদস্য ৬২৫টি বিভিন্ন ধরনের ছাঁটাই প্রস্তাব আনেন। এরমধ্যে আইন ও বিচার বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের দাবী ও ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিরোধী দলের আলোচনার পর সবগুলো প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়।

ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো দেন, জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, মুজিবল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, লিয়াকত হোসেন খোকা, রুস্তম আলী ফরাজী, রওশন আরা মান্নান, বিএনপি হারুনুর রশীদ, রুমিন ফারহানা, মোশাররফ হোসেন, গণফোরামের মোকাব্বির খান। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবি সংসদে তোলেন।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো ২০২১-২২-এর বাজেটের প্রাথমিক পর্যালোচনায় বলেছে বাজেটকে জীবন ও জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে প্রণীত হওয়ায় কথা বলা হলেও কোভিড-১৯-এ ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা উভয়ই উপেক্ষিত। করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন প্রধান অস্ত্র হলেও সাধারণ্যে তার প্রাপ্তি অনিশ্চিত। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী মাসে পঁচিশ লাখ ভ্যাকসিন দেয়া হলে ন্যূনতম চার বছর লাগবে সাধারণ মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে। ভারতের একমাত্র উৎস থেকে আমদানি করা ভ্যাকসিন দিয়ে গণটিকা কার্যক্রম সাফল্যজনকভাবে শুরু হলেও, ভ্যাকসিন নিয়ে বাণিজ্য, কূটনীতি ও রাজনীতির কারণে কবে সেই টিকা আসবে জানা নাই। সর্বশেষ চীন থেকে টিকা কেনা নিয়ে চুক্তির গোপনতথ্য সরকারি উচ্চ পর্যায় থেকে ফাঁস করে দেয়ার যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে সেটা আরও জটিলতা সৃষ্টি করেছে। এটা যারা করেছে কেন করেছে তা জানা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস করার জন্য যেখানে সাংবাদিককে জেলে যেতে হয় সেখানে এ ধরনের গর্হিত কাজের জন্য কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তা জাতিকে জানাতে হবে। তাছাড়া বাজেটে টিকা দানের কোনো রোডম্যাপ মন্ত্রী উল্লেখ করেন নি। বরং টিকা সরবরাহের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সম্পূর্ণ বিপরীত।

অপরদিকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থ বরাদ্দ কিছুটা বৃদ্ধি হলেও, করোনায় গত এক বছরে যে আড়াই কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে দরিদ্র হয়ে পড়েছে তাদের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য কোন বরাদ্দ রাখা হয়নি। এই আড়াই কোটি দরিদ্র মানুষ বাজেটে পরিপূর্ণভাবে উপেক্ষিত। অর্থমন্ত্রী তার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে নিজেই বাজেটকে ব্যবসা বান্ধব বলে দাবি করে বলেছেন যে ‘ব্যক্তিখাতকে ড্রাইভিং সিটে বসাতে হবে’ এবং ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বাড়ার মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়বে- যে বিনিয়োগ গত বছরগুলোতেও বাড়েনি, বরং কমেছে এবং আগামীতে বাড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আর সংবিধানে যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে ব্যক্তিখাতকে ড্রাইভিং সিটে বসানোর কথা বলে মন্ত্রী সংবিধানের উল্টো কথাই বললেন। অথচ কোভিডকালে এমনকি পুঁজিবাদের নেতৃত্ব দানকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষকে দেয়ার জন্য বাজেটে দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী করোনার প্রথম বছরে পঞ্চাশ লাখ লোকের জন্য ২৫০০ টাকা করে যে সামান্য অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তার এক তৃতীয়াংশই অব্যয়িত থেকে গেছে। এবারও ঈদে তিনি ৩৫ লাখ লোককে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন, যা ঐ আড়াই কোটি মানুষের স্বল্পাংশ। সামাজিক নিরাপত্তার অর্থের এক অংশ সরকারি কর্মচারিদের জন্য পেনশন আর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা।

স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ সম্পর্কে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রস্তাবে বলা হয় গত বছরের চাইতে কয়েক হাজার কোটি টাকা এ খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও, তা সামগ্রিক জিডিপি-র ১ শতাংশের কিছু উপরে, যা প্রতিবেশি নেপাল, ভারত, শ্রীলংকা এমনকি পাকিস্তানের চাইতেও কম। অর্থমন্ত্রী গত বছরগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতিকে মোটেই আমলে নেন নাই। কোভিডকালে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে দুর্নীতি ও দূরবস্থা বেরিয়ে এসেছে তার থেকে উত্তরণের কোন পরিকল্পনা বা দিক নির্দেশনা বাজেটে নাই।

শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বাজেটের ১৫.৪ শতাংশ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ১১% শতাংশের কিছু উপরে। প্রযুক্তি খাতকে যুক্ত করে এই বাড়তি বরাদ্দ দেখান হয়েছে। কোভিড যেখানে সমগ্র শিক্ষা জীবন দেড় বছর পিছিয়ে যে পড়েছে সেখানে অনলাইন শিক্ষাসহ বিকল্প শিক্ষার জন্য যে সকল প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন ছিল তা অনুপস্থিত বরঞ্চ বাজেটে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর উপর নতুন করে করারোপ করা হয়েছে যা শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতিতে একেবারেই অযৌক্তিক।

কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ নিয়ে কৃষিমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করলেও কৃষক সন্তুষ্ট নয়। কোভিডের দু’বছর পরপর বাম্পার ফলন ফলালেও কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ সেই পুরান ছকে বাধা। সরকার গত বছর লক্ষ্যমাত্রার বহু নীচে সংগ্রহ করতে পেরেছে। ফলে সরকারী গুদাম শুন্যের পর্যায়ে। খাদ্যশস্যের বাজারের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া হয়েছে সিন্ডিকেটের হাতে যার ফলশ্রুতিতে ফসলের ভরা মৌসুমে চালের দাম বেড়েই চলেছে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে।

কৃষি যান্ত্রিকীরণের সুবিধা ভোগ করছে বড় চাষী। এই বাজেটে পূর্ব প্রতিশ্রুত ২৪০টি উপজেলায় প্যাডিসাইলো প্রতিষ্ঠা, সমবায়ী পরিচালনা ব্যবস্থার কোন কথা নাই। আর খেতমজুরদের পেনশনের প্রশ্নটি উপেক্ষিত। এমনকি ইউনিভার্সাল পেনশন স্কীম নিয়েও কোন উচ্চবাচ্য নাই।

করোনা প্রাথমিকভাবে শহরভিত্তিক থাকলেও এখন দ্বিতীয় ঢেউ গ্রামের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে যা মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে শহরে করোনা সংক্রমণে কাজ হারিয়ে মানুষ গ্রামে আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও গ্রামীন কর্মসংস্থানের উপর চাপ পড়ছে। তার মোকাবিলার কৌশল বাজেটে নাই।

শিল্পের ক্ষেত্রে পাটকলকে ব্যক্তিমালিকানায় তুলে দেয়ার বিষয়টি বাজেটে এবার স্পষ্ট করা হয়েছে। অথচ কথা ছিল পিপিপি-র মাধ্যমে তার আধুনিকায়ন ও পুন:চালুকরণ। একই কথা চিনিকলের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রেও সরকার সংবিধান ও বঙ্গবন্ধুর গৃহীত ব্যবস্থার উল্টোপথে হাটছে। তিস্তাসহ নদী ব্যবস্থাপনার ব্যপারে বাজেট নীরব। নীরব অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উত্তরাঞ্চলে আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে।

ওয়ার্কার্স পার্টির প্রস্তাবে সর্বশেষে বলা হয়, যে কোভিডকালে দু’টি বাজেটে যেটা স্পষ্ট তা’হল জনগণের জীবন ও জীবিকা নয়, ক্ষমতার বলয়ে অতি ধনী-সামরিক-বেসামরিক আমলার, যে শক্ত আঁতাত গড়ে উঠেছে তাদের স্বার্থরক্ষায় বাজেটে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

করোনা মহামারীতে যে বহুমুখী অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসা জনগণের অর্থনৈতিক ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করাকেই ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা উচিত, সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, খাদ্য-কর্মসংস্থান এবং কৃষি ও গ্রামীণ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে; গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; উন্নয়ন বাজেটে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে; মাঝারি, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক শিল্পোদ্যোক্তাদের পরিকল্পিতভাবে প্রণোদনা দিতে হবে; বেকারদের কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার এবং আত্মকর্মসংস্থানে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে; নিম্নআয়ের আড়াই কোটি পরিবারের জন্য আগামী ছয় মাস প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নগদ অর্থ প্রদানে বরাদ্দ থাকতে হবে।”