ন্যাপের ৬৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ২৭ জুলাই

প্রকাশিত: ৫:০৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২১

ন্যাপের ৬৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ২৭ জুলাই

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৬ জুলাই ২০২১ : ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর ৬৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ২৭ জুলাই।
১৯৫৭ সনের ২৫ ও ২৬ জুলাই দুই দিনব্যাপী পুরানো ঢাকার সদরঘাটের কাছে রূপ মহল সিনেমা হলে কর্মী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় ন্যাশনাল আওয়াামী পার্টি (ন্যাপ)। করোনা মহামারির কারণে সীমিত পরিসরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হবে বলে দলটি জানিয়েছে।

সোমবার (২৬ জুলাই ২০২১) গণমাধ্যমে পাঠানো ন্যাপের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৬৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে অাগামীকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে এক ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সারাদেশের নেতৃবৃন্দ ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করবেন।

ন্যাপ গঠনে তৎকালীন নেতৃবৃন্দকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ অামিরুজ্জামান বলেন, “অসম্প্রদায়িক এ দল গঠনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিলেন মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পীর হাবিবুর রহমান, মহিউদ্দিন আহমেদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, মোহাম্মদ তোয়াহা, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, সেলিনা বানু, সৈয়দ আশরাফ হোসেন, আহমেদুল কবির প্রমুখ। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছিলেন সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গফফার খান, ইফতেখার উদ্দিন, জিএম সৈয়দ, মাহমুদুল হক ওসমানী, গাউস বক্স বেজেনজো, মিয়া ইফতেখার উদ্দিন প্রমুখ।
মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে এই দলটি গঠিত হয়।

Manual6 Ad Code

১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ প্রশ্নে দলের ডানপন্থী নেতা-কর্মীরা সোহরাওয়ার্দীর পক্ষাবলম্বন করেন এবং বামপন্থী অংশ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং পূর্ব-পাকিস্তানের সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। ফলে আওয়ামী লীগ আদর্শিক কারণে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ঐ বছর ১৮ মার্চ মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের বামপন্থী অংশের উদ্যোগে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ২৪-২৫ জুলাই গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয়। ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সম্পাদক নির্বাচিত হন পশ্চিম পাকিস্তানের মাহমুদুল হক ওসমানী। ন্যাপের অন্যান্য নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন পূর্ববাংলা থেকে হাজী মুহাম্মদ দানেশ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, মহিউদ্দিন আহমদ, মশিউর রহমান (যাদু মিয়া), পীর হাবিবুর রহমান, এস.এ আহাদ, আবদুল মতিন, আবদুল হক, আতাউর রহমান এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছিলেন ওয়ালি খান, আবদুল মজিদ সিন্ধী, মিয়া ইফতেখার প্রমুখ। ন্যাপের মূল লক্ষ্য ও আদর্শ ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা।

১৯৫৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ন্যাপের উদ্যোগে ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ফুলছড়িতে কৃষক সম্মেলনের আয়োজন করা হয় এবং ঐ সম্মেলনে ‘কৃষক সমিতি’ গঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে মওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করেন। বন্যাদুর্গতদের সাহায্যের দাবিতে মওলানা ভাসানী কারাগারে আমরণ অনশন শুরু করেন। মওলানা ভাসানীর আহবানে সর্বদলীয় প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ১৯৬৪ সালের ১৮ মার্চ সর্বজনীন ভোটাধিকার দিবস পালিত হয়। ১৯৬৫ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ন্যাপ সংযুক্ত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে মিস ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করে।

১৯৬৭ সালের দিকে বিভিন্ন কারণে ন্যাপ নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতবিরোধ চলতে থাকে। ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর রংপুরে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনের পর দেশিয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রশ্নে ন্যাপ চীনপন্থী ও মস্কোপন্থী এ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। চীনপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন মওলানা ভাসানী এবং মস্কোপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন সীমান্ত প্রদেশের খান আবদুল ওয়ালী খান। পূর্ব পাকিস্তান ওয়ালী ন্যাপের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এ অংশ মোজাফফর ন্যাপ নামেও পরিচিত হয়।

১৯৬৭ সালে মওলানা ভাসানী ন্যাপের কাউন্সিল ও কৃষক সমিতির অধিবেশন আহবান করেন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় রিকুইজিশন কাউন্সিল অধিবেশন। ১৯৬৮ সালে ন্যাপ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী গণঅভ্যূত্থানের সূচনা করে। ১০ দফা দাবির ভিত্তিতে ৩ নভেম্বর ‘দাবি দিবস’ এবং ৬ ডিসেম্বর ‘জুলুম প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়। ঐদিন পল্টনে এক জনসভা শেষে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে জনগণ গভর্ণর হাউজ ঘেরাও করে এবং ৭ ডিসেম্বর হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঢাকায় হরতালের দিন পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ৮ ও ১০ ডিসেম্বর সারা প্রদেশব্যাপী হরতাল আহবান করা হয়।

Manual7 Ad Code

১৯৭২ সালে ন্যাপ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণতান্ত্রিক সরকারের এক কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ভাসানীর নেতৃত্বে ৭ দলীয় মোর্চা গঠিত হয়। ভাসানী ন্যাপ ১৬৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যায়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও খাদ্যশস্যের দুষ্প্রাপ্র্যতার প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী ১৯৭৩ সালের ১৫ থেকে ২২ মে ঢাকায় অনশন করেন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত ঐক্যজোট খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। সরকার ১৯৭৩ সালের ৩০ জুন মওলানা ভাসানীকে সন্তোষে তাঁর বাড়িতে গৃহবন্দি করে।

Manual8 Ad Code

১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মুজাফফর) ও কমিউনিস্ট পার্টি সমন্বয়ে ত্রি-দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ, জাতীয় লীগ (অলি আহাদ), জাতীয় লীগ (আতাউর রহমান), জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়ন (হাজী দানেশ), কৃষক শ্রমিক সমাজবাদী দল (খান সাইফুর রহমান), কমিউনিস্ট পার্টি (নাসিম আলী), লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে এক বিরোধী ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ন্যাপ এই চুক্তির বিরোধিতা করে।

১৯৭৪ সালের ১৫ মে ভাসানী ন্যাপের এডহক কমিটি গঠন করা হয় এবং কেন্দ্রীয় ন্যাপ পুনরায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৫ জুলাই জাতীয় রিকুইজিশন কাউন্সিল অধিবেশন ডাকা হয়। দলের তরুণ বামপন্থী অংশ কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনাইটেড পিপল্স পার্টি (ইউপিপি) গঠন করে। মওলানা ভাসানী দলীয় কর্মীদের কোন্দল ও নেতৃত্বের ব্যর্থতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে ন্যাপ থেকে পদত্যাগ করেন।

মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী আলেমা ভাসানীর নেতৃত্বে ভাসানী ন্যাপ কিছুদিন নামসর্বস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ১৩টি ন্যাপের অস্তিত্ব দেখা যায়। বর্তমানে ন্যাপ কয়েকটি দল ও উপদলে বিভক্ত।

Manual1 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ