শ্রীমঙ্গলে খাসিয়াপুঞ্জি-ত্রিপুরাসহ চা বাগান এলাকায় পিছিয়ে পড়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল বাস চালু করার জোর দাবী

প্রকাশিত: ৩:১৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২১

শ্রীমঙ্গলে খাসিয়াপুঞ্জি-ত্রিপুরাসহ চা বাগান এলাকায় পিছিয়ে পড়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল বাস চালু করার জোর দাবী

সৈয়দ অারমান জামী, বিশেষ প্রতিনিধি | শ্রীমঙ্গল, ১০ আগস্ট ২০২১: কাউকে পেছনে ফেলে নয়: আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন সামাজিক অঙ্গীকারের আহবান ও এই শ্লোগানকে সামনে রেখে শ্রীমঙ্গলে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এবং বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে অনলাইন ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৯ অাগস্ট ২০২১) আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে অনলাইন জুম প্লাটফর্মে আয়োজিত এই ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক, লেখক ও সনাক সভাপতি কবি দ্বীপেন্দ্র ভট্টাচার্য।
ওয়েবিনারে সম্মানিত আলোচক হিসেবে হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ অামিরুজ্জামান; বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের মহাসচিব ফিলা পাথমী, চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্টের নির্বাহী পরিচালক ও সনাকের স্বজন সদস্য পরিমল সিং বাড়াইক, দ্বারিকা পাল মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক রজত শুভ্র চক্রবর্তী, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের কো চেয়ারপার্সন আনন্দ মোহন সিনহা, প্রতিবেশ-প্রাণ বৈচিত্র সংরক্ষণ ও গবেষক পাভেল পার্থ, মালেয়া ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ত্রিপুরা আদিবাসী নেতা মৃনাল কান্তি, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের গনিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুদর্শন শীল।
টিআইবির এরিয়া কো-অর্ডিনেটর পারভেজ কৈরী এর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের কো-চেয়াপার্সন ও সনাক সদস্য জিডিশন প্রধান সূছিয়াং। এরপর মুক্ত আলোচনা শুরু হয়।
ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, “আদিবাসীরা ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মাচার, পারিবারিক জীবন ব্যবস্থা সবকিছুতেই ভিন্নতা নিয়ে বসবাসকারী আদিবাসীরা আজো এদেশে ভূমির মালিকানা পায়নি।”
আদিবাসী নেতারা আরো বলেন, ভূমি উন্নয়নের নামে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তারা দিন দিন ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। একারনেই আদিবাসীরা আজো স্থায়ী আবাস ভূমি থেকে বঞ্চিত। চা-বাগানের শ্রমিক জনগোষ্ঠী এবং আদিবাসী জনগোষ্টি প্রতিনিয়ত শোষন, বঞ্চনা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আমাদের প্রত্যহ জীবনে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষা শুধু যোগাযোগ, শিক্ষা, বা সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার বাহন হিসেবেই কাজ করেনা। এটি ব্যক্তির স্বকীয় পরিচয়ের অন্যতম বাহন। সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক। বর্তমান বিশ্বে ৬ হাজার ৭ শত এর কাছাকাছি ভাষার অস্তিত্বের কথা জানা যায়। যার প্রায় ৪০ শতাংশ বিলুপ্তির পথে। আর এর অধিকাংশই আদিবাসী ভাষা। বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্তমানে ভাষা হারিয়ে গেছে।
ওয়েবিনারে আদিবাসীদের পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসনের/সরকারের কাছে কিছু দাবী জানানো হয়; দাবীসমূহ হচ্ছে-
১. মৌলবীবাজারসহ ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীদের জীবন মানের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য দাবী জানানো হয়।
২. শ্রীমঙ্গল এর বিভিন্ন দুগর্ম চাবাগান, খাসিয়াপুঞ্জি এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল বাস চালু করা;
৩. অাদিবাসী শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল বৈষম্য দুর করা;
৪. আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা;
৫. বনাঞ্চল ও খাস জমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ বন্ধ করা;
৬. আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি রক্ষার জন্য প্রতিটি আদিবাসী অঞ্চলে আদিবাসী মিউজিয়াম তৈরী করা;
৭. সকল আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকার নিশ্চিত করতে তাদের মাতৃভাষায় পাঠ্যবই প্রণয়ন ও পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করার সুপারিশ করা হয়;
৮. সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধানে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং তাদের জমির মালিকানা সমস্যার কার্যকর নিষ্পত্তি করতে হবে;
৯. সরকারী চাকুরিতে ‘উপজাতি’ কোটা পুর্নবহাল করতে হবে;
১০. সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আদিবাসীদের আরো বেশি করে অর্ন্তভ’ক্ত করা এবং বরাদ্দ বৃদ্ধি করা;
১১. দুর্গম অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ মৌলিক সেবাসমূহ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে পৃথক তদারকি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে;
১২. আদিবাসীদের শিক্ষা, ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
১৩. শ্রীমঙ্গলে বসবাসরত আদিবাসীদের ভাষা চর্চা ও সংরক্ষনের জন্য একটি কালচারাল একাডেমী প্রতিষ্ঠার জোর দাবী জানানো হয়;

ওয়েবিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল সহ বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত খাঁসিয়া,গারো,দলিত, মনিপুরি, ত্রিপরা, মুন্ডা ও চা জনগোষ্টি সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ, সনাক, স্বজন, ইয়েস, ইয়েস ফ্রেন্ডস, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব,এনজিও প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ