মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ ফেরত চাই: পঙ্কজ ভট্টাচার্য

প্রকাশিত: ৩:৫৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২১

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ ফেরত চাই: পঙ্কজ ভট্টাচার্য

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৪ অক্টোবর ২০২১ : আজ রোববার (২৪ অক্টোবর ২০২১) বেলা ৪টায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে সাম্প্রতিক সময়ে সনাতন ধর্মালম্বী সম্প্রদায়ের শারদীয় দূর্গোৎসবে কথিত কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে দেশব্যপী সনাতন ধর্মালম্বী সম্প্রদায়ের পুজামন্ডপে হামলা, প্রতিমা ভাঙ্গচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, হত্যা ও অব্যাহত নির্যাতনের প্রতিবাদে ঐক্য ন্যাপের উদ্যোগে সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ঐক্য ন্যাপ সভাপতি জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য।
সভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ তারেক।
সভার ঘোষণা পত্র পাঠ করেন সভাপতি মন্ডলীর সদস্য আব্দুল মুনায়েম নেহেরু।
অনুষ্ঠিত সভায় সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন সাবেক এমপি ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি মন্ডলীর সদস্য ডাক্তার শহিদুল্লাহ শিকদার, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, ঐক্য ন্যাপের সভাপতিমন্ডলীর সদস্যবৃন্দ যথাক্রমে এ্যাডভোকেট এস এম এ সবুর , রঞ্জিত কুমার সাহা, অলিজা হাসান, ঐক্য ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশিদ ভুঁইয়া, ঢাকা মহানগর সভাপতি হেদায়েতুল ইসলাম ও সুব্রত রঞ্জন তালুকদার প্রমুখ।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, বাঙালী জাতির ইতিহাসের অন্যতম জাতীয় উৎসব দূর্গাপুজা, হাজার বছর ধরে এই জনপদে সকল ধর্মালম্বীরা এই উৎসাবে মেতে উঠে, নিজেদের মাধ্যে সম্প্রীতির যে ধারা গড়ে উঠেছে তাতে ধর্ম-বর্ণ আর জাতি ভেদাভেদ এই উৎসবে থাকে না। সকলের অংশ গ্রহন এই মাটিতে ঈদ-পূজায় সকলে একাকার হয়ে আনন্দে মেতে উঠে। দূর্ভাগ্যজনক সত্য বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে। ৩০ লক্ষ শহীদানের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে ১৯৭১ সালে সাম্প্রদায়িকতার কবর রচনা করা হয়েছিল। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে আজ বাঙালী জাতি সেই সম্প্রীতির চেতনা হারাতে বসেছে। ঠুনকো অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার নেমে আসে। ক্ষমতার পালাবদলের  হাতিয়ার হয়ে উঠে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। ২০০১ সালে ৩৩টি জেলায় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের খড়গ নেমে এসেছে। সর্বশেষ এই সরকারের সময়ে কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নাসির নগর, চট্টগ্রাম, পাবনা জেলার সাথিয়া, গোপালগঞ্জ-সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই কায়দায় সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন হয়েছে। সর্বশেষ এবারের শারদীয় দূর্গোৎসবে মন্দিরে মন্দিরে নজিরবীহিন আক্রমন, প্রতিমা ভাঙ্গচুর, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুন্ঠনের ঘটনায় বিশ্ববিবেক হতভম্ব দেশের বিবেকবান মানুষ এখন অসহায়। আমরা এই জঘন্য ঘটনার নিন্দা জানাই।
তিনি আরো বলেন, জাতীয় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। সংখ্যালঘুদের উপর সকল অত্যাচারের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার করতে হবে। স্বাধীন সংখ্যালঘু কমিশন করতে হবে। হেফাজতের সাথে আপোষ করে পাঠ্যপুস্তকে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তা বাতিল করতে হবে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করতে হবে। সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বাতিল করতে হবে।
সভায় সাবেক সাংসদ ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার আশেপাশে আয়ুব-ইয়াহিয়া আর মোস্তাকের প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আপনার আন্তরিক ইচ্ছার প্রতিফলন কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আপনার আওয়ামীলীগে কৌশলে সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা অবস্থা পাকাপোক্ত অবস্থান নিয়েছে। রংপুরের ঘটনার সর্বশেষ যে সত্যতা খুজে পাওয়া যায়। কুমিল্লার ঘটনা সরেজমিনে তদন্ত করে আমরা দেখেছি সেখানে আপনার প্রশাসন অকার্যকর ছিলো। আজকে সরকার ও প্রশাসনে স্বাধীনতা বিরোধীরা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।  আপনি ছাড়া জনগণের পক্ষে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে শক্তিশালী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
সমাবেশের ঘোষণায় বলা হয়, লাখো লাখো শহীদের আত্মবলিদানে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষ সম অধিকার ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে, নিরাপদে নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম পালন করবে এই বিষয়টি দেশের সংবিধানে  বর্ণিত রয়েছে। এই স্বাধীন দেশ অর্জনের জন্য  হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান সকলে একত্রে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছে, অনেকে জীবন দিয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয় দেশের  সংখ্যালঘু জনগণ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে হত্যা, হামলা, নির্যাতনের স্বীকার হয়ে চলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গা পূজার সময় মুসলিম ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন কুমিল্লার নানুয়া দিঘীর উত্তর পার্শ্বের অস্থায়ী পূজামন্ডপে রাখার অজুহাতে ১৩ অক্টোবর, ২০২১ তারিখে মহা অষ্ঠমীর দিনে ঐ মন্ডপ আক্রমণ করে প্রতিমা, মন্দির, ভাঙ্গচুর  করা হয়। ঐ দিনই চাঁদপুরের হাজীগঞ্জেও পুজামন্ডপে হামলা করা হয়। জঙ্গি মিছিল বের করা হয়।  সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমন করা হয়। ১৫ অক্টোবর নোয়াখালীর চৌমুহনীতে বিপুল সংখ্যক মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ব্যবসা প্রতষ্ঠানে হামলা চালায়, ভাঙ্গচুর ও মালামাল লুন্ঠন করে। সাম্প্রদায়িক এই ধরনের ঘঠনা চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় ঘটে। ১৮ অক্টোবর রংপুর জেলার পীরগঞ্জ  উপজেলার মাঝি পাড়ায় ঘটে  খুবই হৃদয়বিদারক ও নারকীয় ঘঠনা। এখানে একদল জঙ্গি জনতা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ২৫টি/ত্রিশটি বাড়ি ঘর  জ্বালিয়ে দেয় ও অনেককে শারীরিকভাবে আক্রমন করে রক্তাক্ত করে আহত করে। ধন সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়। মুসলমানের লেবাসে এই আক্রমনকারীদের এহেন জঘণ্য বর্বরোচিত কর্মকান্ড আমাদের বিক্ষুব্ধ করেছে। এটি কোন অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের ঘঠনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এরা আসলে কোন মুসলমান নয়। মুসলমানদের ধর্ম ইসলাম ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের আক্রমন করার, তাদের ধন সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ করা, লুণ্ঠন করা  তাদের ধর্মীয় আচার আচরণে বাধা দেওয়াকে কোন অবস্থাতেই অনুমোদন করে না। এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে ইসলাম নিষেধ করেছে। এরা মুসলমানের লেবাসে ভূমিধস্যু, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী। এরা দেশের শত্রু, জাতির শত্রু, স্বাধীনতার শত্রু। এরা দেশকে তালেবান রাষ্ট্র বানাতে চায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আক্রমন করে দেশ থেকে তাঁড়াতে চায়, তাদের ভূমি দখল করতে চায়। কোন অবস্থাতেই এদের এই জঘণ্য মনোবাসনা কার্যকর করতে দেওয়া যাবে না।
কাজেই ঐক্য ন্যাপ এ ধরনের ঘঠনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং ঐ সকল অসুরদের যথোপযুক্ত বিচার ও শাস্তি দাবী করছে।
আমরা আরো লক্ষ্য করেছি যে, বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের সরকার প্রশাসন দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের সর্বত্র মন্দির মন্ডপের যথাযথ নিরাপত্তা বিধান করতে যথেষ্ট সচেতনতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
আসলে আমরা যদি লক্ষ্য করি ইতোপূর্বে দেশে সংঘঠিত সাম্প্রদায়িক হামলা, মামলা, আক্রমন যেমন কক্সবাজারের রামু, ব্রাম্মনবাড়িয়ার নাসির নগর, সুনামগঞ্জের শাল্লা-সহ বিভিন্ন স্থানের ঘঠনাগুলোর বিচার না হওয়াতেই আলোচ্য সন্ত্রাসীরা সাহসী হয়ে উঠছে। বেশী দুরে না গেলেও দেশবাসী যাদের কাছে বেশি আশা করে সেই দলের এক নাগারে বার বার সরকারে থাকার আমলে ঘটে যাওয়া আইন ও শালিশ কেন্দ্রের হিসাব মতে ৩,৬৭৯ টি সাম্প্রদায়িক ঘটনার একটিরও বিচার না হওয়া খুবই দূঃখজনক। ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সম্পর্কে দেশের মালিক জনগণ জানতে পারে না, এই অবস্থার নিরসন হওয়া দরকার।
এ অবস্থায় আজকের সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে নিম্নোক্ত দাবি জানাচ্ছি;
১. অবিলম্বে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং দলমতের উর্ধ্বে থেকে বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে এদের বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।  সংশ্লিষ্ট  কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে  যেন কোন অবস্থাতেই কোন নিরপরাধ ব্যক্তি কোন প্রকার হয়রানির সম্মুখীন না হয়।
২. ক্ষতিগ্রস্ত সকল মন্দির, বাড়িঘর সরকারি ব্যয়ে পুন:নির্মাণ করে দিতে হবে। দ্রæত গৃহহীনদের পুন:র্বাসন করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৩. নিহত/নিহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আহতদের সরকারি ব্যয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করতে হবে ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৪. যে সকল জায়গায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা হয়েছে, এর যথাযথ তদন্ত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. ’৭২এর  সংবিধান পুন:স্থাপন করতে হবে। জামায়াত শিবির নিষিদ্ধ করতে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ