উদ্যোক্তা মেয়েদের স্বাবলম্বী করছেন সুমনা

প্রকাশিত: ৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২২

উদ্যোক্তা মেয়েদের স্বাবলম্বী করছেন সুমনা

রাজশাহী, ০৮ এপ্রিল ২০২২: রাজশাহী শহরের মেয়ে রোকেয়া পারভীন সুমনা। আর্থিকভাব খুব স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে নন। ছোট থেকেই মায়ের কাছে দেখেছেন কীভাবে সংগ্রাম করতে হয়। তিনিও সংগ্রাম করে নিজের জীবন বদলে দিচ্ছেন, পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বদলে দিচ্ছেন এই শহরের হাজারো মেয়ের।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে নিজেই জানালেন তার এই উদ্যোক্তা তৈরির গল্পের কথা।
সুমনার ভাষ্য মতে, রাজশাহী শহরেই বেড়ে উঠেছি। এই শহরে কোনো শব্দ দূষণ নেই, নেই যানজট। একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর। এই শহরে যাতে নারীরাও নিজেদের মতো জীবন-যাপন করতে পারে, স্বাবলম্বী হতে পারে সেজন্য তাদের নানা উদ্যোগ ও পণ্য তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিই আমি।
পাট পণ্য তৈরির বিষয়ে সাধারণত প্রশিক্ষণ দেন সুমনা। শুধু রাজশাহীই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কর্মকা- পরিচালনা করেন তিনি।
তার মতে, রাজশাহী শহরের নারীদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই পাট এর ট্রেনিং। তারা সময়ের সাথে সাথে নিজেকে যোগ্য উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তুলতে পারে। নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে সবার সামনে। পাট ও পাট জাত পণ্য এর উপর হাতে খড়ি ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে যাতে রাজশাহীর নারীরা এগিয়ে আসতে পারে।
‘আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো আমি রাজশাহীতে ট্রেনিং দেবো। আমার বাবা মৃত মো. লুৎতফুল বারীকে সবাই মাটির মানুষ বলে চিনতো। অথচ আমি তার মেয়ে আমাকে অনেকেই চিনে না। আমি সেই পরিচয় ফিরে পেতে চাই।’
সুমনা বলেন, সেই প্রত্যাশা থেকেই রাজশাহীতে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলি। এখানে এখন সেলাইসহ বিভন্ন কাজের প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এটা আমার জন্য বেশ গর্বের ও আনন্দের।
‘প্রশিক্ষণ চলাকালে অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়। তাদের সংগ্রামের নানা গল্প শুনি। নিজেও সেখান থেকে অনুপ্রেরণা পাই। শেষ আশাও যখন ফুরিয়ে যায়- সেই শূন্য থেকেই নতুন করে শুরু করছে নারীরা। এটা আমার ভালো লাগে।’
তিনি বলেন, আমরা নারীরা শত কষ্টের মাঝেও হাসতে জানি। নিজের পরিবারকে ভালো রাখতে জানি। আর এই হার মানতে না শেখা নারীরাই নব উদ্যোমে এগিয়ে চলেন। কর্ম করে নিজে সংসারের হাল ধরেন, অন্যকেও সহযোগিতা করেন। এটা দেখলেই আমার আনন্দ হয়।
সুমনার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নাম ‘প্রতিষ্ঠান বৈচিত্র্য’। যা ইতোমধ্যে তরুণীদের তো বটেই শহরের বিভিন্ন বয়সী কর্মঠ নারীদের কাছে পরিচিত নাম হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসেন-এমন প্রশ্নের জবাবে হাতের কাজসহ কুটির শিল্পের নারী প্রশিক্ষক রোকেয়া পারভীন সুমনা বলেন, এখানে যারা আসেন তাদের অনেকেই ছাত্রী। আবার অনেকে চাকরির পাশাপাশি শিখছেন এসব কাজ। পাটপণ্যসহ সৌখিন তৈজসপত্র তৈরিতে তাদের আগ্রহ থাকে।
‘আমি যখন তাদের (প্রশিক্ষণার্থী) মাঝে থাকি তখন তাদের চোখে-মুখে একটি স্বপ্ন দেখি। আমি সেই স্বপ্নটা যাতে তারা বাস্তবায়ন করতে পারে সেজন্য কর্মস্পৃহাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করি। মনোবল শক্ত রাখতে পরামর্শ দিই।
রাজশাহী কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী মোহতামিমা জাহান বলেন, আমি পড়াশোনার পাশাপাশি ‘প্রতিষ্ঠান বৈচিত্র্য’তে প্রশিক্ষণ নিয়েছি পাট দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরির। নিজের শো-পিচসহ নানা ধরনের ব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরি করে ফেসবুকে ‘বিচিত্র পণ্য’ পেইজের মাধ্যমে বিক্রি করি। ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমার পুঁজি ছিলো ১০ হাজার টাকা। কিন্তু মুনাফা পেয়েছি ৩০ হাজার টাকা।
এদিকে নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড সার্ভিসেস-মাইডাস কাজ করে চলেছে। রাজশাহীতেও তাদের কার্যক্রম চলমান।
এ বিষয়ে সুমনা বলেন, রাজশাহীর অনেক নারীরাই জানতো না বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা প্রতিদিন অসাধারণ সব বহুমুখী পাটপণ্য তৈরি করে চলছে। রাজশাহীর নারীদের কাছে পাট পণ্যকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য মাইডাস নানা ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করে। নারী উদ্যোক্তাদের পণ্যের বিপণনের সুবিধার্থে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় এসএমই মেলার আয়েঅজন করা হয়ে থাকে। এটা একটা ভালো দিক।
এদিকে ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের অধিক সহায়তা দানকারী এনজিও প্রতিষ্ঠান মাইডাস এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. ইব্রাহিম হোসেন বলেন, মাইডাস-এর উদ্যোগে দেশের কয়েকটি জেলার নারীদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
‘এছাড়া তাদের তৈরি পণ্যের বিক্রি বাড়াতে এবং উদ্যোক্তাদের মার্কেটিং দক্ষতা উন্নয়নের জন্যে মেলার আয়োজন করা হয়। এতে নারীরা লাভবান হন,’ যোগ করেন তিনি।
এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গত বছরের জুনে ভার্চুয়ালি মেলার আয়োজন করে বিসিক, রাজশাহী।
এতে চামড়া, বস্ত্র, হস্তশিল্প, কারুশিল্প, সিল্ক, ফ্যাশন হাউজ, পার্লারসহ প্রায় ৫০ জন উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছিলেন। তবে বছরজুড়েই অনলাইনে বা ফেসবুকে তাদের পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
বিসিক রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক জাফর বায়েজিদ বলেন, ‘বর্তমান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবার অনলাইনে মেলার আয়াজন করা হয়। এবারও এ ধরনের চিন্তা রয়েছে।