সিলেট ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ১লা পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ, মে ৩, ২০২২
তাপতী বসু | কলকাতা (ভারত), ০৩ মে ২০২২ : ঈদ যায় ঈদ আসে-
তখন নিতান্তই বালিকাবেলা।
দড়াটানা নদীর পাড়ে আমাদের গ্রাম। সেই গ্রামে আমার ছোট্ট বন্ধু আকলিমা খানম—ছোট্ট করে সবাই ডাকতো ‘আক্কি’৷
আমাদের বাড়ির অদূরে মল্লিক বাড়িতে ভাড়া থাকতো ওরা৷ আমাদের “বাসাবাটি পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে”এক ক্লাসে পড়তাম দু’জনে৷ বিদ্যালয়ের প্রারম্ভের দিনে আক্কি ছিল পাশে বসার সাথী৷ আমাদের দুজনের আগে যে বিদ্যালয়ে যেতো, জায়গা রাখতো অন্যের জন্যে৷
বিদ্যালয়ে পূজা বা ঈদে ছুটি আসতো৷ শেষ দিন আমরা হাত ধরে বাড়ির পথ ধরতাম৷ আবার দেখা হবে ছুটি শেষে।
এমনই এক ঈদ। ১৯৭১ সাল। স্কুল মাঝে মাঝে খুলতো, আবার বন্ধ হয় যেত। তখন সব মিলিয়ে জনা দশেক পড়ুয়া আমরা নিয়মিত হাজিরা দিতাম। সেই ঈদের সময় আক্কি বলেছিল, “ঈদে আবি- আমাগো ঘরে?”
সেই দুঃসহ ক্রান্তিকালেও রমজান শেষে দ্বিতীয়া চাঁদের আলো হয়তো উঁকিঝুঁকি দিয়েছিল আমাদের নারকেল গাছের সবুজ চিরল চিরল পাতার ফাঁকে৷
সন্ধ্যার আলো-ছায়ার মিলনে তার সৌন্দর্য দেখার সময় কারো ছিলো কিনা জানিনা!
আক্কির নেমন্তন্ন তাই নিতে পারিনি।
ছোটো দাদা রেডিও শুনত গোপনে। কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতারের সব খবর বলত মাকে ….।
তারপর দেশ স্বাধীন হলে সংবাদপত্রের ছবিগুলো
সংগ্রহে রাখতো।
আবার আমরা তেলচুপচুপ ভেজা চুলে দৌড় স্কুলে যেতাম। বেঞ্চে বসে আক্কি হাসতো। লাল-সবুজের ছাপানো, নতুন গন্ধ মাখা ফ্রক৷ হাত মেলে ধরতো৷ মেহেদির নঁকশা করা অতি বালিকা হাত৷ বলতো,
“মিন্দী দিয়ে দিছে আম্মায়! আব্বুর দেওয়া লালনীল কাঁচের চুড়ি৷৷ আক্কি খুলে পড়াতে চাইত আমার হাতে৷ এক সময় বলতো,
“তুই আলিনা কেন্ ঈদে? তোর লগে আড়ি”!
সব ভুলে একটু পরেই আমি আর আক্কি পাল্লা দিয়ে পড়তাম দুই দুগুণে চার, তিন তিরিক্ষে নয় …৷
জীবন তখন জলের মতন, যার পরে আলপনা থাকেনা!
আমাদের স্কুলের মাটির বারান্দা৷ টিফিনে পাঁচ ইটের টুকরোয় ঘোঁট খেলতাম আমরা
“ও ফুল ফুল দোগো, ও দোগো দোগো তেগো..!”
সেদিন খেলা শেষে আক্কি হাত মুছতো আমার জামায়—নিজেরটা যে ঈদের!
আমরা হাসতাম মন খুলে—তখনতো মন খারাপের বয়স নয়৷ ও হাসত ,আমি হাসতাম৷ সেই হাসিতে শুকনো পাতা উড়ে যেতো৷
এরপর! দিনের পরে দিন চলে যায়—যাচ্ছে। কোথায় আছে ‘আক্কি’-জানা নেই৷ অনেক চেষ্টা করলেও তো আর সেই মিন্দি মাখা হাতের রঙিন দিনগুলো ফিরে আসবে না —তাই আক্কির ঠিকানা খুঁজে পাবার কষ্ট করতে মন চায় না৷
কিছু স্মৃতি থাকে অমলিন-নির্ভেজাল৷ আমার অন্তরের আক্কি আছে একই রকম। ওর মনে হয়তো আমিও…।
ঈদ যায়। ঈদ আসে।
বালিকা বয়স কবে ঝরে গেছে।
সেদিনের অসমাপ্ত দাওয়াতের কথা আজও মনে আসে।
নিজের আর বড়ো হওয়া হয়ে ওঠে না।
ছবি:
একাত্তরেও ঈদ এসেছিল, মলিন ঈদ। দিনটি ছিল ২০ নভেম্বর, ১৯৭১। ছবিটি কলকাতার থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় প্রাঙ্গণে ঈদের জামাতের ।
বাসাবাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি