অপমানিত ইজিবাইক শিল্প: বেকার তরুনের উপায় কি?

প্রকাশিত: ৫:০৯ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২২

অপমানিত ইজিবাইক শিল্প: বেকার তরুনের উপায় কি?

মাহা মির্জা |

রোজার মাসে সাভারে একজন অটোরিকশা চালক আত্মহত্যা করেছিলেন। তার নাম নাজমুল। তার অটোরিকশাটি পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে যায় আর তিন হাজার টাকা জরিমানা করে। এরপরই গলায় দড়ি দেন নাজমুল। নাজমুল কে ছিলেন? রিক্সা চালাতে গেলেন কেন? তাও আবার ব্যাটারি চালিত রিক্সা, যেইটার ঠিকঠাক অনুমোদন নেই। নাজমুলের মতো আরো ৪০-৫০ লাখের ´মতো বেকার তরুণ আছেন। তারা কেন শখ করে এইসব অটো চালাতে আসেন?

গতবছর ডিসেম্বর মাসে হাইকোর্ট থেকে রায় দেয়া হয়েছিল, ইজিবাইক অবৈধ। অপসারণ করতে হবে। হাইকোর্টে এই রিট করলো কে? অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, রিট করেছে একটি নতুন ইজিবাইক কোম্পানির সভাপতি। এই কোম্পানি আবার আগামী জুন মাসে ৩০ হাজার নতুন ইজিবাইক নামাবে রাস্তায়। কোম্পানির ইজিবাইকের দাম ৬ লাখ টাকা, আর স্থানীয় মেকানিকের তৈরী ইজিবাইক মাত্র দেড় লাখ টাকায় পাওয়া যায়। বোঝাই যাচ্ছে, নতুন কোম্পানির বিক্রি বাট্টা নিশ্চিত করতে হবে। গরিবের ইজিবাইক অপসারণ তার প্রথম ধাপ।

আমদানি বৈধ, বিক্রি বৈধ, চালানো অবৈধ?

বাংলাদেশে ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। অর্ধেক দেশে তৈরী হলে বাকি অর্ধেক কোথেকে আসে? শুধু গাজিপুরেই তিন সড়কের মোড় থেকে টাকশাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত শো-রুম আছে। এমনকি সেনা কল্যাণ সংস্থার অধীনে ‘ট্রাস্টে’রই একাধিক ইজিবাইকের শো-রুম আছে এই রাস্তায়। আমদানিকারকদের পার্টস এবং সম্পূর্ণ ‘বডি’ আমদানি করার অনূমোদন আছে। এতদিন ধরে আমদানি হয়েছে, বিক্রিও হয়েছে, অথচ গরিব তরুণ সেই একই জিনিস নিয়ে রাস্তায় নামলেই ধরপাকড়, জরিমানা, ডান্ডার বাড়ি?
যাইহোক, এ বছর এপ্রিলে আদালত আরেকটি রায় দিয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, আমদানি বৈধ, কিন্তু ইজিবাইক মহাসড়কে চলতে পারবেনা, চলতে পারবে শহরের মধ্যে, অলিতে গলিতে। এই পাল্টা রিট করলো কে? এই রিট করলো আমদানিকারক। তারা হাজার হাজার পার্টস আর বডি কিনে ফেলেছে, তাদের শো রুম আছে, খরচা পাতি আছে। বিক্রি বাড়ানোর পরিকল্পনাও আছে।

তারমানে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? নতুন ব্যাবসায়ীর রিটে স্থানীয় ইজিবাইক অবৈধ। আর পুরান ব্যাবসায়ীর রিটে আমদানি করা ইজিবাইক বৈধ। আর এতো সব বৈধ অবৈধের আইনি মারপ্যাঁচের মধ্যে পরে চল্লিশ লাখ ইজিবাইক চালকের কি বিশ্রী অপমান। খেটে খাওয়া তরুনকে চোরের মতো রাস্তায় গাড়ি বের করত হয়। কিস্তির টাকায় কেনা গাড়ি মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে ছাড়াতে হয়।

চাহিদার চেয়ে ইজিবাইক বেশি?

জেলাশহরগুলোর জনসংখ্যা বেড়েছে, স্কুল কলেজ দোকানপাটের সংখ্যা বেড়েছে, গণপরিবহন সীমিত, তাহলে ইজিবাইকের চাহিদা বাড়বেনা কেন? টিসিবির দেশেতো আর ঘরে ঘরে টয়োটা নেই।
চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে সত্যি। ২৫০০ টাকার দৈনিক রোজগার ১৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। কিন্তু গাজীপুরের ইজিবাইক-চালকরা জানান, মাসে এখনো ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন তারা। ইজিবাইকের সংখ্যা আরো বেড়ে গেলে উপায় কি-এই প্রশ্নের উত্তরে নিজেরাই সমাধান দিলেন। গাড়ির প্লেট ভাগ করে দেয়া হবে। একদিন লাল প্লেট বের হবে, পরের দিন নীল প্লেট। নীলের দিনে লাল বের হবেনা, তাতে যানজট কম হবে, আবার নীলের আয়ও দ্বিগুন হবে। চালকরাই জানান, ময়মন্সিংও রোডে এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে।

এখন গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী ইজিবাইকের সংখ্যা না অতিরিক্ত বেড়ে গেছে? চাহিদার চেয়ে না গাড়ি বেশি? তাহলে রিট করা কোম্পানিটি ৩০ হাজার ইজিবাইক নামানোর ‘বিজনেস প্ল্যান’ করে কেমনে? গাজীপুরে কোটি টাকার কারখানা খুলেছে, সংবাদপত্রে লক্ষ টাকার বিজ্ঞাপনও ছাপাচ্ছে, বাজার না বুঝেই?

ইজিবাইকে যানজট হয়?

নগরবিদরা বরাবরই বলে আসছেন, একটি আধুনিক নগরীর মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা দরকার। অথচ ঢাকায় অলিগলিসহ রাস্তা মাত্র ৭ শতাংশ! জেলা শহরগুলোতে রাস্তা মোট আয়তনের মাত্র ২-৩ শতাংশের মতো! যানজট কমাতে জেলাশহরগুলোতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাইপাস্ সড়ক। পর্যাপ্ত অলিগলি। পর্যাপ্ত প্যারালাল রোড এবং লিংক রোড। জেলাশহরগুলোর ভিতরে ভিতরে পর্যাপ্ত রাস্তা না থাকার কারণে মহা সড়কে উঠেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয় গাড়িকে। এখন শহরের আয়তনের তুলনায় প্রয়োজনীয় রাস্তা অর্ধেকেরও কম থাকলে যানজট হবেনা তো কি?

দুর্বল কাঠামো ও দুর্ঘটনা

বলা হচ্ছে ইজিবাইকের দুর্বল কাঠামোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, ‘বডি’র তুলনায় মোটরের ওজন ভারী হওয়ার কারণে গতি নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৌশলীরা বলছেন, এটি বেশ কয়েক বছর আগে সমস্যা ছিল। কিন্তু স্থানীয় ভাবে বহু পরীক্ষামূলক চর্চার মধ্যে দিয়ে এই কাঠামো শক্ত হচ্ছে। যেমন দেশের স্থানীয় মেকানিকরা যে বোরাক তৈরী করছেন, তার কাঠামো তুলনামূলক ভাবে মজবুত। প্রকৌশলীদের মতে, কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে যেমন, মোটরের সঙ্গে স্পিড রেগুলেটর (গতি নিয়ন্ত্রক) বসানো, বডির ওজন নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, এবং পিছনের কাঠামো নিয়ে কাজ করা। গাজিপুরের স্থানীয় মেকানিকরা জানান, গাড়ি সারানোর সময় তারা নিজেরাই নতুন করে চিন্তা করেন। আগের চেয়ে উন্নত করার চেষ্টা করেন। এছাড়াও দেশীয় যেসব থ্রি উইলার কোম্পানি বিআরটিএর অনূমোদন পাচ্ছে, সেগুলোর কাঠামোকে ‘মডেল’ কাঠামো হিসাবে ব্যবহার করায় উৎসাহ দিতে সরকারি উদ্যোগ থাকবেনা কেন? মোট কথা, কোনো রকমের ভর্তুকি ছাড়াই স্থানীয় দক্ষতায় যে শিল্প গড়ে উঠেছে, তার নিরাপদ বিকাশের দায়িত্ব রাষ্ট্র কেন নেবেনা? আমেরিকা, ইউরোপ, চায়না, ভারত, বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও গবেষণায় বিপুল পরিমান ভর্তুকি দিচ্ছেনা?

বলা হয়, মহাসড়কে দ্রুত গতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে স্বল্পগতির ইজিবাইক একসঙ্গে চলা ঝুঁকিপূর্ণ। খুবই সত্যি কথা। এদেশে গরুর গাড়ি এবং দূরপাল্লার বাস এক সড়কেই চলে এবং এটি আমাদের সড়ক ব্যাবস্থার একটি পুরানো সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার সমাধানতো বিশেষজ্ঞরাই বাতলে দিয়েছেন। প্রতিটি মহাসড়কের পাশে একটি করে সার্ভিস সড়ক.সংযুক্ত করা, এবং সার্ভিস সড়কগুলোকে মূল সড়কের তুলনায় নিচু রাখা। বাস এটুকু হলেই হয়।

এরকম বহু এলাকা আছে যেখানে কৃষি পণ্য পরিবহন, রোগীকে হাসপাতালে নেয়া বা মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার একমাত্র ভরসা ভ্যান আর ইজিবাইক, এবং এই বাহনগুলোকে এক পর্যায়ে মহাসড়কে উঠতেই হয়। তাহলে এতোবছরেও মহাসড়কগুলোতে সার্ভিস রোড নেই কেন? যোগাযোগ অবকাঠামোতে এই বছরের বরাদ্দ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। ভারত ও চায়নার দ্বিগুন তিনগুন খরচে মহাসড়ক বানানো যায়, বিশ্বের সর্বোচ্চ খরচে মাওয়া রুট তৈরী হয়, অথচ বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের প্রেক্ষাপটে অতি প্রয়োজনীয় সার্ভিস সড়কগুলো তৈরি করা যায়না? গ্রামীণ অর্থনীতির চলাচলের পথকে দুর্ঘটনামুক্ত রাখতে নূন্যতম কোনো দায় নেই রাষ্ট্রের?

এসিড ব্যাটারি পরিবেশবান্ধব নয়

কোনো সন্দেহ নেই যে লেড এসিডব্যাটারি পরিবেশ বান্ধব নয়। এখন যদি প্রশ্ন করি, এই দেশে ঠিক কোন জিনিষটা পরিবেশ বান্ধব? রামপাল, মাতারবাড়ি আর পায়রা বিদুৎকেন্দ্রের কয়লা খুব পরিবেশবান্ধব? বড়োলোকের এসি আর মধ্যবিত্তের ফ্রিজের রেফ্রিজারেন্ট পরিবেশ বান্ধব? তুরাগ, বালু, শীতলক্ষা ধ্বংস করা গার্মেন্টস খুব পরিবেশবান্ধব? এখন কি গার্মেন্টসওয়ালা আর এসিওয়ালাদের বিরুদ্ধে রিট করবেন?

পৃথিবীর সেরা বায়ু দূষণের দেশে, সেরা প্লাস্টিক দূষণের দেশে আর কারও কোনো দায়দায়িত্ব নেই, খালি রিক্সাওয়ালার ব্যাটারি পরিবেশ বান্ধব হওয়াই লাগবে!!

এই দেশে তড়িঘড়ি করে হাজার কোটি টাকার পারমাণবিক বর্জ ব্যাবস্থাপনার মতো ভয়ঙ্কর জটিল চুক্তিও হয়ে যায়, অথচ সামান্য একটা ব্যাটারি রিসাইকেল নীতিমালা হয়না। লেড এসিড থেকে ধীরে ধীরে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে একসময় যেতেই হবে, কিন্তু সেই রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের কোনো পরিকল্পনা থাকবেনা? ভর্তুকি থাকবেনা? পরিবেশ রক্ষার ঝান্ডা উড়াতে হবে খালি রিক্সাওয়ালা অটোওয়ালাদের?

ইজিবাইক একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প নয়?

সস্তার বাহন হিসাবেই নানা ডিজাইনের, নানা রঙের ইজিবাইক ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশ জুড়ে। একসময় শুধু চায়না থেকে আমদানি হতো। চায়নারটা কপি করতে করতে এখন গ্রামে গঞ্জের মিস্ত্রি মেকানিকরাও এই বাহন তৈরিতে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। একেকটি গাড়ি তৈরিতে একজন মোটরের মেকানিক বা একজন কাঠের মিস্ত্রির কত পরিশ্রম, কত চিন্তা। বোরাকের হুড, সিট্, বডি, বাম্পার, চাকা, ব্যাটারি, সব দেশে তৈরী হচ্ছে। চার্জার, পিক আপ, স্টিয়ারিং, বাতি, গ্লাস, হুইপার, ব্রেক সু, এলইডি, প্যাডেল, চেইন, বেল – এগুলোও তৈরী হচ্ছে দেশে। চাকার ফ্রেম, চাকার টিউব, চাকার টায়ার, এগুলোও।

বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটা জেলাতেই এখন শয়ে শয়ে পার্টসের দোকান, ইজিবাইকের গ্যারেজ, স্টিলের ওয়ার্কশপ, আর টায়ারের দোকান। এই বাহনকে ঘিরে আবার সারা দেশ জুড়ে গড়ে উঠেছে লাখে লাখে মেরামতের দোকান। কন্ট্রোল বক্স পুড়ে যায়, স্টিয়ারিং ছিড়ে যায়, বিয়ারিং ভেঙে যায়, ব্রেক ‘লুজ’ হয়ে যায়, নষ্ট পার্টস সারাতে হয়, ইঞ্জিনের তেল বদলাতে হয়। মোটরের মিস্ত্রি, পেইন্টিং মিস্ত্রি, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি, ইঞ্জিন মিস্ত্রি, হেলপার- সব মিলিয়ে একেকটা দোকানেই ৭ থেকে ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়। রহিম আফরোজ, পাওয়ার প্লাস দেশেই ব্যাটারি সংযোজন করছে। উৎপাদক, সংযোজক, চালক আর মেরামত মিলিয়ে এক দশকে তৈরী হয়েছে দারুন প্রাণবন্ত এক স্থানীয় অর্থনীতি। কোনো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ছাড়াই সারা দেশ জুড়ে ষাট সত্তুর লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করেছে এই খাত । এটা জরুরি শিল্প না হলে কোনটা জরুরি শিল্প?

অথচ ইজিবাইক নিয়ে গণমাধ্যমের ভাষা খেয়াল করুন, ‘অবৈধ’, ‘নিষিদ্ধ’, ‘দাপিয়ে বেড়াচ্ছে’, ‘দৌরাত্ম’, ‘রাজত্ব’ ইত্যাদি। খেয়াল করুন, সব রকমের প্রযুক্তি ভালো, ডিজিটাল বাংলাদেশ ভালো, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ভালো, রোবট ভালো, কিন্তু শুধু রিক্সার ‘অটোমেশন’ করা প্রযুক্তি ভালো না। এই যে প্যাডেল চালিত রিক্সা থেকে অটোরিকশা/ইজিবাইক হলো, স্থানীয় পুঁজি, স্থানীয় উদ্যোগ, এবং স্থানীয় চাহিদায় একটা গোটা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠলো, রিক্সা চালকের অর্ধশত বছরের ঘামের কষ্ট লাঘব হলো, লাখে লাখে বেকার তরুনের কর্মসংস্থান হলো, কিন্তু ইজিবাইক ভালো না। কারণ এই জিনিস হাইওয়েতে চললে শীর্ষ-ধনী-বৃদ্ধির দেশের ইজ্জত থাকেনা?
গার্মেন্টস বা অন্যান্য ভারী শিল্পের মাল পরিবহনের কাজে মহাসড়ক ব্যবহৃত হবে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ ছোট অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে গতি দেয়া স্থানীয় মেকানিকদের তৈরী এই বাহনের বেলায় মহাসড়ক ব্যবহার নিষিদ্ধ?

গার্মেন্টস থেকে অটোরিকশা

ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল বাংলাদেশের উপর একটা প্রতিবেদন করেছিল ২০১৮ সালে- ‘দ্য রোবটস আর কামিং ফর গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স’। প্রতিবেদন বলছে, ব্যাপক অটোমেশনের ফলে গার্মেন্টসে কর্মসংস্থানের হার আশংকাজনক ভাবে কমছে। বাস্তবেও আমরা দেখি, গাজীপুর, আশুলিয়া বা টঙ্গীতে গত কয়েক বছরে শত শত সোয়েটার কারখানা বন্ধ হয়েছে, এক ধাক্কায় হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। বলা হচ্ছে, অটোমেশনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের শতকরা ৬০ ভাগ গার্মেন্টস কর্মীই চাকরি হারাবেন (ডেইলি ষ্টার, ২০১৯)। অথচ গার্মেন্টস শিল্পে বছর বছর রফতানি অর্ডার কিন্তু ঠিকই বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন চাকরি তৈরী হচ্ছেনা। অর্থাৎ, শ্রমিকের কাজটা এখন করছে স্বয়ংক্রিয় মেশিন।

বাস্তবতা হলো, ঢাকার গার্মেন্টস, খুলনার পাটকল, উত্তরবঙ্গের চিনিকল থেকে ছাঁটাই হয়েছে লাখো শ্রমিক। এসব অঞ্চলের গোটা স্থানীয় অর্থনীতিটাই ধসে পড়েছে। চারিদিকে কাজের জন্যে হাহাকার। গাজীপুরের ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক, খালিশপুরের কাজ হারানো মানুষ, সারা দেশের অল্প শিক্ষিত বেকার তরুণ দলে দলে ঋণ করে ইজিবাইক কিনেছে। আমরা মহাসড়ক বানিয়েছি পৃথিবীর সর্বোচ্চ খরচে, কিন্তু সেখানে অর্ধকোটি বেকারের জন্যে জায়গা রাখার প্রয়োজন মনে করিনি। গণমাধ্যম, সরকার, পুলিশ, আইন আদালত, নিজেদের শ্রমে ঘামে তৈরী হওয়া গরিবের এই শিল্পকে চরম লাঞ্চিত করেছে, অথচ বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরীতে সরকার যে ব্যর্থ, সেটা নিয়ে টু শব্দ করেনি।

আমাদের কর্মসংস্থান আর ঠিক কবে কিভাবে তৈরী হবে? চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হবে? আমেরিকা রোবট বানাবে, আর আমাদের এখানে আপনাআপনি আন্তর্জাতিক মানের প্রোগ্রামার তৈরী হয়ে যাবে? লাখে লাখে অর্ডার আসবে? প্রোগ্রামার যে তৈরী হবে, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা থেকে ঝরে পড়া তরুণ আর গার্মেন্টস থেকে ছাঁটাই হওয়া তরুণকেও কি ঘাড়ে ধরে প্রোগ্রামারই বানানো হবে? অভাবের তাড়নায় পড়ালেখা শেষ করতে না পারা সাভারের নাজমুলের মতো এই দেশের কয়েক কোটি স্বল্প শিক্ষিত তরুনের জন্যে নূন্যতম কোনো পরিকল্পনা আছে এই রাষ্টের? নাজমুলের মতো একজন খেটে খাওয়া অটোরিকশাচালকের আত্মহত্যা কি আদৌ কাউকে লজ্জিত করে?

কৃতজ্ঞতা: প্রকৌশলী Imran Habib Rumon ভাই, প্রকৌশলী Debasish Sarker, আরমান হোসাইন , Ruhul Amin ভাই, ও গাজীপুরের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের অটোরিকশা চালক ভাইরা

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ