অখণ্ড বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ৭:৪৭ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২২

অখণ্ড বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

জহির-উল-ইসলাম |

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে সর্বজনবিদিত। তবে একথা সত্য, ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর (১৯ অগ্রহায়ণ, ১৩৩৬) কলকাতা অ্যালবার্ট হলে সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে কবিকে সংবর্ধিত করে প্রথম জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। নজরুল ইসলামের বয়স তখন মাত্র ত্রিশ বছর। এই অভিজাত ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে সাবেক বাংলার তৎকালীন সময়ের হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের উজ্জ্বল উপস্থিতি নজর কাড়ার মতো। এমন নজিরবিহীন ঘটনা বাংলার মাটিতে আর কারো ক্ষেত্রে ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। নজরুল চর্চায় কবি জীবনের নানান দিক উঠে আসলেও তাঁর জীবনের এই বিশেষ ঘটনাকে নিয়ে সামান্যতম আলোচনা খুব একটা চোখে পড়ে না। এটা বড় বেদনার কথা।

কাজী নজরুল ইসলামের দুরন্ত প্রতিভা বিকাশে ‘সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের অনন্য অবদান অনস্বীকার্য। এই সওগাতেই প্রথম মুদ্রিত গল্প ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ (জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৬) প্রকাশের মধ্যে দিয়ে নজরুলের সাহিত্য জগতে যাত্রা শুরু হয়। মজার ব্যাপার হল, ‘মুক্তি’ শিরোনামের একটি কবিতা ত্রৈমাসিক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রকাশিত হলেও মাসিক পত্রিকা হিসেবে সওগাতে নজরুলের প্রথম ব্যঙ্গ কবিতা ‘কবিতা সমাধি’ (আশ্বিন, ১৩২৬) প্রকাশিত হয়। এছাড়াও তাঁর প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘তুর্কি মহিলার ঘোমটা খোলা’ (কার্তিক, ১৩২৬) এবং প্রথম প্রকাশিত একটি উদ্দীপনামূলক গান ‘উদ্বোধন’ (বৈশাখ, ১৩২৭) এই সওগাতেই ছাপা হয়।১ আবার এই সওগাতেই অসুস্থ হবার আগে ১৯৪২ সালে নজরুলের লেখা সর্বশেষ কবিতা ‘কবির মুক্তি’ও ছাপা হয়েছিল।২

উল্লেখ্য, মাসিক সওগাত ছাড়াও ১৯২৮ সালে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সওগাতে নজরুলের অগণন লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। শুধু তাই নয়, সমকালীন সময়ের অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তি নজরুলকে নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি শুরু করেন এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাটিতে। ঐ সময়ে সাপ্তাহিক সওগাতের পক্ষ থেকে সওগাত অফিসে বসে অবিভক্ত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রথম দাবিদার কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জাতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়। এ সংক্রান্ত এক তথ্যে বিশিষ্ট ইতিহাস-বেত্তা খাজিম আহমেদ লিখেছেন, ‘আহ্বানকারীদের মধ্যে এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সৈয়দ বদরুদ্দোজা, জলধর সেন, দীলিপ কুমার রায়, দীনেশ রঞ্জন দাশ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, এস ওয়াজেদ আলি, আসাদুজ্জামান, ডা: আর আহমদ, সৈয়দ জালাল উদ্দিন প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।’৩
এমন একটা যৌক্তিক প্রস্তাবকে সমর্থন করেন সেসময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনসমূহ। এর স্বপক্ষে পত্র-পত্রিকায় উঠে আসে তাঁদের অভিমত। সওগাত, ৩০ কার্তিক, ১৩৩৫ সংখ্যায় ‘অনলপ্রবাহে’র কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী লিখলেন,
“স্নেহাস্পদ নজরুলের সংবর্ধনা প্রস্তাবে সুখী হইলাম। আমি সর্ব প্রথমেই তাঁহাকে ৬ বৎসর পূর্বে প্রীতি সম্ভাষণ জানাইয়া কিছু অর্থোপহার প্রেরণ করিয়াছিলাম। এবারে সারা বাংলা তাঁহাকে সংবর্ধনা করিতেছে, ইহাতে আমার কত আনন্দ। আমি অসুস্থ এবং বহু ছাত্র এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সাহায্যের জন্য অনেক ঋণগ্রস্ত হইয়াছি। বড় দুঃখ, আজ যদি টাকা থাকিত, তাহা হইলে কবিকে স্বর্ণ মুকুটে সাজাইয়া আনন্দ লাভ করিতাম। আমার পূর্ণ সহানুভূতি জানিবেন। এ বিষয়ে আমি যতটুকু পারি, চেষ্টা করিব।”৪

ঐ সংখ্যা সওগাতে নজরুলের বাল্যবন্ধু আবদুল ওহাব লিখলেন,
“ছোট বেলায় নজরুল ইসলামের সাথে এক শ্রেণীতে পড়িতাম। সেই সময় একদিন রাণীগঞ্জ শহরে এক ছোট্ট কুটিরে বসিয়া ভাঙা একটা টিনের বাক্স হইতে তাঁর একটি কবিতা আমাকে পড়িয়া শুনায়। তখন তাঁর লেখার শৈশব অবস্থা। … কিন্তু সেই সময়েই তাঁর দিকে চাহিয়া বলিয়াছিলাম—বন্ধু! একদিন তুমি বাংলার কাব্য সাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিবে। আজ আমার সে কথা পূর্ণ হইতে চলিয়াছে এ জন্য আমি মনে মনে গর্বানুভব করি। এইজন্য সমগ্র বাঙ্গালার পক্ষ হইতে তাঁহাকে সংবর্ধনা দিবার আয়োজন হইতেছে দেখিয়া আমি এত আনন্দিত হইয়াছি যে তাহা প্রকাশ করিবার ভাষা খুঁজিয়া পাইতেছি না। … এই আয়োজনকে সাফল্যমণ্ডিত করিবার অনুকূলে আমি কি সাহায্য করিতে পারি জানাইবেন। ছাপা হইয়া থাকিলে অভ্যর্থনা সমিতির মেম্বার সংগ্রহের জন্য ২০০ শত টিকেট পাঠাইবেন।”৫

এদিকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘জাগরণ’ নামক একটি পত্রিকায় এই শুভ প্রচেষ্টার স্বার্থকতা কামনা করে লেখা হল,
“দুই বৎসর পূর্বে কথিকা লেখক মৌলবী আবুল ফজল, সুসাহিত্যিক মৌলবী আনোয়ার হুসেন, কিশোর কবি আবদুল কাদের, ‘অভিযান’ সম্পাদক মোহাম্মদ কাসেম প্রমুখ তরুণেরা কাজি সাহেবকে সংবর্ধনা দিবার জন্য যে বিপুল প্রচেষ্টা করিয়াছিলেন, তাহা সেদিন এত আয়োজন সত্ত্বেও অসুস্থতা নিবন্ধন কবিরাজ অনুপস্থিতির দরুণ হইতে পারে নাই। তজ্জন্য ঢাকার তরুণদের আর আজ দুঃখ নাই। তাঁহাদের আন্তরিক কামনা—এ প্রচেষ্টা সার্থক হউক, সুন্দর হউক।”৬

সূদুর চট্টগ্রামেও এর ঢেউ আছড়ে পড়ল। সেখানকার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্ররা একটা জরুরি সভার আয়োজন করে। এই সভায় যেসব প্রস্তাব অনুমোদিত হয় তার মধ্যে অন্যতম একটা প্রস্তাব হলঃ
সূদুর চট্টগ্রামেও এর ঢেউ আছড়ে পড়ল। সেখানকার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্ররা একটা জরুরি সভার আয়োজন করে। এই সভায় যেসব প্রস্তাব অনুমোদিত হয় তার মধ্যে অন্যতম একটা প্রস্তাব হলঃ

“গত ১৯২৬ সনে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সমস্ত চট্টগ্রামের পক্ষ হইতে সংবর্ধনা দেওয়া হইয়াছিল। আজ সারা বাংলার পক্ষ হইতে তাঁহাকে অভ্যর্থনা দেওয়ার প্রস্তাব শুনিয়া এই সভা আন্তরিক আনন্দ প্রকাশ করিতেছে।”৭

শুধু মুসলমানেরা নয়, এমন খবর চাউর হবার সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন হিন্দু সমাজের বহু বিদ্বজ্জনের অন্তরাত্মাও পুলকিত হয়ে ওঠে। ৬ পৌষ, ১৩৩৫ সওগাতে প্রকাশিত এক চিঠিতে আশুতোষ নারায়ণ চৌধুরী লিখলেন,
“আপনারা নজরুল সংবর্ধনার আয়োজন করছেন, নজরুল কেবল আপনাদের নয়, আমাদেরও। নজরুলকে আজ নানা জনে নানা ভাবে লাঞ্ছিত করছেন, কেহ ছাপার কালিতে, কেহ চিঠি দিয়ে, কেহবা ষষ্ঠি ও ফতোয়া প্রহারে। সংবর্ধনা হবে এই সব লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে মূর্তিমান বিদ্রোহ। … চট্টল তরুণ সমাজ ও চট্টল নাট্য সমাজ তাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে কবি প্রশস্তিতে যোগ দেবে।”৮

নজরুলকে সংবর্ধনা প্রদানের লক্ষ্যে ‘নজরুল সংবর্ধনা’ নামক একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠিত হয়। এই সমিতির এক সভায় কবিকে সংবর্ধনা প্রদানের স্বপক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন, সৈয়দ জালালুদ্দীন হাশেমী ও কৃষ্ণনগরের ফজলুর রহমান। সর্বসম্মতিক্রমে নজরুল ইসলামকে জাতীয় সংবর্ধনা প্রদানের প্রস্তাব গৃহীত হবার পাশাপাশি ব্যারিস্টার এস. ওয়াজেদ আলিকে এই কমিটির সভাপতি এবং ‘সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও ‘কল্লোল’ সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাসকে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।৯
অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত ১৫ ডিসেম্বর, ১৯২৯ সাল, কলকাতা অ্যালবার্ট হলে বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় সেই ঐতিহাসিক সংবর্ধনা সভা। উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে শিল্পী উমাপদ ভট্টাচার্যের কণ্ঠে নজরুলের ‘চল্ চল্ চল্’ পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সমস্ত বাঙালী জাতির পক্ষ থেকে সেদিনের সেই সম্বর্ধনার অভিনন্দন পত্রটি রচনা ও পাঠ করেছিলেন ব্যারিস্টার এস. ওয়াজেদ আলী। রূপার আধারে অভিনন্দন পত্রটি নজরুলের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে কবিকে সোনার দোয়াত ও কলম উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়। একজন আদর্শ বাঙালি হিসেবে নজরুলের প্রতি সেদিনের বুদ্ধিজীবীদের ঐতিহাসিক রায়টি ছিল নিম্নরূপ,
“কবি, তোমার অসাধারণ প্রতিভার অপূর্ব অবদানে বাঙালীকে চির-ঋণী করিয়াছ তুমি। আজ তাহাদের কৃতজ্ঞতাসিক্ত সশ্রদ্ধ অভিনন্দন গ্রহণ কর।

তোমার কবিতা বিচার-বিস্ময়ের ঊর্ধে—সে আপনার পথ রচনা করিয়া চলিয়াছে পাগলা-ঝোরার জলধারার মতো। সে স্রোতধারায় বাঙালী যুগ-সম্ভাবনার বিচিত্র লীলাবিম্ব দেখিয়াছে। আজ তুমি তাহাদের বিস্ময়মুগ্ধ কণ্ঠের অভিনন্দন লও।

বাঙলার সরস কাব্যকুঞ্জ তোমার প্রাণের রঙে সবুজ মহিমায় রাঙিয়া উঠিয়াছে। তাহার ছায়া বাঙালীর পলকহারা নীল নয়নে নিবিড় স্নেহ-অঞ্জন মাখাইয়া দিয়াছে। আজ তুমি তাহাদের মুগ্ধ নয়নের নির্বাক বন্দনা গ্রহণ করতুমি বাঙালীর ক্ষীণকণ্ঠে তেজ দিয়াছ; মূর্ছাতুর প্রাণে অমৃতধারা সিঞ্চন করিয়াছ! আজ অরুণ ঊষার তোরণ দ্বারে দাঁড়াইয়া তাহারা তোমার মরণজিগীষু কণ্ঠের জয়ইঙ্গিত নত মস্তকে বরণ করিতেছে; তাহাদের হাতের পতাকা তোমার মহিমার উদ্দেশ্য অবনমিত হইয়াছে। জাতির এ অভিবাদনে তুমি নয়ন-পাত কর।

তুমি বাঙলার মধুবনের শ্যাম কোয়েলার কণ্ঠে ইরানের গুলবাগিচার বুলবুলের বুলি দিয়াছ; রসালের কণ্ঠে সহকার সাথে আঙ্গুর লতিকার বাহুবন্ধন রচনা করিয়াছ। তুমি বাঙালীর শ্যাম শান্ত কণ্ঠে ইরানী সাকীর লাল শিরাজীর আবেশ বিহ্বলতা দান করিয়াছ। আজ তোমার আসন-প্রান্তে হাতের বাঁশী রাখিয়া তাহারা তোমার সম্মুখে দাঁড়াইয়াছে। তুমি তাহাদের শ্রদ্ধা-সুন্দর চিত্তনিবেদন গ্রহণ কর।
ধূলার আসনে বসিয়া মাটির মানুষের গান গাহিয়াছ তুমি। সে গান অনাগত ভবিষ্যতের। তোমার নয়ন সায়রে তাহার ছায়াপাত হইয়াছে। মানুষের ব্যথা-বিষে নীল হইয়া সে তোমার কণ্ঠে দেখা দিয়াছে। ভবিষ্যতের ঋষি তুমি, চিরঞ্জীব মনীষী তুমি, তোমাকে আজ আমাদের সবাকার নমস্কার।”১০

অনুষ্ঠানে আলোচক অতিথি হিসেবে ভাষণ দিতে গিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেনঃ

“নজরুল জীবনের নানাদিক থেকে উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। তার মধ্যে একটা আমি উল্লেখ করবো। কবি নজরুল যুদ্ধের ঘটনা দিয়ে কবিতা লিখেছেন। কবি নিজে বন্ধুক ঘাড়ে করে যুদ্ধ করেছিলেন, কাজেই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সব কথা লিখেছেন তিনি। আমাদের দেশে ঐরূপ ঘটনা কম, অন্য স্বাধীন দেশে খুব বেশি। এতেই বোঝা যায় যে, নজরুল একটা জ্যান্ত মানুষ। … নজরুল যে জেলে গিয়েছিলেন, তার প্রমাণ তাঁর লেখার মধ্যে অনেক স্থানে পাওয়া যায়। এতেও বোঝা যায় যে তিনি একটি জ্যান্ত মানুষ। তাঁর লেখার প্রভাব অসাধারণ! তাঁর গান পড়ে
আমার মতো বেরসিক লোকেরও জেলে বসে গাইবার ইচ্ছা হতো। … আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাবো— তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাবো, তখনও তাঁর গান গাইবো।

আমি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সর্বদাই ঘুরে বেড়ায়। প্রাদেশিক ভাষায় জাতীয় সংগীত শুনবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো প্রাণ-মাতানো গান কোথাও শুনেছি বলে মনে হয় না।

কবি নজরুল যে স্বপ্ন দেখেছেন, সেটা শুধু তাঁর নিজের স্বপ্ন নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির স্বপ্ন।”১১

রায় বাহাদুর জলধর সেনের বক্তব্য এবং শিল্পী নলিনীকান্ত সরকার ও গোপালচন্দ্র সেনগুপ্তের পরিবেশিত সংগীত উপস্থিত সুধিবৃন্দের সপ্রশংস মনোযোগ আকর্ষণ করে। অপরদিকে সভাপতির বক্তব্যে প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেনঃ

“আধুনিক সাহিত্যে মাত্র দু’জন কবির মধ্যে আমরা সত্যিকার মৌলিকতার সন্ধান পাইয়াছি। তাঁহারা সত্যেন্দ্রনাথ ও নজরুল।

নজরুল কবি—প্রতিভাবান মৌলিক কবি। … আজ আমি এই ভাবিয়া বিপুল আনন্দ লাভ করিতেছি যে, নজরুল ইসলাম শুধু মুসলমান কবি নন, তিনি বাংলার কবি, বাঙালির কবি। কবি মাইকেল মধুসূদন খ্রিস্টান ছিলেন কিন্তু বাঙালি জাতি তাঁহাকে শুধু বাঙালি রূপেই পাইয়াছিলো। আজ নজরুল ইসলামকেও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে শ্রদ্ধা নিবেদন করিতেছেন। কবিরা সাধারণত কোমল ও ভীরু, কিন্তু নজরুল তা নন। কারাগারে শৃঙ্খল পরিয়া বুকের রক্ত দিয়া তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহা বাঙালি প্রাণে এক নতুন স্পন্দন জাগাইয়া তুলিয়াছে।”১২ তিনি সেদিন সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ একটা কথা বলে ছিলেন যা আজ পর্যন্ত আর কারো মুখে উচ্চারিত হতে শুনিনিঃ “… আমার বিশ্বাস, নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমাদের ভাবী বংশধরেরা এক একটি অতিমানুষে পরিণত হইবে।”১৩

সেদিন সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু কাজী নজরুল ইসলাম “টলমল টলমল পদভরে” এবং “দুর্গম গিরি কান্তার মরু” সংগীতদ্বয় পরিবেশন করেন। সেই সঙ্গে সংবর্ধনার উত্তরে ‘প্রতিভাষণ’ প্রদান করেন। তিনি তাঁর ‘প্রতিভাষণ’-এ বলেনঃ

বন্ধুগণ! আপনারা যে সওগাত আজ হাতে তুলে’ দিলেন, আমি তা ‘মাথায় তুলে’ নিলুম। আমার সকল তনু-মন-প্রাণ আজ বীণার মত বেজে উঠছে। তাতে শুধু একটীমাত্র সুর ধ্বনিত হয়ে উঠছে, আমি ধন্য হলুম, আমি ধন্য হলুম। … এত হৃদয়ের এত প্রীতি গ্রহণ করি কি দিয়ে? আমার হৃদয়-ঘট যে ভরে’ উঠলো!

… আমায় অভিনন্দিত আপনারা সেই দিনই করেছেন, যেদিন আমার লেখা আপনাদের ভালো লেগেছে। সেই ‘ভালো লেগেছে’-টাকে ভালো ক’রে বলতে পারার এই উৎসবে আমার একটীমাত্র করণীয় কাজ আছে। সে হচ্ছে সবিনয়ে সস্মিত মুখে সশ্রদ্ধ প্রতি-নমস্কার নিবেদন করা।

… কোনো অনাসৃষ্টি করতে আসিনি আমি। আমি যেখানে ঘা দিয়েছি; সেখানে ঘা খাবার প্রয়োজন অনেক আগে থেকেই তৈরী হয়েছিল।

… বিংশ-শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরি অভিযান-সেনাদলের তূর্য্য-বাদকের একজন আমি—এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

… আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি ব’লেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। সুন্দরের ধ্যান, তার স্তবগানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম্ম। যে কূলে, যে সমাজে, যে ধর্ম্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি ব’লেই কবি।

… কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি, ও-দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।

… আমি ধন্য করতে আসিনি, ধন্য হতে এসেছি আজ। আপনাদের আজ অজস্র ধন্যবাদ।”১৪

উল্লেখ্য, অ্যালবার্ট হলে নজরুলকে জাতিরজাতির পক্ষ থেকে সম্বর্ধনা প্রদান ও জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করার সংবাদ ‘মাসিক সওগাত’ ও ‘সাপ্তাহিক সওগাত’-এর দুটি বিশেষ সংখ্যায় যথেষ্ট মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরা হয়।

সুতরাং একথা দাবি করা যায় আশির দশকে নজরুলকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেবার বহু পূর্বেই তাঁকে অবিভক্ত বাংলায় বাঙালির জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করা হয়েছিল। যার নেপথ্যে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তথ্যসূত্রঃ

১. মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, সওগাত-যুগে নজরুল ইসলাম, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃঃ-১৯-২০। দেখুনঃ নজরুল ও নাসিরউদ্দীন স্মারক-গ্রন্থ, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২১ মে, ১৯৯৫, পৃঃ-১০৫, ১০৬।

২. মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, নজরুলঃ এক অম্লান

নজরুল ও নাসিরউদ্দীন স্মারক-গ্রন্থ, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২১ মে, ১৯৯৫, পৃঃ-১৩০।

৩. খাজিম আহমেদ, সৈয়দ বদরুদ্দোজা : এক বিস্মৃয়মান যোদ্ধা, উদার আকাশ, ঈদ-শারদ উৎসব সংখ্যা, ১৪২৭, ঘটকপুকুর, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পৃঃ-৩৩।

৪. রফিকুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, নজরুল ও নাসিরউদ্দীন স্মারক-গ্রন্থ, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা, ২১ মে, ১৯৯৫, পৃঃ-৮২, ৮৩।

৫. প্রাগুক্ত, পৃঃ-৮৩।

৬. প্রাগুক্ত, পৃঃ-৮৩।

৭. প্রাগুক্ত, পৃঃ-৮৬।

৮. প্রাগুক্ত, পৃঃ-৮৭।

৯. প্রাগুক্ত, পৃঃ-৮৯।

১০. শাহাবুদ্দীন আহমদ, লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাক নুড়ি, প্রীতি প্রকাশন, ঢাকা-১২১৭, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃঃ-৬৩।

১১. সুভাষচন্দ্র বসু, নজরুল একটি জ্যান্ত মানুষ, কাজী নজরুল ইসলাম জন্মশতবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থ, সম্পাদনঃ আবদুল মান্নান সৈয়দ, এ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা-১০০০, ফেব্রুয়ারি ২০০১, পৃঃ-৫৪।

১২. প্রফুল্লচন্দ্র রায়, বাঙালির কবি নজরুল, প্রাগুক্ত, পৃঃ-৫৩।

১৩. শাহাবুদ্দীন আহমদ, লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাক নুড়ি, প্রীতি প্রকাশন, ঢাকা-১২১৭, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃঃ-৬৫।

১৪. আবদুল আজীজ আল্-আমান, নজরুল রচনা-সম্ভার, ৩য় খণ্ড, হরফ প্রকাশনী, কলকাতা-৭, ২৫ মে, ১৯৮১, পৃঃ-৩৬৪-৩৬৬।

(প্রায় এক শতক আগে, ১৫ ডিসেম্বর ১৯২৯ নজরুলকে অ্যালবার্ট হলে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার কথা আজকের প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সামান্যতম চেষ্টা করা হয়েছে এই নিবন্ধটিতে।)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ