রাজা রামমোহন রায় : আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার অগ্রদূত

প্রকাশিত: ৬:২৪ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০২২

রাজা রামমোহন রায় : আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার অগ্রদূত

ঋতুপর্ণা প্যান |

রাজা রামমোহন রায় আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার অগ্রদূত।
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর রাজনৈতিক আবর্তে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল এবং নানা কুসংস্কারের চাপে সমাজের স্বাভাবিক ধারা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে পাশ্চাত্য শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সংস্পর্শে এসে বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে পুনরায় যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়, তাকেই বাংলার নবজাগরণ বলা হয়। পঞ্চদশ শতাব্দিতে ইটালিতে যে নবজাগরণ হয় তা যেমন কালে কালে সমগ্র ইউরোপে পরিব্যাপ্ত হয়েছিল বাংলার নবজাগরণ তেমনি ক্রমে ক্রমে সমগ্র ভারতভূমিকে প্লাবিত করেছিল।

পেত্রার্ক ও বোকাচ্চিও যেমন ইটালির নবজাগরণের অগ্রদূত ছিলেন তেমনি পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত রাজা রামমোহন রায় ছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত।

ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের আদি ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, যেসব মানুষ সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমাজে যে যে ধরনের পরিবর্তন এনেছেন, তাদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়ের নাম থাকবে সবার উপরে। এর কারণ হচ্ছে আঠারো এবং উনিশ শতকে বাংলার মাটিতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা – এসব ক্ষেত্রে যে যে পরিবর্তন এসেছে তার জন্য পুরো কৃতিত্ব রাজা রামমোহন রায়ের। তার সাথে আরও অনেকেই সে সময় কাজ করেছেন। কিন্তু শুরুটা করে দিয়েছিলেন তিনিই। আজকে আমরা বাংলায় যে সমাজ দেখি, শিক্ষার দিক দিয়ে যে পরিবর্তনের ধারা দেখি, তার বীজ বপন করে দিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তার অবদান আরও বেশি করে মনে রাখার মতো এবং গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সে সময় ইংরেজদের আধিপত্য ছিল বেশি। তাদের নির্দেশেই সকল কাজ হতো। এরকম সময়ে বাঙালি হয়ে নিজের মতাদর্শ প্রকাশ করা এবং প্রচার করা অত্যন্ত সাহসিকতার কাজ ছিল নিঃসন্দেহে।

পলাশীর যুদ্ধের পনেরো বছর পরে বাংলার রাধানগরে ১৭৭২ সালের ২২ মে রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম। একটি সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কাজ করে ইচ্ছা করলে তিনি আভিজাত্যপূর্ণ জীবন অতিবাহিত করতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে তিনি বাংলার বাইরে বের হয়েছেন। বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন, সেসব দেশের সংস্কৃতি, সামাজিকতা ও রাজনীতির সংস্পর্শে এসেছেন। নিজ দেশের বাংলা, ইংরেজি কিংবা হিন্দি ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি অন্য দেশের মানুষের সাথে নিজেকে যুক্ত করার জন্য ফার্সি, আরবি, হিব্রু ও গ্রিক ভাষা শিখেছেন। নিজের দেশের সাহিত্যের পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতি এবং তাদের সৃষ্ট সাহিত্য আয়ত্ত করেছিলেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, পৃথিবীর পূর্ব দিকে অবস্থিত অন্যান্য দেশের সাহিত্যকর্ম নিয়েও তার অগাধ জ্ঞান ছিল। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার পড়াশোনা থাকার কারণে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলার বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিয়ে সমালোচনা করতে পেরেছেন এবং সেখানকার রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে নিজের ভাবনাকে প্রকাশ করতে পেরেছেন।

শোনা যায়, রামায়ণ-এর মতন মহা-গ্রন্থ তিনি একেবারে পুরোটা শেষ করে ফেলতেন। রামমোহন মোট ১০টি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন-সংস্কৃত, পারসি, আরবি, উর্দু, বাংলা, ইংরেজি, ফরাসী, ল্যাটিন, গ্রিক ও হিব্রু। এসকল ভাষার প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্যের সঙ্গেও রামমোহন পরিচিত ছিলেন।

বাঙালি রাজা রামমোহন বলতেই বোঝে সতীদাহ প্রথা রদ, বিলেত গমন, অতঃপর প্রকাণ্ড তৈলচিত্রে পাগড়ি মাথায় এক মনীষী। কিন্তু রক্তমাংসের রামমোহন ছিলেন ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন এক অনন্ত বিস্ময়ের আধার। আদ্যোপান্ত গতিময় এক মানুষ ছিলেন তিনি। আজকের বাঙালি জীবনে তাঁকে সত্যিই এক কল্পিত চরিত্রের মতো মনে হয়। রোজ এই মানুষটি খেতেন বারো সের দুধ, পঞ্চাশটা আম এবং একখানা গোটা পাঁঠা! এমনই ছিলেন রামমোহন। বন্ধুর জমিতে নারকেল গাছের সারি দেখে ডাব খেতে ইচ্ছে হল। বন্ধুও তক্ষুনি একটা ডাব এনে দিলেন। রামমোহ‌ন হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘ও গুরুদাস, ওতে আমার কী হবে! কাঁদিশুদ্ধু নারকেল পেড়ে ফেল।’’

ছোটবেলা থেকেই তার্কিক রামমোহন কিশোর বয়সেই হিন্দুদের পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে একটি বই লিখে বাবার বিরাগভাজন হন। ১৬ বছরের রামমোহনকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন বাবা।কোথায় গেলেন রামমোহন? সোজা তিব্বত! ভাবা যায়। সেখানে বৌদ্ধশাস্ত্রের পাঠ নিয়ে চার বছর পর ফিরে এলেন বাড়িতে। ক্রমে আত্মীয়সভা গঠন। তারপর সতীদাহ প্রথা রদ, বিলেত গমন। যাই হোক, সে গল্প তো সকলেরই জানা। একটু বরং জেনে নেওয়া যাক রামমোহনের রোজনামচা।

ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ কফি। তারপর মর্নিং ওয়াক। ফিরে এসে চা খেয়ে ব্যায়াম। তারপর বিশ্রাম ও স্নান। রোজ এক ঘণ্টা দু’জন পালোয়ান তাঁকে দলাই মলাই করতেন সরষের তেল দিয়ে। তারপর শুরু হত দৈনন্দিন কাজকর্ম। কিন্তু সময় সময় জলযোগ, ফলমূল চলতই। শরীরটা ছিল পাহাড়ের মতো।

রামমোহন বলিষ্ঠ পুরুষ ছিলেন। শরীরের দৈর্ঘ্য ছিল ছয় ফুট উচ্চ। মাথা ছিল অস্বাভাবিক বড়। এই জন্যে বিলেতের বিশেষজ্ঞগণ তাঁকে অসাধারণ পুরুষ বলত। কথিত আছে, রামমোহন প্রতিদিন ১২ সের দুধ পান করতেন। শোনা যায় একবারে একটি আস্ত পাঠার মাংস খেতে পারতেন। কলিকাতায় তিনি যখন ধর্মমত প্রচার যখন শুরু করেন তখন কিছু মানুষ তাকে একাধিকবার হত্যার পরিকল্পনা করে। এই কথা শুনে রামমোহন বললেন – “আমাকে মারবে? কলকাতার লোক আমাকে মারবে? তারা কী খায়?’’ এই কথার মধ্যদিয়ে স্পষ্ট হয়, রামমোহনের নিজের শক্তি-সামর্থ্যের উপর যথেষ্ট আস্থা রাখতেন।

জানতেন শত্রুর শেষ নেই তাঁর। তাই বুকের মধ্যে চকচকে ছোরা লুকিয়ে রাখতেন সর্বক্ষণ! এখানেই শেষ নয়। আরও একটা অস্ত্র থাকত তাঁর কাছে। দেখলে মনে হবে সাধারণ লাঠি। কিন্তু তারই আড়ালে থাকত তরোয়াল। সর্বদা এমন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকলেও কোনও রকম আশঙ্কার মেঘের ছায়া থাকত না তাঁর মুখে। এই বাগানে গিয়ে বাচ্চাদের মতো দোলনায় দুলছেন। আবার বন্ধুর বাগানে গিয়ে কাঁদিশুদ্ধ নারকেল পাড়িয়ে খেয়ে ফেলছেন।

ভাবলে অবাক লাগে। গল্পকথায় এই রকম চরিত্রের কথা শোনা যায়। তাঁকে নিয়ে কত গান। একটা গানের উদাহরণ দেওয়া যাক। সেই গানে ব্যঙ্গের তীক্ষ্ণ ফলায় তাঁকে বিঁধে বলা হল, ‘‘সুরাই মেলের কুল/ বেটার বাড়ি খানাকুল/ ওঁ তৎসৎ বলে বেটা/ বানিয়েছে ইস্কুল।’’ কিন্তু সেসব তিরে রামমোহনের কিস্যু যেত আসত না। যেমন চেহারা, তেমন দাপট। যাকে আজকের ভাষায় বলে ‘অ্যাটিচিউড’। কেউ যদি এসে বলত, কেউ বা কারা তাঁকে মারার পরিকল্পনা করছে তিনি বলতেন, ‘‘তাই নাকি? আমাকে মারবে এমন ক্ষমতা আছে তাদের?’’

ব্রিস্টলে আচমকাই মারা গিয়েছিলেন রামমোহন। কিন্তু মৃত্যুর ষাট বছর পরেও তাঁকে ঘিরে একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর শেষ জীবনের পাগড়ি বিলেত থেকে ফিরে এসেছিল কলকাতায়। তখন নাকি দেখা গিয়েছিল, সে পাগড়ি কলকাতার কোনও জোয়ান মানুষের মাথায় আঁটছে না! হয়তো এটা মিথ। কিন্তু মিথও তো এক ধরনের সত্যি। আক্ষরিকতায় না হোক, অনুভবে।

রামমোহনের পাগড়ি আজও বাঙালির কাছে অনতিক্রম্যই রয়ে গিয়েছে। উপাধি কেবল নয়, সত্যিই তিনি ছিলেন রাজা। মেনে চলতেন এই আপ্তবাক্য – ‘লিভ লাইফ কিং সাইজ।’

রামমোহন রায় অবিরামভাবে সারা জীবন সামাজিক কিছু রীতিনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে জাত বা সমাজের স্তরবিন্যাস ও জাতি বিদ্বেষ এবং আরেকটি সতীদাহ প্রথা। তার সময়ে এই দুই রীতির প্রভাবে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং চেতনাবোধের অভাব দেখা দেয়। শক্ত হাতে তিনি তা দমন করেন।

রাজা রামমোহন রায় নিজেকে শুধু শিক্ষিত করে তোলেননি, বরং সমাজের অন্যান্য মানুষও যেন সঠিক শিক্ষার আলো পায় সেজন্য তিনি আধুনিক বাংলা ভাষায় সংস্কৃত উপনিষদগুলোকে অনুবাদ করেছিলেন। এই কাজটি তিনি করেছিলেন সমাজের মানুষদের কুসংস্কার এবং সামাজিক কিছু নিষ্ঠুর রীতিনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য। তখন সমাজের একটু নিম্ন শ্রেণির মানুষদের খুব সহজেই শিক্ষিত কেউ উপনিষদের কথা বলে প্রভাবিত করতে পারতো। যেহেতু এগুলো সংস্কৃতে লেখা ছিল, তাই অনেকেই তা পড়তে পারতো না। যাতে সবাই নিজেদের পরিচিত ভাষায় পড়াশোনা করতে পারে, সেজন্য তিনি এই কাজটি করেছিলেন। সমাজ সংস্কারে তার চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।

তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বাইরের দেশে ভ্রমণ এবং সেখানে যা কাজ হচ্ছে, সেগুলোর সাথে বাংলার মানুষদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। তিনি জানতেন যে, শিক্ষা ছাড়া এই দেশের মানুষ কখনও উন্নতি করতে পারবে না। আবার উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তাদের মতো করে ভাবতে হবে, তাদের কাজগুলো বুঝতে হবে, তাদের সংস্কৃতির সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে হবে। রাজা রামমোহন রায়ের পশ্চিমা দেশের সংস্কৃতি নিয়ে এবং তাদের সেখানে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া জ্ঞান নিয়ে আমূল আগ্রহ ছিল।

রাজা রামমোহন রায়ের আবির্ভাবের সময় থেকে বাংলা তথা ভারতে নবজাগরণের সূত্রপাত হয়। বেদ, বাইবেল, কোরান, পুরাণ, উপনিষদ, গীতা, ভাগবত, জেন্দাবেস্তা, ত্রিপিটক ইত্যাদি সকল ধর্মশাস্ত্র গভীর মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়নের পর তিনি এই সত্যে উপনীত হয়েছিলেন যে সকল ধর্মই মূলত এক। একই ঈশ্বরে বিশ্বাস সকল ধর্মের মূল কথা। সামাজিক ও ধর্মীয় আচার আচরণ ও বাধা নিষেধের কোনো মূল্য নেই । রাজা রামমোহন রায় হিন্দুধর্মকে সংস্কারমুক্ত করার জন্য তিনি ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথমে ‘আত্মীয় সভা’ গঠন করেন। ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে তিনি একে ‘ব্রাহ্মসভা’য় পরিণত করেন। ১৮২৮ এটি আবার ‘ব্রাহ্মসমাজ’ নামে পরিচিত হয়। ব্রাহ্মসভার মূল বক্তব্য ছিল, ঈশ্বর এক ও অভিন্ন, সকল ধর্মের মূল কথা এক । তিনি মনে করেছিলেন ব্রাহ্ম আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয়গণের মধ্যে ধর্মগত ভেদাভেদ দূর হবে ।

তার সময়ে বিজ্ঞানে চলছিল নিউটন পরবর্তী যুগ এবং শিল্প-কারখানা সৃষ্টির একটি রেনেসাঁ যুগ। তখন পশ্চিমারা নিজেদেরকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত করার চেষ্টা করছে। রাজা রামমোহন রায়ের মনে হয়েছিল, পশ্চিমে বিশেষ করে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানে যা হচ্ছে, তা কখনোই ফেলে দেয়ার মতো না এবং এসবকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। এজন্য তিনি দেশে ফিরে নিজেদের পড়াশোনার মধ্যে ইংরেজি ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার উপর জোর দেন এবং সমাজের মানুষদেরকে বোঝান যে নিজেদের দেশকে উন্নতির শিখরে নিতে হলে অবশ্যই সংস্কৃত ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাটাও রপ্ত করতে হবে। সে সময়ের চিত্র যদি আমরা এখন পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক দিয়ে বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশ এবং ইউরোপের মধ্যে সেসময় কী পরিমাণ পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছিলো, যেটা তখন রামমোহন রায় বুঝতে পেরেছিলেন।

নিউটনের সময়ে ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে উন্নতি সাধন হয়, সেটার পেছনে সেই দেশের অভিজাত শ্রেণির মানুষদেরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। রয়্যাল সোসাইটি এবং এর মতো আরও কিছু প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারকে প্রচার করেছিলো এবং বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো। অন্যদিকে বাংলার মাটিতে এমন কাজ করার কেউ ছিল না। ইংরেজদেরও একধরনের অনিচ্ছা ছিল এই দেশের মানুষদের উন্নত করার প্রতি। এখানকার মানুষদের খাটিয়ে নিয়ে তারা নিজেদের দেশের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি করছিলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানে ক্রমেই যে দুই দেশের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, রামমোহন রায় তা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই যখন ইংরেজরা কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ তৈরি করার কথা বলে, তখন তিনি প্রচণ্ডভাবে সেটার বিরোধিতা করেন। সেখানে তিনি প্রস্তাব করেন শুধু সংস্কৃতি নয়, সেখানে বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, ভূগোল এসব বিষয়ও পড়াতে হবে। তার ধারণা ছিল পশ্চিমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবং তাদের নিত্য-নতুন আবিষ্কার এবং ধারণাগুলোকে বুঝতে হলে উপমহাদেশ তথা বাংলার ছেলেমেয়েদেরকেও এসব বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান দিতে হবে, যাতে তারা নিজ দেশকে উন্নত করতে পারে এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর সাথে যেন প্রতিযোগিতা করতে পারে। তার এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ধারণা আমাদের দেশের সমাজে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছিলো।

বাংলা গদ্য সাহিত্যে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি ধর্ম সংস্কারর জন্য যে সকল গ্রন্থ রচনা করেছিলেন সেগুলি বাংলা গদ্যের বিকাশে সহায়ক হয়েছিল। তিনি ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ নামে একটি ব্যাকরণও রচনা করেন । তাঁর পূর্বে বাংলা ভাষায় দর্শন, সাহিত্য, ধর্ম, ইতিহাস নিয়ে কোনও গ্রন্থাদি রচিত হয় নি।

সংবাদপত্রের উপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে ভারতবাসীকে স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার দেবার দাবি জানিয়ে ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের ‘প্রেস রেগুলেশন’ এর প্রতিবাদ জানিয়ে রাজা রামমোহন রায় সুপ্রীম কোর্টে দরখাস্ত পেশ করেছিলেন। ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দের বৈষম্যমূলক ‘জুরি আইন’ বন্ধ করার জন্য এবং কৃষকদের ওপর করের বোঝা কমাবার জন্য রাজা রামমোহন রায় বহু চেষ্টা করেন।

নারীরা যাতে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে তার জন্য বিষয় সম্পত্তিতে নারীদের উত্তরাধিকারের দাবি প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারেও রামমোহন রায়ের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। যদিও নারীশিক্ষা বিস্তারে তাঁর আগ্রহের অভাব কিছুটা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

রাজা রামমোহন রায় বিশ্বাস করতেন যে, পাশ্চাত্য শিক্ষার দ্বারাই ভারতীয়দের উন্নতি সম্ভব হবে । তাই যাতে ভারতে রসায়ন শাস্ত্র, শারীরবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয় তার জন্য তিনি লর্ড আমহার্স্টকে পত্র লিখেছিলেন । কিন্তু তাঁর দাবি উপেক্ষিত হয়। সরকার কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে দূরদর্শী রাজা রামমোহন রায় , রাজা রাধাকান্ত দেব, ভূকৈলাসের জয়নারায়াণ ঘোষাল ও মহাপ্রাণ ডেভিড হেয়ারের সহযোগিতায় ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ২০ জানুয়ারী হিন্দু কলেজ (পরবর্তী কালে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও বর্তমানে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি নামে পরিচিত) স্থাপন করেন। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে চার্টার আইন অনুযায়ী যে এক লক্ষ টাকা পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য ব্যয় করার সিদ্ধান্ত হয়, তার পিছনেও রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্ডার ডাফকে জেনারেল অ্যাসেম্বলী ইনষ্টিটিউশন বা স্কটিশ চার্চ কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন।

রামমোহন ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সপ্তাহে একদিন এই আত্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হত। সেখানে বেদান্ত অনুযায়ী এক ব্রহ্মের উপাসনা এবং পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হত। সভায় বেদপাঠের পর ব্রাহ্মসঙ্গীত গাওয়া হত। সভা সকলের জন্যে উন্মুক্ত ছিল না, কেবলমাত্র রামমোহনের কয়েক জন বন্ধু তাতে যোগদান করতেন। সে-সময় নিন্দুকেরা আত্মীয় সভার বিরুদ্ধে গুজব রটাল যে, আত্মীয় সভায় লুকিয়ে লুকিয়ে গো মাংস খাওয়া হয়। ব্যাস! রামমোহনের অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু একথা শুনে রামমোহনকে ত্যাগ করল। রামমোহন নির্বিকার।

রামমোহনের পিতা রমাকান্ত রায় ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিশোর বয়সেই রামমোহনের মাছ খাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রবল ঝগড়া বাধে বাবা-মায়ের সঙ্গে। তার উপর তাঁর আরবি শিক্ষা, কোরান পড়া, সুফিবাদী বইপত্র অধ্যয়ন ইত্যাদি কর্মকাণ্ড একেবারেই মেনে নিতে পারেননি রমাকান্ত। কিন্তু সমস্যা আর তীব্র হয় যখন ষোল বছর বয়সে রামমোহন তৎকালীন হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিক প্রথার সমালোচনা করে একটি বই লিখে ফেলেন। নাম দেন ‘হিন্দুদের পৌত্তলিক ধর্মপ্রণালী’। ছেলের উপর রেগে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আর সম্পর্কই রাখতে চাইলেন না রমাকান্ত। সারা পরিবারের কাছে রামমোহন তখন চোখের বিষ। বিরক্ত রামমোহন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বেশ কিছু দিন তিব্বতে থাকার পর বাবাই তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিতে আসেন।

পৌত্তলিকার বিরোধিতা করার জন্য তারিণী দেবীও ছেলেকে কোনও দিনই মেনে নিতে পারেননি। তার উপর রামমোহনের দাদার ছেলে গোবিন্দপ্রসাদ কাকার বিরুদ্ধে তারিণী দেবীর কানে ক্রমাগত ইন্ধন যুগিয়ে যান। বাবা-ছেলের সম্পর্ক এমনিতেই নড়বড়ে, স্বামীকে বুঝিয়ে ছেলেকে আরও দূরে করে দেন তারিণী দেবী। পরিবারের সকলের সাথে মানিয়ে চলা অসম্ভব বিবেচনা করে রামমোহন আবার বাসভবন ত্যাগ করে রাধানগর থেকে কিছু দূরে লাঙলপাড়া নামক এক জায়গায় বসবার আরম্ভ করলেন।

পরবর্তীকালে ঢাকায় থাকাকালীন আচমকা রামমোহনের কাছে পিতার মৃত্যুর খবর আসে। ম্লেচ্ছ ছেলের টাকা নেবেন না ঠিক করে নিজের গয়না বন্ধক রেখে তারিণী দেবী স্বামীর শ্রাদ্ধ করেন। এ বার আসে সম্পত্তির অধিকারের পালা। ছেলে রামমোহনকে বাপের সম্পত্তির এক কণাও দেওয়ার ইচ্ছে নেই মায়ের। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও তারিণী দেবীর সঙ্গে সহমত।

কিন্তু রামমোহনও ছেড়ে দেবার পাত্র নন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি বার বার লড়াই চালিয়েছেন। আর এ বার তো অন্যায় তাঁর সঙ্গেই হচ্ছে। মায়ের সঙ্গে বাধল বিবাদ। তারিণী দেবী তাঁর নাতি গোবিন্দপ্রসাদকে সঙ্গে নিয়ে কোর্টে রামমোহনের বিরুদ্ধে মামলা করে বসলেন। রামমোহন কিন্তু প্রথমে মায়ের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে চাইলেন না। পরে অবশ্য ঠিক করলেন মামলা লড়বেন। কারণ এ লড়াইটাও তাঁর মায়ের বিরুদ্ধে নয়, লড়াইটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এখন তিনি মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে মামলাটা যদি না লড়েন, তা হলে তাঁর আন্দোলন সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হবে।

শুরু হল মামলা। ছেলের উপর বিতৃষ্ণা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোর্টে বিচারের সময় তারিণী দেবী বলে উঠলেন – ‘ধর্মত্যাগী পুত্রের মস্তক যদি এখানে ছিন্ন করা হয় তা হলে তা আমি অত্যন্ত পুণ্য কাজ বলে মনে করব।’ যা-ই হোক, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মামলায় রামমোহনেরই জয় হল। পেলেন পৈতৃক সম্পত্তিও। কিন্তু তিনি তাঁর প্রাপ্ত সম্পত্তি নিজের কাছে রাখলেন না। সমস্ত কিছু সসম্মানে ফিরিয়ে দিলেন মা’কে। হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিলেন, তিনি আসলে সম্পত্তির লোভে মামলা লড়ছিলেন না। লড়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

তিনি আড়াইশো বছরের পুরনো, তবু তাঁর আধুনিকতা হয়তো আমাদের এ-যুগের নানা সংস্কার, প্রাইড অ‌্যান্ড প্রেজুডিস-কে আড়াইশো বছর পিছনে ফেলেই এগিয়ে আছে! চারধারে তাকিয়ে দেখুন তাঁর মতো একজনও বাঙালি চোখে পড়ছে কিনা, যে বাঙালি বারো বছর বয়সের মধ্যে মুসলমান সংস্কৃতির কেন্দ্র পাটনায় গিয়ে মৌলবিদের কাছে আরবি আর ফারসি শিখে, আরবি ভাষায় ইউক্লিডের জ‌্যামিতি ও সংখ‌্যা-দর্শন পড়ছে, পড়ছে অ‌্যারিস্টটলের এথিকস। তার আগে অবশ‌্য সেই বালক যথেষ্ট সংস্কৃত চর্চা করেছে বাংলার মহাপণ্ডিতদের কাছে।

এরপর কিশোর রামমোহন যাচ্ছেন কাশীতে হিন্দুধর্মের সন্ধানে। এবং খুঁজে পাচ্ছেন মাত্র ষোলো বছর বয়সে হিন্দুধর্মের সারসত‌্য! এবং বাবা রামকান্তকে, মা তারিণীকে জানাচ্ছেন হিন্দুধর্মের অন্তরসত‌্যটির কথা : আরবি ভাষায় পাশ্চাত‌্য দর্শন এবং সংস্কৃত ভাষায় উপনিষদ চর্চা করে এবং হিন্দু দর্শনের গভীর পাঠ নিয়ে আমি আর হিন্দুদের তেত্রিশকোটি দেবদেবীর একটিকেও মানতে পারছি না। আমি সমস্ত দেবদেবী পরিত‌্যাগ করে সেই বিশুদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞান-পিপাসু হিন্দু হয়েছি যে বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর একটিই। অর্থাৎ আমি আপোসহীন, নিরন্তর, নিখাদ একেশ্বরবাদী হিন্দু ব্রাহ্মণ (রামমোহন রায়ের পদবি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়)। এবং আমার ঈশ্বর নিরাকার। তাঁর কোনও মূর্তিতে আমি বিশ্বাস করি না। আমি সমস্ত রকম মূর্তিপূজার বিরোধী। আমার ঈশ্বর শব্দহীন, স্পর্শহীন, রূপহীন, এক অব‌্যয় নিত‌্য সত্তা। তিনি নিরন্তর দ্রষ্টা। নিরবচ্ছিন্ন স্রষ্টা। কিন্তু নন শ্রবণের বিষয়ীভূত। তিনি নিরাধার। নির্বিকার। নির্বিশেষ। তিনি সর্বদর্শী। সর্বব‌্যাপী। সকলের মধ্যে তিনিই বিনাশহীন আত্মারূপে বিরাজিত। তিনিই পরম ব্রহ্ম। এবং তিনি প্রমাণের অবিষয়। ওঁ তৎ সৎ। লিখলেন ষোলো বছরের রামমোহন। এইরকম কোনও ষোলো বছরের কিশোর এ-যুগের আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে চোখে পড়ছে কি?

এরপরে যা ঘটল তার তুলনায়। রামমোহন শুধু একেশ্বরবাদী হিন্দু হয়েই ফিরে এলেন না কাশী থেকে, তিনি পড়লেন নালন্দা বিশ্ববিদ‌্যালয়ের ইতিহাস। তিনিও নালন্দা বিশ্ববিদ‌্যালয়ের অসামান‌্য ছাত্র অতীশ দীপংকরের মতো হতে চান প্রজ্ঞার সন্ধানী। পড়তে চান প্রাচীন পুঁথি। হতে চান হারিয়ে-যাওয়া দর্শন ও এষণার অধিকারী! তিনি হাঁটতে শুরু করলেন তিব্বতের পথে। এবং অবশেষে পৌঁছলেন সেই রহস‌্যময় দেশে। তিনি যে প্রাচীন পুঁথির পাঠ উদ্ধার করে গোপন প্রজ্ঞার অন্বেষণে এসেছেন, এ-কথা জানলেন লামারা। তাঁকে হত‌্যা করার চেষ্টাও হয়েছিল। প্রাচীন পুঁথির আড়াল করা জ্ঞানভাণ্ডার স্মৃতিতে ধারণ করে দেশে ফিরলেন রামমোহন। এবং দেশে ফিরে লিখলেন ফারসি ভাষায় তাঁর একেশ্বরবাদী, সম্পূর্ণ দেবদেবীহীন দার্শনিক গ্রন্থ : ‘তুইফাৎ-উল্‌-মুয়াহ্‌হিদীন’। ১৮০৩ সালে লিখেছিলেন এই বৈপ্লবিক বই।

১৮০৩ সালে লিখেছিলেন এই বৈপ্লবিক বই। তখন রামমোহনের বয়স সবে তিরিশ পেরিয়েছে। এরপর রামমোহনকে দেখছি আমরা ইংরেজ সিভিলিয়ান ডিগবির দেওয়ান রূপে। তিনি প্রভূত অর্থ উপার্জন করলেন। কলকাতায় চারটি প্রাসাদের মতো বাড়ি করলেন। এবং তৈরি করলেন বিদগ্ধ বাঙালিদের এক সমাজ। নাম দিলেন ‘আত্মীয়সভা’। এই আত্মীয়সমাজকেই তিনি ক্রমশ পরিণত করলেন ব্রাহ্মসমাজে। এরপর এমন একটি কাজ করলেন যা আর কোনও বাঙালি কোনওকালে করেছে বলে আমার জানা নেই। তিনি হিব্রু শিখে বাইবেলের পুরনো অংশ মূল ভাষায় পড়লেন। এবং দুঃসাহসে বললেন, পুরনো বাইবেলের অবতারবাদ বর্জনীয়। ক্রাইস্টের উপদেশই ক্রিশ্চানধর্মের সারাৎসার। একদিকে অধিকাংশ হিন্দুরা তাঁর শত্রু। অন‌্যদিকে গোঁড়া ক্রিশ্চানরাও তাঁর বিরোধিতা শুরু করল।

এই সময় এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটল রামমোহনের জীবনে। তাঁর দাদা জগমোহন মারা গেলেন কমবয়সেই। পণ্ডিতেরা জোর করে জগমোহনের চিতায় তুলল রামমোহনের খুব ভালবাসার বউদি অলকামঞ্জরীকে, নতুন বউয়ের সাজে। অলকামঞ্জরীর কথা আমরা ভুলে গেছি। কিন্তু তিনিই ছিলেন রামমোহনের সতীদাহ-বিরোধী দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রেরণা। রামমোহন জীবন্ত অলকামঞ্জরীকে তাঁর চোখের সামনে চিতায় পুড়তে দেখে বলেছিলেন, ‘বৌদি, তোমাকে বাঁচাতে পারলাম না, কিন্তু হিন্দুদের এই বর্বরতা আমি নাশ করবই’। এবং মহাপণ্ডিত, উদারপন্থী রামমোহন শেষ পর্যন্ত হিন্দুশাস্ত্রের প্রমাণ দাখিল করে সহমরণ প্রথার বিরুদ্ধে আইন আনতে সফল হলেন। সতী হতে গেলে কোনও নারীকে চন্দ্র সূর্য সাক্ষী করে সংকল্প নিয়ে মন্ত্রপাঠ করতে হত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই মন্ত্র জোর করে পাঠ করানো হত। তারপর বলা হত, এই সতী-মন্ত্র থেকে ফেরবার উপায় নেই। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড বেন্টিঙ্ক রামমোহনের সঙ্গে একমত হয়ে সতীদাহ আইন করে বন্ধ করলেন। সে-যুগে এই কাজটি করা কতদূর কঠিন ছিল আজকের বাঙালি তা বুঝতে পারবে না। যেমন বুঝতে পারবে না আজকের বাঙালি রামমোহনের সময় দিল্লির বাদশার দূত হয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বসবার জন‌্য ১৮৩১ সালে ইংল‌্যান্ড যাওয়া কী বিস্ময়কর ঘটনা।

যে বেদ শূদ্র সম্প্রদায়ের শোনার অধিকার ছিল না, আর তা উচ্চারণ করলে নাকি জিহ্বা কেটে দেওয়ার রীতি ছিল সেই বেদ-কে অনুবাদ করে সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত করে দিলেন রামমোহন। ব্যাস! সর্বসাধারণের জন্যে বেদ ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে রামমোহনের বিরুদ্ধে হিন্দু সমাজে চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হল। শুরু হল রামমোহনের প্রকাশ্য বিরোধিতা। ইংরেজি বেদান্ত গ্রন্থের ভূমিকায় রামমোহন লিখলেন – “আমি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করে বিবেক ও সরলতার আদেশে যে পথ অবলম্বন করেছি তাতে আমার প্রবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন আত্মীয়গণের তিরস্কার ও নিন্দার পাত্র হতে হল। কিন্তু যাই হোক না কেন, আমি এই বিশ্বাসে ধীরভাবে সমস্ত কিছু সহ্য করতে পারি যে, একদিন আসবে, যখন আমার এই সামান্য চেষ্টা লোকে ন্যায় দৃষ্টিতে দেখবে।”

রামমোহনের বই ও বইয়ের অনুবাদের ফলে দেশে বিদেশে রামমোহনের নাম ছড়িয়ে পড়ল। লন্ডন, ফ্রান্স, আমেরিকায় রামমোহন জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। অন্যদিকে নিজ দেশের বাঙালিরা রামমোহনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু করল। রামমোহন-বিরোধী অন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করল।

এরই মধ্যে রামমোহন যীশুখ্রিস্টের উপদেশ – ‘শান্তি সুখের পথ’ ইংরাজিতে – ‘Precepts of Jesus-Guide to Peace and Happiness’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই বইটি লেখার জন্য রামমোহন শুধুমাত্র বাইবেল কিংবা ওল্ড টেস্টামেন্টের ইংরেজি পড়েই ক্ষান্ত হননি, গ্রিক ও হিব্রু ভাষাও আয়ত্ত করেছিলেন। এতদিন রামমোহন হিন্দু সমাজ ও ধার্মিকদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে ছিলেন, এই বই প্রকাশের পর এবার খ্রিস্টান পাদ্রীদের বিরোধিতার সম্মুখীন হলেন। মিশনারি পাদ্রী উইলিয়াম কেরি ও মার্শম্যান সাহেবও এই বইয়ের বিরোধিতা করলেন। ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’য় তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করলেন কেরি ও মার্শম্যান। তাঁদের বক্তব্য, রামমোহন যীশুর উপদেশ মান্য করেছেন ঠিক কথা, কিন্তু প্রভু যীশুর অলৌকিক ঘটনাগুলোকে অস্বীকার করেছেন। ব্যাস! এই নিয়ে উভয়পক্ষের বিরোধ চরমে উঠল।

এতদিন ধরে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস রামমোহনের সমস্ত বই ছাপতেন। খ্রিস্টানরা বিরোধিতা করার ফলে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস রামমোহনের নতুন বই ‘Final Appeal’ ছাপাতে অস্বীকার করল। কিন্তু মানুষটির নাম রামমোহন রায়। যিনি হারতে শেখেননি। রামমোহন নিজেই ‘ইউনিটেরিয়ান প্রেস’ নামে একটি প্রেস নির্মাণ করলেন। আর সেই প্রেস থেকে ‘Final Appeal’ বইটি ছাপা হল।

রামমোহনের শেষ এই গ্রন্থে তাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্য দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। রামমোহন মার্শম্যানের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে তাঁর ভাবনার মধ্যে কোনো যুক্তি নেই এবং তাঁর ভুল কোথায়। মার্শম্যান ভুল বুঝলেন এবং নীরব থাকলেন।

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির সনদ প্রাপ্তির সময় রাজা রামমোহন রায় বিলাতের পার্লামেন্টে যে প্রতিবেদন পাঠান, তা তাঁর প্রগতিশীল অর্থনৈতিক চিন্তার পরিচায়ক। তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে শোষিত কৃষককুলের সপক্ষে বক্তৃতা করেছিলেন। নতুন সনদে তিনি কৃষকদের স্বার্থরক্ষা জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

রামমোহনের জীবনের শেষ তিন বছর কেটেছিল ইংল্যান্ডে। বিলেত যাওয়ার আগে তিনি দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন। এদিকে বিলেত যাওয়ার আগে রামমোহনের আত্মীয়-স্বজন তাঁকে অনেক বাধা দিয়েছিল। কারণ, সেই যুগে দেশের শাস্ত্র অনুযায়ী সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ একটা ব্যাপার। জাত চলে যাওয়ার মতো একটা গুরুতর বিষয়। রামমোহন এসব মানলেন না। আর তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এসব অযৌক্তিক প্রথাকে উপেক্ষা করে, বিরোধিতার তোয়াক্কা না করে নিজ মর্জিতে বিলেত গেলেন। সে সময় তাঁর সঙ্গী ছিলেন তাঁর পালিত পুত্র রাজমোহন, রামরত্ন মুখোপাধ্যায় নামে এক পাচক ব্রাহ্মণ এবং রামহরি নামে এক ভৃত্য।

অনেকেই মনে করেন, রাজা রামমোহন রায় পশ্চিমাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করতেন, কিন্তু আদৌ ব্যাপারটি এরকম ছিল না। তিনি বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায় যখন খ্রিস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক সমালোচিত হতো, তখন কড়া ভাষায় সেগুলোর প্রতিবাদ করতেন। ঠিকভাবে প্রতিবাদ করার জন্যই তিনি গ্রিক এবং হিব্রু ভাষা শিখেছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলার মানুষদের স্বাধীন চিন্তাধারার পক্ষে ছিলেন। সেজন্য ব্রাহ্ম সমাজ নামক একটি ধর্মীয় সংঘও গড়ে তোলেন, যেখানে স্বাধীন চিন্তাধারার বিষয়ে আলোচনা করা হতো এবং তাদের বিশ্বাস সমাজে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া হতো। এমনকি তিনি যখন দিল্লির সম্রাটের পক্ষ থেকে ১৮৩০ সালে ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দিতে যান, তখন তার কথা এবং আলোচনার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশ যে জ্ঞান-বিজ্ঞান সমৃদ্ধ দেশ, তা পুরোপুরি প্রকাশ পায়। ১৮৩৩ সালের সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখে বাংলার এই মহান পণ্ডিত এবং সমাজ-সংস্কারক ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল শহরে প্রয়াত হন।

রামমোহনকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন দিল্লির বাদশা। ‘রাজা’ উপাধি তাঁর ধনদৌলতের জন‌্য নয়। তিনি ‘রাজা’ তাঁর মন ও মননের আন্তর্জাতিক ব‌্যাপ্তির জন‌্য। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রাজা রামমোহনই ভারতের প্রথম রাজদূত। তাঁর মতো প্রজ্ঞাবান, বোধদীপ্ত, উদারপন্থী এবং বিপ্লবী সমাজসংস্কারক আর কোনও ভারতীয় রাজদূত কি ইংল‌্যান্ডের রাজসভায় আমরা আজও পাঠাতে পেরেছি?

রাজা রামমোহন রায়ের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এবং প্রযুক্তিতে যেন কোনো পার্থক্য না থাকে, এই দেশের মানুষ যেন কোনোভাবে পিছিয়ে না থাকে। তিনি যদি এখন কোনোভাবে দেখতে পারতেন যে দু’শ বছর আগে তার দেখিয়ে দেয়া পরিবর্তনগুলো এখন সমাজে পরিবর্তন এনেছে এবং আধুনিক সমাজ গড়ে তুলেছে, তাহলে হয়তো তিনি খুশি হতেন; কিন্তু আধুনিক সমাজে যে যুদ্ধ-বিগ্রহ, হিংসা-বিদ্বেষ এবং শিক্ষিত মানুষের মাঝেও যে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে বা ঘটছে, সেগুলো দেখে হয়তো মন খারাপও করতেন।

রাজা রামমোহন রায়ের প্রাসঙ্গিকতা কিন্তু এতটুকু কমেনি বর্তমান ভারতে। আজও সমাজে রয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে হিংসা হানাহানি, নারী সুরক্ষা আজও প্রশ্নের মুখে এবং ভারতে আজও প্রতিদিন স্রেফ পণের দাবির মুখে অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে মৃত্যুর সাথে লড়তে হয় মেয়েদের। শিক্ষা আজ স্রেফ ডিগ্রি অর্জন করার পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সত্যিকারের শিক্ষা আজ কথার কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈতিকতার ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ভারতীয় সমাজকে এক অদ্ভুত সংকটের সামনে এসে দাঁড় করিয়েছে। নিঃসন্দেহে ভারতের এক নব্য নবজাগরণের প্রয়োজন, যেখানে সমাজের দোষ ত্রুটিগুলো প্রশ্ন করা হবে, উলঙ্গ রাজার সভায় সেই বাচ্চাটিকে খুঁজে পাওয়া যাবে আর অবশ্যই ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে। আজ ২৫০ বছরে রাজা রামমোহন রায়। আরও এক নবজাগরণের অপেক্ষায় ভারত

আজ ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়-এর জন্মদিবস। এই যুগপথিক-কে আমার প্রণাম।

★ তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- Scientific Edge (2003) – Jayant Narlikar, Penguin Books, রাজর্ষি রামমোহন – জীবনী ও রচনা – অনিলচন্দ্র ঘোষ, রোর মিডিয়া, বেঙ্গল স্টুডেন্টস ডট কম, বঙ্গদর্শণ, আদিত্য গুপ্ত – গল্পকুটির ডট ইন, কলকাতার রাজকাহিনী – পূর্ণেন্দু পত্রী, আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময়, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ