দমা দম মস্ত কালান্দার

প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, মে ২৩, ২০২২

দমা দম মস্ত কালান্দার

সিদ্ধার্থ দে | ক্যানবেরা (অস্ট্রেলিয়া), ২৩ মে ২০২২ : সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়। প্যাটেল হলে কারো একটা ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছি একটু রাতের দিকে। রেডিওতে গান বাজছে।

হঠাৎ একটা গান শুনে সবার কথা বন্ধ হয়ে গেল। মহিলা কণ্ঠ। সুরে, গায়কীতে মাদকতা মেশা। গানের একটা কথাও বুঝলাম না।

সঞ্জীব চাড্ডা বলল : সিন্ধি গান। শিল্পী বাংলাদেশের রুনা লায়লা।

পাঠক ঠিকই ধরেছেন। গানটি অর্ধ শতাব্দ পরেও জনপ্রিয় ।

দমাদম মস্ত কালান্দার।

*************************************

সে বয়সটা ছিল দৌড়নোর। সারা বছর চাপের মধ্যে থাকতাম সবাই।

গানটা ভাল লেগেছিল। ব্যাস । গানের কথার মানে বা প্রেক্ষাপট কি, সে বিষয়ে মাথা ঘামাবার সময় ছিল না, ইচ্ছেও ছিল না। সত্যি কথা বলতে, সে আমলে কৌতূহল জাগলেও তথ্য সংগ্রহ দুস্কর ছিল।

শুধু চাড্ডা জন্মসূত্রে পাঞ্জাবি বলে হয়তো সিন্ধি ভাষার সঙ্গে কিছুটা পরিচিত ছিল – তাই জানতে পেরেছিলাম গানটির লিরিক্স কোন ভাষায়।

*************************************

সত্তরের দশকের শেষের দিকে। শ্যামবাজারের বাড়িতে দিদির (ঠাকুমার) ঘরে বসে অল্প কিছুদিন আগে আসা সাদা কালো টেলিভিশনে একটা অনুষ্ঠান দেখছি। বাবা খুব একটা টিভি দেখতেন না – কিন্তু সেদিন কোন কারণে ঘরে ছিলেন।

তখন একটাই চ্যানেল – দূরদর্শন কলকাতা। যদিও ঢাকার টেলিভিশন দেখার জন্য কিছু বাড়ির ছাদে আলাদা করে অ্যান্টেনা বসানো শুরু হয়েছে। সম্প্রচার হত – যতদূর মনে আছে – সন্ধ্যার দিকে তিন চার ঘন্টা মাত্র।

অনুষ্ঠানের শিল্পী – সেই রুনা লায়লা। এনার বয়স তখন মধ্য কুড়িতে – আমাদেরই বয়সী। সুন্দরী বলা যাবে না – তবে তর্কাতীতভাবে আকর্ষণীয়া।

দেখতে যেমনই হোন – অনুষ্ঠানটিতে দর্শকদের টেনে রেখেছিলেন মহিলা। বাবার মত গানবাজনায় কম আগ্রহী মানুষও মন দিয়ে গানগুলি শুনেছিলেন। রুনা সেদিন সেই সিন্ধি গানটি গেয়েছিলেন কিনা মনে নেই – তবে ওনার আর একটা সুপারহিট গান – সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী – গেয়েছিলেন সেটা স্পষ্ট মনে আছে। এছাড়া গেয়েছিলেন বেশ কয়েকটি পল্লীগীতি।

বাবা বেশ ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলেন। ওনার শৈশব কেটেছিল বর্তমানের বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় দাদুর মুন্সেফের চাকরির সুবাদে।

*************************************

সেদিন পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কেনা একটা বই পড়ছিলাম। লেখিকা ইংরেজ। অ্যালিস অ্যালবিনিয়া। বইটির নাম : Empires of the Indus।

বইটিতে লেখিকা পাকিস্তানে সিন্ধু নদীর মোহনা থেকে শুরু করে উজান বেয়ে উত্তর দিকে এগিয়েছেন। নদীর দুপাশের শহরগুলির স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশেছেন – জেনেছেন দুর্দশাময় বর্তমান পরিস্থিতি। অঞ্চলটির হাজার বছরের ইতিহাসের নানা কাহিনীও শুনিয়েছেন পাঠকদের।

(অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা কথা বলব – পাকিস্তানের কথা উঠলেই আমাদের একটা শত্রু দেশের কথা মনে হয়। অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে স্বীকার করব – বইটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল পড়শী দেশটার ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে কত অল্প জানি। রাজনীতিবিদরা মনে হয় ইচ্ছে করেই এই না জানা প্রসূত বিদ্বেষকে জিইয়ে রাখতে আগ্রহী।

বর্তমান পাকিস্তানের একটা মানচিত্র দিলাম এই লেখাটির সঙ্গে। জানতে আগ্রহী পাঠকদের কতজন পাকিস্তানের সবকটি রাজ্যের নাম, রাজধানী এবং ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।)

*************************************

সিন্ধু নদীর ধারে অসংখ্য সুফি সন্তদের আশ্রম।

এই সুফি সন্তদের সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত – শুধু এইটুকু শুনেছি এনাদের মধ্যে মৌলবাদীসুলভ জঙ্গীপনা ছিল না। আন্তরিক ভাবে সব মানুষের মঙ্গল কামনা করতেন এঁরা।

এঁদের মধ্যে একজনের নাম উল্লেখ করেছেন লেখিকা। নাম লাল শাহবাজ কালান্দার। হঠাৎ দুই-য়ে দুই-য়ে চার হয়ে গেল। লিঙ্ক হল দুটি – সিন্ধু প্রদেশ আর ‘কালান্দার’ শব্দটি।

একটু গুগুলানুসন্ধান করেই জানতে পারলাম সেই মাদকতাময় গানটি এই সন্তকে উদ্দেশ্য করেই নিবেদিত। ইতি সিন্ধু প্রদেশের সেহওয়ান নগরে এসেছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আফগানিস্তান থেকে যদিও ওনার পূর্বপুরুষদের নিবাস ছিল বাগদাদে। জনশ্রুতি আছে ওনাকে ঘিরে নাকি নানা রকম অলৌকিক ঘটনা আছে।

এই সন্তের প্রয়ান হয় ১২৭৪ সালে প্রায় ১০০ বছর বয়সে। সমাধিস্থ আছেন সেই সেহওয়ান শহরেই। ওনার জন্মদিনে প্রতি বছর পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে দু কোটি মানুষ আসেন ওনার সমাধিসৌধে।

*************************************

মূল গানটি লিখেছিলেন আমির খুসরো ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। ৮০০ বছরে গানের কথার কিছু ভাঙাগড়া হয়েছে। সুরের কতটা পরিবর্তন হয়েছে জানিনা।

কিন্তু আজও দেখি ‘সারেগামাপা’ এবং অন্যান্য রিয়েলিটি শো গুলিতে প্রতিযোগীরা নিয়মিত গানটি গেয়ে থাকেন।

সত্তরের দশকে গানটি ‘দম মারো দম’এর সঙ্গে জনপ্রিয়তায় টক্কর দিয়েছিল।

মজার ব্যাপার হল – গানটি আদতে একটি ইসলাম ধর্মের ভক্তিগীতি। মন কাড়া সঙ্গীত দেশ-কাল-ভাষা-ধর্মের তোয়াক্কা করে না।

(গানটির ইউটিউব লিঙ্ক দিলাম। বহু নামী দামী গায়ক গায়িকা (আশা ভোঁশলে, রাহাত ফতেহ আলী খান সহ) এই গানটি গেয়েছেন। আমার কিন্তু রুনা লায়লার কণ্ঠেই সবচেয়ে ভাল লেগেছে।)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ