অবসরের গান: কবরীর স্মৃতিটুকু থাক

প্রকাশিত: ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২২

অবসরের গান: কবরীর স্মৃতিটুকু থাক

শরীফ শমসীর |

শ্রীমতী লাবন্যপ্রভা পাল ও শ্রী কৃষ্ণদাস পালের অন্যতম সন্তান মিনা পাল কালে কালে রূপালি পর্দার মিষ্টি মেয়ে কবরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তাঁর হাসি সত্যিই মিষ্টি ছিল, তা কোনো সিনেমার নিছক বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল না, দর্শকদের মুখের ভাষা ছিল।
কবরী (১৯৫০-২০২১) তের বছর বয়সে যখন সিনেমায় আসেন তখন তাঁর শরীর বয়সের কারণেই পুষ্ট ছিল না। তাঁর ভাষায়, পিঠে টাইট করে কি যেন বেঁধে তার ওপর ব্লাউজ পরিয়ে, ফিতা দিয়ে পেটিকোট আটকিয়ে শাড়ি পরিয়ে তাঁকে সিনেমার শুটিংএ হাজির করা হয়; বালিকার সেই শুরু, শুরুতেই নায়িকা; দর্শক তাঁকে নিয়েছিলেন, এরপর নায়িকা হিসেবে তিনি দর্শকদের নেশা হয়ে গিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সিনেমায় তখনো মেরেলিন মনরোর যুগ শুরু হয়নি; কবরীই ভরসা। কারণ, কবরী ছিলেন নিম্নমধ্যবিত্তের কিশোরী, তাল- লয়- মুদ্রা না-জানা। তিনি সিনেমার সঙ্গেই বেড়ে উঠেছিলেন ; শিক্ষায়, রূপ -লাবন্যে, প্রজ্ঞায়, দ্রোহে, দেশপ্রেমে এবং আইকনে।
১৯৬৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি সিনেমার সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু সমাজের সাথে এবং দেশের সাথেও ছিলেন। চলচ্চিত্রের যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সাথে ছিলেন কবরী তাঁদের অন্যতম। নিঃস্ব হয়ে শরণার্থী হিসেবে ভারতে গিয়েছিলেন, অভিনয় করে মুক্তিযুদ্ধের কল্যাণে অর্জিত অর্থ ব্যয় করেছিলেন ; মাথা উঁচু করে ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি আশা করেছিলেন, চলচ্চিত্র মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিকশিত হবে কিন্তু তা মুনাফার নিমিত্তে ধাবিত হয়েছিল। কবরী নামটি ব্যবসাসফল ছিল কিন্তু ব্যবসাইতো সব নয়, এতটুকু কবরী বুঝতেন। বিদেশে আমাদের সিনেমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি; সে এক ঝকঝকে সময় ছিল।
কালের বিবর্তনে তিনি পরিচালক হয়েছিলেন, নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে সিনেমা করতে চেয়েছিলেন; পছন্দের বিষয় ছিল, নারীর অবস্থা ও কন্ঠ তুলে ধরা। সার্থক ছিলেন কীনা বিচারের বিষয় কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা ছিল প্রশংসনীয়।
নারী হিসেবে কবরী ছিলেন প্রতিবাদী, স্বাধীন। বিবাহিত জীবনে নিজের পছন্দের গুরুত্ব বুঝতেন, সারাহ কবরী নামও গ্রহণ করেছিলেন।
তিতাস একটি নদীর নাম তাকে সিনেমাবোদ্ধা মহলে অমর রাখবে, সারেং বউ বা অন্যান্য সিনেমাও তাঁর অভিনয়দক্ষতার কথা বলবে।
কবরী গনতন্ত্র ও মানুষকে ভালোভাসতেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সময়ে সংসদ সদস্য ছিলেন, নির্বাচন করতে গিয়ে সন্ত্রাস মোকাবেলা করেছেন, সংসারে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন; তবুও তিনি মাথা নোয়াবার ছিলেন না। নিজের মর্যাদার জন্য একলা হেঁটেছেন। কবরী মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি করেছিলেন।
কবরী জানতেন, রূপালী পর্দার জীবন চাঁদের আলোর মতো মোলায়েম নয়, চাঁদের পৃষ্ঠদেশের মতো খসখসে, রুক্ষ ও অমসৃণ। কবরী শুরু করেছিলেন যখন তখন সিনেমা ছিল শিল্প যখন শেষ করেছেন তখন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। সবকিছুই বাণিজ্যিক হয়েছে, শিল্প আর কতটুকু।
কবরীর জীবন নিয়ে একটা বায়োপিক হোক; তাঁর সময় নিয়ে কেউ কেউ উচ্চতর গবেষণা করুক– কামনা করি। তখনই জানা যাবে কবরীর জীবন- সফর, তাঁর মন এবং বাংলাদেশের সেলুলয়েডের বেড়ে উঠার কাহিনি।
কবরী বাংলাদেশের সিনেমার মিষ্টি মেয়ে ছিলেন, তাঁর জীবনে মিষ্টি তেমন ছিল না কিন্তু জীবনকে তিনি তাঁর মতো উপভোগ করেছেন, একটি মেয়ের জীবনে এর চেয়ে মহৎ আর কি হতে পারে!
দীর্ঘজীবী হোক আমাদের কবরী। তাঁর জন্ম সার্থক হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ