বিদ্রোহী অযোধ্যা

প্রকাশিত: ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৭, ২০২২

বিদ্রোহী অযোধ্যা

রানা চক্রবর্তী |

‘বক্সার যুদ্ধের’ পরে ১৭৬৪ সালে মোঘল সম্রাট ও অযোধ্যার নবাব ‘সুজাউদ্দৌলা’র সঙ্গে ইংরেজদের যে সন্ধি হয়েছিল, তাতে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি মোঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করেছিল, এবং অযোধ্যার নবাব বৃটিশ ছাড়া অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে (অর্থাৎ মারাঠাদের সঙ্গে) মিত্রতা স্থাপন করবেন না বলে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। ক্রমে সেই সন্ধির সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা অযোধ্যার আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তাঁদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিলেন। নবাব সুজাউদ্দৌলার মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র ‘আসফউদ্দৌলা’ ১৭৭৫ সালে ইংরেজদের সঙ্গে আরেকটি সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তাঁর রাজ্যে ইংরেজ সৈন্যদের অবস্থানের জন্য খরচের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ঐ বছরেই অযোধ্যার বেগমদের কাছ থেকে (আসফউদ্দৌলার মা ও মাতামহী) ইংরেজরা একপ্রকার জোর করে ৫৫ লক্ষ টাকা আদায় করেছিলেন। তারপরে ‘ফয়জাবাদে’ যেখানে বেগমরা থাকতেন, সেখানে বৃটিশ সৈন্য পাঠানো হয়েছিল, এবং বছরের পর বছর ধরে তাঁদের উপরে লুণ্ঠন ও অত্যাচার চালানোর পরে তাঁদের যা কিছু অবশিষ্ট সম্পত্তি ছিল, সেটাও ১৭৮২ সালের ডিসেম্বরে মাসে ইংরেজদের হাতে সমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। ১৭৯৭ সালে আসফউদ্দৌলার মৃত্যুর পরে ‘ওয়াজির আলি’র পরিবর্তে, হাতের পুতুল ‘সাদত আলি’কে ইংরেজরা অযোধ্যার তখতে বসিয়েছিলেন। পরের বছর ইংরেজরা একটা নতুন সন্ধিকে নবাবের ঘাড়ে চাপিয়ে এলাহাবাদের দুর্গ, যেটাকে তখন সকলে ‘উত্তর-পশ্চিমের চাবি-কাঠি’ বলতেন, সেটা দখল করে নিয়েছিলেন, এবং প্রতি বছর অযোধ্যায় অবস্থিত কোম্পানির সৈন্যদের খরচ বাবদ ৭৬ লক্ষ টাকা করে নবাবের কাছ থেকে আদায় করা শুরু হয়েছিল। সেই সন্ধিচুক্তির ফলে নবাব তাঁর অবশিষ্ট স্বাধীনতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন, ও প্রকৃতপক্ষে অযোধ্যা তখন থেকেই ইংরেজের শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। যদিও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে নবাব বঞ্চিত হয়েছিলেন, তবুও রাষ্ট্রের যা কিছু গলদ, যা কিছু দোষ – সেসবের জন্য কিন্তু ওই নামমাত্র নবাবই দায়ী থেকে গিয়েছিলেন। অযোধ্যার শাসনযন্ত্র ইংরেজদের কয়েকজন দালালের হাতে চলে গিয়েছিল; সর্বত্র অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচারের ফলে সমস্ত অযোধ্যায় একটা অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজদের সেই দুর্নীতিপরায়ণ প্রভুত্বকে অনেকেই মেনে নিতে রাজী হননি। শেষে ওয়াজির আলির নেত্বত্বে তাঁরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, এবং কয়েকজন ইংরেজ বিদ্রোহীদের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু ওই বিদ্রোহ বেশীদূর এগিয়ে যেতে পারেনি, এবং ওয়াজির আলি তাঁর বাকি জীবনটা বন্দী অবস্থায় ‘ফোর্ট উইলিয়ামে’ কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই বিদ্রোহ দমিত হওয়ার পরে ভারতের গভর্নর জেনারেল ওয়েলেসলী নবাবকে আরেকটা নতুন সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে সমগ্র গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অর্থাৎ অযোধ্যার প্রায় অর্ধেক রাজ্য সরাসরি দখল করে নিয়েছিলেন। এরপরে ‘ওয়াজেদ আলি’ ১৮৪৭ সালে যখন অযোধ্যার তখতে বসেছিলেন, তখন অযোধ্যার নবাবী কোষাগারে মাত্র এক কোটি বিশ লক্ষ টাকা অবশিষ্ট ছিল। ইংরেজের অর্থ ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে মাত্র ৫ বছরের মধ্যে সেটা কমতে কমতে সাড়ে সাত লক্ষ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল! পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই অযোধ্যার পরিণতি যে কি হবে তা, সেটা ‘লর্ড ডালহাউসি’ ভালভাবেই জানতেন। যদিও অযোধ্যার নবাবেরা ইংরেজদের সাথে করা সন্ধির সমস্ত চুক্তিগুলিই তখন বিশ্বস্তভাবে পালন করে যাচ্ছিলেন; তাই ওই নিরীহ, আশ্রিত ও রক্ষিত রাজ্যটিকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করবার জন্য ইংরেজদের একটা সামান্য অজুহাতও খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছিল। কিন্তু নেকড়ের যখন ছাগলকে ভক্ষণ করবার প্রয়োজন বোধ হয়, তখন ছাগলের জল ঘোলা করতে বেশীক্ষণ লাগে না। তাই অযোধ্যার বৃটিশ রেসিডেন্ট ‘স্লীম্যান’, লাট সাহেবের কাছে চিঠির পর চিঠিতে লিখতে শুরু করেছিলেন যে, নবাব হচ্ছেন একজন দুশ্চরিত্র, লম্পট ব্যক্তি; তিনি সর্বক্ষণ নর্তকী ও কতগুলি নিম্নশ্রেণীর স্ত্রীলোকের দ্বারাই পরিবেষ্টিত হয়ে থাকেন; “রাজকার্যের জন্য তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও পাওয়া যায় না এবং তিনি এ সম্বন্ধে কিছু বোঝেনও না, বা কেয়ারও করেন না।” আর সব থেকে বড় অভিযোগ ছিল যে, “তিনি তাঁর প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন!” ১৮৫৪ সালে মেজর জেনারেল ‘আউটরাম’, স্লীম্যানের জায়গায় অযোধ্যার রেসিডেন্ট পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। আউটরামও সেই একই সুর গাইতে শুরু করেছিলেন যে, অযোধ্যার নবাব রাজকার্যে একেবারেই মন দেন না, তাঁর রাজ্য অরাজকতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, প্রজারা আর্তনাদ করছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। লণ্ডনে ‘কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স’ অযোধ্যা নিয়ে ওই ধরণের অজস্র চিঠি পেয়েছিল। তারপরে নেকড়ের ছাগলকে ভক্ষণ করবার দিন ঠিক করতে বেশী সময় লাগে নি, অবশ্য নেকড়ের মতে সেটা নাকি ছাগলেরই ভালোর জন্যই ছিল! অযোধ্যার ৫০ লক্ষ লোকের প্রতি ‘মানবতার জন্য’, তাঁদের ‘নেটিভ অত্যাচারের’ হাত থেকে বাঁচাবার জন্য, ও ‘কৃষকদের অসাধারণ দুর্দশা থেকে রক্ষা করবার জন্য’ অযোধ্যাকে বৃটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করাই ঠিক হয়েছিল। যদিও নবাব ওয়াজেদ আলির বিরুদ্ধে সেই সব অভিযোগ সম্বন্ধে বোর্ড অব ডাইরেক্টার্সের একজন সভ্য ‘জোনস’ লিখেছিলেন, “এই দেশের রীতিনীতি অনুসারে নৃত্য ও গীত খুব আপত্তিজনক ব্যবসা নয়। নবাবের সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে; বৃটিশ রেসিডেন্টরা নবাবের মন্ত্রী নিয়োগ করা, তাঁর প্রজাদের মধ্যে কিভাবে বিচার হবে সে সব নিয়ন্ত্রণ করা, এই ধরনের সব ক্ষমতাই নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছেন এবং যখন তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীর সংস্কার করতে চেয়েছিলেন তখন তার অনুমতি তাঁকে দেওয়া হয়নি। তা হলে, আমাদের এই সমস্ত উদ্ধত হস্তক্ষেপের দরুন তাঁর বিরক্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কি প্রকার কাজের অধিকার আমরা তাঁকে দিতে প্রস্তুত?” নবাবের নৈতিক চরিত্রের বিষয়ে জোনস বলেছিলেন যে, তিনি খুব ভালভাবেই খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিলেন যে, নবাবের চাইতে বেশী চরিত্রবান লোক খুব কমই রয়েছেন। তারপরে অযোধ্যার তখনকার অর্থনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে জোনস নিজেই যেচে অনেক অনুসন্ধান করে এই মত দিয়েছিলেন যে, “জীবিকার্জনের জন্য শ্রমিকদের অন্য প্রদেশে চলে যেতে হত না। সব শহরগুলিই সমৃদ্ধিশালী ছিল, প্রাসাদ নির্মিত হত, শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া হত, রাস্তাঘাটও তৈরী হত; সোরা, নীল ও শস্যদ্রব্যের রপ্তানি একেবারেই কমে যায়নি এবং জনসাধারণের মনোভাব এতটুকু দমে যায়নি, অপরাধের সংখ্যাও খুবই কম।” (History of the Indian Mutiny, Vol. I, Charles Ball, পৃ- ১৫১)
১৮৫৬ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি তারিখে সকাল বেলায়, “বৃটিশ রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল আউটরাম প্রাসাদে গিয়ে নবাবকে কয়েকটি কথা ব্যাখ্যা করে, তাঁর হাতে একটা সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করতে দিলেন। এই সন্ধির দ্বারা তিনি তাঁর রাজ্যের শাসনভার সম্পূর্ণরূপে কোম্পানির হাতে তুলে দেবেন। তার পরিবর্তে তাঁর জন্য মোটা রকমের একটা আয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে এবং তিনি কতকগুলি বিশেষ সুবিধা ও সম্মানের অধিকারী হবেন। এই দলিলটি খুব মন দিয়ে পড়ার পর নবাব দুঃখে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেন এবং যখন কোনো যুক্তির দ্বারাই সন্ধিপত্রে তাঁকে স্বাক্ষর করতে রাজী করানো গেল না, তখন রেসিডেন্ট ঘোষণা করলেন যে, তাঁকে বাধ্য হয়ে নবাবকে জানাতে হচ্ছে যে, তিনি তিন দিন পর অযোধ্যার শাসনভার হাতে নেবেন।” (History of the Indian Mutiny, Vol. I, Charles Ball, পৃ- ১৫৬) এরপরে ৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে একটি ঘোষণাপত্রে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, ঐদিন থেকে অযোধ্যার বাসিন্দারা বৃটিশ সরকারের প্রজা হলেন। ওই কাজের সমর্থনে লর্ড ডালহাউসির ঘোষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, “অযোধ্যার যে শাসনযন্ত্র লক্ষ লক্ষ লোককে দুঃখদৈন্যের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, সেটাকে যদি আর এক মুহূর্তও সহ্য করা হয়, তা হলে বৃটিশ সরকার ভগবান ও মানুষের সামনে দোষী বলে গণ্য হবে।” তারপরে অযোধ্যার নবাবকে বাৎসরিক ১২ লক্ষ টাকা বৃত্তি দিয়ে কলকাতায় নির্বাসিত করা হয়েছিল। একই সাথে তাঁকে এটাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, যদি তিনি ইংরেজদের সন্ধিপত্রে চুপচাপ স্বাক্ষর করে দিতেন, তাহলে তাঁকে বছরে ১৫ লক্ষ টাকা করে ভাতা দেওয়া হত! যাই হোক, এইভাবে অতীতের সমস্ত পবিত্র সন্ধি-চুক্তিগুলিকে উপেক্ষা করে একটি রক্ষিত মিত্র রাজ্যকে গ্রাস করবার পরে স্বঘোষিত ইংরেজ শাসকেরা গর্ব করে বলেছিলেন, “এখন জনসাধারণের বেশীর ভাগই তাঁদের কার্যের সমর্থন করে, সুতরাং নতুন সরকার খুবই নিরাপদ।” (A History of the Sepoy War in India, Vol. III, Sir John William Kaye, পৃ- ৪১৮) তবে অযোধ্যার জনসাধারণের ইংরেজের প্রতি বাস্তবে কতটা দরদ ছিল, সেটা অবশ্য তাঁরা এক বছর যেতে না যেতেই ইংরেজদের হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিয়েছিলেন। অযোধ্যা অধিকার করবার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানকার তালুকদার ও কৃষকদের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার তাঁদের সেটেলমেন্ট অফিসারদের লেলিয়ে দিয়েছিল। তাঁদের উপরে ‘বার্ড’ ও ‘টোমাসনের’ স্টিম-রোলার চলেছিল। ইতিমধ্যে কর্নেল স্লীম্যান লিখিত ‘ডায়েরি অব এ টুর ইন আউদ’ ছাপা হয়ে গুপ্তভাবে ইংরেজ কর্মচারীদের মধ্যে প্রচারিত হয়েছিল। সেই বইতে দেশীয় তালুকদারদের একদল দস্যু, দখলকারী ও হত্যাকারী বলে অভিহিত করা হয়েছিল, এবং তাঁদের পিষে সমান করে দেওয়ার নীতি সুপারিশ করা হয়েছিল। তালুকদারদের অগ্রাহ্য করে ইংরেজদের সেটেলমেন্ট অফিসারেরা সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে নতুন করে জমি ও খাজনার বন্দোবস্ত করেছিলেন। অযোধ্যার সাবেক তালুকদারদের জঙ্গল দিয়ে ঘেরা যেসব দুর্গ ছিল, সেগুলোর অনেকগুলিকেই ইংরেজরা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছিল; আর তালুকদারদের যেসব সৈন্যসামন্ত ছিল, তাঁদেরও অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কিছু কিছু লোক কৃষিকার্যে নিযুক্ত হলেও বেশিরভাগই কিন্তু বেকার অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। নবাবের বাহিনীতে যে ৬০,০০০ সৈন্য ছিল তাঁদেরও সেই একই দুরবস্থা হয়েছিল। তালুকদারী উঠে যাওয়ার ফলে কৃষকেরা কিন্তু মোটেই লাভবান হননি। উল্টে বর্ধিত খাজনা ও ট্যাক্সের বোঝা তাঁদের উপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একই সাথে আবশ্যকীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্দশাও বেড়ে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে অযোধ্যায় নিযুক্ত একজন ইংরেজ অফিসার পরে লিখেছিলেন, “আমরা মানুষকে সুখী করবার চাইতে আমাদের রাজভাণ্ডার পূর্ণ করবার দিকেই বেশী জোর দিয়েছিলাম। স্ট্যাম্পের উপর ট্যাক্স, দরখাস্তের উপর ট্যাক্স, খাদ্যদ্রব্যের উপর, বাড়ির উপর, খেয়া পার হবার উপর – সব কিছু উপর ট্যাক্স। তারপর সব কিছুই কনট্রাক্টরকে দেওয়া হত; আফিংএর কনট্রাক্ট, খাদ্যশস্যের কনট্রাক্ট, লবণের কনট্রাক্ট – যা প্যারিসে অক্টোয়া নামে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল।” (Personal Narrative of the Siege of Lucknow, L. E. R. Rees, পৃ- ৩৪) এছাড়া ইংরেজ সরকার যেসব নতুন আইন-আদালত স্থাপন করেছিল, তার ফলেও লোকের দুর্গতির কোন সীমা থাকে নি। ঐতিহাসিক ‘কে’ এই সম্বন্ধে বলেছিলেন, “আমাদের রাজস্ব আইনের ফলে কৃষকরা যেমন উৎকন্ঠিত হয়ে উঠল, আমাদের নতুন আইন-কানুনগুলিও এত বাহাড়ম্বরপূর্ণ দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়সাধ্য হয়ে পড়ল যে, তাতেও জনসাধারণ কম হয়রানি ভোগ করল না। তা ছাড়া আমাদের সরকার সব কিছুরই এত বিনাশক হয়ে উঠল যে, জনসাধারণের কাছে তা খুবই অপ্রিয় হয়ে পড়ল।” (A History of the Sepoy War in India, Vol. III, Sir John William Kaye, পৃ- ৪২৬) এক কথায় ইংরেজ শাসনে অযোধ্যার কোনো শ্রেণীর লোকই সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। উচ্চতম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি থেকে শুরু করে নিম্নতম কৃষক পর্যন্ত সকলেই সেখানে বিক্ষুব্ধ হয়ে ছিলেন।
১৮৫৭ সালে মার্চ মাসে ‘হেনরী লরেন্স’ চীফ কমিশনার হয়ে অযোধ্যায় এসেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেই অসন্তোষের বারুদখানায় যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ হতে পারে। তাই তিনি দেশীয় তালুকদারদের ও সিপাহীদের কিছু সুযোগ সুবিধা দিয়ে, কিছু মিষ্টি কথা বলে শান্ত করবার একটা চেষ্টা করেছিলেন। এছাড়া সারা এপ্রিল মাস ধরে তিনি অযোধ্যার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে পৃথক পৃথক ভাবে দরবার করেছিলেন। সেই দরবারে তিনি মুসলমানদের বলেছিলেন যে, ইংরেজরা শিখদের অত্যাচার থেকে মুসলমানদের মুক্ত করেছে এবং শিখদেশের অভ্যন্তরে, মাক্কা প্রদেশেও তখন মুসলমানেরা স্বাধীনভাবে নমাজ পড়তে পারছেন। হিন্দুদেরকে লরেন্স জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, মুসলমান রাজত্বে তাঁরা যে অবস্থায় ছিলেন, ব্রিটিশ শাসনে তাঁরা কি তার থেকে ভালো অবস্থায় নেই? পুনরায় স্বৈরাচারী নবাবের অধীনে ফিরে গেলে তাঁদের কি ভালো হবে? তিনি শিখদের বলেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলমানদের প্রতিশোধ নেবার সম্ভাবনাটা তাঁরা যেন ভুলে না যান! রাজা ও তালুকদারদের বলেছিলেন যে, দেশে যদি অরাজকতার সৃষ্টি হয়, যদি কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, তাহলে তাঁরাই তো সব থেকে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাঁরাই সবার আগে তাঁদের সম্পত্তি ও প্রতিপত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন। কিন্তু ইতিমধ্যে অসন্তোষের জল এতদূর গড়িয়ে গিয়েছিল যে, সাম্রাজ্যবাদীদের চিরাচরিত ভেদনীতির কৌশল প্রয়োগ করেও শেষরক্ষা হয়নি। চারিদিকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের অসন্তোষ নানাভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। ১৮৫৭ সালের ১৮ই এপ্রিল তারিখে লরেন্স অযোধ্যার কোন একটি রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে যাওয়ার সময়ে একটা ঢিল এসে তাঁর মাথায় পড়বার পরে তিনি নিজেও সেই অসন্তোষ ভালভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ২রা মে তারিখে ৭ম বাহিনীকে নতুন টোটা ব্যবহার করতে হুকুম করা হলে তাঁরা সেই আদেশ অমান্য করেছিল। এর দু’-এক দিন পরেই ওই বাহিনীকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে ১৫ই মে তারিখে মিরাট ও দিল্লীর সিপাহী বিদ্রোহের লক্ষ্ণৌতে এসে পৌঁছেছিল। দ্রুতবেগে বিপদ ঘনীভূত হয়ে আসছে দেখে হেনরী লরেন্স অযোধ্যা রেসিডেন্সীকে কেন্দ্র করে ৬০ একর জায়গা নিয়ে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছিলেন। চারদিকে পরিখা খনন করে, দেওয়ালগুলিকে মেরামত ও মজবুত করে, দরজা ও জানালার কাছে ব্যারিকেড তৈরি করে, চারদিকে কামানের ব্যাটারি প্রস্তুত করে ও সৈন্য সমাবেশ করে, খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে শত্রুর আক্রমণকে প্রতিরোধ করবার জন্য সব রকম ব্যবস্থাই অবলম্বন করা হয়েছিল। লরেন্সের কর্মতৎপরতায় দিন দিন রেসিডেন্সী শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত অযোধ্যায় বিদ্রোহের কোনো চিহ্নমাত্র না দেখতে পেয়ে, লরেন্স ২৩শে জুন তারিখে ‘লর্ড ক্যানিং’কে একটি চিঠিতে গর্ব করে লিখেছিলেন, “আমার সন্দেহ হচ্ছে যে, আমরা একেবারেই আক্রান্ত হব কিনা। আমাদের প্রস্তুতির ফলে শত্রুরা খুবই শঙ্কিত হয়ে উঠেছে।” (History of the Indian Mutiny, Vol. I, G. W. Forrest, পৃ- ৩৪৫) আবার ২৭শে জুন তারিখের চিঠিতেও তিনি জেনারেল ‘হ্যাভলক’ ও ‘হুইলার’কে একই মর্মে তাঁর বিশ্বাস ও আশার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরেই তিন দিন যেতে না যেতেই ৩০শে জুন তারিখে রাত ১টার সময়ে লক্ষ্ণৌতে অবস্থিত সিপাহীরা বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ইংরেজদের কামানের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিদ্রোহীরা শহরে প্রবেশ করতে পারেন নি। বিদ্রোহীদের ধ্বংস করবার জন্য পরদিন লরেন্স তাঁদের সদলবলে আক্রমণ করেছিলেন। লক্ষ্ণৌ শহর থেকে ৮ মাইল দূরে অবস্থিত ‘চিনহাটে’ বিদ্রোহী ও ইংরেজ সৈন্যদের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধের প্রসঙ্গে একজন ইংরেজ ঐতিহাসিক লিখেছিলেন যে, দু’ পক্ষের মধ্যে যখন ঘোরতর কামান যুদ্ধ চলেছিল, তখন, “দেখা গেল যে, শত্রু-বাহিনীর মধ্যভাগ পিছনে হটে যাচ্ছে – মনে হল যেন আমাদেরই জয় হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল ঝড়ের পূর্বেকার স্তব্ধতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকাণ্ড মাঠটা যেন কেঁপে উঠল এবং আমাদের উপর দিয়ে লৌহের ঝড় বয়ে যেতে লাগল ও ঘাসের গোড়াগুলি থেকে, প্রত্যেক গর্ত থেকে ধোঁয়া বের হয়ে আমাদের দু’ পাশ ছেয়ে ফেলে দিল। আমাদের কামানগুলি থেকেও অবিশ্রাম ধারায় গোলা বর্ষণ হতে থাকল। কিন্তু বন্যার স্রোত ক্রমশঃ এগিয়েই আসতে লাগল এবং শীঘ্রই শিখদের ভাসিয়ে নিয়ে গেল। অযোধ্যার গোলন্দাজরা ও গাড়ি-চালকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করল। … অশ্বারোহীদের আক্রমণ করতে বলা হল কিন্তু শিখরা তাঁদের ঘোড়ার মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে পালিয়ে গেল।” ইংরেজরা বারবার বিদ্রোহীদের হটাতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বারবারই তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিদ্রোহীরা ক্রমে এগিয়ে এসে ইংরেজদের প্রায় ঘিরে ফেলবার উপক্রম করেছিলেন। লরেন্স তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই তাঁর সৈন্যদের পিছু হটতে আদেশ দিয়েছিলেন। তাঁদের এই পশ্চাদ্গমন ক্রমে পলায়নে পরিণত হয়েছিল – “সর্বপ্রকার শৃঙ্খলাই নষ্ট হয়ে গেল।” (History of the Indian Mutiny, Vol. II, G. W. Forrest, পৃ- ২৩৩) চিনহাটের যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর ১১৮ জন ইংরেজ অফিসার ও সৈন্যের প্রাণ গিয়েছিল, আর ৫৪ জন জখম হয়েছিলেন, এবং বৃটিশ বাহিনীর ১৮২ জন ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যু হয়েছিল। বিদ্রোহীরা পলায়নপর ইংরেজদের পশ্চাদ্ধাবন করতে শুরু করেছিলেন। ইংরেজরা কোনক্রমে লখনৌ শহরে ফিরে লৌহ-সেতু দিয়ে রেসিডেন্সীতে প্রবেশ করেছিলেন। লৌহ-সেতু ও পাথর সেতু দু’ জায়গাতেই প্রবল বিদ্রোহীরা বাধা পেয়েছিলেন। “তারপর এই দুটি সেতুর কিছু দূরে তাঁরা গোমতী পার হয়ে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে গেল ও চারদিককার বাড়িগুলি দখল করে সেখান থেকে আমাদের পরিখার মধ্যে বন্দুক চালাতে লাগল ৷ তখন থেকেই শুরু হল লক্ষ্ণৌ রেসিডেন্সীর বিখ্যাত অবরোধ।” (History of the Indian Mutiny, Vol. II, G. W. Forrest, পৃ- ২৩৬) এইভাবে ১লা জুলাই তারিখে লখনৌ রেসিডেন্সী অবরোধ শুরু হয়েছিল। রেসিডেন্সীতে তখন ১,৭২০ জন সৈন্যের মধ্যে ১,০০৮ জন ইংরেজ আর ৭১২ জন ভারতীয় সৈন্য ছিলেন। এছাড়াও সেখানে বেসামরিক ১,২৮০ জন মানুষ ছিলেন; তাঁদের মধ্যে ৬০০ জন ইংরেজ স্ত্রীলোক ও শিশু, আর বাদবাকি ৬৮০ জনের প্রায় সকলেই তাঁদের দাসদাসী ছিলেন। অবশেষে ৮৭ দিন টানা যুদ্ধের পরে ১৮৫৭ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর তারিখে ইংরেজরা লখনৌ রেসিডেন্সীর অবরুদ্ধদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তখন সেখানে ১,০০৮ জন ইংরেজ সৈন্যদের মধ্যে ৫৭৭ জনকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া গিযেছিল, এবং তাঁদের মধ্যেও বেশীরভাগ তখন জখম কিংবা অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন। যাঁরা বিদ্রোহীদের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ‘হেনরী লরেন্স’, জুডিসিয়াল কমিশনার ‘ওমানি’ ও ‘মেজর ব্যাঙ্কস’, চীফ ইঞ্জিনিয়ার ‘এণ্ডারসন’ প্রমুখ প্রধান ছিলেন। ৯ জন ইংরেজ গোলন্দাজ-অফিসারের মধ্যে মাত্র ৪ জন তখনও পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ১ জন ইংরেজ স্ত্রীলোক ও ৫৩ জন শিশু মারা গিয়েছিলেন। ইংরেজদের পক্ষে থাকা ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে ১৩০ জন নিহত হয়েছিলেন, আর ২৩০ জন পালিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ অতি বিপজ্জনক ব্যাপার হওয়া সত্ত্বেও, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভারতীয় সৈন্য লখনৌ রেসিডেন্সী ত্যাগ করেছিল। (History of the Indian Mutiny, Vol. II, G. W. Forrest, পৃ- ২৩৭) সেই পলাতকদের মধ্যে শিখদের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। (History of the Indian Mutiny, Vol. II, G. W. Forrest, পৃ- ৩৩৩)
লখনৌর অবরুদ্ধদের উদ্ধার করবার জন্য জেনারেল হ্যাভলক ২০শে জুলাই তারিখে কানপুর থেকে যাত্রা করেছিলেন। ২৯শে জুলাই তারিখে ‘উনাও’ শহর থেকে ৮ মাইল দূরে ‘বসিরতগঞ্জে’ বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাঁর বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। ‘ফরেস্ট’ সেই যুদ্ধ সম্বন্ধে লিখেছিলেন, “যখন আমাদের লোকরা গ্রামটার দিকে অগ্রসর হল, তখন বাড়িগুলির দেওয়ালের ছিদ্রগুলি থেকে ভয়ানকভাবে গুলী বর্ষণ হতে লাগল। … আমরা গ্রামটাতে আগুন ধরিয়ে দিলাম, তারপরেও তাঁরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগল। অযোধ্যার গোলন্দাজরা, যাঁরা সৈনিক হিসেবে খুব ভালো শিক্ষা পেয়েছিল, কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে একগুঁয়ের মতো যুদ্ধ করে চলল এবং তাঁদের কামানের পাশে দাঁড়িয়ে ধ্বংস হল।” (History of the Indian Mutiny, Vol. I, G. W. Forrest, পৃ: ৪৮৩-৮৫) কিন্তু সেই যুদ্ধে হ্যাভলকেরও এত ক্ষতি হয়েছিল যে, তাঁকে পিছু হটে গিয়ে ‘মঙ্গলভারে’ অপেক্ষা করতে হয়েছিল, এরপরে যখন নতুন সৈন্যদল সেখানে পৌঁছেছিল তখন আবার তিনি লক্ষ্ণৌর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পুনরায় ৫ই আগস্ট তারিখে বসিরতগঞ্জের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে উভয়পক্ষের যুদ্ধ হয়েছিল। সেবারে বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ এতটাই তীব্র ছিল যে, হ্যাভলককে আবার মঙ্গলভারে ফিরে যেতে হয়েছিল। ইংরেজরা ফিরে যাওয়ার সময়ে বিদ্রোহীরা ১২ই আগস্ট তারিখে ‘বুড়িয়াকা-চৌকী’তে আবার তাঁদের আক্রমণ করেছিলেন। ইতিমধ্যে হ্যাভলক খবর পেয়েছিলেন যে, কানপুরের অবস্থা আবার সংকটজনক হয়ে উঠেছে এবং ৫,০০০ বিদ্রোহী কানপুর ও বিঠুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তাই হ্যাভলককে বাধ্য হয়েই তখন কানপুর ফিরে যেতে হয়েছিল। এইভাবে ইংরেজদের বিদ্রোহীদের হাতে অবরুদ্ধ লখনৌর প্রথম উদ্ধারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। অবরুদ্ধ ইংরেজদের নায়ক ব্রিগেডিয়ার ‘জন ইংলিশের’ স্ত্রী তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “শিখরাও যে বিক্ষুব্ধ তা সন্দেহ করা হয়েছিল। জন প্রয়োজনীয় সাবধানতার ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন। জন তাঁদের এমন জায়গায় কাজ দিলেন যে, তাঁরা ৩২শ বাহিনীর (ইংরেজ) আয়ত্তের অধীনে থাকল এবং নিজেদের জীবনকে বিপদ্‌গ্রস্ত না করে আর তাঁদের পালাবার পথ থাকল না; তা সত্ত্বেও, আমাদের ঘরের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার কথাটা চিন্তা করতেও কি রকম ভয়ঙ্কর লাগে।” (Personal Narrative of the Siege of Lucknow, L. E. R. Rees, পৃ- ৬৩) ১৮ই সেপ্টেম্বর তারিখে হ্যাভলক কানপুর ত্যাগ করে আবার লখনৌর দিকে যাত্রা করেছিলেন। ২১শে সেপ্টেম্বর তারিখে যদিও একমাত্র মঙ্গলভার ছাড়া বিদ্রোহীদের সঙ্গে আর কোথাও তাঁর বাহিনীর সম্মুখ-যুদ্ধ হয়নি, তবুও বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহীদের গেরিলা যুদ্ধের ফলে ইংরেজদের অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছিল। লখনৌ রেসিডেন্সীর আত্মরক্ষার ক্ষমতাও তখন শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছিল; সেখানে খাদ্যদ্রব্যের আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট ছিল না; সৈন্যসংখ্যাও অর্ধেকের বেশী কমে গিয়েছিল। ওই অবস্থায় ইংরেজদের পক্ষে আর এক সপ্তাহও বোধহয় টিকে থাকা সম্ভব হত না। সেই সময়ে রেসিডেন্সীর একজন ইংরেজ অফিসার লিখেছিলেন, “যদি তাঁরা (হ্যাভলক ও আউটরাম) শেষ মুহূর্তে এসে না পৌছাতেন, তাহলে আমাদের নেটিভ সিপাহীরা, যাঁরা এ পর্যন্ত খুবই মহত্ব দেখিয়েছে এবং প্রশংসনীয় বিশ্বস্ততা দেখিয়েছে, নিশ্চয়ই আমাদের ত্যাগ করে চলে যেত। যদি তাঁরা তা করত, তাহলে তাঁদের কোনো দোষও দেওয়া যেত না, কারণ জীবন হচ্ছে মধুর; আর তাছাড়া, আশা-ভরসা আমাদের একেবারেই ছিল না।” (Personal Narrative of the Siege of Lucknow, L. E. R. Rees, পৃ- ২৪৮) কিন্তু সব ইংরেজই যে নেটিভদের ওই রাজভক্তির সমানভাবে তারিফ করেছিলেন – তা নয়। হ্যাভলকের বীর সৈন্যরা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তাঁরা একজন বিদ্রোহীকেও জীবিত রাখবেন না, এবং তাঁরা কালা আদমী মাত্রকেই বিদ্রোহী বলে গণ্য করতে শিখেছিলেন। এরই ফলস্বরূপ ২৬শে সেপ্টেম্বর তারিখে রেসিডেন্সীতে ঢুকে প্রথমেই তাঁরা কয়েকজন রাজভক্ত সিপাহীকে খুন করে নিজেদের বীরত্ব দেখিয়েছিলেন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ইতিহাসে রাজভক্তির এই ধরণের বিয়োগান্ত উদাহরণ অনেক পাওয়া যায়। কানপুর ত্যাগ করবার পরে ‘আলমবাগ’ পর্যন্ত ৬ দিনের যুদ্ধের ফলে বিদ্রোহীদের হাতে হ্যাভলকের বাহিনীর ২০৭ জন নিহত হয়েছিলেন, আর আলমবাগ থেকে রেসিডেন্সীতে পৌঁছাতে গিয়ে তাঁর বাহিনীর ৩১ জন অফিসার ও ৫০৪ জন সৈন্য হতাহত হয়েছিলেন। (History of the Indian Mutiny, Vol. II, G. W. Forrest, পৃ- ৬৩) বিদ্রোহীদের হাতে নিহতদের মধ্যে ইংরেজদের একজন সর্বশ্রেষ্ট ‘হিরো’, ‘জেনারেল নীল’ও ছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের অত বড় বিজয়ের পরেও লখনৌ রেসিডেন্সীর অধিবাসীরা খুব একটা উৎফুল্ল হতে পারেন নি। রেসিডেন্সীর একজন ইংরেজ মহিলা, ২৭শে সেপ্টেম্বর তারিখে নিজের ডাইরিতে লিখেছিলেন, “এই দিনটা সকলের পক্ষেই খুব বেদনাদায়ক হয়েছিল; সকলেই খুব ভগ্নোদ্যম এবং সকলেই বুঝতে পারল যে আমরা উদ্ধার পাইনি। আমাদের বিপদের তুলনায় আমাদের সৈন্যের সংখ্যা খুবই কম এবং মজুত খাদ্যের তুলনায় তাঁরা খুবই বেশী।” (ডে বাই ডে এ্যাট লক্ষ্ণৌ, মিসেস কেইস, পৃ- ২২১) এর উপরে আবার খবর এসেছিল যে, শহরের বাইরে ১ লক্ষ সশস্ত্র লোক জমায়েত হয়েছে এবং তাঁদের সঙ্গে ‘নানা সাহেব’ও উপস্থিত রয়েছেন। সিপাহী বিদ্রোহের সাংগঠনিক কাজে কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে নানা সাহেব কোনো কৃতিত্ব না দেখালেও তাঁর নাম শুনলেই আবালবৃদ্ধবনিতা সকল ইংরেজই আতঙ্কিত হয়ে উঠতেন – এটাই ছিল তাঁর প্রধান কৃতিত্ব। এরপরেও আরো অনেকদিন ধরে রেসিডেন্সীর আশ্রিতদের অবরুদ্ধ হয়েই থাকতে হয়েছিল।
১০ই নভেম্বর তারিখে বৃটিশ বাহিনীর কমাণ্ডার-ইন-চীফ ‘স্যার কলিন ক্যাম্পবেল’ ৫,০০০ জন সৈন্য ও ৩২টা কামান নিয়ে আলমবাগে পৌঁছেছিলেন। ১৩ই নভেম্বর তারিখে বিদ্রোহীদের উপরে আক্রমণ শুরু করবার আগে তিনি তাঁর বাহিনীকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, “জোয়ানরা, আমি তোমাদের বলতে চাই যে, আমাদের সামনের কাজটা খুবই কঠিন ও বিপজ্জনক। ক্রাইমিয়াতে আমরা যতটা বিপদের ও কঠিন কাজের সম্মুখীন হয়েছিলাম – আজকের কাজ তার চাইতেও বেশী কঠিন ও বিপজ্জনক।” (Reminiscences of the Great Mutiny, Forbes-Mitchell, পৃ- ৩৩) এরপরে বিদ্রোহীদের হাত থেকে ‘দিলখুসা’ ও ‘লা মার্টিনিয়ের’ দখল করবার পরে ক্যাম্পবেল আকস্মিকভাবে ‘সেকেন্দারাবাগ’ আক্রমণ করেছিলেন। ২,৫০০ বিদ্রোহী অন্যত্র গিয়ে লড়বার জন্য সেখানে জমায়েত হয়েছিলেন, এবং সেটির পিছন দিকের সমস্ত দরজাগুলিই বন্ধ ছিল। তাছাড়া, সেই সিপাহীদের সঙ্গে কোনো কামানও ছিল না। ফলে শত্রুর কামানের গোলাতে তাঁদের বেশীরভাগই ধ্বংস হয়েছিলেন। তারপরে ইংরেজরা বিদ্রোহীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। প্রতিটি বিদ্রোহীই ইংরেজদের বিরুদ্ধে শেষপর্যন্ত লড়াই করে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। এছাড়াও সেকেন্দারাবাগের যুদ্ধের আর একটি ঘটনা ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। সেকেন্দারাবাগের প্রাঙ্গণের মধ্যস্থলে একটা ঝাঁকড়া পিপ্পল গাছ ছিল, ও সেটির গোড়ায় কতগুলি জলের কলসী ছিল। একজন ইংরেজ অফিসার লিখেছিলেন, “হত্যাকাণ্ড যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তখন আমাদের অনেক লোক ছায়ার জন্য ও তাদের অসহ্য তৃষ্ণা নিবারণের জন্য ঐ গাছের নীচে যাচ্ছিল।” কিন্তু কিছুক্ষণ পরে দেখা গিয়েছিল যে, অনেক ইংরেজ সৈন্য মৃত অবস্থায় ওই গাছের গোড়ায় পড়ে রয়েছেন। তাতে অনেকের সন্দেহ হয়েছিল। তখন ‘ওয়ালেস’ নামক একজন ইংরেজ সৈন্য পিছনে সরে গিয়ে ওই গাছটিকে খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করতে শুরু করেছিলেন। “পরক্ষণেই সে চেঁচিয়ে বলে উঠল – ‘আমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছি’, তারপর সে গুলী ছুঁড়ল এবং তৎক্ষণাৎ একটা লাল কোট ও গোলাপী রঙের সিল্কের পাতলুন পরা এক ব্যক্তির দেহ মাটিতে এসে পড়ল। জোরে পড়ার ফলে তাঁর কোটের বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছিল। কাছে গিয়ে দেখা গেল যে, সে একজন স্ত্রীলোক! তাঁর সঙ্গে পুরানো ধরনের দুটি পিস্তল ছিল, একটি গুলীভরা অবস্থায় তাঁর বেল্টেই ছিল এবং আরেকটির দ্বারা সে ছয়জনের অমূল্য প্রাণ নষ্ট করেছিল।” (Reminiscences of the Great Mutiny, Forbes-Mitchell, পৃ- ৫৮) চারদিন ধরে বিদ্রোহীদের সঙ্গে ঘোরতর যুদ্ধের পরে অবশেষে ১৭ই নভেম্বর তারিখে ইংরেজরা সম্পূর্ণভাবে রেসিডেন্সী উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আবার ২২শে নভেম্বর তারিখে সমগ্র ইংরেজ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পবেলকে রেসিডেন্সী ত্যাগ করে কানপুর অভিমুখে ছুটতে হয়েছিল। আউটরাম তাঁর বাহিনী নিয়ে আলমবাগে রয়ে গিয়েছিলেন।
কানপুর বিদ্রোহীদের হস্তচ্যুত হওয়ার পরে ‘তাঁতিয়া তোপী’ নানা সাহেবের অনুমতি নিয়ে গোয়ালিয়রে চলে গিয়েছিলেন। সেখানকার শক্তিশালী ‘গোয়ালিয়র কনটিনজেন্ট’ জুন মাস থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিষ্ক্রিয় ভাবে বসেছিল, অবশেষে তাঁরা তাঁতিয়ার সঙ্গে যোগ দিতে সম্মত হয়ে ৯ই সেপ্টেম্বর তারিখে কল্পিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। ২৭শে নভেম্বর তারিখে নানা সাহেব কানপুর আক্রমণ করেছিলেন, ও জেনারেল ‘উইণ্ডহাম’কে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে কানপুর পুনরায় দখল করে নিয়েছিলেন। উইণ্ডহাম ইনট্রেঞ্চমেন্টে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এরপরেই নানা সাহেব তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছিলেন। তিনি গঙ্গার উপরে থাকা নৌকোর সেতুটি ভেঙে দেননি। এর ফলে ২৯শ তারিখে ক্যাম্পবেলের বাহিনী এক রকম বিনা বাধায় সেই সেতু পার করে কানপুরে প্রবেশ করেছিল; তার ফলে এলাহাবাদের পথ, যে পথ দিয়ে তখন একটা বিরাট ইংরেজ বাহিনী এগিয়ে আসছিল, তাঁদের জন্যও রাস্তা খুলে গিয়েছিল। নানা সাহেব শত্রুকে ৫/৬ দিন সময় দিয়ে আরো ভুল করেছিলেন। ক্যাম্পবেলের বাহিনী তখন লখনৌর স্ত্রীলোক, শিশু ও অসুস্থদের এলাহাবাদ পৌঁছিয়ে দিতে ব্যস্ত ছিল। সেই সুযোগে যদি বিদ্রোহীরা ক্যাম্পবেলকে পূর্ণোদ্যমে আক্রমণ করতেন, তা হলে তাঁদের প্রতিরোধ করা কিংবা সেতু রক্ষা করবার মত শক্তি ক্যাম্পবেলের ছিল না। তাঁতিয়া ৪ঠা ডিসেম্বর তারিখে সেই ভুল সংশোধন করবার একটা চেষ্টা করেছিলেন; ঐদিন তিনি প্রচণ্ডভাবে ইংরেজদের আক্রমণ করেছিলেন ও সেতুটি ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু ওই শেষ মুহূর্তে তাঁকে ব্যর্থ হতে হয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে, ৪ঠা ও ৫ই ডিসেম্বর তারিখে কলকাতা থেকে ৫,৬০০ সৈন্যের একটা ইংরেজ বাহিনী ৩৫টা কামান নিয়ে কানপুর পৌঁছে গিয়েছিল। তাছাড়া দিল্লী থেকেও একটা বড় বাহিনী ‘হোপ গ্র্যান্টের’ নেতৃত্বে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। ৬ই ডিসেম্বর তারিখে ইংরেজরাই বিদ্রোহীদের উপরে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছিলেন। ওই তারিখে সমস্ত দিন ও রাত্রিব্যাপী যুদ্ধের পরে বিদ্রোহীরা কানপুর ত্যাগ করেছিলেন, এবং নানা সাহেবও নদী পার করে অযোধ্যায় চলে গিয়েছিলেন। কিছুদিন পরে ‘ফতেগড়’ ইংরেজদের হাতে আক্রান্ত হয়েছিল। কানপুর থেকে ৮০ মাইল উত্তরে গঙ্গার ধারে সেই সামরিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে জনসাধারণ ও সিপাহীরা ‘ফরাক্কাবাদের’ নবাবের অধীনে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, এবং তাঁদের আক্রমণে ‘কর্নেল স্মিথ’ ও অন্যান্য ইংরেজদের সেখান থেকে পালাতে হয়েছিল। ১৮৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে ফতেগড় দু’দিক থেকে ইংরেজদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল – একদল এসেছিল দিল্লী থেকে, আরেকদল এসেছিল কানপুর থেকে। ১৮৫৮ সালের ৩রা জানুয়ারি তারিখে ইংরেজরা আবার ফতেগড় অধিকার করে নিয়েছিলেন। সেই দিনই ফরাক্কাবাদের নবাবকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। “প্রথমতঃ, তাঁর শরীরের সর্বত্র শুয়োরের চর্বি ঢেলে দেওয়া হল, ও ঝাড়ুদার দিয়ে তাঁকে বেত মারা হল, তারপর তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হল। এটা করা হয়েছিল কমিশনারের হুকুমে।” (Reminiscences of the Great Mutiny, Forbes-Mitchell, পৃ- ১৬৯) কমিশনার ‘পাওয়ার’ সমগ্র ফতেগড় জেলা ঘুরে বেরিয়েছিলেন, এবং কোন জোয়ান দেশীয় লোককে দেখা মাত্রই তাঁদের ধরে ধরে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন। একমাত্র ‘মাও’ নামক একটা ছোট জায়গাতেই তিন দিনের মধ্যে একটা বড় পিপ্পল গাছের শাখায় কমপক্ষে ১০০ লোককে তিনি ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন। এতে পাওয়ারের বন্ধুরা তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘হ্যাঙ্গিং পাওয়ার’ (‘Hanging Power’) উপাধি দিয়েছিলেন। (রিকলেসন্স্ অব এ হাইল্যাণ্ড সাবঅল্টার্ন, গর্ডন-আলেকজাণ্ডার, পৃ- ২১০) ফতেগড় সম্বন্ধে ফোরবস-মিচেল লিখেছিলেন, “কমিশনার পুলিস স্টেশনে তাঁর আদালত বসালেন। আমি জানি না বন্দীদের কিভাবে বিচার করা হয়েছিল, অথবা কি রকম সাক্ষ্য প্রমাণ তাঁদের বিরুদ্ধে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। আমি এইটুকু মাত্র জানি যে, বন্দীদের দলে দলে মার্চ করিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তার পরক্ষণেই পুলিস স্টেশনের সামনেই যে একটা মস্ত বড় বটগাছ ছিল, সেখানে আবার মার্চ করিয়ে নিয়ে গিয়ে তাঁদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল। এই কাজ শুরু হয় বেলা ৩টার সময় এবং অনবরত চলতে থাকে পরের দিন সকালবেলা পর্যন্ত। তখন দেখা গেল যে, গাছে আর একটুও জায়গা খালি নেই, এবং ঐ সময়ের মধ্যে ১৩০ জনকে ঝোলানো হয়ে গিয়েছে। একটা ভয়াবহ দৃশ্য তাতে কোন সন্দেহ নেই।” ওই ঘটনার আগে যে বিখ্যাত ইংরেজ বীরপুরুষ দিল্লীতে নিরস্ত্র বন্দী মোঘল শাহজাদাদের স্বহস্তে খুন করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, সেই ‘হডসন’ও ওই ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন। হডসনও তখন সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে ঘৃণায় বলে উঠেছিলেন, “এই সব কাজ আর আমার সহ্য হচ্ছে না। আমার যে এখন কোনো ডিউটি নেই, তাতে আমি খুবই খুশী।” (Reminiscences of the Great Mutiny, Forbes-Mitchell, পৃ: ১৬৯-৭১)
কানপুর ও ফতেগড় দখলের পরে সমগ্র গঙ্গা-যমুনা দোয়াব, অন্ততঃ সেই অঞ্চলের শহরগুলি, ইংরেজের অধিকারে এসেছিল, এবং কলকাতা থেকে লাহোর, পেশোয়ার পর্যন্ত সমস্ত ‘গ্র্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড’টাই ইংরেজ সৈন্য ও সাজসরঞ্জামের যাতায়াতের জন্য মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনও উত্তরে সমগ্র রোহিলখণ্ড ও অযোধ্যা এবং দক্ষিণে সমগ্র বুন্দেলখণ্ড সম্পূর্ণভাবে বিদ্রোহীদের অধিকারেই থেকে গিয়েছিল।
©️রানা©️
(তথ্যসূত্র:
১- History of the Indian Mutiny, 3 Vols., Charles Ball.
২- A History of the Sepoy War in India, 3 Vols, Sir John William Kaye.
৩- History of the Indian Mutiny, 3 Vols., G. W. Forrest.
৪- India Struggles for Freedom, Hirendranath Mukherjee.
৫- Reminiscences of the Great Mutiny, Forbes-Mitchell.
৬- Personal Narrative of the Siege of Lucknow, L. E. R. Rees.)

©️রানা চক্রবর্তী©️

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ