বুলিংয়ের শিকার তারকা: বিকৃত মানসিকতার পরিচয়

প্রকাশিত: ৬:০৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৯, ২০২২

বুলিংয়ের শিকার তারকা: বিকৃত মানসিকতার পরিচয়

নুরজাহান নুর |

তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই। কখন কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন, এসব যেন জানতেই হবে। আর বড় তারকা হতে গেলে প্রচারণার বিকল্প নেই। বিশেষ করে শোবিজ অঙ্গনে। একসময় গণমাধ্যমই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু আধুনিকতার এই যুগে বদলে গেছে সেই ধরন। তারকারা নিজেদের নতুন সৃষ্টি কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের যেকোনো ঘটনা মুহূর্তেই ভক্তদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দিয়ে। তারকাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে তাদের ফলো করে থাকেন নেটিজেনরা। আর পেয়ে যান তাদের কাঙ্ক্ষিত সব সংবাদ। কিন্তু এতে ভালোর পাশাপাশি মন্দটাও গ্রহণ করতে হচ্ছে তাদের। প্রতিনিয়ত অনলাইন বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন তারকারা।

দেখা গেছে, বেশিরভাগ তারকার কমেন্ট সেকশন অশালীন মন্তব্যে পূর্ণ। অনেক সময় তাদের ছবি দিয়ে খোলা হয় ফেক অ্যাকাউন্ট। যা দিয়ে বিভিন্ন আইনবহির্ভূত কার্যক্রমও ঘটানো হচ্ছে। পাশাপাশি তারকাদের আইডি হ্যাক হওয়ার ঘটনা এখন হরহামেশাই হচ্ছে। এর বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটছে ফেসবুকে। অনুসারীদের কাছ থেকে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় বিব্রত তারকারা। তারকাদের ছবি বা পোস্টের কমেন্ট সেকশনে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা কিছু টক্সিক নেটিজেনের দৈনন্দিন কাজ।

সম্প্রতি এপার বাংলা-ওপার বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান তার ফেসবুক পেজে ছবি পোস্ট করেন। আর কমেন্ট সেকশনে বরাবরের মতোই অশ্লীল মন্তব্য। মন্তব্যগুলো এতটাই কুরুচিপূর্ণ যে, তা প্রকাশযোগ্য নয়। যারা এসব মন্তব্য করেন, তাদের মূল্যবোধ কতটুকু আছে বা তারা কতটুকু মানুষ হওয়ার যোগ্য, তাই আজ প্রশ্ন। অনলাইন বিড়ম্বনা নিয়ে অভিনেত্রী জয়া আহসান বলেন, ‘এখন আমি বাংলাদেশ ও কলকাতায় নিয়মিত কাজ করি। কিন্তু বাংলাদেশে যে পরিমাণ বুলিংয়ের শিকার হই, তা ভয়াবহ। এখন এসব গায়ে মাখি না।’

একুশে টেলিভিশন তারকাদের অনলাইন বিড়ম্বনা নিয়ে কথা বলছেন শোবিজের কয়েকজন বিখ্যাত তারকার সঙ্গে। জাকিয়া বারী মম বলেন,‘একটা শ্রেণি আছে, যারা অন্যদের বিষয়ে সবসময় নোংরা ভাষায় কথা বলে। আগে যেটা অনলাইনের বাইরে ছিল, এখন সেই বিকৃত মানসিকতার লোকরাই অনলাইনের দুনিয়ায় প্রবেশ করেছে। এদের কোনো বাছবিচার নেই।’

ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস সাইবার হয়রানি প্রসঙ্গে বলেন, ‘অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ আমরা পুরস্কার পাই। বাহবা পাই। দর্শক ভক্তরা আমাদের অভিনয়কে ভালোবেসেই তা করেন। এতে যেমন আমরা খুব খুশি হই, পাশাপাশি এটাও মাথায় রাখতে হবে আমরা কিন্তু শুধু আলোচনার ঊর্ধ্বে নই। আমাদের সবাই পছন্দ করেন না। তাই সমালোচনা কিংবা বকাঝকা সহ্য করার মতো মানসিকতা আমাদের থাকতে হবে। এখন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা। তাই সব কিছু মেনে নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’

তারকাদের ছেলে-মেয়েরাও মুক্তি পায় না এই মন্তব্য থেকে। সম্প্রতি সাকিব আল হাসানের ছোট্ট মেয়ে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। এসব কথা থেকে মুক্তি পায় না অপুর ৫ বছরের ছেলে আব্রাহাম বা বুবলির অবুঝ ছেলে শেহজাদ। এই ফুলের কুঁড়ির মতো বাচ্চাদের ছবিতে বাজে মন্তব্য কিভাবে সম্ভব, তা আমি ভেবে পাই না।

একজন মানুষ হিসেবে আমাদের বাক-স্বাধীনতা আছে অবশ্যই। কিন্তু বাক-স্বাধীনতার মানে কাউকে অশালীন মন্তব্য করা নয়। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাজে মন্তব্য করেন, তারা হয়তো জানেই না যে, এই ব্যাপারটি অপরাধের মধ্যেই পড়ে। এই সাইবার বুলিং রুখতে আরও কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। সাইবার বুলিং একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজনের পোস্টে কমেন্ট করার স্বাধীনতা দেওয়ার মানে এই নয় যে,যা খুশি তা লিখতে হবে। কাকে কী লিখবে, কোথায় কোন ভাষা ব্যবহার করবে, এটা না জানলে তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকার প্রয়োজন নেই।

ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও মানুষের চিন্তা-ভাবনাই মূলত এই সাইবার বুলিং এর জন্য দায়ী। একজনের হাতে একটা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট থাকলেই ভাবে সে যা খুশি মন্তব্য করতে পারে। একজন তারকাকে নিয়ে মুখে যা আসে তা বলতে পারে। কিন্তু তা অনেক বড় অপরাধ।

কমেন্টে বাজে মন্তব্যের পাশাপাশি ফেইক আইডিও ভয়ের কারণ। তারকাদের মধ্যে ফেইক আইডি নিয়ে অনেক যন্ত্রণার মধ্যে আছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। প্রতারকরা প্রতিনিয়ত তার নামে নতুন নতুন আইডি খুলছে। এসব আইডির মধ্যে তার পুরো নামসহ আরও রয়েছে- মিষ্টি মেয়ে পরী, রূপালী পরী, পরীকন্যা ইত্যাদি। সব আইডিতে তার নতুন নতুন ছবি আপলোড করা হচ্ছে। ফলে এটা যে ফেইক আইডি, তা ভক্তদের বোঝার কোনো উপায় থাকছে না। আর তারকাদের নামে ফেইক আইডি খুলে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও করছে প্রতারকরা।

তাই শিগগিরই সাইবার বুলিং বন্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ করতে হবে। একটি স্বাভাবিক সামাজিক প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনতে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ