সিলেট ১২ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:২০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কিংবদন্তি শিক্ষক তিনি, বলা যায় শিক্ষকদের শিক্ষক। তাঁর আরেক পরিচয় তিনি এদেশের শীর্ষ রবীন্দ্র গবেষক। তিনি সৈয়দ আকরম হোসেন, বুদ্ধিজীবী মহলে পরম শ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তিত্ব, কেবল জ্ঞানদীপ্তির জন্য নয়, তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভা, আপোষহীন নির্লোভ অবস্থান তাকে এক অনন্য শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে। এমন একজন বিরল মানুষের সাথে একত্র ভ্রমণের প্রস্তাব এলে ফেরানো হবে পাপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফাউন্ডেশন, কুষ্টিয়া সৈয়দ আকরম হোসেনকে সম্মাননা দিবে, ঢাকা ছেড়ে কদাচিৎ বাইরে যাওয়া মানুষটি কুষ্টিয়া যাবেন সে সম্মাননা গ্রহণ করতে। সঙ্গী হিসেবে কাউকে নিতে চান কিনা মাহমুদ হাফিজের এমন প্রস্তাবে স্যার পছন্দ করলেন আমাকে। এ এক সৌভাগ্য আমার। তাঁর সাথে ভ্রমণের সুযোগ পেতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে অগুণিত ভক্তকুল- আমি জানি।
দিনটি মঙ্গলবার। ঠিক ছিল আমরা তিনটার বাসে চড়ব। সমস্যা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ক্লাস আছে তিনটা তক। আমাকে accommodate করার জন্য বাস নেওয়া হলো সাড়ে পাঁচটায়। ক্লাস শেষে আমি চলে যাই গুলশানে মাহমুদ হাফিজের বাসায়, তিনি তখুনি নেমে আসায় ওই একই বাহনে চড়ে আমরা চলে যাই কল্যাণপুরে। খালেক পাম্পের একপাশে এই এস বি পরিবহন, তার যাত্রী অপেক্ষার কাউন্টারে প্রবেশ করে প্রথমেই আমরা সৈয়দ আকরম হোসেনকে আবিস্কার করি। শুভ্র বেশ, শুভ্র কেশ, শুভ্র মন ও শুভ্র চেতনার শুভ্র মানুষ। উত্তরা থেকে আশুলিয়ার সড়ক বেয়ে তিনি এসেছেন গাড়ি ছাড়ার এক ঘণ্টারও বেশি আগে। এসে দেখেছেন সোয়া চারটার গাড়ি তখনো ছাড়েনি। আমরা তো সে গাড়িতেও যেতে পারতাম। মাহমুদ হাফিজ এর ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে সোয়া চারটার গাড়ি যাবে পদ্মা সেতু পেরিয়ে, সময় লাগবে ৬ ঘণ্টা, আমাদের গাড়ি যাবে আরিচায় ফেরিতে পদ্মা পেরিয়ে, সময় লাগবে সাড়ে ৪ ঘণ্টা। এ দুটি রুট ছাড়াও আরেকটি রুট আছে। পদ্মা নয়, আরও উজানে যমুনা পেরিয়ে সিরাজগঞ্জ হয়ে।
‘তাহলে কুষ্টিয়া যাওয়া যায় তিন রুটে,’ আমি মাহমুদ হাফিজকে বলি। তিনি বললেন, ‘না, আপনি প্লেনেও যেতে পারবেন। কুষ্টিয়ায় অবশ্য এয়ারপোর্ট নেই। যশোরে নেমে সড়কপথে দেড় ঘন্টার জার্নি। আমি বললাম, তাহলে ট্রেন বাদ থাকবে কেন? আমার মনে পড়ল শৈশবে ট্রেনে চড়ে কুষ্টিয়া যাওয়ার স্মৃতি। সেটা অবশ্য ফরিদপুর থেকে গিয়েছিলাম। ট্রেনের টিকেট আপনি পাবেন না, শর্ট নোটিসে তো নয়ই। তাই বাস ভরসা। আমরা ভরসার বাস ধরতে এক ঘণ্টা আগে বাস কাউন্টারে এসে হাজির।
লাগেজগুলো টিকেট কাউন্টারে গচ্ছিত রেখে আমরা যাই চা খেতে। খালেক পাম্পের পুর্বপাশে দুটি দোকান, একটি ছোটো, অন্যটি বড়ো। বড়োটির চেহারা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মতো। তার ভেতরে চেয়ার টেবিল পাতা। সেখানে বসে চায়ের সাথে আমরা আকরম স্যারের মুখনিঃসৃত কথা অমৃতের মতো পান করি। তিনি বলছিলেন রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের কথা যারা ছিলেন পূর্ববঙ্গের মানুষ, পিরালী ব্রাহ্মণ। কখন কুশ গ্রামের হিন্দুরা হলো কুশারী, মুখ গ্রামের হিন্দুরা হলো মুখোপাধ্যায় আর খান জাহান আলী পীরের এলাকার হিন্দুরা পিরালী। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ পঞ্চানন ও শুকদেব ভাগ্যান্বেষণে নৌকা নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল পশ্চিমে। নৌকা এসে ভিড়েছিল গঙ্গার মুখে। সেখানে জেলেরা মাছ ধরছিল নদীতে। পঞ্চানন কুশারী ও শুকদেবের গলায় পৈতা ও মালা দেখে ধীবর ও মাঝিরা
মহাখুশি, কেননা পুজো-আচ্চা করতে পারবে। সেটা হেস্টিংসের যুগ। ইংরেজদের জাহাজে মাল খালাস করা ভারতীয় কুলিরাও দুই ব্রাহ্মণ দেখে খুশি। তারা পঞ্চানন ও শুকদেবকে ঠাকুর বলে ডাকতে লাগল। এ থেকেই তারা হলো ঠাকুর পরিবার। ইংরেজরা ঠাকুর উচ্চারণ করতে পারতো না, তারা বলতো ট্যাগোর, লগবুকে এদের নাম উঠল Tagore।
রবীন্দ্রনাথকে জমিদার বলাটা ভুল বলে মনে করেন রবীন্দ্রগবেষক সৈয়দ আকরম হোসেন। তার ব্যাখ্যা হলো জমিদার তো তিনি যার আয় জমি থেকে। ঠাকুর পরিবারের আয়ের উৎস ছিল ব্যবসা, জমি নয়। জমিদারী তারা কিনেছিল অনেক পরে। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ধনাঢ্য ব্যক্তি, তিনি ভারতে প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, নাম ইউনিয়ন ব্যাংক, তার ছিল মোটর গাড়ি, কয়লা, লবন, আমদানি রফতানির ব্যবসা। প্রিন্স দ্বারকানাথ অনেকগুলো ভাষা জানতেন। তখন আদালতে ইংরেজ বিচারককে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার উকিলী জেরা ও বাদানুবাদ ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে হতো। বেশ ভালো পয়সা পাওয়া যেত এই দোভাষীর কাজে। দ্বারকানাথের প্রাথমিক অর্থসমাগম হয়েছিল আদালতে দোভাষীর কাজ করে। পরে তিনি রানীর সুনজরে পড়ে যান। বেলঘরিয়ায় কুইন ভিক্টোরিয়াকে তিনি যে সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন তার জৌলুষ দেখে ইংরেজদের পর্যন্ত তাক লেগে গিয়েছিল।
২.
সৈয়দ আকরম হোসেন হলেন চলন্ত রবীন্দ্র অভিধান। কল্যাণপুরের দূরপাল্লার বাস টার্মিনালের এক আধুনিক মনোহারী দোকানে বসে দুধ ও চিনিহীন চা নামের বিস্বাদিত তরল পান করতে করতে মাহমুদ হাফিজ ও আমি সৈয়দ আকরম হোসেনের স্বাদুবাক্যের অমৃত পান করে চলি। তিনি বলছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃপুরুষের ইতিহাস।
প্রথম যৌবনে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন চোস্ত আধুনিক, স্যুট-টাই-পরা ভারতীয় সাহেব। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর পুত্র দেবেন্দ্রনাথকে ২৫ বছর বয়সেই ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালক বানিয়ে দিয়েছিলেন। একদিন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পায়ের কাছে একটা দলাপাকানো কাগজ এসে পড়ল। তিনি সেটা পকেটে ভরে রাখলেন। বাড়ি ফিরে কাগজের ভাঁজ খুলে দেখেন তাতে উপনিষদের বাণী লেখা ‘পরের ধনে লোভ করো না। নিজের ধন অর্জন করো’। ওই বাণী পাঠের পর তাঁর জীবনদর্শন বদলে গেল, তিনি ভাবুক ও সংসারবিবাগী হয়ে উঠলেন। পুত্রের বৈরাগ্য দেখে পিতা দ্বারকানাথ পূর্ববঙ্গে জমিদারী কিনলেন, যাতে তার অবর্তমানে দেবেন্দ্রনাথ জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
সে সময়ে খাজনা দিতে অসমর্থ হলে জমিদারি নীলামে উঠত সূর্যাস্ত আইন মেনে। সেভাবেই পতিসর, শাহজাদপুর ও শিলাইদহের জমিদারি কেনা। দ্বারকানাথের হাতে তখন প্রচুর কাঁচা টাকা, তিনি রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রশ্রয়প্রাপ্ত। জমিদারি কেনার আরেক কারণ নিজস্ব জমিতে নীল চাষ করে ইংল্যান্ডে রফতানি করে অধিকতর মুনাফা লাভ। তখন ওই অঞ্চলে নীল চাষ হতো। ঠাকুর পরিবার বংশানুক্রমিকভাবে জমিদার ছিলেন না, তারা মূলতঃ ব্যবসায়ী পরিবার। পূর্ববঙ্গের এক গ্রাম থেকে ভাগ্যান্বেষণে কলকাতা এসে এরা ধনাঢ্য হয়েছিলেন। সুতরাং রবীন্দ্রনাথকে জমিদার বলা ভুল।
সৈয়দ আকরম হোসেন ছাত্র পড়িয়েছেন ৫৫ বছর। তিনি যেখানেই যান সেখানেই ছাত্ররা তাকে ঘিরে ধরে, তাঁর জ্ঞানপ্রদীপের দীপ্তিতে আলোকিত করতে চায় অন্তরদীপ। জ্ঞান আলোর মতোই, এক প্রদীপ জ্বালাতে পারে সহস্র প্রদীপ, শিক্ষকরা এই কাজটি করেন। এমুহূর্তে মাহমুদ হাফিজ ও আমি সৈয়দ আকরম হোসেনের মনোযোগী ছাত্র। সক্রেটিস যা বলতেন তা লিখে নিতেন তাঁর শিষ্যরা, আমিও লিখে নিচ্ছি আকরম স্যার যা বলছেন তা। ৩৩ বছর আগে মাহমুদ হাফিজ সরাসরি তাঁর ছাত্র ছিলেন; আমার সে সৌভাগ্য হয়নি।
পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরের কর্মযোগ আর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্তিযোগ এসে মিশল রবীন্দ্রনাথে। তাই তো আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথ একদিকে জমিদারি সামলাচ্ছেন, শান্তিনিকেতনে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করছেন, অন্যদিকে কবিতা রচনা করছেন। তাঁর জিনে দুপ্রকার জিন এসে মিশেছিল। রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ভারতের প্রথম আইসিএস অফিসার, মেজো ভাই ভারতের প্রথম ব্যারিস্টার। রবীন্দ্রনাথের কিন্তু প্রথাগত পড়াশোনায় মন ছিল না। পিতার মতো সে ভাবুক, অধ্যাত্মবাদী, সংসারে অমনোযোগী। চপ্পল পায়ে কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে শেলী, কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, বায়রনের বই কিনে এনে পড়তেন। তার বিবাগী মন আর সন্তবেশ দেখে ঘাবড়ে গিয়ে পিতা তাকে সংসার সংলগ্ন করার অভিপ্রায়ে বিয়ে করানোর তোড়জোড় করলেন। পিতার নির্দেশ মেনে নিলেন, কিন্ত কন্যা দেখতে গেলেন না, এতটাই নির্বিকার ছিলেন নিজের বিয়েতে।
আমরা শুনছি রবীন্দ্রনাথের জীবনের গল্প, এর অনেকটাই আমাদের জানা, কিন্তু যা জানা নেই তা হলো কার্যকারণের ব্যাখ্যা, ঘটনাসমূহের যোগসূত্র। হঠাৎ আলোর উদ্ভাসনের মতো আসে আকরম স্যারের অভিজ্ঞানসঞ্জাত উক্তি। যেমন ঐ কর্মযোগ আর ভক্তিযোগের সমাহারে রবীন্দ্রনাথের মানসগঠনের বিষয়টি; ঠাকুর পরিবার ব্যবসায়ী পরিবার, জমিদার পরিবার নয়- এই সিদ্ধান্ত। স্যার বললেন, রবীন্দ্রনাথকে ১৮ বছর বয়সে ইংল্যান্ড পাঠানো হচ্ছিল ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য। তিনি যাননি, মাদ্রাজ থেকে ফিরে এসেছিলেন। একথা বলার পর আকরম স্যার আমাদের চমকে দিয়ে বললেন, রবীন্দ্রনাথ যে ব্যারিস্টার হননি তা ছিল মঙ্গলজনক। কী হতো ব্যারিস্টার হয়ে? ব্যারিস্টার আছে হাজার হাজার, রবীন্দ্রনাথ তো ঐ একজনই। বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি, বাঙালির অপার উল্লাস যে রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত যাননি। মাহমুদ হাফিজ ও আমি যারপরনাই বিস্মিত!
৩.
তর্কাতীতভাবে সৃজনশীলতার জগতে
বাঙালির সবচেয়ে বড়ো প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ। তিনি মিশে আছেন বাঙালির সকল উৎসব, সকল স্পন্দন, সকল যাপনে। প্রতিদিন তিনি উদিত হন বাঙালির প্রাণে, বাংলার আকাশে রবির মতোই রবীন্দ্রনাথ। তাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাঙালির আবেগ ও আগ্রহের অন্ত নেই। রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণাকর্মও প্রচুর। সৈয়দ আকরম হোসেন গবেষণার জন্য বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর এম ফিল থিসিস ‘রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : দেশকাল ও শিল্পরূপ’ এতটাই মূল্যবান রচনা ছিল যে বাংলা বিভাগ তা পুস্তকাকারে মুদ্রিত করেছিল। কোনো ছাত্রের থিসিস বই আকারে প্রকাশ বাংলা বিভাগে ওই প্রথম। তাঁর পিএইচডি থিসিস ‘রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : চেতনালোক ও শিল্পরূপ’ও পুস্তকাকারে প্রকাশিত হলো। বই দুটোর নাম মাহমুদ হাফিজের ঠোঁটস্থ, কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের হেন ছাত্র নেই যারা রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পাঠের সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে সৈয়দ আকরম হোসেনের এ দুটো বই পড়েননি।
সৈয়দ আকরম হোসেনের ছাত্ররা ছড়িয়ে আছেন সমাজের সকল স্তরেই। ১৯৬৮ সালে তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তখন থেকে পরবর্তী ৫৫ বছর তিনি পড়িয়েছেন। পয়ষট্টি বছর বয়স পর্যন্ত তো বটেই, এরপরে ছিলেন সুপারনিউমারি প্রফেসর। পরবর্তীকালে বাংলা বিভাগে যারা খ্যাতিমান প্রফেসর হয়েছেন তারা সকলেই তার সরাসরি ছাত্র। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্বচ্ছ হবে- এ মুহূর্তে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ আকরম হোসেনের সরাসরি ছাত্র। ভাবা যায়?
কেবল একাডেমিক জগতে নয় সৈয়দ আকরম হোসেনের ছাত্ররা প্রশাসনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করেছেন। একবার তারা তাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন অফিসার্স ক্লাবে একটি বক্তৃতা দিতে। সংগঠকদের আশঙ্কা ছিল রবীন্দ্রনাথের ঊপর বক্তৃতা শুনতে তেমন শ্রোতা আসবে কিনা। আকরম স্যার বলেছিলেন মনোযোগী শ্রোতা সাতজন পেলেই যথেষ্ট। সেদিন তাঁর বক্তৃতা শুনতে হলঘর ভরে গিয়েছিল, অতিরিক্ত চেয়ার আনতে হয়েছিল অন্য ঘর থেকে। এর কারণ কী? প্রথম কারণ রবীন্দ্রনাথে বাঙালির চিরকালীন আগ্রহ। দ্বিতীয় কারণ সৈয়দ আকরম হোসেনের মাধুর্যময় জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা। টানা দু’ঘন্টা তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন শ্রোতাদের যারা প্রধানত এলিট শ্রেণির।
কুষ্টিয়াগামী বাস ছাড়বে সাড়ে পাঁচটায়, আমরা বাস টার্মিনালে পৌঁছেছি সাড়ে চারটায়। মাঝের এই একটি ঘণ্টা আমার জন্য হলো রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ গবেষক সৈয়দ আকরম হোসেনকে জানার সুবর্ণ সময়। আমি রোমাঞ্চিত সময়পর্বটি এখানেই শেষ নয়, এটা সম্প্রসারিত হবে আজ ও আগামীকাল। স্যার বললেন জমিদার তো অনেকেই ছিল। কালের গর্ভে তারা সকলেই বিলীন, সে অর্থে জমিদার না হয়েও রবীন্দ্রনাথ টিকে আছেন, টিকে থাকবেন ততদিন যতদিন এ ধরায় বাঙালি থাকবে।
সৈয়দ আকরম হোসেন বলছেন, আমরা শুনছি। ১৩ বছর পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ প্রায় গৃহবন্দী ছিলেন, ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনা ও কলকাতা ছেড়ে বাইরে তেমন যাননি। ১৩ বছর বয়সে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো হিমালয় দেখাতে। কলকাতার বাইরে প্রকৃতির মাঝে গিয়ে তিনি মুগ্ধ হলেন। পরবর্তীকালে সে স্থানের প্রেক্ষাপটে, সে স্মৃতি অবলম্বন করে লিখলেন বউ-ঠাকুরানীর হাট। রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস অবশ্য ‘করুণা’- দুর্বল সে লেখাকে তিনি নিজেই বাতিল করতে চেয়েছিলেন। ‘করুণা’, ‘রাজর্ষি’ ও ‘বউ-ঠাকুরানীর হাট’ – এ তিনটি হলো রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের উপন্যাস। প্রথম পর্ব শেষে রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করলেন বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতা অর্জিত না হলে উপন্যাস লেখা যায় না। যে কারণে পরবর্তী ১৪ বছর তিনি উপন্যাস লেখেননি। দ্বিতীয় পর্বে লিখলেন ‘চোখের বালি’, ‘নৌকাডুবি’। আকরম স্যার বললেন, রবীন্দ্র উপন্যাসের তৃতীয়, চতুর্থ পর্বও রয়েছে।
বাস ছাড়ার সময় নিকটবর্তী হলে আমরা বাস কাউন্টারে এসে বসি। এসে শুনি বাস ছাড়বে আধ ঘণ্টা পরে। ডিপার্টমেন্ট স্টোরে দেখেছিলাম তৃতীয় লিঙ্গের চারজনকে, নারীর মতো দেহসৌষ্ঠব হলেও তাদের ঠিক নারী বলা যাবে না। বাস কাউন্টারে এসে দেখি সেই চারজন ‘চাঁদা’ তুলছে। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের কোথাও কি তৃতীয় লিঙ্গের কোনো চরিত্র রয়েছে? এমন একটি প্রশ্ন আমার মনে এলেও স্যারকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে যাই।
কুষ্টিয়াগামী বাস ছাড়ল সন্ধ্যা ছয়টায়। দিনের রবি অস্তগামী হলেও আমাদের চেতনালোকে যে রবি রয়েছেন তিনি দিবাবসানেও উজ্জ্বল। উপরন্তু আমাদের সঙ্গে রয়েছেন এক রবিকরোজ্জ্বল মনীষী।
পুনশ্চঃ আজ সৈয়দ আকরম হোসেনের জন্মদিন। জন্মদিনে স্যারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাতে দুবছর আগে লেখা রিপোস্ট করছি। স্যারের সাথে কুষ্টিয়ায় যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেসময়ে লেখা। স্যার ও আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কবি ও ভ্রামণিক মাহমুদ হাফিজ। কুষ্টিয়ার সন্তান তিনি।
#
কামরুল হাসান
কবি, লেখক ও শিক্ষাবিদ
সহকারী অধ্যাপক
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
ঢাকা।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি