নারী প্রশ্ন, রোকেয়া-সম্পর্কিত ১১টি থিসিস ও কবিতায় রাজনীতি

প্রকাশিত: ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০২৫

নারী প্রশ্ন, রোকেয়া-সম্পর্কিত ১১টি থিসিস ও কবিতায় রাজনীতি

Manual4 Ad Code

আজফার হোসেন |


নারী প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে ইতিহাসের ভেতরে হাজির হয় না; প্রশ্নটি একটি র‍্যাডিকাল প্রশ্নও বটে। ইংরেজি শব্দ ‘র‍্যাডিকাল’ উদ্ভুত হয়েছে লাতিন ‘রেইডিক্স’ এবং ‘র‍্যাডিক্যালিস্’ থেকে, যাদের অর্থ ইংরেজিতে ‘রুট’ (এবং বাংলায় ‘মূল’)। এবং নারী প্রশ্নের র‍্যাডিকাল চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য এই জায়গায় যে, প্রশ্নটি আমাদেরকে বিরাজমান অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের মূলে নিয়ে যায়। বেগম রোকেয়ার রাজনৈতিক পুনর্পাঠে এই বিষয়টি পরিষ্কার হতে থাকে যে, সমাজের তাবৎ অসম ক্ষমতা-সম্পর্ককে প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ করতে থাকে নারী প্রশ্ন নিজেই। এও বলা যাবে যে, লিঙ্গ, শ্রেণী, বর্ণ (‘রেইস’ অর্থে) ও অন্যান্য বিভাজন-ও-বৈষম্য-ভিত্তিক সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে যোগসাজশে একই সঙ্গে উৎপাদন-সম্পর্ক ও ক্ষমতা-সম্পর্কের দিগন্ত রচনা করে।


রোকেয়ার কাজের পুনর্পাঠে এই বিষয়টা—অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে—পরিষ্কার হতে থাকে যে, উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ ও পুরুষতন্ত্রসহ বিভিন্ন কাঠামোগত ক্ষমতা-সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে নারী প্রশ্নকে র‍্যাডিকাল হয়ে উঠতে গেলে সেখানে জরুরি হয়ে ওঠে এক ধরনের passage বা অবস্থানান্তর। সেই অবস্থানান্তরকে ইংরেজিতে এভাবে বলা যায় : women-in-themselves থেকে women-for-themselves-এ। অর্থাৎ নারীকে নারীর অবস্থানে কেবল নারী হিসাবে চিহ্নিত করাটাই যথেষ্ট নয়; নারীকে নারীর জন্য সচেতনভাবেই রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে ইতিহাসের মঞ্চে উপস্থিত হতে হয় প্রবলভাবে। এই অবস্থানান্তরের কথা বোঝানোর জন্য একজন লড়াকু কবির—লাতিন আমেরিকার লড়াকু কম্যুনিস্ট কবি রোকে ডাল্টনের—একটা দুর্দান্ত কবিতার কাছে যাওয়া যেতে পারে, যদিও রোকেয়ার পরিপ্রেক্ষিত এবং সময় থেকে কবি রোকে ডাল্টনের পরিপ্রেক্ষিত ও সময় অনেক আলাদা। আমার তর্জমায় ডাল্টনের কবিতাটা দাঁড়াচ্ছে এ-রকমঃ

আরো দুর্দান্ত প্রেমের জন্য

সকলেই মানেন যে, যৌনতা
প্রেমিক-প্রেমিকার পৃথিবীতে শর্ত বটে :
এ-কারণে পেলবতা আর তার বুনো শাখা-প্রশাখা।

সকলেই মানেন যে, যৌনতা
পরিবারের অভ্যন্তরে দারুণ প্রয়োজনীয় :
এ-কারণে সন্তান-সন্ততি,
এক সঙ্গে রাত্রি যাপন
আর দিনে আলাদা থাকা
(পুরুষ জীবিকার কারণে থাকে রাস্তায়,
অফিসে কিংবা ফ্যাক্টরিতে;
নারী থাকে পারিবারিক কাজের পশ্চাৎরক্ষী সৈনিক হিসেবে,
রান্নাঘরের রণকৌশল আর রণনীতিতে
যাতে অভিন্ন লড়াইয়ে তারা টিকে থাকে
নিদেনপক্ষে মাসের শেষ পর্যন্ত।)

সকলেই মানেন যে, যৌনতা
একটি অর্থনৈতিক ক্যাটাগরি :
এ-ক্ষেত্রে যৌনকর্মীদের উল্লেখ করাই যথেষ্ট,
কিংবা ফ্যাশনের কথা
সংবাদপত্রে নারীর জন্য বরাদ্দ আলাদা পাতা
কিংবা পুরুষের জন্য।

কিন্তু ঝামেলা বাধে তখনই
যখন একজন নারী বলে ওঠেন—
যৌনতা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক ক্যাটাগরি।

কেননা যখন একজন নারী বলে ওঠেন—
যৌনতা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক ক্যাটাগরি,
ঠিক তখনই তিনি কেবল নারী থাকেন না,
তিনি হয়ে ওঠেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন নারী
নারীর পক্ষে নারী হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত হন
তিনি তাঁর যাত্রা শুরু করেন মানুষ-হওয়া থেকে,
যৌনতা থেকে নয়,
আর তিনি সচেতন হয়ে ওঠেন, কেননা তিনি জানেন,
যে কর্পোরেশন তৈরি করেছে লেবুগন্ধী ডিওডোরেন্ট আর সাবান
যেগুলো ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিতে স্পর্শ করে তাঁর চামড়া,
সেই একই কর্পোরেশন বানিয়েছে বোমা বা নেইপাম;
কেননা তিনি জানেন, যে-কাজ ঘরের
সেই কাজ সামাজিক শ্রেণীরও, কেননা ঘর সমাজের বাইরে নয়।

তিনি জানেন, নারী আর পুরুষের মধ্যে পার্থক্য
আরও বেশি জ্বলজ্বল করে ওঠে গভীর প্রেমভরা রাতে

যখন আমাদের সকল গোপন-রাখা বিষয়
যা আমাদের মুখোশ পরিয়ে অপরিচিত করে রেখেছিল
জানাজানি হয়ে যায়।

কবিতায় “ঝামেলা বাধানোর” কথা উল্লেখ করেছেন রোকে ডাল্টন। এই ঝামেলা-বাধানোর সঙ্গে আমি যে অবস্থানান্তরের কথা উল্লেখ করেছি তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। অর্থাৎ নারী যখন রাজনৈতিকভাবে সচতন হয়ে ওঠেন, তখনই নারী প্রশ্ন কেবল তাৎপর্যপূর্ণভাবে ইতিহাসের মঞ্চে হাজির-ই হয় না, তা বিরাজমান আধিপত্যবাদী ব্যবস্থাকে কোনো না কোনোভাবে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। নারীর এই রাজনৈতিক সচেতনতার উপর—অর্থাৎ তার অবস্থানান্তরের উপর—রোকেয়া জোর দিয়েছেন বিশেষভাবে; এমনকি তিনি বিরাজমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করেছেন। এর প্রমাণ মেলে রোকেয়ার _মতিচূর_-এর একাধিক প্রবন্ধেই। রোকেয়ার নিজস্ব ভাষ্য মোতাবেক “সমাজের প্রচলিত ধারায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা” ছাড়া নারীর অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।

Manual3 Ad Code


যে অবস্থানান্তরের বিষয় উল্লিখিত হয়েছে আগের অংশে, তার জন্য প্রয়োজন পড়ে অনেক ধরনের অনুশীলন আর কর্মকাণ্ডের, বিশেষ করে শিক্ষার। এই শিক্ষার কথাই বেগম রোকেয়া জোরেশোরেই বলেছেন। তবে, রোকেয়ার মতে, সব শিক্ষাই এক ধরনের নয়। শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণেরও রাজনৈতিক চেহারা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ মোটা দাগে এবং সহজ করে বলা চলে, ক্ষমতাসীনের শিক্ষা আর ক্ষমতাহীনের শিক্ষা এক নয়। এক ধরনের শিক্ষা আছে যা বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তার উৎপাদনে ও পুনরুৎপাদনে ভূমিকা রাখে। আরেক ধরনের শিক্ষা আছে যা ওই ধরনের সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং এমনকি তার খোলনলচে পাল্টে ফেলার পথও বাতলে দেয়। বেগম রোকেয়ার জন্য নারী প্রশ্ন পরিবর্তনকামী রাজনৈতিক শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জন্য শিক্ষা হচ্ছে চূড়ান্তভাবে নারী সংগ্রামের এলাকা। এও বলা যাবে যে, ফ্রানৎস ফানো ও পাউলো ফ্রেয়েরির বহু আগেই তাঁর মত করেই বেগম রোকেয়া উপনিবেশবাদবিরোধী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। রোকেয়ার ওই উক্তিটি আবারো স্মরণ করা দরকার : “আমরা গোলাম জাতি নই, এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে হইবে”।


রোকেয়ার জন্য তত্ত্বের সঙ্গে অনুশীলনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক স্থাপন করার ক্ষেত্রে শিক্ষা বিভিন্নভাবে ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে তত্ত্ব ও অনুশীলনের প্রয়োজনীয় ঐক্যের চেহারা ও চরিত্র কেমন হবে তা প্রথমত বেগম রোকেয়ার জন্য নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতাস্পৃষ্ট বাস্তবতার অনুপুঙ্খ পাঠের ওপর। রোকেয়ার _মতিচূর_-এর দুই খণ্ড, _অবরোধবাসিনী_ তো বটেই, এমনকি _পদ্মরাগ_ উপন্যাসটিকেও বৈষম্যমূলক পুরুষতান্ত্রিক বাস্তবতার অনুপুঙ্খ পাঠ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, অবশ্য এই শিক্ষাটা নেয়ার জন্য যে, পাঠ ও জ্ঞান মোটেই যথেষ্ট নয় যদি তা সমাজ পরিবর্তনের কাজে না লাগে। তত্ত্ব এক্ষেত্রে শুধু জ্ঞানকে ধারণই করবে না; বরঞ্চ তা জ্ঞানের রাজনীতিকীকরণও ঘটাবে এই মাত্রায় যে, জ্ঞান নির্দেশ করবে করনীয়টা কি। অন্যদিকে আবার অনুশীলনের ভেতর দিয়ে জ্ঞান উৎপাদিত ও বিকশিত হবে যেমন, তেমনি তার রাজনীতিকীকরণও ঘটবে সমাজ পরিবর্তনেরই স্বার্থেই।


রোকেয়ার জন্য তত্ত্ব ও অনুশীলনের ‘ডায়ালেকটিকস’-কে মূর্ত, সক্রিয় ও প্রবাহিত করার জন্য যা জরুরি তা হচ্ছে সংগঠন। সাহিত্যিক ও শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি রোকেয়া একই সঙ্গে ছিলেন তাত্ত্বিক, অ্যাকটিভিস্ট ও সংগঠক। তাঁর জন্য রাজনৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হচ্ছে সাংগঠনিকতা। নিজের জীবনের বাস্তব কাজে তো বটেই, এমনকি তাঁর _পদ্মরাগ_ উপন্যাসে বর্ণিত সেই “তারিণীভবন”ও রাজনৈতিকতার সঙ্গে সাংগঠনিকতার সম্পর্কের যুৎসই রূপক ও দ্যোতক হিসেবে কাজ করে। এই “তারিণীভবন” বিধবা ব্রাহ্ম মহিলা দীণ-তারিনী দেবী প্রতিষ্ঠিত আশ্রম। এই আশ্রমে মেয়েদের স্কুল আছে, বিধবাদের আশ্রয় আছে, আতুর আশ্রম আছে, আবার নারী ক্লেশ নিবারণী সমিতিও আছে। এবং এদের সকলের একত্রে তীব্রভাবে সংগঠিত হওয়ার অবকাশও আছে। আজকে আমরা যাকে মৈত্রী ও সংহতির রাজনীতি বলছি, তার পূর্বাভাস আমরা বেগম রোকেয়ার জীবনে ও কাজে প্রত্যক্ষ করি।


পুরুষতন্ত্র-সম্পর্কিত একাধিক তত্ত্ব বেরিয়ে এসেছে বেগম রোকেয়ার কাজ থেকেই, যদিও তিনি অবশ্যই পশ্চিমা মুলুকের নারীবাদীদের কায়দায় ‘পেইট্রিআর্কি’ বর্গটি ব্যবহার করেননি। তাঁর কাজের পুনর্পাঠের ভেতর দিয়েই এটাই বেরিয়ে আসে যে, পুরুষতন্ত্র হচ্ছে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও এমনকি ভাষিক অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের সমগ্র। এই সমগ্রের নির্দিষ্ট প্রকাশ প্রথমত আমরা লক্ষ্য করি পরিবারে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। আসলে পরিবার ও প্রতিষ্ঠানকে প্রথমত টার্গেট করেছেন রোকেয়া।


সমাজে নারীর ওপর গভীর শোষণ ও নির্যাতন প্রত্যক্ষ করেছেন বলেই রোকেয়া দেখতে পেয়েছেন কিভাবে উপনিবেশবাদ কাজ করে। অবশ্যই রোকেয়ার নিজের কাজই আমাদের বলে দেয় যে, উপনিবেশবাদ নিজেই পুরুষতান্ত্রিক আর পুরুষতন্ত্র উপনিবেশবাদী।


নারী প্রশ্নকে একজন পরিবর্তনকামী তাত্ত্বিক ও অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে গভীরভাবে দেখতে পেরেছেন বলেই রোকেয়া শ্রেণী প্রশ্নকেও সামনে এনেছেন। একাধিক প্রবন্ধেই তিনি শ্রেণী প্রশ্নের পথ ধরেই অবিভক্ত ভারতের উপনিবেশপীড়িত চাষী বা কৃষকের মুক্তি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।


রোকেয়ার কাজের পুনর্পাঠ সম্ভব চারটি বস্তুক ও প্রতার্কিক এলাকার পারস্পরিক সম্পর্কের পুনর্পাঠের ভেতর দিয়েই। এই চারটি এলাকা হচ্ছে : ভূমি, শ্রম, ভাষা, দেহ। এই চারটি এলাকাতেই পুরুষতন্ত্র কাজ করে, যেমন ওই সব এলাকায় আরও কাজ করে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদ। তাই নারীর ভূমি, নারীর শ্রম, নারীর ভাষা ও নারীর দেহকে পুরুষতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদের বহুমাত্রিক আধিপত্যের কবল থেকে স্বাধীন না করলে নারীর স্বাধীনতা সম্ভব নয়।

১০
রোকেয়ার কাজ ও জীবন যুগপৎ এও প্রমাণ করে যে, নারী প্রশ্নকে যে কোনো লড়াইয়ের বা সংগ্রামের শুধু একটি ইস্যুতে রূপান্তরিত করা মোটেই যথেষ্ট নয়। এভাবে নারী প্রশ্ন আসলে প্রান্তেই থেকে যায়। বরঞ্চ নারী প্রশ্নকে প্রতি মুহূর্তেই কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবে ইতিহাসের মঞ্চে ও লড়াইয়ের ময়দানে হাজির থাকতে হবে।

১১
নারী মুক্তি এবং সব মানুষের সার্বিক মুক্তি দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত। অর্থাৎ নারী মুক্তি ছাড়া সব মানুষের সার্বিক মুক্তি সম্ভব নয় আর সব মানুষের সার্বিক মুক্তি ছাড়া নারীর মুক্তিও সম্ভব নয়। এই বিশেষ ‘ফরমুলেশন’টা রোকেয়ার কাজের সমগ্র থেকেই বর্তমান সময়ের তাগিদেই আমরা বিশেষভাবে ‘ডিরাইভ’ করতে পারি, যদিও এও সত্য যে, রোকেয়া “নারী মুক্তি” কথাটা সরাসরি ব্যবহার করেন নাই। তবে পুনর্পাঠ মানেই কেবল পুনরুৎপাদন নয়, বরং লড়াইয়ের স্বার্থেই সম্প্রসারণ এবং এমনকি পুনঃআবিষ্কারও বটে।

সবশেষে একটি কবিতা। পূর্তো রিকোর লড়াকু কালো নারীবাদী কবি মার্থা ভিয়ানুয়েভা কবিতাটি লিখেছিলেন ২০০২ সালে। আমি নিজেই কবিতাটি বেগম রোকেয়াকে উৎসর্গ করে অনুবাদ করি ২০০৭ সালে। কবিতাটি নিচে দেয়া হলো :

পুরুষতন্ত্রের তোমরা যারা

Manual5 Ad Code

ভীষণ উপুর-করা দুপুর খাঁ খাঁ, আমার দেহ ঝলসে যায়
আর আমার চামড়ার ওপর তোমাদের স্পর্শরা তাঁবু গাড়ে।
রঙমহলের অবিরত উৎসবে আপাদমস্তক ঝলসে যায়,
ঝলসে ঝলসে ঝলসে যায়; ঝলসে ঝলসে ঝলসে যায়।

Manual1 Ad Code

হা হা হাহাকারে মরু হাওয়ায় ভেসে যাওয়া ধবনি সব আর্তনাদ করে,
তাদের গতরে গতরে মাটির আদিম গন্ধ, ঢেউ-তোলা কারুকাজে
শ্রমের গন্ধ, শিশুর নাড়িতে তারই অন্তরের ধুকপুক ধুকপুক ধুকপুক,
সেও ঝাঁ ঝাঁ ঝলসানো দুপুরে; এরপরও বলো, তাদের ইতিহাস কই?
তারপরও নৈঃশব্দকে করাত দিয়ে চিরে চিরে তারাই তো দেখায় ইতিহাস।

তেপান্নটি অলিগলি মাড়িয়ে সবাই যখন ভরাট রাতের মুখোমুখি
তোমাদের দিনে দিনে বেড়ে ওঠা সাজানো-গোছানো অন্ধকারে
ভিক্ষা শেখানো শিক্ষায় কেবলি তর্জনি নির্দেশ, কেবলি রক্তচক্ষু
কিংবা শুধুই সূর্য ঢেকে দেয়া রক্তপাত বা বন্দুক-বুলেট-বেয়োনেট।

তোমাদের শিক্ষা শেখায় ভিক্ষা
তোমাদের শিক্ষা শেখায় ভিক্ষা
তোমাদের শিক্ষা শেখায় ভিক্ষা
পুঁজি শেখায় ভিক্ষা
উপনিবেশ শেখায় ভিক্ষা
বিশ্বব্যাংক শেখায় ভিক্ষা
পুরুষালি আইন শেখায় ভিক্ষা
অর্জনে
তর্জনে
গর্জনে
বর্ষণে
ভিক্ষা
ভিক্ষা
ভিক্ষা

বিশেষ্য থেকে সর্বনামে কিংবা ক্রিয়াপদের চঞ্চল আবাহনে
তোমাদের তাবৎ আখ্যানের পরতে পরতে ক্ষমতার ক্ষ্যাপা দাপটে
শীতের চাবুকে চাবুকে, মসজিদের প্রবেশ পথে, ভিক্ষাপাত্র হাতে
কঙ্কালসার দেহ নারী থাকে, ঘুরপাক খায়, আবারো ছোটে সে।
থাকে সে তোমাদের তাবৎ জাল-ফেলা জ্যামিতির ভেতরে ভেতরে,
যেমন তোমাদের হে হে করা পুরুষালি জাতীয়তাবাূত
কিংবা ঘেউ ঘেউ করা পেশী-ফোলানো নন্দনতত্ত্বে বারবার
মাটি নারী হয়, নারী হয় নদী, নারী হয় নক্ষত্র, নারী হয় জাতি-
কিন্তু কার থাবায় দাউ দাউ জ্বলে সেই নদী-নক্ষত্র-জাতি-দেশ?
কার আততায়ী ইশারায় তছনছ সেই দেহ, সেই মাটি, সেই ভিটে?

বচনে বসনে বিজ্ঞাপনে বিপণনে সাবানের রকমারি-ঝকমারিতে
কিংবা কোকাকোলা-পেপসির ফুঁসে ওঠা ফেনায় ফেনায়
দেহ বিকোনোর দালালদের তকমায় তকমায়, জোব্বা-পরা মুরুব্বিদের
শাস্ত্রে শাস্ত্রে, ভণ্ডামির পিঠে পিঠে আমরা দেখি শ্রমবিদ্ধ নারী,
গুলিবিদ্ধ নারী, এমনকি তোমাদের উপমা-রূপক-বিদ্ধ নারী,
আর ওই দেবদূতের গান পান করে এখন মশগুল হরেক রকম কর্তা।

কিন্তু দেশের শস্যের দানায় দানায় নারী, ক্ষেতে-মাঠে-মিলে-
কারখানায় নারী, একেবারে বাড়ির ভেতরে ভেতরে নারী,
তোমার সন্তানের পাতে পাতে নারী, উন্নয়নবিশারদের বানোয়াট
পরিসংখ্যানে-পরিসংখ্যানে নারী, শাসনতন্ত্রের মার্জিনে নারী,
প্লেটো-এরিস্টটল-দেকার্ত-ফ্রয়েডের পাদটীকায় নারী,
আবার জেগে ওঠা ভোরের ফেটে পড়া রক্তলাল আলোতে নারী,
কিংবা রাস্তায় ঝরা টকটকে গোলাপের মতো অঢেল রক্তে নারী,
বিস্ফোরকের মতো টগবগ করা আগুন-ধরা ভাষণে ভাষণে নারী
নারী নারী নারী নারী নারী নারী নারী নারী নারী নারী নারী মার্চে নারী
আর উজ্জ্বল সময়ের সংকেতে আমরা নিশ্চিহ্ন করবো তোমাদেরঃ

আমরা আছি
আমরা আছি
আমরা আছি
আমরা আছি

এই পরিচিত ইতিহাসেই
আমাদের মুছে ফেলা সব আখ্যানকে
আগ্নেয়গিরি বানাবার এই লড়াইয়ে

Manual5 Ad Code

আমরা আছি।

জানুয়ারি-জুন ২০০৮, মুক্তস্বর
[ঈষৎ পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত]