সিলেট ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:৪১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫
বিজয়ের মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে জামায়াতে যোগ দিতে দেখেও হতাশ হবেন না। কারণ এটা কোনো হঠাৎ ব্যক্তিগত বিচ্যুতি না, বরং ইতিহাস বিকৃতির একটা একেবারেই পূর্বানুমেয় ধাপ। এই দৃশ্য আমাদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, ক্ষুব্ধ করতে পারে, কিন্তু অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং অবাক হব তখনই, যদি এটাকে আমরা নিছক একজন প্রবীণ মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে চালিয়ে দিই। সেটাই হবে সবচেয়ে বড় বিশ্লেষণগত ভুল।
দেখুন, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় কোনো জৈবিক বা স্থায়ী সার্টিফিকেট না।একটা নৈতিক এবং আদর্শিক অবস্থান, যেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয় পুনঃনিশ্চিত হয়, নয়তো পরিত্যক্ত হয়।একাত্তরে অস্ত্র ধরলেই কেউ চিরকালের জন্য মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায়, এই ধারণা ইতিহাস, দর্শন বা নৈতিকতার কোথাও টেকে না। বরং ঠিক উল্টোটা সত্য।
ট্রানজিশনাল জাস্টিস ও মেমোরি স্টাডিজ বহু আগেই দেখিয়েছে, গণহত্যা-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোতে সবচেয়ে বড় সংকটটা তৈরি হয় তখনই, যখন অপরাধী আদর্শকে ‘রাজনৈতিক মতভেদ’ হিসেবে পুনঃপ্যাকেজ করা হয় এবং ভিকটিমের ইতিহাসকে আবেগের স্তরে নামিয়ে আনা হয়। আক্তারুজ্জামানের এই সিদ্ধান্ত ঠিক সেই পর্যায়েরই একটি ক্লাসিক উদাহরণ, যেখানে অপরাধী ও প্রতিরোধকারীর সীমারেখা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করা হয়।
কিছুদিন আগে আমাকে একজন বেশ আন্তরিক ভঙ্গিতেই বলেছিল, জামাতকে একটু সমর্থন দিয়ে দেখেন, ওরা নাকি এখন অনেক আধুনিক, অনেক ইনক্লুসিভ।মজা করে জামাতের নারীবাদী শাখায় যোগ দিতে বলেছিলো আরেকজন। কিন্তু কথাটা এমনভাবে বলা হচ্ছিল, যেন জামাত গত দশকে হঠাৎ করে আদর্শিক রিহ্যাব শেষ করে ক্যাম্পাসে ফিরে এসেছে। মনে মনে ভাবলাম, এটা ঠিক যেমন বলা, “আপনি একটু নরম হয়ে বিষের স্বাদ নিন, এখন তো সায়ানাইডও অনেক আপডেটেড।”
আমি শুধু এটুকুই বলেছিলাম, জামাত আদর্শিকভাবে কখনো বদলায় না। বদলায় শুধু তার মার্কেটিং ভাষা। বদলেছে ব্রোশিওর, পোস্টার, হ্যাশট্যাগ, আদর্শ ওই একই।
আমার নিজের আত্মীয়দের মধ্যেই একজন জামাত করেন। আমার সামনে তিনি ভীষণ ভদ্র, অমায়িক, সাহায্যপ্রবণ, একেবারে আদর্শ সামাজিক মানুষ। কিন্তু আমার আড়ালে তিনি আমার পরিবারকে বলেছেন, “কেন আমাকে জেন্ডার স্টাডিজ পড়তে দেওয়া হলো, সেটা নাকি পরিবারের চরম ভুল।এই কারণেই লুবনা একটা কথাও যেতে দেয় না। ঐখানে পড়লে সবাই ওয়েস্টার্ন, নারীবাদী, আর নাস্তিক হয়ে যায়।”
তবে এই দ্বৈততা কোনো ব্যক্তিগত ভণ্ডামি না, এটা জামাতি রাজনীতির কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। সামনে সৌজন্য, পেছনে আদর্শিক শুদ্ধিকরণ, কিন্তু সেই শুদ্ধিতেও লুকিয়ে থাকে ভণ্ডামি। নিজেদের জন্য গিবত করা বৈধ, আর অন্যকে বলতে হবে তুমি যেন গিবত না করো, সেইজন্যে জামাতে আসো।ব্যক্তিগত ব্যবহার যতই ভদ্র হোক, ওদের রাজনৈতিক প্রকল্পটা থেকে যায় অপরিবর্তিত।
আজকে জামাত যতই তাদের শিবিরে নারী, সনাতন ধর্মাবলম্বী, এমনকি মুক্তিযুদ্ধকেও ‘ইনক্লুড’ করার চেষ্টা করুক না কেন, এটা কোনো আদর্শিক রূপান্তর না। এটা নিখাদ রাজনৈতিক রিব্র্যান্ডিং। তারা বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে না, তারা বৈচিত্র্য ব্যবহার করে। এখানে ইনক্লুশন কোনো নৈতিক অবস্থান না, একটা কৌশলমাত্র।
হুমায়ুন আজাদ এই জায়গাটাই সবচেয়ে নির্মমভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। একজন মানুষ একসময় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েও আজীবন মুক্তিযোদ্ধা নাও থাকতে পারেন, কিন্তু একজন রাজাকার আদর্শগতভাবে রাজাকারই থাকেন। কারণ মুক্তিযোদ্ধা হওয়া মানে একটা ধারাবাহিক নৈতিক চর্চা, প্রতিদিনের অবস্থান। আর রাজাকার হওয়া একটা স্থায়ী আদর্শিক নির্বাচন।
আজকের দিনেও আজাদের সেই তত্ত্বগত সতর্কতা সমানভাবে প্রযোজ্য। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা কোনো ব্যক্তি না, তারা দুইটা বিপরীত নৈতিক এবং রাজনৈতিক দর্শন।
মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ এর সশস্ত্র লড়াই ছিল এবং তার চেয়েও বেশি ছিল একটা প্রগতিশীল সামাজিক প্রকল্প, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং উপনিবেশিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটা র্যাডিকাল বিচ্ছেদ।
জামায়াতে ইসলামী ছিল এবং আছে এই প্রকল্পের আদর্শিক বিপরীত মেরু। তারা শুধু স্বাধীনতার বিরোধিতা করে নাই, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়ক কাঠামো হিসেবে তারা গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং নারীর বিরুদ্ধে সংগঠিত সহিংসতার অংশীদার ছিল। এই ইতিহাস কোনো মতামত না, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে স্বীকৃত বাস্তবতা।
আর সেকারণেই একজন মুক্তিযোদ্ধার সেই আদর্শিক শিবিরে যোগ দেওয়া কোনো ব্যক্তিগত মন-পরিবর্তন না। বলা যেতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক ভিত্তিকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রতীকী মুহূর্ত একটা। মেমোরি পলিটিক্সের ভাষায় একে বলা হয়, “moral dilution of foundational violence” রাষ্ট্রের জন্মের সময়কার সহিংস সত্যকে এমনভাবে ঝাপসা করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর স্পষ্টভাবে অপরাধী ও প্রতিরোধকারীর পার্থক্য বুঝতে না পারে।
একজন বললেন, “তিনি তো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাই জামায়াতে যোগ দিলেও আলাদা করে দেখা উচিত,”
এই ক্ষেত্রে আমি বলবো, এটা মুক্তিযুদ্ধকে নৈতিক অবস্থান থেকে নামিয়ে এনে একটা আলগা পরিচয়ে পরিণত করা।
এখানেই হুমায়ুন আজাদের দ্বিতীয় সতর্কতা সবচেয়ে ভয়াবহভাবে সত্য হয়ে ওঠে। আজ রাজাকাররা শুধু রাষ্ট্রের বাস্তব কাঠামো দখল করেনি, তারা আমাদের ভাষা, কল্পনা ও মূল্যবোধের এলাকাতেও ঢুকে পড়েছে। গণমাধ্যম, সামাজিক প্ল্যাটফর্ম আর ভিউ-ইকোনমির সহায়তায় এমন এক স্বাভাবিকতা তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধও বিতর্কযোগ্য হয়ে ওঠে, আর মুক্তিযুদ্ধ নামিয়ে আনা হয় ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার স্তরে।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটা রাষ্ট্রের নৈতিক ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দেয়। রাজনৈতিক বহুত্ববাদ গণতন্ত্রের শর্ত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের জন্মের নৈতিক সত্য কোনো রাজনৈতিক অপশন না। Loud &Clear!
সত্য এটাই যে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কাউকে তার পদক বা পরিচয়ের জন্য বিচার করে না। বিচার করে সে কোন আদর্শের পাশে দাঁড়িয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে তার শত্রু আদর্শকে বৈধতা দেয়, তারা একাত্তরের নৈতিক চুক্তি নিজেরাই ছিঁড়ে ফেলে।
ইতিহাস নির্দয়ভাবে সৎ, সে জানে কাকে কোথায় রাখতে হয়। বিজয়ের মাসে এই ছবি আমাদের মন খারাপ করার জন্য না, আমাদের সতর্ক করার জন্য। যেন আমরা বুঝতে পারি, মুক্তিযুদ্ধ রক্ষা করতে হয় প্রতিদিন।
Otherwise, there will come a day when the adversaries of the Liberation War will appropriate the authority of history itself, disguised under the very signature of a freedom fighter.
#
ড. লুবনা ফেরদৌসী
শিক্ষক ও গবেষক
ইংল্যান্ড।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি