চট্টগ্রাম নগরীতে ভূমিধস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অগ্রিম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব

প্রকাশিত: ৯:৩১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫

চট্টগ্রাম নগরীতে ভূমিধস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অগ্রিম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব

Manual8 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | চট্টগ্রাম, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ : চট্টগ্রাম নগরীর ভূমিধস ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দুর্যোগের আগেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রাণ ও সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে ‘অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন (AA) প্ল্যান ফর ল্যান্ডস্লাইড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক একটি যাচাই (ভ্যালিডেশন) কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রবিবার (১৪ ডিসেম্বর ২০২৫) নগরীর হোটেল পেনিনসুলায় আয়োজিত এ কর্মশালায় নগর পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

কর্মশালায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চারটি ভূমিধসপ্রবণ ওয়ার্ড—ওয়ার্ড ৭ (পশ্চিম ষোলশহর), ওয়ার্ড ৮ (শুলকবাহার), ওয়ার্ড ৯ (উত্তর পাহাড়তলী) এবং ওয়ার্ড ১৪ (লালখান বাজার)—কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব এলাকায় অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন, নির্বিচারে পাহাড় কাটা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হওয়ায় ভূমিধসের ঝুঁকি দিন দিন বেড়ে চলেছে।

Manual3 Ad Code

ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ওয়াইপিএসএ) এর আয়োজনে এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের সহযোগিতায় কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়। ইউরোপিয়ান সিভিল প্রোটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান এইড অপারেশনস (ECHO HIP) ও জার্মান ফরেন ফেডারেল ফরেন অফিস (GFFO)-এর অর্থায়নে পরিচালিত অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন প্রকল্পের আওতায় এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেয়ে দুর্যোগের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অনেক বেশি কার্যকর। ভূমিধসের মতো নীরব দুর্যোগে অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন পরিকল্পনা প্রাণহানি কমাতে এবং নগর অবকাঠামো সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
তিনি নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন।

কর্মশালার সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম। তিনি বলেন, “ভূমিধস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আলাদা কোনো প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং চট্টগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ন এবং পাহাড় সংরক্ষণ ছাড়া এই ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়।”

Manual7 Ad Code

আলোচনা পর্বে ওয়াইপিএসএ’র পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন) মিসেস নাসিম বানু বিভিন্ন অংশীজনের প্রশ্নের উত্তর দেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য নিরাপদ সরিয়ে নেওয়ার (ইভাকুয়েশন) পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ভূমিধসকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন উদ্যোগ আগে ছিল না। এই প্রকল্পটি সে অর্থে একটি পথিকৃৎ উদ্যোগ। স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা হয়েছে, যা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভূমিধসজনিত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।”

এর আগে সেভ দ্য চিলড্রেনের ম্যানেজার ফাতিমা মেহেরুন্নেসা তানি প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম ও অগ্রগতি সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি এবং অন্যান্য অংশীজনদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও প্রস্তুতি জোরদার করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

Manual5 Ad Code

কর্মশালায় ওয়ার্ডভিত্তিক অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন ওয়াইপিএসএ’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (মনিটরিং অ্যান্ড রিসার্চ) মোরশেদ হাসান মোল্লা এবং প্রকল্প কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম। তারা ঝুঁকি নিরূপণ, ট্রিগার নির্ধারণ, আগাম সতর্কতা, কমিউনিটি প্রস্তুতি ও জরুরি সাড়া দেওয়ার কৌশল তুলে ধরেন।

সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, জরুরি সেবা সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা কর্মশালায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, পাহাড় সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন।

কর্মশালার শেষে অংশগ্রহণকারীরা একমত পোষণ করেন যে, অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন, জনগণের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই চট্টগ্রাম নগরীকে ভূমিধসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে আরও নিরাপদ ও সহনশীল করে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

Manual6 Ad Code