সিলেট ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:১২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৭, ২০২৬
দুর্ঘটনা, যানজট ও অনিশ্চয়তায় ভরা সড়কপথের বিপরীতে ট্রেনই এখনো দেশের মানুষের সবচেয়ে আস্থার বাহন। তুলনামূলক নিরাপদ যাত্রা, সাশ্রয়ী ভাড়া ও নির্দিষ্ট সময়সূচির কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষ রেলপথে চলাচল করছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের কাছে ট্রেন মানেই কিছুটা স্বস্তির যাত্রা। তবে এই স্বস্তির আড়ালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে একটি গভীর সংকট—বিনা টিকিটে ভ্রমণ।
রেলওয়ের নিয়মিত টিকিট যাচাই অভিযানে উঠে আসা পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজারের বেশি যাত্রী টিকিট ছাড়া ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করছে। এতে একদিকে যেমন রেলওয়ের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে ভেঙে পড়ছে যাত্রী শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার ভিত্তি।
এক মাসে টিকিটবিহীন যাত্রী ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ডিসেম্বর ২০২৫ মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই এক মাসে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮১৭ জন টিকিটবিহীন যাত্রী শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় হয়েছে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার ৯৮৯ টাকা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—
পূর্বাঞ্চলে ৩০ দিনে টিকিটবিহীন যাত্রী ছিল ৭৫ হাজার ৬৮৭ জন,
জরিমানা আদায়: ৫৩ লাখ ১৭ হাজার ৩৭৯ টাকা।
পশ্চিমাঞ্চলে একই সময়ে টিকিটবিহীন যাত্রী ছিল ৯০ হাজার ১৩০ জন,
জরিমানা আদায়: ৫১ লাখ ৭০ হাজার ৬১০ টাকা।
পরিসংখ্যান বলছে, পূর্বাঞ্চলের তুলনায় পশ্চিমাঞ্চলে টিকিটবিহীন যাত্রীর সংখ্যা ও চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি টিকেটবিহীন যাত্রী
দুই অঞ্চল মিলিয়ে ডিসেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজারেরও বেশি যাত্রী বিনা টিকিটে ভ্রমণ করেছে। পূর্বাঞ্চলে দৈনিক গড়ে দুই হাজারের বেশি টিকিটবিহীন যাত্রী শনাক্ত হলেও পশ্চিমাঞ্চলে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দিনে তিন থেকে চার হাজারে।
দৈনিক ভাড়া ও জরিমানা মিলিয়ে দুই অঞ্চলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ থেকে ১০ লাখ টাকা। কোনো কোনো দিনে শুধু পশ্চিমাঞ্চলেই ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের তথ্য রয়েছে। পূর্বাঞ্চলেও একাধিক দিনে ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় হয়েছে।
টিটিই ও স্টেশন ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে চাপ
টিকিট যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনার (টিটিই) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিপুলসংখ্যক টিকিটবিহীন যাত্রী শনাক্ত করতে গিয়ে তাঁদের প্রতিনিয়ত নানা ধরনের চাপ ও বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়। অনেক যাত্রী জরিমানা দিতে অনীহা প্রকাশ করে, তর্কে জড়ায় কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করে।
কিছু স্টেশনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কারণে দায়িত্ব পালনে নীরব থাকতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে যাত্রী শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যেমন কঠিন হয়ে উঠছে, তেমনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের মানসিক চাপও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে টিটি ও অ্যাটেনডেন্টদের বাড়তি আয়ের চিন্তা থেকেই বিনা টিকিটের যাত্রীরা সাহস পায়। তবে বড় সমস্যা হলো—রেলস্টেশনগুলোর অরক্ষিত অবস্থা। স্টেশনের প্রবেশ ও বহির্গমন পথ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, বিনা টিকিটে যাত্রার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনেক পুরনো। সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন আধুনিক করা জরুরি।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, “এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাহিদার তুলনায় টিকেটের সংখ্যা অপ্রতুল; ট্রেনের সংখ্যাও কম। প্রথমেই চাহিদা অনুযায়ী টিকেট ও বগির সংখ্যা বাড়ানো জরুরী। এছাড়াও ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। —সেই লক্ষ্যে কাঠামোগত পরিবর্তনের চিন্তা করতে হবে।”
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে কমলাপুর, বিমানবন্দরসহ বড় স্টেশনগুলোতে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিতে হবে। বাজেট বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, টিকিটবিহীন যাত্রীদের সঙ্গে কোনো টিটি বা অ্যাটেনডেন্ট জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব সুরক্ষা ও যাত্রী সেবা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “টিকিটবিহীন যাত্রার সমস্যা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা যাবে না। জনগণের দৈনন্দিন চাহিদা অনুযায়ী ট্রেনের সংখ্যা ও আসন বাড়ানো জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সব আন্তঃনগর ট্রেনে কোচ ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দ্রুত আরও অন্তত দুটি আধুনিক দ্রুতগামী আন্তঃনগর ট্রেন সার্ভিস চালু করা এখন সময়ের দাবি। পরিকল্পিতভাবে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন না হলে এই সমস্যা থেকেই যাবে।”
উপসংহার
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, টিকিটবিহীন যাত্রা রোধে শুধু জরিমানা বা অভিযান নয়—স্টেশন নিরাপত্তা, টিকিট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ট্রেন ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং যাত্রীবান্ধব পরিকল্পিত রেল উন্নয়ন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। নইলে বাড়তে থাকা যাত্রী চাহিদার চাপ সামাল দিতে গিয়ে রেলওয়ের শৃঙ্খলা ও রাজস্ব দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি