বিশ্বভ্রাতৃত্বের স্থপতি লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল

প্রকাশিত: ১:২৫ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০২৬

বিশ্বভ্রাতৃত্বের স্থপতি লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল

Manual8 Ad Code

সৈয়দা হাজেরা সুলতানা |

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা অস্ত্রের পরিবর্তে আদর্শ দিয়ে, ক্ষমতার পরিবর্তে মানবিকতা দিয়ে এবং যুদ্ধের বদলে শান্তির দর্শন দিয়ে পৃথিবীকে নতুন পথ দেখিয়েছেন। স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড রবার্ট স্টিফেনসন স্মিথ ব্যাডেন পাওয়েল (১৮৫৭–১৯৪১) তেমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর চিন্তা, দর্শন ও কর্ম আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীর জীবনে অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

লর্ড ব্যাডেন-পাওয়েল জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, লন্ডনের স্ট্যানহোপ স্ট্রিটে এক সম্ভ্রান্ত ও বিদ্যান পরিবারে। তাঁর পিতা রেভারেন্ড টমাস ব্যাডেন-পাওয়েল ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও একজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী। মাতা হেনরিয়েটা স্মিথ ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অ্যাডমিরাল উইলিয়াম স্মিথের কন্যা। এমন এক জ্ঞানমনস্ক পরিবারেই গড়ে ওঠে ব্যাডেন-পাওয়েলের শৈশব।

Manual1 Ad Code

শৈশব ও কৈশোর: বইয়ের বাইরে শিক্ষা

Manual5 Ad Code

শিক্ষাজীবনে খুব উজ্জ্বল ছাত্র না হলেও ব্যাডেন-পাওয়েলের আগ্রহ ছিল প্রকৃতি, অভিযান ও সৃজনশীলতায়। নদীতে মাছ ধরা, নৌকা চালানো, ছবি আঁকা, ঘোড়ায় চড়া, শিকার করা এবং অভিনয়ের প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল। ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে নৌকা করে দুঃসাহসিক অভিযান তাঁর নেতৃত্বগুণ ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রথম দৃষ্টান্ত।

এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তীতে তাঁর শিক্ষাদর্শনের ভিত্তি গড়ে দেয়—যেখানে বইয়ের বাইরে জীবনই হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

সামরিক জীবন ও শাফেকিং যুদ্ধ

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৮৭৬ সালে প্রথম ভারতে নিযুক্ত হন। সাহসিকতা, কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার জন্য অল্প সময়েই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার শাফেকিং যুদ্ধ। ২১৭ দিনব্যাপী এই যুদ্ধে তিনি অভিনব কৌশলে স্থানীয় কিশোরদের তথ্যসংগ্রহে যুক্ত করেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মনে গেঁথে যায়—সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে শিশুরাও সমাজ ও রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই যুদ্ধ-অভিজ্ঞতাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে একটি আদর্শভিত্তিক বালক আন্দোলন গড়ে তুলতে।

স্কাউট আন্দোলনের সূচনা

যুদ্ধ শেষে ১৯০১ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি দেখেন, তাঁর লেখা Aids to Scouting বইটি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। এরপর ১৯০৭ সালে তিনি ব্রাউনসি আইল্যান্ডে প্রথম পরীক্ষামূলক স্কাউট ক্যাম্প আয়োজন করেন। এই ক্যাম্পের সাফল্য তাঁকে আরও দৃঢ় করে।

১৯০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ Scouting for Boys। বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে স্কাউট আন্দোলন।

ব্যাডেন-পাওয়েলের ভাষায়, “Scouting is a game with a purpose.”
অর্থাৎ স্কাউটিং হলো খেলার মধ্য দিয়ে জীবন গঠনের শিক্ষা।

কাব, গাইড, রোভার ও রেঞ্জার

স্কাউট আন্দোলনকে বয়সভিত্তিকভাবে বিস্তৃত করতে তিনি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন শাখা চালু করেন—

কাব স্কাউট (১৯১৬): ১২ বছরের নিচে শিশুদের জন্য,

Manual4 Ad Code

গার্ল গাইড মুভমেন্ট (১৯১০): তাঁর বোন অ্যাগনেস ব্যাডেন-পাওয়েলের সহযোগিতায়,

রোভার স্কাউট ও রেঞ্জার: তরুণ-তরুণীদের জন্য।

সব শাখার মূল উদ্দেশ্য একটাই—সৎ, সাহসী, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ গড়ে তোলা।

বিশ্ব স্কাউট আন্দোলনের স্বীকৃতি

১৯২০ সালে লন্ডনের অলিম্পিয়াতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরিতে তাঁকে ঘোষণা করা হয়
“Chief Scout of the World”।
১৯২৯ সালে তৃতীয় বিশ্ব জাম্বুরিতে তিনি লাভ করেন
“Lord Baden-Powell of Gilwell” উপাধি।

শেষ জীবন ও চিরবিদায়

১৯৩৮ সালে তিনি জীবনের শেষ অধ্যায় কাটানোর জন্য আফ্রিকার কেনিয়ায় চলে যান। সেখানেই ১৯৪১ সালের ৮ জানুয়ারি এই মহান মানবতাবাদী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

তাঁর সমাধিফলকে খোদাই করা আছে একটি স্কাউট চিহ্ন—যার অর্থ “আমি আমার পথ শেষ করেছি, তোমরা তোমাদের পথ খুঁজে নাও।”

উপসংহার

Manual3 Ad Code

লর্ড ব্যাডেন-পাওয়েল আজ নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শে গড়ে ওঠা স্কাউট আন্দোলন আজও বিশ্বব্যাপী মানবিকতা, নেতৃত্ব ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের বার্তা বহন করে চলেছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জন্ম নেওয়া যে আন্দোলন একদিন মানবিক শান্তির পতাকা তুলে ধরবে—সে দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

আজকের অস্থির পৃথিবীতে ব্যাডেন-পাওয়েলের দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক—
ভাল মানুষ হও, দায়িত্বশীল নাগরিক হও এবং পৃথিবীটাকে একটু ভালো অবস্থায় রেখে যাও।

#
সৈয়দা হাজেরা সুলতানা (শানজিদা)
শিক্ষার্থী
পদার্থ বিজ্ঞান সম্মান (১ম বর্ষ)
মুরারিচাঁদ কলেজ
সিলেট।