ইউএপির দুই শিক্ষককে বরখাস্ত একাডেমিক স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন, পুনর্বহালের দাবি

প্রকাশিত: ৩:০৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০২৬

ইউএপির দুই শিক্ষককে বরখাস্ত একাডেমিক স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন, পুনর্বহালের দাবি

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ : ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) দুই শিক্ষককে বরখাস্তের ঘটনাকে ‘মব জাস্টিস’-এর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আত্মসমর্পণ এবং একাডেমিক স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। অবিলম্বে ওই দুই শিক্ষককে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠনটি।

বুধবার (২১ জানুয়ারি ২০২৬) দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইউএপির বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক লায়কা বশির এবং সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এ এস এম মহসিনকে বরখাস্তের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। এ এস এম মহসিন বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে পাঠ করা লিখিত বক্তব্যে চার দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—
১) অবিলম্বে বরখাস্ত হওয়া দুই শিক্ষককে পুনর্বহাল করা,
২) বরখাস্তের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ করা,
৩) ভীতি প্রদর্শন ও মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং
৪) বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির নিরাপত্তা ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিতে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার কার্যকর প্রয়োগ।

Manual3 Ad Code

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একাডেমিক স্বাধীনতা গভীর সংকটে রয়েছে। ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী ভিন্নমত দমন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আনুগত্য আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের যে আশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

তারা অভিযোগ করেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি গোষ্ঠী ধর্মীয় অনুভূতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বাধীন মত প্রকাশের কারণে হয়রানি করা হচ্ছে, যেখানে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউএপির দুই শিক্ষককে বরখাস্ত করার ঘটনা এই প্রবণতার সাম্প্রতিক ও ভয়াবহ উদাহরণ।

Manual8 Ad Code

লায়কা বশিরের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তিনি নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থেকে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন, যা কোনো ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয়নি। তবে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একাংশ সেটিকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করে অনলাইন হয়রানি শুরু করে। তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেও চাপ অব্যাহত থাকে। অভিযোগ যাচাই না করেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে ফোনে পদত্যাগ করতে বলে, যা একাডেমিক নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

Manual6 Ad Code

পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় লায়কা বশির তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে বক্তারা অভিযোগ করেন, তদন্ত কমিটি গুগল ফরমের মাধ্যমে অভিযোগ সংগ্রহ করে ৩৪টি বেনামি অভিযোগ গ্রহণ করে, যা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। তাকে অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও তার আগেই তাকে বরখাস্ত করা হয়, যা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

অন্যদিকে, এ এস এম মহসিনের ক্ষেত্রে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত ছাড়াই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। বক্তারা বলেন, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে থাকলেও তাকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপসারণ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীরব ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান সংবিধানসম্মতভাবে একাডেমিক স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্বে থাকলেও তারা কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজলী শেহরীন ইসলাম, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শামীমা শিল এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক তানভীর সোবহানসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা।

Manual6 Ad Code

বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গভীর সংকটে পড়বে এবং শিক্ষকসমাজ আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে। অবিলম্বে ইউএপির দুই শিক্ষককে পুনর্বহাল না করা হলে শিক্ষকসমাজ বৃহত্তর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবে বলেও তারা জানান।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ