জলবায়ু পরিবর্তন: উপকূলীয় জনপদে নিরাপদ পানির সংকট, লবণাক্ততায় অনিশ্চিত জনজীবন

প্রকাশিত: ১০:২১ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৬, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন: উপকূলীয় জনপদে নিরাপদ পানির সংকট, লবণাক্ততায় অনিশ্চিত জনজীবন

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | বাগেরহাট, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও গভীরভাবে আঘাত হানছে দেশের উপকূলীয় জনপদে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে পানির লবণাক্ততা ভয়াবহ আকার ধারণ করায় নিরাপদ পানির সংকট এখন জনস্বাস্থ্য, জীবিকা ও মানবাধিকারের গুরুতর সংকটে রূপ নিয়েছে। অথচ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে এই জীবন-মরণ সমস্যা তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও জলবায়ু কর্মীদের।

২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে নিরাপদ পানির অধিকারকে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, উপকূলীয় বাস্তবতায় তার প্রতিফলন এখনও দৃশ্যমান নয়।

ভয়াবহ লবণাক্ততা, বিপন্ন জনজীবন

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানির লবণাক্ততার মাত্রা প্রতি লিটারে ২,০০০ মিলিগ্রামেরও বেশি, যেখানে পানযোগ্য পানির জন্য অনুমোদিত সীমা সর্বোচ্চ ১,০০০ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার।

বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক জানান, মোরেলগঞ্জ, মোংলা, শরণখোলা ও কচুয়া উপজেলার অধিকাংশ এলাকাই তীব্র লবণাক্ততার কবলে।

বিশেষ করে মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলার গ্রামগুলোতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রবেশ করায় পুকুর, খাল, নদী ও নলকূপ—সবই হয়ে উঠেছে অনুপযোগী। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং দুর্বল বাঁধব্যবস্থার কারণে এই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব

নিরাপদ পানির অভাব সরাসরি প্রভাব ফেলছে জনস্বাস্থ্যে। উপকূলীয় অনেক বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই, ফলে শিক্ষার্থীরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক এলাকায় প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।

শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জের বাসিন্দাদের ভাষায়—এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি এখন বিলাসিতা।

উপকূলজুড়ে একই চিত্র

খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর মাদিনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, “বছরের পর বছর আমরা পানির সংকটে ভুগছি। একসময় নলকূপই ছিল না, পুকুরের পানিই খেতে হতো।”

পাইকগাছা উপজেলার গড়ইখালি গ্রামের ব্যবসায়ী খান জাহান আলী বলেন, “চারপাশেই লবণ পানি। নিরাপদ পানি নেই, আবার স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন বিষয়ে সচেতনতারও অভাব।”

কৃষি ও অর্থনীতিতে ধস

মোরেলগঞ্জের সন্ন্যাসী গ্রামের নারী নেত্রী জান্নাতুল হাবিবা বলেন, “লবণাক্ত পানি মানুষের ঘরবাড়ি, স্বাস্থ্য আর জমিজমা ধ্বংস করছে। ফলে দারিদ্র্য বাড়ছে।”

লবণাক্ততায় ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র।

Manual6 Ad Code

তরুণদের উদ্যোগ, সরকারের সীমাবদ্ধতা

গত গ্রীষ্মে যুব সংগঠন ইউথনেট গ্লোবাল নিজেদের অর্থায়নে মোরেলগঞ্জের কিছু এলাকায় বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করে—যা সংকটের গভীরতাই তুলে ধরে।
সংগঠনের জেলা সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল শিহাব ইমন বলেন, “নারী ও শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি সংগ্রহে ব্যয় করছে, অথচ পানিবাহিত রোগ নীরবে বাড়ছে।”

Manual1 Ad Code

সরকারি পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদ জানান, “কিছু এলাকায় নলকূপও আর কার্যকর নয়। নতুন নলকূপ স্থাপন ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে

Manual8 Ad Code

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটের মূল চালিকাশক্তি। ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এর সমাধান সম্ভব নয়।”

Manual3 Ad Code

রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

ইউথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, “নিরাপদ পানি উন্নয়ন নয়, এটি সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার উপেক্ষা মানে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা।”

উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা এখন কেবল অবকাঠামোগত প্রশ্ন নয়—এটি জলবায়ু ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতার কঠিন পরীক্ষা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ