সিলেট ১০ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:১২ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : আজ ৫ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। এ বছর জাতির গ্রন্থাগার দিবসের স্লোগান হলো ‘জ্ঞানেই মুক্তি, আগামীর ভিত্তি’। জ্ঞানের আধার হলো বই, আর বইয়ের আবাসস্থল হলো গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি। ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস, বইমেলার মাস। এ মাসেই জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত হচ্ছে।
১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে মানুষের কাছে গ্রন্থাগারকে জনপ্রিয় করা, গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে প্র্তি বছর ৫ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত হয়ে আসছে।
সর্বস্তরের মানুষকে গ্রন্থাগারমুখী করে তোলার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে দিবসটি পালন করা হয়। কোনো দিবস পালন করার উদ্দেশ্য থাকে ওই বিষয় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তোলা। জ্ঞানার্জন, চেতনা, মূল্যবোধের বিকাশ, গবেষণা, সংস্কৃতিচর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে গ্রন্থাগারের অপরিসীম ভূমিকা রাখার প্রত্যাশায় গ্রন্থাগার দিবসের প্রবর্তন।
গ্রন্থাগার দিবসের আবেদন হলো গ্রন্থাগারের বার্তা সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া; সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রন্থাগারের সেবা পৌঁছে দেয়া। তথ্যসমৃদ্ধ জনগণ রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ, তাই তথ্য পৌঁছে দিতে গ্রন্থাগারকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আলোকিত ও সত্যিকার শিক্ষিত সচেতন দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কাজ করছে।
জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের তাৎপর্য দেশের মানুষ, বর্তমান প্রজন্মকে বইপড়া, জ্ঞানচর্চা, মুক্তচিন্তা চর্চায় কতটুকু উদ্বুদ্ধ করতে পারছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের বেশিরভাগ মানুষ এ দিবস সম্পর্কে অবগত নন। মানুষ এখনো জানেন না, এ দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য কী? বর্তমান প্রজন্মের মাঝে দিন দিন বইবিমুখতা বাড়ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেই বই পড়ার চর্চা। নেই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ। শুধু গাইড বই মুখস্থ নির্ভরতা আর সরকারি আমলা-কেরানি হওয়ার প্রতিযোগিতায় বিভোর প্রজন্ম। জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠন ছাড়া আমাদের পরিপূর্ণ মুক্তি বা সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।
দুঃখজনক যে, বইবিমুখ সৃজনশীলতা বিবর্জিত একটা প্রজন্ম গড়ে উঠছে। বই ছেড়ে তরুণ প্রজন্ম এখন স্মার্টফোনে ব্যস্ত। অথচ এ বিষয়ে ভাবার কেউ নেই! আমরা ভুলেই গেছি, তরুণ প্রজন্মের সঠিক পরিচর্যা ও তাদের বেড়ে ওঠার ওপরই নির্ভর করে দেশের ভবিষ্যৎ। গ্রন্থাগার আমাদের আলোর পথের নীরব পথপ্রদর্শক।
সমৃদ্ধ জাতি গঠনে গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরির বিকল্প নেই। পুরনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে গ্রন্থাগারগুলোকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করা দরকার। প্রজন্মকে বইপড়া, জ্ঞানচর্চায় মুক্তচিন্তায় উৎসাহিত করতে হবে এবং এর জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
প্রতিটি জেলায় একটি মডেল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা ভীষণ প্রয়োজন। দেশে অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নও ঘটেছে কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি ও মননশীলতার কি সে ধরনের কোনো উন্নয়ন হয়েছে? সাংস্কৃতিক জাগরণ ও মননশীলতার উন্নয়ন ছাড়া জাতির সমৃদ্ধি ও পরিপূর্ণ মুক্তি সম্ভব নয়।
কোনো দিবস পালন করার উদ্দেশ্য থাকে ওই বিষয় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তোলা। জ্ঞানার্জন, চেতনা, মূল্যবোধের বিকাশ, গবেষণা, সংস্কৃতিচর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে গ্রন্থাগারের অপরিসীম ভূমিকা রাখার প্রত্যাশায় গ্রন্থাগার দিবসের প্রবর্তন।
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জেলা, উপজেলা পর্যায়ে এখন মোট গণগ্রন্থাগারের সংখ্যা ৭১টি। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার। ৫৮ জেলায় মোট বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৩৭ হাজার। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারে প্রতিদিন ৩ হাজার ৩৬০ জন পাঠক আসেন। অন্যদিকে জেলা পাঠাগারগুলো দৈনিক ব্যবহার করছেন প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার পাঠক।
দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান গ্রন্থাগার, এনজিও পরিচালিত গ্রন্থাগার ইত্যাদির মধ্যে একটি কার্যকর এবং ফলদায়ক সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এরূপ সমন্বয়ের ফলে বাংলাদেশের গ্রন্থাগার সেবার মান ও কার্যকারিতা দু-ই আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রন্থাগারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে। গ্রন্থাগার হচ্ছে সভ্যতার বাহন। দিবসটি ঘিরে সারা দেশের গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার অঙ্গনগুলো নানামুখী কর্মকাণ্ডে মুখর থাকে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সব জেলায় সকালে শোভাযাত্রা ও বিকেলে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পাঠচক্র, সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৯০ লাখ ছাত্রছাত্রীকে বই পড়াচ্ছে। চার হাজার স্কুলে যেখানে কোনো লাইব্রেরি ছিল না, লাইব্রেরি করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এছাড়া আরও দুই হাজার বিদ্যালয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র লাইব্রেরি স্থাপন করেছে। ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি প্রায় তিন হাজার গণকেন্দ্র ও পাঁচ হাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালনা করে, দেশব্যাপী প্রায় ১৪ লাখ পাঠক-পাঠিকা তৈরি করেছে। এসব কেন্দ্রে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। জ্ঞান ও তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করছে লাইব্রেরিজ আনলিমিটেড’ কর্মসূচি। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ঘোষণার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের গ্রন্থাগার-সংক্রান্ত কার্যাবলি আরও বেগবান হচ্ছে।
গ্রন্থাগারগুলোতে পাঠকের বয়স অনুযায়ী বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা ও বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য পাঠক ফোরাম, বই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। আগামী দিনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় গণগ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ সমগ্র দেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করবে।
জ্ঞানের চর্চা, সংরক্ষণ ও মানবজাতির কল্যাণে জ্ঞান বিতরণের জন্য কালের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে গ্রন্থাগার। আজ আমরা যে আধুনিক গ্রন্থাগার দেখি তার ইতিহাস দুই হাজার বছরের বেশি। তবে ৪০০০-৫০০০ বছর আগেও গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব ছিল বলে ধারণা করেন গবেষকরা। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিকে আধুনিক লাইব্রেরির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমান আধুনিক বিশ্বের গ্রন্থাগারের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশে গ্রন্থাগারগুলোকে সেই অর্থে আধুনিক বলা যায় না। বিশ্বজুড়ে লাইব্রেরির ধারণাই আজ পরিবর্তন হয়ে গেছে।
লাইব্রেরি হয়ে উঠেছে একাধারে জ্ঞান বিতরণকেন্দ্র, সামাজিক মিলনমেলার স্থান, একই সঙ্গে বিনোদনকেন্দ্রও বলা যায়। একসময় গ্রন্থাগার ছিল আবদ্ধ, সাধারণ মানুষের জন্য তা উন্মুক্ত ছিল না। গণতন্ত্রের প্রসারে জ্ঞানবিজ্ঞানে জনসাধারণের প্রবেশের পাশাপাশি ওই সব রাজরাজড়াদের লাইব্রেরিও উন্মুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গবেষক, সাধারণ মানুষ- সবার জ্ঞানের পিপাসা মেটানোর জন্য গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করে যায়।
রাষ্ট্রের উন্নয়নে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনুমান করার জন্য তথ্যবিহীন একটি রাষ্ট্র কল্পনা করা যায়, যেখানে কোনো তথ্য লিপিবদ্ধ নেই, না আছে আগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কোনো নথিপত্র। এমন একটি রাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বে যদি টিকে থাকা সম্ভব না হয় তাহলে লাইব্রেরির উন্নয়ন ছাড়াও কেন রাষ্ট্রের উন্নয়ন হতে পারে না এই ধারণাটুকু আমরা পেতে পারি। গ্রন্থাগার শুধু বই ধারণ করে এমন নয়, একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, অর্জন, আবিষ্কার-সবই ধারণ করে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন তৈরি করে। গ্রন্থাগারের উন্নয়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া এবং গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করা সরকারের কর্তব্য।
আমাদের সমাজে গ্রন্থাগার বলতে এখানও সেই আলমারিতে সাজানো সারি সারি বইয়ের চিত্রই মানসপটে ভেসে ওঠে। কিন্তু প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রন্থাগারের ধারণা পরিবর্তিত হয়ে ডিজিটাল গ্রন্থাগার হয়ে গেছে বেশ আগেই। গ্রন্থাগারে ডিজিটাল তথ্যসামগ্রী সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে আছে ই-বুক, পিডিএফ, সিডি, ডিভিডি, ইন্টারনেট পরিষেবা, অনলাইন গবেষণা জার্নাল, অনলাইন ডকুমেন্টেশনসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা। পাঠক চাইলে খুব সহজে গ্রন্থাগারের সব ডিজিটাইজড ভার্সন অ্যাকসেস পেয়ে ঘরে বসেই পড়াশোনা করতে পারছে। সময়, শ্রম, অর্থসাশ্রয়ী এই পদ্ধতি প্রয়োগে দরকার ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি। পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগে সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের মাধ্যমে গ্রন্থাগারগুলো ডিজিটাল গ্রন্থাগারে পরিণত করতে পারে। শুধু সারি সারি বইয়ের ধারণা থেকে বের হয়ে গ্রন্থাগারকে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন কর যেতে পারে।
গ্রন্থাগার দিবসের আবেদন হলো গ্রন্থাগারের বার্তা সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া; সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রন্থাগারের সেবা পৌঁছে দেওয়া। তথ্যসমৃদ্ধ জনগণ রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ, তাই তথ্য পৌঁছে দিতে গ্রন্থাগারকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আলোকিত ও সত্যিকার শিক্ষিত সচেতন দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কাজ করছে। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালন সফল হোক। আধুনিক তথ্যনির্ভর জাতি গঠনে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাঠাগার সেবা সবার কাছে পৌঁছে যাক।
যে পরিবারে গ্রন্থাগার আছে, তা ওই পরিবারে এক ধরনের আলাদা জ্যোতি ছড়ায়। ওই পরিবারে অসামাজিক ও জঙ্গিবাদী কাজ হতে পারে না। প্রতিটি সচেতন পরিবারেরই উচিত একটি পারিবারিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা। শিশুদের বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করা। ছোট হলেও প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার চালু করা উচিত। প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার আছে কি না, থাকলে চালু আছে কি না, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা তা পড়েন কি না ইত্যাদি বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
দুঃখের বিষয়, অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং অনেক অভিভাবক বলে থাকেন, বাইরের বই পড়ে সময় নষ্ট করার সময় নেই আমাদের শিক্ষার্থীদের। কলেজ পর্যায়েও বই পড়া, প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার স্থাপন ও সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের যদি আমরা সঠিক জ্ঞানের রাজ্যে নিয়ে যেতে পারি, বই পড়ার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে পারি, তাহলে তাদের আত্মা পরিশুদ্ধ হবে, তারা জঙ্গিবাদে জড়াবে না, ইভ টিজিং করবে না, মাদকাসক্ত হবে না, হাতে হকিস্টিক আর পিস্তল নিয়ে প্রতিপক্ষকে তাড়া করবে না। বই পড়লে তারা আলোয় উদ্ভাসিত হবে, অন্যায় করবে না। তাদের মনের দিগন্ত প্রসারিত হবে। তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে বিশিষ্ট লেখক ও মহামানবদের সঙ্গে। আর সেটি সম্ভব বই পড়ার মাধ্যমে। বই পড়েই তারা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে পারবে, দেশকে ভালোবাসতে শিখবে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রন্থাগার সম্পর্কে বলেছেন, ‘এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়িয়া আছে। বই হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেয়া সাঁকো।’
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, জীবনে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই, বই এবং বই।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম বলেন, একটি বই একশটি বন্ধুর সমান, কিন্তু একজন ভালো বন্ধু, পুরো একটি লাইব্রেরির সমান। দেকার্তে বলেন, ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলা।
অস্কার ওয়াইলড বলেন, একজন মানুষ ভবিষ্যতে কী হবেন, সেটি অন্য কিছু দিয়ে বোঝা না গেলেও তার পড়া বইয়ের ধরন দেখে, তা অনেকাংশেই বোঝা যায়।
মনীষীদের এই উক্তিগুলো থেকে খুব সহজেই বোঝা যায়, উন্নত জাতি গঠনে গ্রন্থ এবং গ্রন্থাগারের গুরুত্ব অপরিসীম।
জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের তাৎপর্য ও এর গুরুত্বারোপ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সংগঠক, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “আলোকিত মানুষ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হাত ধরেই সত্তর দশকের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। হাটি হাটি পা পা করে ৪৬ বছর পূর্ণ হয়েছে তার। স্বাধীন, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল মূল্যবোধসম্পন্ন, শক্তিশালী মানুষ তৈরির লক্ষ্যেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৪৬ বছর থেকে কাজ করছে। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিদ্যাসহ বিশ্বজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ বইগুলোর পঠন-পাঠন এই কাজের অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কোনো গৎ-বাঁধা, ছক-কাটা, প্রাণহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি সপ্রাণ সজীব পরিবেশ- জ্ঞান ও জীবন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পূর্ণতর মনুষ্যত্বে ও উন্নততর আনন্দে জেগে ওঠার এক অবারিত পৃথিবী। এক কথায়, যাঁরা সংস্কৃতিবান, কার্যকর, ঋদ্ধ মানুষ- যাঁরা অনুসন্ধিৎসু, সৌন্দর্যপ্রবণ, সত্যান্বেষী; যাঁরা জ্ঞানার্থ, সক্রিয়, সৃজনশীল ও মানবকল্যাণে সংশপ্তক ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; তাঁদের পদপাতে, মানসবাণিজ্যে, বন্ধুতায়, উষ্ণতায় সচকিত একটি অঙ্গন।
মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং বিভিন্নবিষয়ক জ্ঞান ও রুচিশীল সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার বিকাশ ঘটানো এর উদ্দেশ্য। আর তাই জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস আয়োজন বর্ণাঢ্য ও উৎসবমূখর হোক, সেই প্রত্যাশা করছি।
এ দিবসে জ্ঞানপিপাসু প্রতিটি মানুষের অবারিত অংশগ্রহণে আলোকিত মানুষ’ গড়ার আন্দোলন তরান্বিত হোক।”
গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষে ও এর তাৎপর্য তুলে ধরে লেখা কবিতা —
আজ বইয়ের দিন, আজ জ্ঞানের জয়,
আজ নীরব আলোর উৎসবময়।
কালো অক্ষরে বাঁধা যে আলো,
সে আলোতেই মেলে ভবিষ্যৎ ভালো।
ফেব্রুয়ারির বুকে ভাষার গান,
বইমেলার ধুলোয় স্বপ্নের টান।
এই মাসেই ডাকে গ্রন্থাগার,
জ্ঞানেই মুক্তি—আগামীর দ্বার।
বই শুধু কাগজ, কালির রেখা?
না—এ ইতিহাস, না—এ একা।
এ মানুষের বুদ্ধির ফল,
এ সভ্যতার দীর্ঘতম চল।
আলেকজান্দ্রিয়ার ধ্বংসস্তূপে
আজও জ্বলে জ্ঞানের দীপকূপে।
চার হাজার বছরের গোপন স্বর
বলে—গ্রন্থাগার মানেই ভোর।
পাঁচই ফেব্রুয়ারি—স্মৃতির দিন,
খুলেছিল দ্বার, খুলেছিল চিন।
পঞ্চাশ চারে সেই প্রথম সকাল,
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি—জ্ঞানচাল।
তারপর কেটে গেছে বহু কাল,
তবু কি জাগল পাঠের আলো?
আজও প্রশ্ন—এই দিবস কি
ছুঁতে পেরেছে গণমানুষের বোধবীথি?
শহরের আলো, গ্রামের আঁধার,
দুয়ের মাঝখানে গ্রন্থাগার।
যেখানে বই, সেখানে মন,
যেখানে জ্ঞান, সেখানেই গঠন।
তবু আজ কেন বইবিমুখতা?
কেন স্মার্টফোনে বন্দি আত্মা?
স্ক্রিনের আলোয় চোখ ঝলসে,
মন পড়ে থাকে শূন্য গ্লাসে।
বিদ্যালয়ে নেই পাঠের প্রাণ,
লাইব্রেরি মানে তালা-বান।
গাইড বই মুখস্থ বিদ্যার নামে,
মন পড়ে থাকে সংকীর্ণ ফ্রেমে।
আমরা কি চাই শুধু চাকরি-দৌড়?
নাকি চাই মনুষ্যত্বের জোয়ার?
জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ছাড়া
মুক্তি কি আসে, উন্নয়ন ধরা?
গ্রন্থাগার শুধু বইয়ের ঘর নয়,
এখানে গড়ে ওঠে বিবেকবোধ হয়।
এখানে মানুষ মানুষ হয়,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিন্তা রয়।
যে ঘরে বই, সে ঘরে আলো,
সেখানে অন্ধকার ঢোকে না ভালো।
সেখানে জন্মে না ঘৃণা-বিষ,
সেখানে জঙ্গি চিন্তা হয় নিঃশেষ।
একটি পরিবার, একটি তাক,
শুরু হোক আলো—এই তো ডাক।
শিশুর হাতে বই তুলে দাও,
ভবিষ্যৎটাকে রক্ষা করো চাও।
প্রতিটি জেলায় মডেল পাঠাগার,
এ শুধু দাবি নয়—এ প্রয়োজনার।
রাস্তা-সেতু হয়েছে অনেক,
মননের উন্নয়ন কই সেইখানে এক?
ডিজিটাল যুগে বদলেছে রূপ,
লাইব্রেরি আজ জ্ঞানের ইউটিউব।
ই-বুক, জার্নাল, তথ্যভাণ্ডার,
ঘরে বসেই জ্ঞানের বিস্তার।
তবু দরকার দক্ষ জনবল,
দরকার বাজেট, দরকার বল।
গ্রন্থাগারিক শুধু চাকুরে নয়,
তিনি আলোর বাহক, সভ্যতার সয়।
রাষ্ট্র যদি তথ্যহীন হয়,
সে রাষ্ট্র কি টিকে থাকে কই?
ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্জন-খতিয়ান
সবই ধরে রাখে গ্রন্থাগারই জান।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলো,
গ্রাম-শহরে ছড়ায় ভালো।
নব্বই লাখ ছাত্রের চোখে
বইয়ের স্বপ্ন জ্বলে লোকে লোকে।
ব্র্যাক, ব্রিটিশ কাউন্সিল—হাত বাড়ায়,
জ্ঞানকে নিয়ে যায় দূর প্রত্যন্ত পাড়ায়।
সরকার-বেসরকারি মিলিত স্রোত,
এভাবেই জাগুক পাঠের প্রণোদ।
রবীন্দ্রনাথ বলেন—কালো অক্ষরে
মানবাত্মা বাঁধা অমর ভরে।
শহীদুল্লাহ বলেন—বই, বই, বই,
এই তিনেই জীবন পূর্ণতা পাই।
কালাম বলেন—বই মানেই বন্ধু,
লাইব্রেরি মানেই বন্ধু-সিন্ধু।
দেকার্তে বলেন—ভালো বই পড়া
মানে শতাব্দীর জ্ঞানী ধরা।
অস্কার ওয়াইলড স্মরণ করায়,
মানুষের ভবিষ্যৎ বই-ই জানায়।
তাই তো বলি—গ্রন্থের পথে
হাঁটলেই মানুষ পূর্ণতা পেতে।
আজ গ্রন্থাগার দিবসের ডাক,
নেই যেন এ ডাক আনুষ্ঠানিক ফাঁক।
এ হোক আন্দোলন, এ হোক শপথ,
আলোকিত মানুষ—এটাই লক্ষ্যপথ।
শোভাযাত্রা নয় শুধু আজ,
দরকার পাঠ, দরকার আজ।
সেমিনারের ভাষণ শেষে
বই তুলে নিই হৃদয়বেশে।
সভ্যতা বাঁচে গ্রন্থাগারে,
সভ্যতা মরে বইহীন ঘরে।
এই সত্য বুঝে আজকের দিনে
শপথ নিই আমরা—বই ফিরুক জীবনে।
জ্ঞানেই মুক্তি—এই হোক পথ,
আগামীর ভিত্তি—এই হোক শপথ।
গ্রন্থাগার থাকুক প্রাণের মাঝে,
বাংলা জাগুক বইয়ের ভাষায়।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি