সিলেট ১০ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৫০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : সিলেট অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণে যাঁরা নীরবে, নিরলসভাবে আজীবন কাজ করে গেছেন, তাঁদের অন্যতম রামকৃষ্ণ সরকার আর নেই।
ধামাইল গানের সংগ্রাহক, সংরক্ষক, প্রশিক্ষক ও লেখক রামকৃষ্ণ সরকার বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সিলেটসহ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
লোকজ সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আজীবন ভালোবাসা ও অবদানকে স্মরণ করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাই টিভি–এর মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি সঞ্চয় দে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, “লোকজ সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও অবদান আমাদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর চলে যাওয়া সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।”
শোক প্রকাশ
রামকৃষ্ণ সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “ধামাইল শুধু একটি নৃত্যগীত নয়, এটি সিলেট অঞ্চলের নারীদের অনুভূতির ভাষা ও লোকজ সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি। এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে রামকৃষ্ণ সরকার আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাঁর মৃত্যু লোকসংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।”
ধামাইল: হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্য
সিলেটের লোকঐতিহ্য-ভাণ্ডারে ধামাইল নৃত্যগীত এক গৌরবোজ্জ্বল নাম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিয়ে, পূজা, অন্নপ্রাশনসহ নানা সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবে ধামাইল ছিল অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। গ্রামীণ জীবনের আনন্দ-বেদনা, নারীর অনুভূতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রকাশ ঘটত এই নৃত্যগীতে।
কিন্তু সময়ের স্রোতে ও আধুনিক সংস্কৃতির আগ্রাসনে ধামাইল আজ বিলুপ্তপ্রায়। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই ধামাইল কেবল একটি অপরিচিত নাম। ঠিক এমন এক সময়ে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ সরকার।
শিকড় থেকে যাত্রা
রামকৃষ্ণ সরকারের জন্ম মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের রুস্তমপুর গ্রামে। শৈশব থেকেই ধামাইলের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। আশপাশের গ্রামে বিয়ের আসরে গোল হয়ে হাততালি দিয়ে নেচে ওঠা নারীদের ধামাইল নাচ তাঁকে মুগ্ধ করত। সেই মুগ্ধতাই ধীরে ধীরে পরিণত হয় আজীবনের সাধনায়।
বিলুপ্তপ্রায় এই শিল্পরূপকে রক্ষায় গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি সিলেট অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন তিন শতাধিক ধামাইল গান, পাশাপাশি কীর্তন, বাউল ও আধ্যাত্মিক গান। শুধু গান সংগ্রহই নয়—গানের সঙ্গে যুক্ত নৃত্যভঙ্গি, ছন্দ, দেহভাষাও তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন যত্ন ও শ্রদ্ধার সঙ্গে।
প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ
২০০৫ সালে রামকৃষ্ণ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন নবনাগরী ধামাইল সংঘ ও ধামাইল একাডেমি। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি শিশু থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী নারী-পুরুষকে বিনামূল্যে ধামাইল গান ও নৃত্যের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিল্পীরা আজ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ধামাইল পরিবেশন করছেন, যা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই লোকঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি করছে।
সংগ্রাহক নন, সহযাত্রী
লোকগবেষক পার্থ তালুকদার মনে করেন, “সিলেট অঞ্চল মরমি সাধক ও চারণকবিদের উর্বর ভূমি। রাধারমণ দত্ত, হাছন রাজা, শাহ আবদুল করিমদের গান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হলেও সংরক্ষণের অভাবে বহু লোকগান হারিয়ে গেছে। রামকৃষ্ণ সরকারের মতো সংগ্রাহক না থাকলে ধামাইলও হয়তো হারিয়ে যেত।”
রামকৃষ্ণ সরকার শুধু গবেষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন ধামাইল শিল্পীদের সহযাত্রী। কাদা-মাটি মাড়িয়ে, প্রখর রোদে হেঁটে তিনি পৌঁছে গেছেন প্রত্যন্ত গ্রামে। নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের সঙ্গে মিশেছেন, তাঁদের জীবনের গল্প শুনেছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন অনুপ্রেরণা হয়ে। হারিয়ে যাওয়া সুর ও নৃত্যের ধারাকে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন মানুষের সামনে।
অবহেলায় নিভে যাওয়া জীবন
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর রামকৃষ্ণ সরকারের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর স্ত্রী শুক্লা রানী জানান, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। মেয়েদের পড়াশোনার খরচ সামলাতেও হিমশিম খেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অবহেলার মধ্যেই নিভে গেল এক নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতিসেবীর জীবন।
শেষ বিদায়ে রামকৃষ্ণ সরকারকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —
চলে গেলে তুমি আজ, রামকৃষ্ণ সরকার,
লোকজ মাটির বুক ভিজে উঠল বারবার।
ধামাইলের ঘুঙুর কাঁদে নিঃশব্দ রাতে,
সুর হারিয়ে খোঁজে তোমায় শূন্য আঙিনাতে।
শ্রীমঙ্গলের পথ ধরে হেঁটে গেছ নীরবে,
কাদা-মাখা গ্রাম পেরিয়ে ইতিহাসের গর্ভে।
হাততালির বৃত্ত ভেঙে, থমকে গেল গান,
নারীর বুকের ভাষা আজ হলো অচেনা নাম।
ধামাইল যে নাচ ছিল না, জানতে তুমি ভালো,
সে ছিল ঘরের গল্পকথা, সুখ-দুঃখের আলো।
বিয়ের উঠোন, পূজার রাত, অন্নপ্রাশনের দিন,
একই ছন্দে বাঁধা ছিল জীবনের রঙিন ঋণ।
শত শত বছর ধরে নারীর নিঃশ্বাসে,
ধামাইল বেঁচে ছিল সিলেটের আকাশে।
কিন্তু সময়ের দম্ভে, শহুরে অবহেলায়,
সে গান হারাচ্ছিল ধীরে নীরবতায়।
তখনই তুমি একা দাঁড়ালে প্রহরীর মতো,
লোকসংস্কৃতির পাশে পাহারায় নিরত।
গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরে, পায়ে ধুলো মেখে,
হারানো সুর কুড়িয়ে আনলে শত ব্যথা রেখে।
তিন শতাধিক গান তুমি করেছ সংগ্রহ,
কীর্তন, বাউল, ধামাইল—অমূল্য সম্ভার বহ।
লেখোনি শুধু কাগজে, রেখেছ মানুষের মনে,
নাচের ভঙ্গিমা, ছন্দ, তুলে ধরেছ যত্নে।
নবনাগরীর আঙিনায় শিশুদের কণ্ঠে,
তোমার শেখানো সুর বাজত নতুন গন্তব্যে।
বিনামূল্যে দিয়েছ শিক্ষা, বিনিময় চাওনি কিছু,
শুধু চেয়েছ বাঁচুক গান—এই ছিল পিছু।
কিন্তু হায় সমাজ জানল না তোমার দাম,
চিকিৎসার খরচে থেমে গেল জীবনের গান।
সংসারের কষ্ট, মেয়েদের পড়ার দায়,
তবু মুখে ছিল না অভিযোগের ছায়া।
লোকসংস্কৃতির সৈনিক তুমি, নিঃস্ব যোদ্ধা,
রাষ্ট্র চিনল না তোমায়, চিনল না শ্রদ্ধা।
যে মানুষ বাঁচাল ঐতিহ্যের প্রাণ,
সে মানুষই হারাল জীবনের অধিকার-মান।
আজ হাসপাতালের শীতল বিছানায়,
থেমে গেল ধামাইলের এক নির্ভীক ছায়া।
কিন্তু থামে কি সুর? থামে কি ইতিহাস?
মানুষ মরে, কাজ বাঁচে—এই তো বিশ্বাস।
রাধারমণ, হাছন রাজা, করিমের পাশে,
তোমার নাম লেখা রইল লোকগানের আকাশে।
সংগ্রাহকের কলমে নয়, শিল্পীর ঘামে,
তুমি লিখে গেলে নাম বাংলার গ্রামে।
তুমি শুধু গবেষক নও, ছিলে সহযাত্রী,
গ্রামের শিল্পীদের তুমি ছিলে অন্তরাত্মা।
তাদের গল্প, তাদের কান্না,
তাদের হাসি—সবই নিয়েছ বুকের মান্না।
আজ ধামাইলের বৃত্তে একটি হাত কম,
তবু তোমার শেখানো ছন্দে ঘোরে যুগধর্ম।
নারীর কণ্ঠে যখন উঠবে নতুন গান,
সেখানে তুমি আছ—অমর, অমলিন প্রাণ।
ধামাইল বাঁচানো মানে দেশ বাঁচানো কথা,
এই বোধ তুমি রেখে গেলে উত্তরাধিকার-পথা।
লোকঐতিহ্যের প্রদীপ তুমি জ্বালিয়ে গেলে,
অন্ধকার রাষ্ট্রের মুখে আলো ঢেলে দিলে।
চলে গেলে তুমি, কিন্তু রেখে গেলে দায়,
আমরা কি রাখব তোমার সাধনার ন্যায়?
নাকি ভুলে যাব আবার লোকজের ঋণ,
নতুন কোলাহলে হারাবে পুরোনো দিন?
রামকৃষ্ণ সরকার, তুমি ঘুমাও শান্তিতে,
ধামাইল বাঁচুক মানুষের অন্তঃস্থিতিতে।
তোমার নাম উচ্চারিত হোক প্রতিটি নাচে,
যতদিন সিলেটি গান বেঁচে আছে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি