শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জে ত্রয়োদশ নির্বাচন: তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি এগিয়ে

প্রকাশিত: ৮:০০ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬

শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জে ত্রয়োদশ নির্বাচন: তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি এগিয়ে

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার–৪ (শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ) আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘদিন জনগণের মধ্যে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র অবস্থান থাকা এই আসনে এবার ভিন্ন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মাঠে আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় বিএনপি প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। তবে স্বতন্ত্র ও জোটপ্রার্থীদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বহুমুখী সক্রিয় অবস্থান ও উপস্থিতিতে নির্বাচনী লড়াই সহজ নয় বলেও মত বিশ্লেষকদের।

আসনের কাঠামো ও ভোটার পরিস্থিতি

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ—এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার–৪ আসনে রয়েছে মোট ১৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা। পোস্টাল ভোটারসহ মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৮ জন। দুই উপজেলায় মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৬৩টি।

প্রার্থীদের তালিকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন—
বিএনপি: মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) — ধানের শীষ,
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট (বাসদ): অ্যাডভোকেট কমরেড মো. আবুল হাসান — মই,
স্বতন্ত্র: মহসিন মিয়া মধু — ফুটবল,
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): প্রীতম দাশ — শাপলা কলি,
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: মাওলানা নূরুল আলম হামিদী — রিকশা,
জাতীয় পার্টি: মো. জরিফ হোসেন — লাঙ্গল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও চা শ্রমিকদের ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করে স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়ী হয়ে আসছিলেন। ২০০১, ২০০৯ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এখানে বিজয়ী হন। তিনি সাতবারের সংসদ সদস্য।

এই তিন নির্বাচনেই তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি নেতা হাজী মুজিব। বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অতীতের কয়েকটি নির্বাচনে ভোট কারচুপির মাধ্যমে হাজী মুজিবকে পরাজিত করা হয়েছিল।

হাজী মুজিবের অবস্থান ও প্রচারণা

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাজী মুজিব ২০০১ সাল থেকে ব্যক্তিগত তহবিল ব্যবহার করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলন–সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে তাকে প্রায় চার বছর কারাবরণ করতে হয়েছে—যা তার রাজনৈতিক ত্যাগের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন সমর্থকরা।

এবারের নির্বাচনে বিএনপির বিশাল কর্মীবাহিনী দুই উপজেলায় ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাচ্ছে। বিশেষ করে চা শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের আকৃষ্ট করতে কৃষি কার্ড ও ফ্যামেলি কার্ডভিত্তিক নানা প্রতিশ্রুতি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে।

স্থানীয় ভোটারদের মতে, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় এবং হাজী মুজিবের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক উপস্থিতির কারণে বিএনপি এবার শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

কৃষক দল ও অঙ্গসংগঠনের মাঠ কার্যক্রম

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো ব্যাপক জনসংযোগ চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, শ্রীমঙ্গল পৌর শাখা ধানের শীষে ভোট চেয়ে প্রচার কার্যক্রম চালিয়েছে।
প্রচার বার্তায় নেতারা বলেন, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি জনগণের ভোটাধিকার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা দূর করার একটি সুযোগ।

তারা প্রতিশ্রুতি দেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে—

পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন,
আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা,
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ,
কর্মসংস্থান সৃষ্টি,
চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মানবিক জীবনমান নিশ্চিত করা হবে।

চা শ্রমিক ও কৃষি খাতের প্রতিশ্রুতি

Manual4 Ad Code

প্রচারণায় চা শ্রমিকদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিএনপি নেতারা জানান, উন্নত আবাসন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে চা শ্রমিকদের মর্যাদা রক্ষা করা হবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ফসলের ন্যায্যমূল্য, মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

অন্যান্য প্রার্থীর অবস্থান

স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জনপ্রিয় সাবেক মেয়র মহসিন মিয়া মধু ফুটবল প্রতীক নিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার আত্মীয়স্বজন ও নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী মাঠে সক্রিয় থাকায় ভোটের হিসাব কিছুটা জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে ১১ দলীয় জোটের দুই প্রার্থী—এনসিপির প্রীতম দাশ ও খেলাফত মজলিসের মাওলানা নূরুল আলম হামিদী—নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রচার চালাচ্ছেন। শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী প্রচারণায় সক্রিয় থাকলেও পরবর্তীতে জোটগত দ্বিধাবিভক্তির কারণে জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে।

Manual7 Ad Code

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমর্থিত ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট কমরেড মো. আবুল হাসান ব্যাপক গণসংযোগ অব্যাহত রাখলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে মাঠে তেমন সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষণ

Manual6 Ad Code

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন মূলত ধানের শীষ, ফুটবল, মই, রিকশা ও শাপলা কলি প্রতীকের মধ্যে বহুমুখী তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি প্রার্থী হাজী মুজিব স্পষ্টভাবেই এগিয়ে রয়েছেন।

উপসংহার

Manual4 Ad Code

সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। উন্নয়ন, শ্রমিক অধিকার, কৃষি ও গণতন্ত্র—এই ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে ভোটাররা যে রায় দেবেন, তার ওপরই নির্ভর করবে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও উন্নয়ন পথচিত্র।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ