শহীদ দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬

শহীদ দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | রাজশাহী, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : রূপম। পুরো নাম দেবাশীষ ভট্টাচার্য। ছাত্রমৈত্রী নেতা। ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি হাত-পায়ের রগ কাটার পর নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর স্টাডি অব টেরোরিজমের প্রতিবেদনে হালে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত এই ছাত্র সংগঠনটি সেই বছর এই হত্যাকা-টি ছাড়াও নৃশংসভাবে ছাত্রনেতাদের হাতের কবজি কেটে দেশজুড়ে আলোচনায় আসে।

নব্বইয়ের দশকের ছাত্রনেতাদের বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, নৃশংসতা আর হত্যার মধ্য দিয়ে ১৯৯২ সালের পর থেকে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ত্রাস হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর মেধাবী নেতৃত্বকে একের পর এক হত্যার মাধ্যমে দুর্বল করে ফেলা হয়। কিন্ত এসব ব্যাপারে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে। এই সুযোগে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে শিবির। ১৩ ফেব্রুয়ারি ছ্ত্রামৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপম ‘সকাল-সন্ধ্যা’ নামের একটি বাসে ঢাকা যাচ্ছিলেন। মহানগরীর চৌদ্দপাই এলাকায় ছাত্রশিবির ক্যাডাররা বাসের পথরোধ করে। একপর্যায়ে বাসভর্তি যাত্রীর সামনে সশস্ত্র শিবির ক্যাডাররা রূপমকে নিচে নামিয়ে আনে।

Manual6 Ad Code

এরপর প্রকাশ্যেই তার হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা রূপমকে এ সময় উপর্যুপরি ধারালো অস্ত্র দিয়েও আঘাত করা হয়। এসব কাজ পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করে খুব ধীরে-সুস্থেই চলে যায় হামলাকারীরা। স্থানীয়রা তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ঝরে যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো একটা মেধাবী প্রাণ।

শহীদ রূপম
— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

ফেব্রুয়ারির শীতল ভোরে কাঁপে লাল আকাশ,
রাজশাহীর বাতাস জুড়ে শোকের দীর্ঘশ্বাস।
চৌদ্দপাইয়ের মোড়ে আজও থমকে থাকে পথ,
রক্তমাখা স্মৃতির ভেতর জেগে থাকে শপথ।

রূপম তুমি নামটি শুধু নয় কোনো নাম,
জাগ্রত এক প্রতিজ্ঞার দীপ্ত অবিরাম।
দেবাশীষের চোখে ছিল স্বপ্নের আলোক,
মানুষ হবার সাধনাতে অনড় অটল লোক।

ক্যাম্পাস জুড়ে উচ্চারিত মুক্তির ভাষণ,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল দৃপ্ত উচ্চারণ।
ছাত্রমৈত্রীর পতাকা হাতে হেঁটেছ যে দিন,
প্রগতিরই গান ধরেছিলে দৃঢ় কণ্ঠস্বর ঋণ।

নব্বইয়ের সেই উত্তাল দিন অগ্নিময় সময়,
ভয়কে যারা শাসন করত, করত হৃদয় ক্ষয়।
অন্ধকারের রাজনীতির বিষদাঁত তখন,
ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়াত নীরব বিভীষিকাগণ।

একেক করে ঝরেছে কত তরুণ মেধা প্রাণ,
নিষ্ঠুরতার লেলিহান আগুনে পুড়ে জ্ঞান।
কবজিহারা আর্তনাদে কেঁপেছে প্রাচীর,
তবু নীরব থেকেছে কত দায়িত্বহীন অধীর।

তেরোই ফেব্রুয়ারি—দিনটি কালো অক্ষরে,
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা রক্তক্ষয়ের ঘরে।
‘সকাল-সন্ধ্যা’ বাসের ভেতর যাত্রাপথে তুমি,
ঢাকার পথে স্বপ্ন বয়ে এগোচ্ছিলে ভূমি।

হঠাৎ করে পথরোধে দাঁড়ায় ঘাতকদল,
সভ্যতারই মুখে তখন লেগে যায় ছলছল।
যাত্রীভরা বাসের মাঝে থমকে যায় প্রাণ,
নির্মমতার দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয় জ্ঞান।

নামিয়ে নেয় তোমায় তারা প্রকাশ্য জনে,
অস্ত্রের ঝলক রৌদ্রছায়া কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে।
হাতের রগ, পায়ের রগ কেটে দেয় তারা,
মানবতার বুকের উপর আঁকে কালো ধারা।

Manual5 Ad Code

যন্ত্রণাতে ছটফটানো রক্তাক্ত শরীর,
তবু চোখে নিভে না কোনো প্রতিবাদের নীর।
উপর্যুপরি আঘাত নামে ধারালো অস্ত্রে,
পিশাচেরা ধীরে সরে যায় অন্ধকারের পথে।

রাস্তার ধুলায় লুটিয়ে থাকা জাগ্রত এক দীপ,
নিভে গিয়ে আলোক হয়ে জ্বলে অনন্তরূপ।
মেডিকেলের পথে যেতে ঝরে প্রাণপ্রদীপ,
রাজশাহীর আকাশ জুড়ে নেমে আসে স্নিগ্ধ নীড়।

Manual8 Ad Code

ঝরে গেলে তুমি, তবু ঝরেনি উচ্চারণ,
রক্তস্রোতে ভেসে ওঠে ন্যায়েরই আহ্বান।
একটি প্রাণের বিনিময়ে জাগে হাজার প্রাণ,
অন্ধকারের প্রাচীর ভেঙে ওঠে নতুন গান।

রূপম, তোমার মৃত্যু নয় নিছক পরাজয়,
ইতিহাসের কাঁধে তুলে দিয়েছে নতুন জয়।
যে হাত কেটেছে রগ, সে কেটেছে নিজ মুখ,
মানবতার আদালতে লিখেছে লজ্জার সুখ।

আজ একত্রিশ বছর পেরোয় কালের স্রোতে,
তবু ক্ষতচিহ্ন শুকোয়নি বিশ্ববিদ্যালয় নোটে।
শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে থাকে নীরব সাক্ষী হয়ে,
রক্তমাখা সেই বিকেলের কথাই শুধু কয়।

ফেব্রুয়ারির বাতাস যখন দোলে কাঁপে ডাল,
তোমার নামই উচ্চারিত হয় লাল-সবুজে ঢাল।
শিক্ষাঙ্গনের প্রতিটি দেয়াল জানে তোমার ক্ষয়,
মুক্তচিন্তার দীপ জ্বেলে দিয়েছিলে যে জয়।

Manual2 Ad Code

যারা ভেবেছিল ভয় দেখিয়ে থামাবে উচ্চারণ,
তারা জানে না রক্তে জন্ম নেয় প্রতিরোধ-ধ্বনি গান।
একটি রূপম মানে শুধু একক তরুণ নয়,
সহস্র কণ্ঠে ধ্বনিত হওয়া অমর অভিযয়।

তোমার কাটা শিরা বেয়ে যে রক্ত ঝরেছিল,
তারই লালে লিখে গেছে ইতিহাস অমলিন ফল।
স্বাধীনতার মানচিত্রে নতুন রেখা টানে,
শহীদেরা পথ দেখায় আগামী প্রজন্মখানে।

আজও যখন অন্যায়ের ছায়া নামে ঘিরে,
তোমার স্মৃতি দাঁড়ায় এসে সাহস হয়ে তীরে।
ছাত্ররাজনীতির পথে যারা সত্য চায়,
তোমার নামই শপথ হয়ে বুকের মাঝে রয়।

রূপম, তুমি নিভে গিয়ে জ্বেলেছ আলোকস্তম্ভ,
অন্ধকারে দিশেহারা জনতার অনুপ্রেরণাসম্ভ।
রক্তের ঋণ শোধ হয় না কালের পরিমাপে,
তবু ন্যায়বোধ জেগে থাকে অটল প্রতাপে।

ফেব্রুয়ারির এই প্রহরে নত করি শির,
তোমার ত্যাগে জাগুক আবার মানবতার নীর।
শহীদ দেবাশীষ ভট্টাচার্য, প্রিয় রূপম নাম,
বাংলার ছাত্রহৃদয়ে থাকবে অনির্বাণ।

যতদিন ক্যাম্পাসে বাজে মুক্তির সুরধ্বনি,
যতদিন তরুণ চোখে জ্বলে স্বপ্নের আগুনখানি,
ততদিন তোমার স্মৃতি অমল দীপ্তিমান,
রক্তের ফেব্রুয়ারি হয়ে জাগবে অবিরাম।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ