বাম রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা, তবে সাংগঠনিক শক্তি ও জনসম্পৃক্ততা জরুরি

প্রকাশিত: ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬

বাম রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা, তবে সাংগঠনিক শক্তি ও জনসম্পৃক্ততা জরুরি

Manual8 Ad Code

চিররঞ্জন সরকার |

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থিদের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে বাম সংগঠন ও কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ের গণআন্দোলনগুলোতেও তাদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তারা নিয়মিতভাবে শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি, দেশের সম্পদ রক্ষা, লুটপাট বন্ধ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, দ্রব্যমূল্য—এসব ইস্যুতে কথা বলে। ফলে আদর্শ ও দাবির দিক থেকে বাম রাজনীতি এখনো প্রাসঙ্গিক। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে তাদের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও লুটপাটনির্ভর দলগুলোই নির্বাচনে ভালো ফলাফল করছে। এর বিপরীতে গরিব ও খেটেখাওয়া মানুষের পক্ষে কথা বলা বামপন্থি দলগুলো শক্তিশালী না হয়ে ধর্মকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠা মিথ্যাচার ও ভণ্ডামিতে ঠাসা মৌলবাদী গোষ্ঠী নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামদলগুলোর চরম ভরাডুবি এই রাজনীতিকে নতুন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তবে কি এই দেশে বাম রাজনীতি অচল হয়ে গেল? এটা কি বাম রাজনীতির সীমাবদ্ধতা, নাকি দলগুলোর সাংগঠনিক ব্যর্থতা?

এবারের নির্বাচনে ‘বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়া’র লক্ষ্যে নির্বাচনের আগে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ নামে জোট গঠন করে বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ অন্যতম। নির্বাচনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ১৪৭ জন প্রার্থীই বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। প্রত্যেকেই জামানত হারিয়েছেন। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটের সংখ্যা ছিল একেবারেই নগণ্য, এমনকি অনেক কেন্দ্রে বাম প্রার্থীরা কোনো ভোটই পাননি। অথচ তাদের প্রচারণায় ছিল বৈষম্যবিরোধী বক্তব্য, কর্মসংস্থানের দাবি, সামাজিক ন্যায়ের কথা। আইন অনুযায়ী, একটি আসনে যত সংখ্যক ভোট পড়বে, তার আট ভাগের এক ভাগের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। বাম দলগুলোর প্রার্থীরা প্রতিটি আসনেই জামানত হারিয়েছেন। এই ফল বাম রাজনীতির সাংগঠনিক শক্তি, জনভিত্তি ও কৌশলগত বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি করেছে।

Manual2 Ad Code

বামদের ভরাডুবির কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে ঐক্যহীনতার বিষয়টি। বাংলাদেশে বাম রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো—একই আদর্শের ভেতরে অসংখ্য দল, উপদল ও বিভক্ত ধারা। সামান্য মতভেদ থেকেও নতুন দল হয়েছে, নতুন প্ল্যাটফর্ম হয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, ১৫–২০ জন সক্রিয় নেতাকর্মী নিয়ে আলাদা আলাদা দল গড়ে উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে বাম রাজনীতি একটি বিভক্ত ও দুর্বল শক্তি হিসেবে থেকে গেছে। এক বামপন্থি আবার আরেক বামপন্থিকে ‘সুবিধাবাদী’ ‘সংশোধনবাদী’ মনে করে। ফলে কেউই সাংগঠনিকভাবে সবল হতে পারে না।

ষাটের দশকের আন্তর্জাতিক মতাদর্শিক বিভাজনের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছিল। রুশপন্থি ও চীনপন্থি ধারার বিভক্তি থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী সময়ে আরও নানা ভাগ তৈরি হয়েছে। কেউ নির্বাচনমুখী, কেউ নির্বাচনবিরোধী; কেউ সংসদীয় পদ্ধতিতে বিশ্বাসী, কেউ তা মানে না। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে বাম রাজনীতির পথ ও লক্ষ্য অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। কে আসলে কী চায়—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর তারা পায় না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো লেজুড়বৃত্তির অভিযোগ। অনেক সময় দেখা গেছে, বাম দলগুলো বড় কোনো রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে—কখনো ক্ষমতাসীনদের পাশে, কখনো বিরোধীদের পাশে। এতে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়। ভোটার তখন মনে করে—আলাদা করে বামকে ভোট দেওয়ার দরকার কী, বড় দলকেই ভোট দিলেই তো একই ফল! ফলে বামদের নিজস্ব ভোটব্যাংক তৈরি হয় না।

বাম রাজনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত শ্রমিক, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষ। কিন্তু বাস্তবে এই ভিত্তি মজবুত নয়। শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা অনিশ্চিত চাকরি, কম মজুরি ও বাসস্থানের সমস্যায় এমনভাবে জর্জরিত যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়। গ্রামে কৃষকদের মধ্যেও সংগঠিত রাজনৈতিক চেতনা দুর্বল। আর বাম সংগঠনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি গ্রামভিত্তিক কাজ কমে গেছে। তারা নতুন কর্মী সংগ্রহ, দল বড় করার চেয়ে তত্ত্ব নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়। ফলে দল ছোট হয়।

আরও একটি বিষয় হলো সাংস্কৃতিক দূরত্ব। বাম রাজনীতির সঙ্গে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক’ ভাবমূর্তি জড়িয়ে গেছে। তারা যুক্তি, তত্ত্ব, বিশ্লেষণের ভাষায় কথা বলে—যা সব শ্রেণির মানুষের কাছে সহজে পৌঁছায় না। সাধারণ মানুষ চায় সহজ ভাষা, সরাসরি সমাধানের কথা, বাস্তব সুবিধার রূপরেখা। শুধু নীতির কথা নয়, প্রয়োগের ছবিও দেখতে চায়। এই জায়গায় চরম ঘাটতি আছে।

বামপন্থি রাজনীতির আরেকটি গুরুতর ব্যাধি হচ্ছে পদ–পদবি ও নেতৃত্ব আঁকড়ে থাকার প্রবণতা। আদর্শগতভাবে বাম রাজনীতি ত্যাগ, গণতান্ত্রিক চর্চা ও সমষ্টিগত নেতৃত্বের কথা বললেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই বেশি দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যক্তি নেতৃত্বের পদে থেকে যেতে চান; নেতৃত্বের স্বাভাবিক রদবদল বা নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার সংস্কৃতি নেই বললেই চলে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে নেতৃত্বে আসতে না পারলে অনেক নেতা ঘোঁট পাকাতে শুরু করেন। নতুন নেতৃত্ব যেন উঠে আসতে বা কাজ করতে না পারে, সে জন্য সময়, মেধা ও অর্থ ব্যয় করার ঘটনাও অস্বীকার করা যায় না। এতে সংগঠনের শক্তি বাড়ার বদলে ভেতরের দ্বন্দ্বই বাড়ে।

কথা ও আচরণের মধ্যে স্ববিরোধিতাও বামপন্থিদের একটা বড় সমালোচনার জায়গা। জনসমক্ষে ত্যাগ, সংযম ও সমতার কথা বলা হলেও ব্যক্তিজীবনে বিলাসী জীবনযাপন—এমন বৈপরীত্য নেতাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে। সাধারণ কর্মীদের কাছে কঠোর আদর্শিক শৃঙ্খলার প্রত্যাশা করা হয়, কিন্তু নেতারা নিজে সেই মানদণ্ড মেনে চলেন না। একইভাবে দেখা যায়, অনেকে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে ইংল্যান্ড-আমেরিকার সমালোচনা করেন, কিন্তু নিজের সন্তানদের সেইসব দেশেই পাঠান। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে এটি স্বাভাবিক হলেও রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। ফলে কর্মে ও আচরণে সৎ, সংযমী এবং গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের সংকট এখন বাম দলগুলোর ভেতরেও আলোচিত বিষয়। এই সংকট কাটাতে হলে নেতৃত্বে মেয়াদসীমা, নিয়মিত নির্বাচন, স্বচ্ছ জবাবদিহি, জীবনাচরণে সংযম এবং কথার সঙ্গে কাজের মিল—এসব নীতি বাস্তবে প্রয়োগ করা ছাড়া বিকল্প নেই। তবেই আদর্শ ও আস্থার ফাঁকটা কমানো সম্ভব।

বাম রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো নেতৃত্বের একটি অংশের মধ্যে অহমিকা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং অনমনীয়তার প্রবণতা। সাধারণভাবে দেখা যায়, বাম ঘরানার নেতারা অন্য অনেক প্রচলিত দলের তুলনায় বেশি পড়াশোনা করেন, তাত্ত্বিক আলোচনা ও মতাদর্শিক বিতর্কে বেশি সময় দেন। রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনীতি, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব নিয়ে তাদের জ্ঞানও তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। কিন্তু এই পুঁথিগত শক্তিই অনেক সময় উল্টো দুর্বলতায় পরিণত হয়। বেশি জানার অনুভূতি থেকে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ‘উচ্চমন্যতা’ তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে দলীয় সংস্কৃতিতে অহংকেন্দ্রিক আচরণে রূপ নেয়।

এর ফলে ভিন্ন মতকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক মতপার্থক্য হিসেবে নেওয়ার বদলে ভুল বা বিভ্রান্তি হিসেবে দেখা হয়। যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন বা সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ না করে ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে ধরা হয়। দলের ভেতরে মতবিনিময় ও বিতর্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলার বদলে প্রশ্নকারীকেই ‘বিপথগামী’ বা ‘শৃঙ্খলাভঙ্গকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। বহিষ্কার বা দূরে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এর পরিণতি হয় আরও ক্ষতিকর—যিনি বাদ পড়েন, তিনিও থেমে থাকেন না; নিজের সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে নতুন দল বা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। এভাবে বিভাজনের চক্র চলতেই থাকে। ছোট ছোট দল জন্ম নেয়, কিন্তু জনভিত্তি তৈরি হয় না।

Manual4 Ad Code

এই প্রবণতা বাম রাজনীতিকে বাস্তবতা থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। মাঠের শক্তি, জনসম্পৃক্ততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বাস্তব হিসাব না করে তারা এক ধরনের আত্মতুষ্টির ঘোরে থাকেন। আত্মসমালোচনার বদলে তখন দায় চাপানো হয় পরিবেশ, নির্বাচনব্যবস্থা বা জনগণের ‘অচেতনতা’-র ওপর।

তবে এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বজুড়েই বামপন্থার এক ধরনের বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে। একসময় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মডেল হিসেবে যে দেশগুলোর কথা বলা হতো—যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীন—আজ সেগুলোকে আর আগের অর্থে উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায় না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে বহু আগেই। চীনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও একদলীয় শাসনব্যবস্থা আছে, কিন্তু অর্থনীতিতে শক্তিশালী বাজার কাঠামোও গড়ে উঠেছে। বামপন্থিরা এখন আর স্পষ্টভাবে বলতে পারে না—তারা যে সমাজের কথা বলে, তার বাস্তব উদাহরণ কোথায়।

এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান বাম রাজনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ধর্মের ভাষা আবেগের ভাষা—সহজ, দ্রুত এবং গভীরভাবে মানুষের মনে পৌঁছায়। অন্যদিকে অধিকার, সাম্য, ন্যায়—এসব ধারণা যুক্তিভিত্তিক, ব্যাখ্যা দরকার হয়, সময় লাগে। ফলে ধর্মীয় পরিচয়ের আহ্বান অনেক সময় রাজনৈতিক আহ্বানের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। মানুষকে ধর্মের কথা বলে দ্রুত সংগঠিত করা যায়, কিন্তু শ্রেণিবৈষম্য বা কাঠামোগত অন্যায়ের কথা বলে সংগঠিত করা তুলনামূলক কঠিন।

গত কয়েক দশকে মানুষের সামাজিক চরিত্রও বদলেছে। আগের তুলনায় এখন মানুষ বেশি বাস্তবমুখী, অনেক ক্ষেত্রে বেশি ভোগবাদী। তারা দীর্ঘমেয়াদি আদর্শের প্রতিশ্রুতির চেয়ে স্বল্পমেয়াদি বাস্তব লাভকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ‘এখন কী পাব’—এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় শুধু আদর্শের কথা বলে মানুষের সমর্থন টানা কঠিন। বামপন্থিরা সাধারণত নগদ সুবিধা দেওয়ার রাজনীতি করে না, করতে চায়ও না। কিন্তু অন্য রাজনৈতিক শক্তি যখন সরাসরি বা পরোক্ষ সুবিধা দেয়, তখন প্রতিযোগিতায় বামরা পিছিয়ে পড়ে।

এখন প্রশ্ন—এই অবস্থা থেকে বের হতে বাম রাজনীতির কী করা উচিত?

প্রথমেই যা করা দরকার তা হলো বাস্তবভিত্তিক ঐক্য গড়া। সব মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব নয়, দরকারও নেই। কিন্তু ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে একটি কার্যকর ঐক্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা দরকার। নির্বাচনে একটি আসনে একজন প্রার্থী—এই সাধারণ সমঝোতাও যদি বজায় রাখা না যায়, তবে মানুষের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। ঐক্যের জন্য নিয়মিত সংলাপ, যৌথ কর্মসূচি, বিরোধ মীমাংসার কাঠামো দরকার।

Manual1 Ad Code

তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার দিকে জোর দিতে হবে। গ্রাম, হাট, কলকারখানা এলাকা, শ্রমবাজার—এসব জায়গায় নিয়মিত কাজ করতে হবে। শুধু সভা-সমাবেশ নয়, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে—মজুরি না পাওয়া, জমি নিয়ে বিরোধ, স্থানীয় দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসেবা—এসব ইস্যুতে সরাসরি সহায়তা দিলে সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই সম্পর্কই পরে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ নেয়।

ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে বোঝানো, নতুন কর্মীবাহিনী তৈরি, পাড়া-মহল্লায় ছোট ছোট সভা, নিয়মিত যোগাযোগ—এসব কাজ এখন কম দেখা যায়। ছাত্র–যুবদের টার্গেট করে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগও এখন সীমিত। অথচ রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে। শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা শহরকেন্দ্রিক কর্মসূচি দিয়ে সংগঠন বড় হয় না।

বামপন্থিদের ধর্ম বিষয়ে আরও সংবেদনশীল ও ইতিবাচক হতে হবে। ধর্মকে সরাসরি অস্বীকার বা অবজ্ঞা করলে ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। বরং ধর্মের ভেতরে যে ন্যায়, সততা, মানবসেবা, শোষণবিরোধী মূল্যবোধ আছে—সেগুলো আত্মস্থ ও চর্চায় আনা দরকার। এটা বোঝাতে হবে যে, সামাজিক ন্যায়বিচারের রাজনীতি ধর্মবিরোধী নয়; বরং মানুষের মর্যাদা রক্ষারই আরেক ভাষা। ধর্মপ্রাণ মানুষের আস্থা না পেলে সংগঠন বিস্তৃত করা কঠিন।

Manual4 Ad Code

নির্বাচনি রাজনীতিতে কৌশল বদলানোও জরুরি। একসঙ্গে সারাদেশে বহু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শক্তি নষ্ট করার বদলে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকা টার্গেট করা উচিত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন—ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, চেয়ারম্যান, পৌর কাউন্সিলর—এসব পদ থেকে শুরু করলে তৃণমূলভিত্তি তৈরি হয়। স্থানীয় সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখলে মানুষের আস্থা বাড়ে। ধাপে ধাপে সেই আস্থা বড় নির্বাচনে কাজে লাগে।

রাজনীতিকে শুধু স্লোগাননির্ভর না রেখে জনসেবামুখী করতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ, নিরাপদ পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—এসব বিষয়ে নিয়মিত কাজ করা যায়। তরুণদের জন্য লাইফ স্কিল প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, চাকরি প্রস্তুতি কর্মশালা, ভাষা শেখার ক্লাব—এসব উদ্যোগ সরাসরি উপকার দেয়। রক্তদান কর্মসূচি, বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ক্যাম্প, আইনি সহায়তা শিবির—এসব জনমুখী কাজ মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে রাজনীতি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। নতুন সময়ের ইস্যু ধরতে হবে। এখন শুধু জমি-শ্রমের প্রচলিত প্রশ্ন নয়—ডিজিটাল কাজ, ফ্রিল্যান্স শ্রমিক, গিগ ইকোনমি, বেকার শিক্ষিত তরুণ, জলবায়ু ঝুঁকি, নগর বস্তি—এসব বড় বাস্তবতা। বাম রাজনীতিকে দেখাতে হবে—এই নতুন সমস্যাগুলোর সমাধানে তাদের কী পরিকল্পনা আছে। তরুণদের চাকরি, দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতি প্রস্তাব দিতে হবে।

ভাষা ও যোগাযোগ কৌশল বদলানো দরকার। কঠিন তাত্ত্বিক ভাষার বদলে সহজ, দৈনন্দিন ভাষায় কথা বলতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট ভিডিও, গ্রাফিক ব্যাখ্যা—এসব মাধ্যম ব্যবহার করে বার্তা পৌঁছাতে হবে। শুধু সমালোচনা নয়, সমাধানের গল্প বলতে হবে—ক্ষমতায় গেলে কী করবে, ১০টি নির্দিষ্ট কাজ কী—এগুলো স্পষ্ট করতে হবে।

স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে হবে। বড় দলের ছায়ায় থাকলে স্বল্পমেয়াদে সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হয়। মানুষ বিকল্প শক্তি দেখতে চায়—সহযোগী শক্তি নয়। তাই নীতিগত বিষয়ে আপস না করে স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার সাহস দরকার।

যুব ও নারীনেতৃত্ব বাস্তবভাবে তুলে আনতে হবে। কেবল পোস্টারে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তরুণ ও নারী নেতাদের ভূমিকা দিতে হবে। ছাত্র, তরুণ পেশাজীবী, তরুণ শ্রমিক—এই শ্রেণির সঙ্গে সরাসরি কাজ বাড়াতে হবে। তাদের সমস্যা—চাকরি, বাসা ভাড়া, শিক্ষা ব্যয়, অনলাইন কাজের অনিশ্চয়তা—এসব নিয়ে আলাদা কর্মসূচি দরকার।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাম রাজনীতির আবেদন শেষ হয়ে যায়নি। বৈষম্য, বেকারত্ব, সামাজিক অন্যায় যতদিন থাকবে, ততদিন সাম্যের রাজনীতির প্রয়োজন থাকবে। কিন্তু সেই প্রয়োজনকে শক্তিতে রূপ দিতে হলে বামপন্থিদের আত্মসমালোচনা করতে হবে, নিজেদের নতুনভাবে তৈরি করতে হবে।

কেবল গতানুগতিক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রাখলে বামপন্থিরা কখনই সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা হতে পারবে না। সেক্ষেত্রে দোকানের ঝাপ বন্ধ করে দেওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ!।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ