সিলেট ১০ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:৩৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক| ঢাকা, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষি খাত নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তাতে করপোরেট পুঁজির হাতে বন্দী কৃষকেরা আরও বেশি শৃঙ্খলিত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেছেন, একটা অধীনতার চুক্তি করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিদায় নিচ্ছেন।
আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অবিভক্ত বাংলায় তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রর জন্মশতবার্ষিকীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক শিক্ষক আনু মুহাম্মদ।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘তেভাগা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতটা ছিল একটা সামন্তব্যবস্থার বিরুদ্ধে। এসব আন্দোলন একই সঙ্গে ব্রিটিশ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তান হলো, বাংলাদেশ হলো। এখন আমরা যে কৃষিব্যবস্থার মধ্যে আছি, তার মধ্যে একটা বড় পরিবর্তনের জায়গা হচ্ছে এখন আগের সেই সামন্ত কৃষিব্যবস্থা নেই। এখন করপোরেট পুঁজির আগ্রাসনের মধ্যে ঢুকে গেছে কৃষি। কৃষক এখন পুঁজির শৃঙ্খলে বন্দী।’
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘করপোরেট পুঁজির আগ্রাসন আমরা দেখে আসছিলাম দীর্ঘদিন ধরে। সর্বশেষ ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের কৃষিকে আরও শৃঙ্খলিত করার ব্যবস্থা করেছে।’
চুক্তির শর্ত উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সে চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি, তাদের করপোরেট স্বার্থ, সেগুলোর বাইরে বাংলাদেশ যেতে পারবে না—এ রকম একটি অধীনতামূলক চুক্তি করে ড. ইউনূস বিদায় নিচ্ছেন।’
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ইলা মিত্র দূর থেকে দেখার বিষয় নয়, পূজা করার বিষয় নয়। ইলা মিত্রর সংগ্রামকে নিত্যদিনের সংগ্রামের সাথি করে নিয়ে চলতে পারলেই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করে কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার একটা বড় সৌভাগ্য, কলকাতায় ইলা মিত্রর বাড়িতে আমি এক বছর ছিলাম। তিনি তিনবার বাংলাদেশে এসেছেন, তিনবারই আমার বাসায় ছিলেন। ভালো ছাত্রী ছিলেন, সেরা কলেজে পড়েছেন, রাজনীতিতে প্রশিক্ষিত ছিলেন, খেলাধুলাতেও পারদর্শী ছিলেন।’
কমরেড ইলা মিত্রর ত্যাগ ও কর্মব্যস্ততার চিত্র তুলে ধরে কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আমি কাছ থেকে দেখেছি কতটা ব্যস্ততায় তাঁর দিন কাটত। তিনি ছিলেন বিধানসভার সদস্য। কলেজে পড়াচ্ছেন, সকালে বাজার করে রান্না করছেন, তারপর পার্টি অফিসে যাচ্ছেন। ঝড়ের গতিতে ছুটেছেন তিনি।’
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘ইতিহাসের বিকৃতি নানাভাবে হয়, ভুল তথ্য দিয়ে হয়; কিন্তু সবচেয়ে বড় বিকৃতি হলো সত্যকে আড়াল করে রাখা। আমাদের কোন টেক্সট বইয়ে ইলা মিত্রর নাম আছে? আমাদের কোন টেক্সট বইয়ে তেভাগা আন্দোলনের কথা আছে? এই লড়াই আমাদের করতে হবে এবং এটা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
জমি বর্গা দেওয়া যায়, কিন্তু স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না মন্তব্য করে মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, মেহনতি মানুষকে একটা কথা বুঝতে হবে যে তাদের নিজেদের স্বার্থে নিজেদের দাঁড়াতে হবে। জমি বর্গা দেওয়া যায়, কিন্তু স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না। স্বার্থটা খালি অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও।

রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অবিভক্ত বাংলায় তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রর জন্মশতবার্ষিকীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের আলোচকেরা: আরপি নিউজ
অবিভক্ত বাংলায় উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ ভূমিহীন কৃষকের ও এক ভাগ জমির মালিকের—এই দাবিতে ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলন গড়ে ওঠে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে কলকাতা থেকে পার্টির সিদ্ধান্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে আসেন ইলা মিত্র। কৃষকদের সংগঠিত করে তিনি আন্দোলন জোরদার করে তোলেন।
গবেষক ও লেখক পাভেল পার্থ বলেন, ‘এমন একটা সময়ে এমন একজনকে নিয়ে কথা বলতে এসেছি, যাঁকে আমাদের রাষ্ট্র কখনো গুরুত্ব দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা অন্য একটি দেশের জিম্মায় দিয়ে দিয়েছে। নানকার বিদ্রোহ থেকে ২৪–এর জুলাই গণ–অভ্যুত্থান—সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছে কৃষক ও তাদের সন্তানেরা। কিন্তু রাষ্ট্র কখনো কৃষকের পক্ষে দাঁড়ায়নি। একটি দেশের প্রধানতম উৎপাদককে কখনোই সেই মর্যাদা দেওয়া হয়নি।’
কবি ও লেখক সোহরাব হাসান বলেন, ইলা মিত্র শুধু তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন না, তিনি একাধারে শিক্ষাব্রতী ছিলেন, দুইবার বিধানসভার সদস্য ছিলেন, কমিউনিস্ট নেত্রী ছিলেন। কলকাতার জীবন ছেড়ে পার্টির সিদ্ধান্তে নাচোলে চলে আসেন। কৃষকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘রানি মা’।
পূর্ব বাংলায় ইলা মিত্র থাকতে পারেননি, কিন্তু পূর্ববঙ্গকে কখনো ভুলতে পারেননি। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের উচিত ছিল তাঁকে একটি স্বীকৃতি দেওয়া। ব্রিটিশ আমলে তেভাগা আন্দোলনে তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর একটা উদ্যোগ রাষ্ট্র নিতে পারত যে তিনি ওই মামলায় নির্দোষ ছিলেন।
সোহরাব হাসান আক্ষেপ করে বলেন, তাঁকে কি একটা সম্মানজনক নাগরিকত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল না?
ইলা মিত্রর জীবন ও কর্মের ওপর একটা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। তিনি বলেন, ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ হয়েছিল ১৮৫৫ সালে। ইতিহাসবিদেরা বলেন, আমাদের প্রথম স্বাধীনতার সংগ্রাম ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে। আমি দ্বিমত পোষণ করে বলি, সংগ্রামের শুরু সাঁওতাল বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে আরও দুই বছর আগে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে ইলা মিত্রর স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এএলআরডির চেয়ারপারসন খুশী কবির। তিনি বলেন, ‘আমাদের হবু প্রধান বিরোধী দল বলছে নারী কিছু করতে পারে না। তারা ইলা মিত্রর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জেনে দেখতে পারে যে নারী কী করতে পারে।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের খোকন সুইটেন মুর্মু বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে ইলা মিত্র জীবন ও কর্ম নিয়ে সংকলিত বই ‘বঞ্চনা ও বৈষম্যবিরোধী সাঁওতাল বিদ্রোহের কিংবদন্তি নেত্রী–ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ’ শীর্ষক বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি