সিলেট ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২৬
প্রথমেই একটা মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, সন্ত্রাসবাদ আর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ এক জিনিস না। এই দুটাকে ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে ফেলা একটা সচেতন রাজনৈতিক কূট-কৌশল।
ইতিহাসবিদরা বহুবার দেখিয়েছেন, ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল একটা সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধ, যার লক্ষ্য ছিল দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করা, নির্বিচারে বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা চালানো না। শব্দ বদলালেই ইতিহাস বদলে যায় না, কিন্তু ইতিহাসকে বিকৃত করার সবচেয়ে সহজ উপায় অবশ্যই শব্দ বদলে দেওয়া, এই যে বিপ্লবীকে সন্ত্রাসী বানিয়ে ফেললেই যেন কাজ শেষ। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল না।
মাস্টারদা সূর্য সেন এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সন্ত্রাসী বলা ইতিহাসের বিরুদ্ধে একটা সচেতন রাজনৈতিক অবস্থান। এখানে একটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন জরুরি, terrorism কী, আর anti-colonial resistance কী?
১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ছিল একটা highly targeted রাজনৈতিক অভিযান। টেলিগ্রাফ লাইন কাটা, অস্ত্রাগার দখল, প্রশাসনিক কাঠামো অচল করা, এসব ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রকে আঘাত করার কৌশল। রাজনৈতিক তত্ত্বে একে বলা হয় targeted anti-state violence, যা উপনিবেশিক পরিস্থিতিতে প্রায়শই স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে বিশ্লেষিত হয়। এখানে নির্বিচারে বেসামরিক মানুষকে টার্গেট করার কোনো প্রমাণ নাই, যা সন্ত্রাসবাদের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ইতিহাসবিদরা সূর্যসেনের এই অভিযানকে proto-revolutionary action হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, একটা উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর প্রথম সংগঠিত রাষ্ট্র-চ্যালেঞ্জ হিসেবে।
একইভাবে, প্রীতিলতার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণকে suicide bombing বলা বৌদ্ধিকভাবে অসৎ। suicide bombing বলতে বোঝায়, নিজেকে বিস্ফোরিত করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা। প্রীতিলতা তা করেননি। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রথম নারী বিপ্লবী এবং বীরকন্যা। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম ও্ পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে বিষপানে আত্মাহুতি দেন। তিনি একটা বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক স্থাপনায় targeted হামলা চালান, যেখানে “Dogs and Indians not allowed” ধরনের অপমানজনক সাইনবোর্ড ছিল, এবং ধরা পড়ার আগে সায়ানাইড গ্রহণ করেন, যেটা ছিল নির্যাতন এড়ানোর কৌশল। তিনি বাংলার বিপ্লবী নারীদের সাহসের অনন্য প্রতীক।
এখানে একটা বড় পদ্ধতিগত ভুল কাজ করছে, anachronism। ২১শ শতকের terrorism ধারণা নিয়ে ১৯৩০ এর ঔপনিবেশিক সংগ্রামকে বিচার করা এই সময়ের gen z দের একটা কমন একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক শর্টকাট, এরা ইতিহাস বোঝার বদলে তাকে বিকৃত করতে বেশি উৎসাহী।
সমস্যাটা ধারণাগত বিকৃতি বা conceptual distortion এর, আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, terrorist শব্দ নিজেই একটা power-loaded category। ঔপনিবেশিক শাসকরা সবসময়ই তাদের বিরোধীদের এই লেবেল দিয়েছে। ব্রিটিশরা ভারতীয় বিপ্লবীদের terrorist বলেছে, ফরাসিরা আলজেরিয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের, এমনকি Nelson Mandela কেও একসময় সন্ত্রাসী বলা হতো।
এখন আসি দ্বিতীয় যুক্তিতে, “আমরা সূর্যসেন, প্রীতিলতাদের সেলিব্রেট করি, কিন্তু মুসলিম সংগ্রামীদের না।”
এই যুক্তি দেখতে নিরপেক্ষ মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে এটা একটা বিপজ্জনক communal reframing of history। একটা false binary তৈরি করে এটা। উপমহাদেশের ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলন ছিল inherently plural, এখানে ধর্মীয় পরিচয় প্রধান নির্ধারক ছিল না। আপনি সূর্য সেনের এর ভূমিকা স্বীকার করলে মাওলানা ভাসানী বা এ কে ফজলুল হকের অবদান অস্বীকার করতে হয় না।
ইতিহাস কোনো ধর্মীয় প্রতিযোগিতা না, যেখানে একজনকে স্বীকৃতি দিলে অন্যজন মুছে যায়। উপমহাদেশের ঔপনিবেশিকবিরোধী সংগ্রাম ছিল বহুমাত্রিক, বহুধর্মীও এবং আন্তঃসম্পর্কিত। সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনেও মুসলিম বিপ্লবীরা ছিলেন। এখানে হিন্দু, মুসলিম, নারী, পুরুষ, সবাই অংশ নিয়েছে।
এই সংগ্রামকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ করা আসলে ইতিহাসের ব্যাখ্যা না, বরং এক ধরণের political project of identity construction. এরা selective framing করে, অতীতকে ব্যবহার করে, to create ideological division, সোজা কোথায় বর্তমানের বিভাজনকে শক্তিশালী করার কূটকৌশল আমি বলবো।
এখানে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন আসে, violence এর legitimacy। Frantz Fanon তাঁর The Wretched of the Earth এ দেখিয়েছেন, ঔপনিবেশিক শাসন নিজেই একটা structural violence, যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রায়শই সহিংস হয়ে ওঠে। সেই সহিংসতা সবসময় নৈতিকভাবে আরামদায়ক না হলেও, সেটাকে সরলভাবে terrorism বলা যায় না। সেটা বরং একটা রাজনৈতিক agency পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া।
এই পুরো আলোচনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো memory politics। যখন ইতিহাসকে নির্বাচিতভাবে পুনর্গঠন করা হয়, তখন কিছু চরিত্রকে মহিমান্বিত করা হয়, কিছু চরিত্রকে মুছে ফেলা হয়, আর কিছু চরিত্রকে নতুন নামে ডাকা হয়। এখন যদি সূর্যসেনকে সন্ত্রাসী বলা যায়, কাল খুব সহজেই অন্য যেকোনো প্রতিরোধ আন্দোলনকেও একই ভাষায় অপরাধ বানানো যাবে।
যদি আমরা ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে সব ধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধকে সন্ত্রাসবাদ বলে চিহ্নিত করি, তাহলে একই যুক্তি কি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে না? পাকিস্তানি সামরিক রাষ্ট্র তো মুক্তিযোদ্ধাদেরও terrorist বলেছিল। তাহলে কি আমরা সেই ভাষাকেই এখন পুনরাবৃত্তি করছি?
তাই সূর্যসেন বা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে ‘সন্ত্রাসী’ বলাকে দৃষ্টতার পাশাপাশি আমি মনে করি, এটা পুরো ঔপনিবেশিক প্রতিরোধের ইতিহাসকে অপরাধের ভাষায় অনুবাদ করা। আর একবার যদি আমরা এই অনুবাদকে স্বাভাবিক করে ফেলি, তাহলে ভবিষ্যতের প্রতিরোধগুলোকেও খুব সহজেই সন্ত্রাস বলে ঘোষণা করা যাবে।
#
ড. লুবনা ফেরদৌসী
শিক্ষক ও গবেষক
ইংল্যান্ড।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি