মানবতা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

প্রকাশিত: ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, মে ২১, ২০২৬

মানবতা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

Manual5 Ad Code
প্রযুক্তির অগ্রগতির ভিড়ে মানুষ কি মানুষ হওয়াই ভুলে যাচ্ছে?

সৈয়দা হাজেরা সুলতানা |

আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণা কিংবা ডিজিটাল যোগাযোগ—সবখানেই মানুষ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। শহর বড় হয়েছে, অট্টালিকা উঁচু হয়েছে, মানুষের জীবনযাত্রা হয়েছে আরও আধুনিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উন্নতির ভেতর মানুষ কি সত্যিই মানবিকতায় উন্নত হয়েছে?

চারদিকে তাকালে যেন ভিন্ন এক বাস্তবতা চোখে পড়ে। মানুষ এখন মানুষকে বোঝার আগেই বিচার করে, ভালোবাসার আগেই স্বার্থের হিসাব করে, সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগেই নিজের লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে। সম্পর্কগুলো ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে, আর মানবতা হয়ে পড়ছে নিঃস্ব ও অসহায়। সমাজে সহমর্মিতা, মমত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সময়ে ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন—এসব শব্দ আর কেবল সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়; যেন আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী থেকে পুরুষ—কেউই আজ নিরাপদ নয়। রাজনৈতিক মতভেদ, ধর্মীয় বিভাজন কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে মানুষ মানুষকে নির্মমভাবে আঘাত করছে। দল ও মতের ভিন্নতার কারণে একজন মানুষ আরেকজনের জীবন কেড়ে নিতে দ্বিধা করছে না। এমনকি মায়ের সামনে সন্তানকে হত্যা করা কিংবা গর্ভবতী নারীকে নির্যাতনের মতো বিভীষিকাময় ঘটনাও আজ আমাদের সমাজে ঘটছে।

Manual2 Ad Code

প্রশ্ন জাগে—মানুষ এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে কীভাবে?

যে মানুষ নিজেও একদিন মায়ের গর্ভে ছিল, সে কীভাবে একজন গর্ভবতী নারীর প্রতি পাশবিক আচরণ করতে পারে? যে মানুষ শৈশবে ভালোবাসা ও স্নেহে বড় হয়েছে, সে কীভাবে একটি শিশুর জীবন নির্মমভাবে কেড়ে নিতে পারে? সভ্যতার দাবি করা মানুষ যদি মানবিকতা হারিয়ে ফেলে, তবে সেই সভ্যতার প্রকৃত মূল্য কোথায়?

মানবিকতার এই অবক্ষয়ের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের প্রভাব মানুষকে ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। এখন মানুষ অন্যের কষ্ট অনুভব করার চেয়ে নিজের অবস্থান ও সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে সহমর্মিতার জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে তরুণ সমাজের একাংশ আজ বিভ্রান্তির মধ্যে বেড়ে উঠছে। তারা ভার্চুয়াল জগতে সংযুক্ত হলেও বাস্তব মানবিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। প্রতিযোগিতামূলক সমাজে সফলতার চাপ মানুষকে সংবেদনশীলতার পরিবর্তে কঠোর করে তুলছে। অথচ একটি সুস্থ সমাজ গড়তে প্রযুক্তির চেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধ।

আমরা প্রায়ই বলি, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু সেই শ্রেষ্ঠত্ব কেবল জ্ঞান বা ক্ষমতায় নয়; বরং বিবেক, মমতা ও মানবিকতায়। একজন মানুষ তখনই প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে, যখন সে অন্যের দুঃখ বুঝতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং অসহায় মানুষের পাশে থাকার সাহস রাখে।

আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনুষ্যত্বের পুনর্জাগরণ। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবখানেই মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। শিশুদের শুধু ভালো ফলাফল নয়, ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু তার ঊর্ধ্বে আমাদের মনে রাখতে হবে—সবার আগে আমরা মানুষ।

ধর্ম, বর্ণ, মত কিংবা পরিচয়ের বিভাজন ভুলে যদি আমরা একে অপরের প্রতি সামান্য সহমর্মিতা দেখাতে পারি, তবে সমাজ অনেক বেশি সুন্দর ও নিরাপদ হয়ে উঠবে। কারণ মানবতা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

Manual4 Ad Code

আজ সময় এসেছে নিজেদের কাছে প্রশ্ন করার—আমরা কি সত্যিই মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি?

মানুষ হই—শুধু পরিচয়ে নয়, মনেও। ????
#

Manual2 Ad Code

সৈয়দা হাজেরা সুলতানা (শানজিদা)
শিক্ষার্থী,
পদার্থবিজ্ঞান (সম্মান) ১ম বর্ষ
মুরারিচাঁদ কলেজ,
সিলেট।

Manual7 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ