সিলেটের রাতারগুলে বৃক্ষরোপণ ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ কর্মসূচি

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, জুন ৬, ২০২৬

সিলেটের রাতারগুলে বৃক্ষরোপণ ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ কর্মসূচি

Manual6 Ad Code
  • জলারবন রক্ষায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক | সিলেট, ০৬ জুন ২০২৬ : বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দেশের একমাত্র স্বীকৃত মিঠাপানির জলাবন রাতারগুলে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য অপসারণ এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে শনিবার (৬ জুন ২০২৬) সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রাতারগুল জলারবনের মাঝের ঘাট এলাকায় এ কর্মসূচির আয়োজন করে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), সিলেট শাখা এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট, সিলেট।

আয়োজকদের সূত্রে জানা যায়, সকাল থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে স্বেচ্ছাসেবক, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে ফলজ, বনজ ও ঔষধি প্রজাতির প্রায় অর্ধশতাধিক গাছের চারা রোপণ করা হয়। একইসঙ্গে বন ও বনসংলগ্ন এলাকা থেকে পাঁচ বস্তারও বেশি প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য ক্ষতিকর বর্জ্য সংগ্রহ করে পরিবেশসম্মত উপায়ে ধ্বংস করা হয়।

Manual3 Ad Code

পরিবেশবাদীরা জানান, পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য দিন দিন রাতারগুলের পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

আলোচনা সভায় পরিবেশ সংকট নিয়ে উদ্বেগ

বৃক্ষরোপণ ও বর্জ্য অপসারণ কর্মসূচির আগে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ধরার সিলেট শাখার আহ্বায়ক এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট, সিলেটের সভাপতি ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ধরার সংগঠক ও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক।

Manual5 Ad Code

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে বৃক্ষরোপণ এবং বন সংরক্ষণ এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে কার্যকর বনভূমির পরিমাণ তার তুলনায় অনেক কম। সরকারি নথিতে বনভূমি থাকলেও অনেক স্থানে পর্যাপ্ত বৃক্ষ নেই। তাই বনভূমি পুনরুদ্ধার, নতুন বন সৃষ্টি এবং সারাদেশে সবুজায়ন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।”

রাতারগুলের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং একটি সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এখানে আগত পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। টেকসই পর্যটনই হতে পারে রাতারগুল সংরক্ষণের অন্যতম কার্যকর উপায়।”

প্লাস্টিক দূষণে হুমকির মুখে রাতারগুল

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পরিবেশ সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টিই এ দিবসের মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, “সিলেটের পাহাড়, টিলা, বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য দেশের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বন উজাড় এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে এ অঞ্চলের পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্তমানে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি দেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাবন রাতারগুলও এ দূষণের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, “আজকের কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা প্রতীকীভাবে বর্জ্য সংগ্রহ ও ধ্বংস করেছি। এর মূল উদ্দেশ্য পর্যটক ও স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা। একইসঙ্গে পরিবেশ দূষণ রোধে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাই।”

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর নজরদারির দাবি

সভাপতির বক্তব্যে ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার বলেন, রাতারগুল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভূমিক্ষয় ও নদীভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। স্থানীয় সচেতন জনগণ ও পরিবেশকর্মীদের আন্দোলনের ফলে প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করায় বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

তিনি বলেন, “রাতারগুল শুধু একটি বন নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাস। কিন্তু প্লাস্টিক ফাঁদ ব্যবহার করে মাছ শিকারসহ নানা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব অনিয়ম বন্ধে আমরা ধারাবাহিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “রাতারগুলকে ঘিরে পর্যটন কার্যক্রম অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে। একইসঙ্গে নতুন বৃক্ষরোপণ, বন পুনরুদ্ধার এবং বিদ্যমান বন সংরক্ষণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।”

স্থানীয়দের সম্পৃক্ততায় পরিবেশ রক্ষার বার্তা

অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কমরেড উজ্জ্বল রায়, ট্যুরিস্ট পুলিশের উপপরিদর্শক সঞ্জয় কুমার রায়, পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রেজাউল কিবরিয়া, ধরার সিলেট শাখার সদস্য নাহিদ পারভেজ বাবু ও সোনা মিয়া, ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফখরুল ইসলাম চৌধুরী, স্থানীয় বাসিন্দা আমির আলী, আরব আলী, মিনহাজ উদ্দিন, ফজলু মিয়াসহ পরিবেশকর্মী, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ কর্মসূচির মাধ্যমে রাতারগুলের পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দায়িত্বশীল পর্যটনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।

Manual1 Ad Code

পরিবেশবাদীদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, পর্যটক ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের এই অনন্য জলাবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ