সিলেট ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৩৫ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | যশোর, ১২ জুন ২০২৬ : বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণের আগেই দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলসীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে যেসব উদ্যোগ দুই দেশের জন্য কল্যাণকর হবে, আগামী দিনে সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দুই দেশের জনগণের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক বন্ধনের কথা তুলে ধরে বলেন, “ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা।”
শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) বেলা ১১টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পেট্রাপোল সীমান্ত অতিক্রম করে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। এ সময় নো-ম্যানস ল্যান্ডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তা এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী মৃণাল ত্রিবেদী। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
সম্পর্কের নতুন বার্তা
বাংলাদেশে পৌঁছে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে।
তিনি বলেন, “প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রে আমরা মিলেমিশে কাজ করতে চাই। একটি ক্রিকেট দল যদি সম্মিলিতভাবে গড়ে ওঠে, তাহলে সেটি যেমন শক্তিশালী হয়, তেমনি দুই দেশের সহযোগিতাও আমাদের আরও এগিয়ে নিতে পারে। তবে এর জন্য উভয় পক্ষের সমর্থন প্রয়োজন।”
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে কেবল কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণভিত্তিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বের দিকে আরও জোর দেওয়া হতে পারে।
‘পুশ ইন’, সীমান্ত উত্তাপ ও বাণিজ্য ইস্যু
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে কথিত ‘পুশ ইন’, অনুপ্রবেশ, ভিসা জটিলতা এবং বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকরা তাঁর কাছে এ বিষয়ে জানতে চান।
জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা। আমার তো মনে হচ্ছে না, আমি বাংলাদেশে এসেছি। ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি—এই ১৬০ কোটি মানুষের জন্য যা ভালো হয়, সেটাই করা হবে। দুই দেশের জন্য ভালো হয় এমন পদক্ষেপই আমরা সামনে নিতে চাই।”
যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো নীতিগত ঘোষণা দেননি, তবে তাঁর বক্তব্যে দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বৈধ বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো তাঁর দায়িত্বকালে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
ব্যতিক্রমী নিয়োগ
বাংলাদেশে ভারতের ১৮তম হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। গত এপ্রিল মাসে ভারত সরকার তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেয়। তিনি পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
প্রণয় ভার্মা ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সম্প্রতি তাঁকে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের কূটনৈতিক রীতিতে সাধারণত ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস (আইএফএস)-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রায় ৫৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সক্রিয় রাজনীতিবিদকে ভারত বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠাল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
৭৫ বছর বয়সী দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ। তিনি একসময় ভারতের রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর লোকসভা আসন থেকেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পান।
তবে ২০১৬ সালের পর তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বিজেপির একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক
গুজরাটি ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও দীনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবন গড়ে উঠেছে মূলত পশ্চিমবঙ্গে। ফলে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি সাবলীলভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন এবং পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর গভীর ধারণা রয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক এই সংযোগ বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধন, শিক্ষা বিনিময় এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে তিনি সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হবেন।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর সামনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
সীমান্তে উত্তেজনা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ হ্রাস;
ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধি;
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা;
সংযোগ অবকাঠামো ও ট্রানজিট সহযোগিতা সম্প্রসারণ;
পানি বণ্টন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আস্থা বৃদ্ধি;
প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদার করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগের কারণে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে বিভিন্ন জটিল বিষয়ে দ্রুত সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, ভিসা ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও অসন্তোষও দেখা দিয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দীনেশ ত্রিবেদীর দায়িত্ব গ্রহণকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বেনাপোলে তাঁর প্রথম বক্তব্যেই যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা এবং জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা উঠে এসেছে, তা আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের গতিপথে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে কূটনৈতিক মহলের প্রত্যাশা।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি