সরদার ফজলুল করিম: জ্ঞান, সংগ্রাম ও মানবমুক্তির এক অনন্য আলোকবর্তিকা

প্রকাশিত: ১০:৫৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২৬

সরদার ফজলুল করিম: জ্ঞান, সংগ্রাম ও মানবমুক্তির এক অনন্য আলোকবর্তিকা

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৫ জুন ২০২৬ : আজ বাংলাদেশের প্রখ্যাত দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, অনুবাদক, লেখক ও প্রগতিশীল চিন্তার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব সরদার ফজলুল করিমের দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী।

২০১৪ সালের ১৫ জুন তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারিয়েছিল এক অসাধারণ মনীষীকে, যিনি আজীবন জ্ঞানচর্চা, মানবমুক্তি, যুক্তিবাদী চিন্তা এবং সাম্যভিত্তিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্নে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছে।

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে সরদার ফজলুল করিম একটি অনন্য নাম। তিনি শুধু একজন দর্শনের শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণের এক অক্লান্ত সৈনিক। বিশ্বদর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি এবং সমাজচিন্তাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও বোধগম্য ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য। জীবনব্যাপী তিনি বিশ্বাস করেছেন, মানুষের মুক্তির পথ জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিক চেতনার মধ্য দিয়েই নির্মিত হতে পারে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন: সংগ্রামের ভিতর থেকে উঠে আসা এক আলোকিত মানুষ

১৯২৫ সালের ১ মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে, বরিশালের উজিরপুর উপজেলার আটিপাড়া গ্রামের এক নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সরদার ফজলুল করিম। তাঁর পিতা খবিরউদ্দিন সরদার ছিলেন কৃষিজীবী এবং মাতা সফুরা বেগম ছিলেন গৃহিণী। শৈশবে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকলেও জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর ছিল অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ছোটবেলায় বাজারে তরিতরকারি বিক্রি করেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।

বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ১৯৪০ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪২ সালে আইএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৫ সালে অনার্স এবং ১৯৪৬ সালে দর্শনশাস্ত্রে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন।

তাঁর অসামান্য ফলাফলের কারণে তিনি ব্রিটিশ সরকারের উচ্চশিক্ষার জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ স্কলারশিপ লাভের সুযোগ পান। কিন্তু ব্যক্তিগত উন্নতির চেয়ে সামাজিক মুক্তির সংগ্রামকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তিনি সেই স্কলারশিপের সাক্ষাৎকারপত্র ছিঁড়ে ফেলেন। এই ঘটনা তাঁর জীবনদর্শনের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে আছে।

শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি: ব্যক্তিসাফল্যের বদলে মানুষের পক্ষে অবস্থান

১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। একজন মেধাবী শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর সামনে ছিল সম্ভাবনাময় এক একাডেমিক ভবিষ্যৎ। কিন্তু সমাজের বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে পদত্যাগ করে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

মানুষের মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি আজীবন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল দৃঢ়, কিন্তু সেই বিশ্বাস কখনও অন্ধ মতাদর্শে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং মানবমুক্তির বৃহত্তর দর্শনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

কারাজীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম

Manual1 Ad Code

প্রগতিশীল ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে পাকিস্তান আমলে সরদার ফজলুল করিমকে বারবার রাষ্ট্রের নিপীড়নের শিকার হতে হয়। তিনি দীর্ঘ ১১ বছর বিভিন্ন সময়ে কারাগারে বন্দি ছিলেন। কারাবাসের সময়ও তিনি সংগ্রাম থেকে বিচ্যুত হননি। সহবন্দিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং ৫৮ দিনের অনশন ধর্মঘটেও যুক্ত ছিলেন।

কারাগারে থেকেও তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা কমেনি। ১৯৫৪ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বাংলা একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ এবং পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যাবর্তন

১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে। স্বাধীনতার পর তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন প্রিয় শিক্ষক, যিনি জটিল দর্শনচিন্তাকেও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারতেন।

জ্ঞানচর্চার প্রতি আজীবন নিবেদন

সরদার ফজলুল করিমের জীবন ছিল জ্ঞানচর্চার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার চিন্তার স্বাধীনতা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি কাজে লাগাতে চাইতেন পাঠ, গবেষণা ও লেখালেখির জন্য।

তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত একটি ঘটনা আজও আলোচিত। একবার মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা তাঁকে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান। বিনয়ের সঙ্গে তিনি জবাব দেন—
“Your time is valuable and my time is also valuable. Let us not waste our time.”

এই উক্তির মধ্যেই প্রতিফলিত হয় তাঁর ব্যক্তিত্ব, আত্মমর্যাদাবোধ এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর নিষ্ঠা।

লেখক ও অনুবাদক হিসেবে অসামান্য অবদান

বাংলা ভাষায় বিশ্বদর্শন ও পাশ্চাত্য দর্শনের ক্লাসিক গ্রন্থগুলোকে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে সরদার ফজলুল করিমের অবদান ঐতিহাসিক। তিনি মনে করতেন, জ্ঞান যদি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তবে তার প্রকৃত সামাজিক মূল্যায়ন হয় না।

তাঁর উল্লেখযোগ্য মৌলিক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—

চল্লিশের দশকে ঢাকা,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক,

রুমীর আম্মা,

নানা কথা,

নানা কথার পরের কথা,

নূহের কিশতী ও অন্যান্য প্রবন্ধ,

গল্পের গল্প,

সেই সে কাল,

দর্শনকোষ,

শহীদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা স্মারকগ্রন্থ।

তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—

প্লেটোর রিপাবলিক,

Manual2 Ad Code

প্লেটোর সংলাপ,

এরিস্টটলের পলিটিক্স,

Manual8 Ad Code

এঙ্গেলসের অ্যান্টি-ড্যুরিং,

রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট,

দি কনফেশনস,

পাঠ-প্রসঙ্গ।

তাঁর অনুবাদগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল মূল ভাব ও তাত্ত্বিক গভীরতা অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলা ভাষায় সাবলীল উপস্থাপন।

চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ

Manual6 Ad Code

সরদার ফজলুল করিমের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ। তিনি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সংকীর্ণতা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন দৃঢ়ভাবে। তাঁর রচনায় বারবার উঠে এসেছে মানবিকতা, যুক্তিবাদ, মুক্তচিন্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য কেবল রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই তিনি জ্ঞানচর্চাকে মানুষের মুক্তির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

বাংলা ভাষা, সাহিত্য, দর্শন ও অনুবাদ সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য সরদার ফজলুল করিম বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০০০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পদক অর্জন করেন।

তাঁর অবদান কেবল পুরস্কারে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের চিন্তাজগতে তিনি এক স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।

আজও প্রাসঙ্গিক কেন সরদার ফজলুল করিম

বর্তমান সময়ে যখন সমাজ নানা ধরনের বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, তথ্য-বিভ্রান্তি ও মূল্যবোধের সংকটের মুখোমুখি, তখন সরদার ফজলুল করিমের চিন্তা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যুক্তিবাদ, মানবিকতা, জ্ঞানচর্চা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আজও জাতির জন্য পথনির্দেশক।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন মানুষ একই সঙ্গে শিক্ষক, চিন্তাবিদ, রাজনৈতিক কর্মী, অনুবাদক এবং মানবমুক্তির সংগ্রামী হতে পারেন। ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রতিষ্ঠার চেয়ে মানুষের কল্যাণকে বড় করে দেখার যে বিরল দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ তাঁর দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে সেই প্রজ্ঞাবান মানুষটিকে, যিনি জ্ঞানের আলোকে সমাজকে আলোকিত করার ব্রত নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়— জ্ঞান কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয় নয়; এটি মানুষের মুক্তি, মর্যাদা এবং মানবিক সমাজ নির্মাণের শক্তিশালী হাতিয়ার।

জন্ম: ১ মে ১৯২৫
মৃত্যু: ১৫ জুন ২০১৪

সরদার ফজলুল করিমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ