সংস্কৃতি খাতে ২% বরাদ্দের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে মানববন্ধন ও মিছিল

প্রকাশিত: ১০:০৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২৬

সংস্কৃতি খাতে ২% বরাদ্দের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে মানববন্ধন ও মিছিল

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ, ২৩ জুন ২০২৬ : জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতে কমপক্ষে ২ শতাংশ বরাদ্দ, শিক্ষার সব স্তরে সাংস্কৃতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং দেশের সকল উপজেলায় আধুনিক গণপাঠাগার নির্মাণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে মানববন্ধন ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বক্তারা বলেছেন, সংস্কৃতির বিকাশ ছাড়া একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন সম্ভব নয়। সমাজে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, মাদকাসক্তি, সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক অবক্ষয় মোকাবিলায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকল্প নেই।

মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) বিকেল সাড়ে ৫টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। পরে অংশগ্রহণকারীরা শহরে একটি মিছিল বের করেন।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক প্রদীপ সরকার এবং সঞ্চালনা করেন জেলা সদস্য সচিব জামাল হোসেন।

Manual2 Ad Code

সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য কমরেড সেলিম মাহমুদ। সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল, মূকাভিনয় সংগঠক জহিরুল ইসলাম মিন্টু, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম নারায়ণগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আক্তার, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের জেলা সদস্য সেলিম আলাদিন ও বেলাল হোসাইন এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম।

বক্তারা বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতকে আবারও অবহেলা করা হয়েছে। দেশের সামগ্রিক বাজেটের তুলনায় সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত কম, যা জাতির সৃজনশীল, নৈতিক ও মানবিক বিকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; টেকসই ও মানবিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তারা বলেন, বর্তমান সময়ে সমাজে মাদকাসক্তি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং অপসংস্কৃতির বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব সামাজিক সংকট মোকাবিলায় সাংস্কৃতিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংস্কৃতি মানুষকে যুক্তিবাদী, মানবিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে এবং সমাজে সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলে।

Manual4 Ad Code

বক্তারা আরও বলেন, দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগীত, নৃত্য, চারুকলা ও শারীরিক শিক্ষা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষকও নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা দাবি জানান, প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে সাংস্কৃতিক ও শারীরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং এ জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সমাবেশে বক্তারা দেশের পাঠাগার সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তারা বলেন, বহু উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকায় এখনও আধুনিক গণপাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ডিজিটাল যুগে বইপাঠের অভ্যাস কমে যাওয়ার পাশাপাশি পাঠাগারের অভাবে জ্ঞানচর্চার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি জ্ঞানভিত্তিক, সচেতন ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের স্বার্থে দেশের প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন গণপাঠাগার নির্মাণ এবং নিয়মিত বই সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

Manual2 Ad Code

বক্তারা অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সংস্কৃতি খাতকে প্রায়ই গৌণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সৃজনশীল শক্তি বিকাশের প্রধান মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। তাই সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি শুধু শিল্পী-সাহিত্যিকদের দাবি নয়; এটি একটি সুস্থ, সচেতন ও মানবিক সমাজ গঠনের জাতীয় প্রয়োজন।

Manual4 Ad Code

মানববন্ধন থেকে তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়—জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২ শতাংশ সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ও শারীরিক শিক্ষা চালু করে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, এবং দেশের সকল উপজেলায় আধুনিক গণপাঠাগার নির্মাণ।

সমাবেশের শেষাংশে বক্তারা বলেন, একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গঠনে সংস্কৃতি খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ বাড়ানো না হলে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা কঠিন হবে। তারা সরকারের প্রতি সংস্কৃতি খাতকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান।

মানববন্ধনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সচেতন নাগরিকরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শন করে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং পাঠাগার নির্মাণের দাবিতে স্লোগান দেন। অনুষ্ঠানের পর একটি মিছিল নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ