সিলেট ১৩ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, প্রগতিশীল রাজনীতি ও শিশু-কিশোর আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় আলোকবর্তিকা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৪ আগস্ট ২০২৬ : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণ, শিশু-কিশোরদের মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আজীবন সোচ্চার থাকা শহীদ জায়া, শিক্ষাবিদ, গবেষক, ঔপন্যাসিক ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক পান্না কায়সারের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
২০২৩ সালের ৪ আগস্ট সকালে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁর প্রয়াণে দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, শিক্ষাঙ্গন এবং শিশু-কিশোর সংগঠনগুলো গভীর শোক প্রকাশ করে।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠন স্মরণসভা, আলোচনা, দোয়া ও শ্রদ্ধাঞ্জলি কর্মসূচির আয়োজন করেছে। তাঁর কর্মজীবন, আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে বিভিন্ন আয়োজনে।
জন্ম ও শৈশব
অধ্যাপক পান্না কায়সার ১৯৫০ সালের ২৫ মে কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার পয়ালগাছা চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা, গবেষণা, রাজনীতি এবং সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
গণআন্দোলনের উত্তাল সময়ে বিয়ে
১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে, শহীদ বুদ্ধিজীবী, প্রখ্যাত সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সেদিন ঢাকা শহরে কারফিউ জারি ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই শুরু হয় তাঁদের দাম্পত্য জীবন।
শহীদুল্লাহ কায়সারের সান্নিধ্যে পান্না কায়সারের সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রগতিশীল চিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শনের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। পরবর্তীকালে তিনি নিজেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠে পরিণত হন।
মুক্তিযুদ্ধের নির্মম ট্র্যাজেডি
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে, আলবদর বাহিনীর সদস্যরা রাজধানীর বাসা থেকে শহীদুল্লাহ কায়সারকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম নৃশংস অধ্যায়।
এই নির্মম ঘটনার পর ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করেন পান্না কায়সার। একদিকে তিনি দুই সন্তান—অভিনেত্রী শমী কায়সার ও অমিতাভ কায়সারকে এককভাবে লালন-পালন করেন, অন্যদিকে নিজেকে নিবেদিত করেন শিক্ষা, সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং সামাজিক আন্দোলনে।
শিশু-কিশোর আন্দোলনের অগ্রদূত
অধ্যাপক পান্না কায়সারের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল শিশু-কিশোরদের নিয়ে তাঁর নিরলস কাজ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত দেশের অন্যতম বৃহৎ শিশু-কিশোর সংগঠন ‘খেলাঘর’-এর সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৭৩ সালে যুক্ত হন।
১৯৯০ সালে সংগঠনটির প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সারাদেশে খেলাঘরের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করেন। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা”—এই আদর্শকে সামনে রেখে তিনি হাজার হাজার শিশু-কিশোরের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার বীজ বপন করেন।
শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তাঁর ভূমিকা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শিক্ষক, লেখক ও গবেষক
পেশাগত জীবনে পান্না কায়সার দীর্ঘদিন রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
সাহিত্য ও গবেষণাতেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর গবেষণাকর্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন পান্না কায়সার। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি শিক্ষা, নারী অধিকার, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সোচ্চার
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার আন্দোলনে অধ্যাপক পান্না কায়সার ছিলেন দৃঢ় কণ্ঠস্বর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তিনি দীর্ঘদিন জনমত গঠনে কাজ করেন এবং বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল ইতিহাসের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার একটি মৌলিক দর্শন।
আদর্শের উত্তরাধিকার
পান্না কায়সারের জীবন ছিল ব্যক্তিগত বেদনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের এক অনন্য সমন্বয়। স্বামীকে হারানোর গভীর শোককে তিনি কখনও ব্যক্তিগত সীমায় আটকে রাখেননি; বরং তা রূপ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মকে আদর্শিকভাবে গড়ে তোলা এবং মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের সংগ্রামে।
শিক্ষক, লেখক, গবেষক, সাংস্কৃতিক সংগঠক, সংসদ সদস্য ও শিশু-কিশোর আন্দোলনের নেতৃত্ব—প্রতিটি পরিচয়ে তিনি রেখে গেছেন অনন্য অবদান।
স্মরণে এক আলোকিত জীবন
তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে অধ্যাপক পান্না কায়সারকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন দেশের সাহিত্যিক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, খেলাঘরের কর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষ।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের মতে, “পান্না কায়সারের জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, মানবিক সমাজ নির্মাণ এবং শিশু-কিশোরদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন তিনি লালন করেছিলেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।”
দেশের ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের একজন সংগ্রামী প্রতিনিধি হিসেবে যেমন তিনি স্মরণীয়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নে নিরলস এক কর্মী হিসেবেও তাঁর অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি