ফেল করা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, শিক্ষকদের কক্ষে বাইরে থেকে তালা

প্রকাশিত: ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২৬

ফেল করা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, শিক্ষকদের কক্ষে বাইরে থেকে তালা

Manual3 Ad Code
  • শেরপুরে রামেরচর উচ্চবিদ্যালয়ে এসএসসি ফল নিয়ে উত্তেজনা; দুই দাবি মেনে নেওয়ার পর মুক্ত শিক্ষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক | শেরপুর, ১১ আগস্ট ২০২৬ : এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর শেরপুর সদর উপজেলার রামেরচর উচ্চবিদ্যালয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি কক্ষে আটকে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুটি দাবিতে সম্মতি দেওয়ার পর শিক্ষকদের মুক্ত করা হয়। গতকাল সোমবার বিকেলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় রামেরচর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ৭৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাঁদের মধ্যে মাত্র ২১ জন পাস করেছে। ফলাফল প্রকাশের পর বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবক বিদ্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে একটি কক্ষে আটকে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেন। খবর পেয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদা বেগম বিষয়টি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানান। পরে তাঁর মাধ্যমে খবর পেয়ে শেরপুর সদর থানা-পুলিশ বিদ্যালয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষকদের উদ্ধার করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

দুই দাবি মেনে নেওয়ার পর তালা খোলা

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুটি দাবিতে সম্মতি দেওয়ার পর শিক্ষকদের আটকে রাখা কক্ষের তালা খুলে দেওয়া হয়।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রথম দাবি ছিল, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের খাতা পুনর্নিরীক্ষণের (বোর্ড চ্যালেঞ্জ) জন্য প্রয়োজনীয় খরচ শিক্ষকদের বহন করতে হবে। দ্বিতীয় দাবি ছিল, ২০২৭ সালে যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হয়েছে, সেসব বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ফরম পূরণের খরচও শিক্ষকদের বহন করতে হবে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদা বেগম শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এসব দাবিতে সম্মতি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

‘শিক্ষকদের গাফিলতিতে ছেলে ফেল করেছে’

ফলাফল নিয়ে ক্ষুব্ধ কয়েকজন অভিভাবক শিক্ষকদের পাঠদানে গাফিলতির অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় এক অভিভাবকের দাবি, শিক্ষকদের অমনোযোগ ও পাঠদানে গাফিলতির কারণেই তাঁর ছেলে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে।

স্থানীয় অভিভাবক ও ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আবুল হোসেনও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তাঁর বড় ছেলে এই বিদ্যালয় থেকে ভালো ফল করে এসএসসি পাস করেছে। কিন্তু শিক্ষকদের অমনোযোগ ও পাঠদানে গাফিলতির কারণে তাঁর ছোট ছেলে এবার ফেল করেছে।

তাঁর অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে আগে থেকেই অসন্তোষ ছিল। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর সেই ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।

প্রধান শিক্ষকের দাবি, নিয়মিত পড়াশোনা না করায় ফল খারাপ

তবে শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলাফলের জন্য শিক্ষকদের পাঠদানে গাফিলতির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদা বেগম।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষকেরা পাঠদানে কোনো গাফিলতি করেননি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনা না করায় ফল খারাপ হয়েছে।’

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, শুধু পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন না। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তাঁর ধারণা।

তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের দুটি দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

Manual1 Ad Code

৭৮ জনের মধ্যে পাস ২১

বিদ্যালয়ের এবারের এসএসসি ফলাফল নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েও নানা আলোচনা চলছে। বিদ্যালয় থেকে ৭৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করেছে মাত্র ২১ জন। অর্থাৎ ৫৭ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, পাস করা ২১ জন শিক্ষার্থীর কেউই স্থানীয় নয়; তাঁরা শহরের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী। এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফলাফল প্রকাশের পর এই পাসের হার ও অকৃতকার্যের সংখ্যা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার বিকেলে বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটে।

পুলিশ গিয়ে শিক্ষকদের উদ্ধার করে

শেরপুর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোহেল রানা বলেন, রামেরচর উচ্চবিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং শিক্ষকদের একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখার খবর পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়।

Manual4 Ad Code

তিনি বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষকদের উদ্ধার করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।

Manual5 Ad Code

পুলিশের উপস্থিতিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। পরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবির বিষয়ে আলোচনা হয় এবং দুটি দাবিতে সম্মতি দেওয়ার পর অবরুদ্ধ শিক্ষকরা মুক্তি পান।

শিক্ষার্থীদের ফলাফল ও দায় নিয়ে প্রশ্ন

একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৭৮ জনের মধ্যে ২১ জনের পাস এবং ৫৭ জনের ফেল করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার কারণ নির্ধারণে শুধু শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের এককভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পড়াশোনার পরিবেশ, অভিভাবকদের তদারকি, বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ এবং সামগ্রিক একাডেমিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর প্রভাব ফলাফলের ওপর থাকতে পারে।

Manual8 Ad Code

অন্যদিকে পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের একটি কক্ষে আটকে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি বা অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এদিকে বিদ্যালয়ের ফলাফল খারাপ হওয়ার প্রকৃত কারণ কী এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কতটা—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের যে অভিযোগ প্রধান শিক্ষক করেছেন, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রামেরচর উচ্চবিদ্যালয়ের এই ঘটনায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন করে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করার ওপরই এখন গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।